মঙ্গলবার, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে

স্নেহের তমাল,
ভালবাসা নিস। কেমন আছিস জানিনা। আর এ না জানাটা আমার সারা জীবনের চরম ব্যার্থতা। আমাকে ছাড়া তোরা যে কেউ সুখে নেই তা আমার ঢের জানা। কিন্তু এ ছন্নছাড়া জীবনে কিছুই করার নেই তোদের জন্য। মা, বাবা, মিতালী সাবাই কেমন আছে রে ? আমাকে কি তোর মনে পড়ে ? মনে না পড়াটাই স্বাভাবিক।

পর কথা হলঃ তোরা ভেবেছিলি আমি হইতো বেঁচে নেই। আর এটাই স্বাভাবিক, কারণ আমি তো কারো সাথেই কোন প্রকার যোগাযোগ করিনি, করতেও পারিনি। চিঠি খানা মায়ের কাছেই লিখতাম কিন্তু মা খুব কষ্ট পাবে তাই তোকে লেখা। তুই তো এখন অনেক বড় হয়েছিস। আমি জানি, ভাই হারানোর কষ্ট তুই এখন সইতে পারবি। মায়ের কাছে হয়তো শুনেছিস যে, আমি রাগ করে মাঝে মাঝে বাড়ি ছাড়া হয়ে যেতাম আর এবার বাড়ি ছাড়া হলাম বাবার ওপর রাগ করে। শেষ দিকে বাবা যে আমাকে মোটেও সহ্য করতে পারতেন না। তাই অবশেষে গ্রাম ছাড়া হলাম। চলে এলাম ঢাকায়। ভেবেছিলাম কিছু একটা করেই বাবার সামনে এসে হাজির হব। এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে কোন কিছু করতে পারলাম না। তখন প্রায় দিনই আমার না খেয়ে কাটতো। এখানকার মানুষ বড়ই নিষ্ঠুর। সিদ্ধান্ত নিলাম আর এদেশ নয়। একদিন সমুদ্র পথে জাহাজে করে আরও কয়েকজন বাংলাদেশির সাথে পাড়ি জমালাম গ্রিসের পথে। এর পর যা হবার তাই হলো। ব্রিটিশ সেনাদের হাতে ধরা পড়লাম তুরস্কে এসে। তারপর থেকে সেভাবেই আছি। নামের সাথে কী অদ্ভুত মিল দেখেছিস ? আমার নাম বাবা-মা আদর করে রেখেছিলেন কামাল পাশা। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস যে, আজ আমি সেই কামাল পাশারই দেশে। তাও আবার কারাগারে ! তোদেরকে চিঠি লিখব সে পয়সা তো আমার নেই ! এসব কথা ভেবে কেবল নীরবে চোখের পানি ফেলেছি। আজ একটু পরেই একজন মুক্তি পাবে। ফরহাদ ওর নাম। সে দেশে ফিরে যাবে, তাই তার কাছে আমার এই চিঠিখানা দিলাম। আমাদের বাড়িতে গেলে ফরহাদের একটু যত্ন নিতে বলিস মাকে। জানিস তমাল, আজ আমার না খুব করে তোদের কথা মনে পড়ছে বিশেষ করে মায়ের কথা । মা কেমন আছে রে ? বাবা এখন হয়তো আমার কথা মনে করে নীরবে কাঁদে, তাই না ? তোদের কথা ভাবতে ভাবতে আমার এখন দিন কাটে। আজ যে, বাংলা কার্তিক মাসের ১০ তারিখ সেটাও আমার মনে আছে। অথচ দেশে থাকতে সপ্তাহে কোন্ দিন কী বার তারও খবর রাখতাম না। আসলে এটাই হয় । বাইরে না এলে দেশের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ পায় না। আজ আমি হারিয়ে খুঁজে ফিরি। আমাদের গ্রামটা এখন কেমন হয়েছে রে ? আমি যদি আবার আমার প্রিয় গ্রাম রাজাপুর ফিরে যেতে পারতাম। গ্রামের মানুষ কি সব আগের মত আছে ? গ্রামের সেই বট গাছটা কেমন আছে, পূবের মাঠে এখনও সরিষা ফুল ফোটে কি না, বর্ষা এলে খালের পানি বাড়ির উঠোন ছোঁই কি না কিছুই জানিনা। বিলে কি আগের মত এখন আর টেংরা-পুটি পাওয়া যায় ? এখন আমার সেই চোখ আছে কিন্তু হাজার কাঁদলেও চোখে আর পানি বের হয় না। হয়তো ভাববি যে, কেন তোকে এসব কথা লিখলাম। তোর এসব জানানো দরকার কারণ জীবনে আমি যে ভুল করেছি তুই যেন তা না করিস। মা-বাবা আর নিজের গ্রামকে ভুলে যাসনে । গ্রামই হল মানুষের শিকড় । আর শিকড়কে কখনও ভুলতে নেই। বাবা-মাকে শ্রদ্ধাভরে ভালবাসিস। আমি তো এক হতভাগা ছন্নছাড়া। পারলাম না তোদের কাছে ফিরে যেতে। মাকে আমার কথা বলিস আর সালাম জানাস। পারলে আমার জন্য দোয়া করিস। ফরহাদের সময় হয়ে এসেছে। এ এমন এক জায়গা যে, মুক্তি পেলে আর কাউকে এখানে রাখে না। তাই মন চাইলেও চিঠি আর দীর্ঘ করতে পারলাম না। তোদের সবার মঙ্গল কামনায় এখানেই লেখার ইতি টানলাম।

তোর চির হতভাগা ছন্নছাড়া ভাই
কামাল পাশা