লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৫ মে ১৯৭৮
গল্প/কবিতা: ৭৮টি

সমন্বিত স্কোর

৪.১৭

বিচারক স্কোরঃ ২.৫৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৬ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftউচ্ছ্বাস (জুন ২০১৪)

জন্ম কথা
উচ্ছ্বাস

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.১৭

মামুন ম. আজিজ

comment ১০  favorite ১  import_contacts ১,৮২৩
এক.
দুপুরে খাবার পর এই সময়টা বড্ড অদ্ভুত লাগে। কিছুই যেন ভালো লাগে না নীলার। অথচ এই তো মাস চারেক আগেও দুপুর আর বিকেলের মাঝামাঝি এই সময়টার আলাদা এই বিরূপ মৌণতা ধরা দিত না। লাঞ্চের পর রোজ অফিসে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু হতো। কখন ছয়টা বাজবে সেই অপেক্ষার একটা তাড়া থাকত নীরবে। ব্যস্ততার মাঝে এক নিদারুন প্রশান্তি আছে। অথচ তখন ব্যস্ততা শেষে প্রতিটা রাতে সুপনের হাতটা শক্ত করে ধরার উচ্ছ্বাসটা এক সময় ভাটা পড়ত। দুই এক রাত বাদে আর সব রাতগুলোই সুপন আর নীলাকে সেই কষ্টে অশ্রু বিহীন কান্নায় ডোবাত। বিয়ের পর ছয় ছয়টা বছর পেরিয়ে যাবার পরও কোন বাচ্চা কাচ্চার খবর নেই। চেষ্টা তো সেই এক বছর পর থেকেই । কত পরীক্ষা নিরীক্ষা। কত ডাক্তার কবিরাজ।

আর আজ সেই পূর্নতা জঠরে পালছে নীলা। কত সুখ তাকে কাঁটাতারের বেড়ার মত ঘিরে থাকবে , তা না চেপে বসেছে এক নতুন নিঃসঙ্গতা। টিভির দিকে তাকিয়ে থাকতে একটুও ভালো লাগে না এই সময়টাতে। সুপনকে ফোন দিলে এক মিনিটের বেশি কথা বলতে পারে না। ঐ এক মিনিটেই খোঁজ নেয় কখন খেয়েছি, কোন কমপ্লিকেসি আছে কিনা। এই তো। ভালবাসা কোন কথা বলার সময় নেই। থাকার কথাও না সুপনের। সে কথা নীলা জানে। ব্যাংকে চাকরী তো সেও করেছে। ব্যাংক আলাদা হতে পারে। কিন্তু সুপনের মত ক্যাশ ইনচার্জ অফিসারের ব্যস্ততা তাই তার কাছে নতুন করে জানার মত কিছু নয় । এক মিনেটে নিজের আর পেটের ভেতরে বাড়তে থাকা বাচ্চাটার খোঁজ খবর দেয়ার পর বারন্দায় গিযে দাঁড়ায় নীলা।

খোলা চেখেই বদলে যায় বারন্দার ওপাশের সব দৃশ্য। আজ থেকে আরও শত বছর কিংবা আরও চার-পাঁচশ বছর আগে এই জায়গাতে কি ছিল- নীলার মন সে দৃশ্য দেখার চেষ্টা করে। হয়তো কোন মহরাজার মহারাণী পালকিতে বসেছিল। বেহারা পালকি কাঁধে দুলকি চালে এগিয়ে চলেছিল এইখানে কোন নির্জণ বন প্রান্তর দিয়ে। সবজবন, ধূসর মাটি, ধুলো উড়ছে সিপাহীদের ঘোড়ার ঘুরের। পালকি ঘিরে ধীম তালে ঘোড়া এগোচ্ছে। স্পষ্ট যেন দেখতে থাকে নীলা। পালকিতে বসা রাণীটিও তার মতই পোয়াতি। কিন্তু তার মত কেনো হবে। মহারাজ কি সুপনের মতো সমস্যায় আক্রান্ত। তাই কি হয়। মহারাজাদের গন্ডায় গন্ডায় রাণী, উপপত্নি। সন্তানও ডজন ডজন। নামের যেমন কাজেও তারা তেমন মহা যোগ্যের অধিকারী।

দূর কি সব ভাবনায় ঘোরে ফেরে। ঘরে ফিরে আসে আবার। পিঠে বালিশ রেখে খাটে বসে দেয়ালে হেলান দেয়। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ঢোলাঢালা কামিজচা উঁচু করে ধরে, নিজের সুন্দর ফর্সা পেটটাতে আলতো করে হাত বুলায়। আপন মনে হেসে ওঠে। পেটটা উঁচু হয়েছে। স্পষ্ট বোঝা যায় এখন। আর বড় হবে। সে মা হবে। ঘুচবে ছয় ছয়টি বছরের বন্ধ্যা অপবাদ। ভাগ্যিস সুপনের মত আধুনিক জামাইটা পেয়েছিল। না হলে শাশুড়ি আর খালা শাশুড়ি মিলে কবেই তার সতীনে সতীনে ভরিয়ে দিত ঘর।

সুপন তার মাকে কিছুতেই বোঝাতে সক্ষম হয়নি। এক্স ওয়াই ক্রমোজ থিউরির দিকে সুপন যায়নি। ওসব উনি বোঝার কথা নয়। সহজ ভাষাতেই বুঝাতে চেয়েছিল। বলেছিল - মা সমস্যাটা আমার, আমারই বাচ্চা জন্মা দেয়ার ক্ষমতা নেই। বীজের অভাব আমাতেই।

কে বুঝে সে কথা। ওদিকে আবার সুপনের ছোট খালা থাকেন পাশের পাড়াতেই। হরদম আনাগোনা। তারা কেবল বোঝেন - বউটাই বাঝা। পেটের থলি নষ্ট। তাদের কাছে একটাই সমাধান- ভালো থলি ওয়ালা একটা বউ। খালাতো মেয়েও দেখে ফেলেছেন কয়েবার।

ভাগ্যিস সুপন বোঝে। মাকেও না বোঝাতে পারার কষ্টটাও পায় আবার গভীর রাতে স্ত্রীর চোখও মোছে। নীলার এইতো অবর্ননীয় সুখ জীবনে। নাই বা হলো বাচ্চাকাচ্চা। কত জনেরই তো হয় না। মন কি তবুও মানে। হা হা করে ওঠে। খালা শাশুড়ি আসার সময় নিজের বড় ছেলের দু’বছরের মেয়েটাকে নিয়ে আসেন সাথে। খুব মিষ্টি মেয়ে। নীলারও ন্যাওটা। নীলা কালে নিলে খালা তেমন কিছু বলেন না ঠিকই তবে কেমন যেন একটা চাহনী হয় তখন তার। মাঝে মাঝে বলেও ফেলেন, দেখো বউমা, একটু সাবধানে, তোমার তো আবার ছেলেপুলে পালার অভ্যাস নেই। দু বছরের মেয়েটাকে জড়িয়েই একটু আড়ালে তখন কান্না টা একটু আসতে দিতে হয়। না হলে ওটা বাধই মানবে না।

আর আজ কত সুখ। পেটে তার আপন সন্তান পালছে সে। কোন মতে আর ছয়টা মাস। তার নিজের সন্তান। নিজের ডিম্বাণু হতে জন্ম নেয়া একটি শিশু তিল তিল করে বেড়ে উঠছে। একদিন বাতাসে আসবে, আলো দেখবে। হাসবে। কচি কচি আঙ্গুল পেচিয়ে ধরবে হাত। উফ্! ভেবেই শিউরে ওঠে তার শরীর।


দুই.
খালা শাশুড়ি সুপনের জন্য শেষ যে মেয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন তা ছিল তারই এক ননাসের মেয়ে। নাম তার নাতাশা। নাতাশা বিয়ের সাত মাসের মাথায় বিধাব হয়। তার স্বামী এক দুূর্ঘটনায় মারা যায়। স্বামীর মৃত্যুও শোক তার জন্য কঠিন ছিল। প্রেমের বিয়ে ছিল। তার উপর প্রেমে ছিল পাবিবারিক গভীর বাধা। সব বাধা মোকাবিলা করে তবে শেষে বিয়ে হয়েছিল। কপাল! টিকলো না। আরও দুর্ভাগ্য, স্বামী মারা যাবার সময় সে তিন মাসের প্রেগনেন্টন ছিলো। টিকলো না। মিস কেরেজ হয়ে গেলো। সে মেয়েও পণ করেছে আর বিয়ে করবে না। তবে তাকে যেমন করেই হোক রাজী করাতে পেরেছিল সুপনের খালা। সুপনতো শুনেই তেলে বেগুনে জ্বলে একাকার। নীলা চুপচাপ কেমন যেন হয়ে পড়েছিল সে সময়। কি করবে কিছু বুঝতে পারছিল না। কেবল তাকিয়ে ছিল সুপনের দিকেই। সুপন কিছু একটা করবে। খালার এই আগ্রাসন আর শাশুড়ি মা-র গোয়াতুর্মি সেই থামাবে। থামিয়েছিল। সুপনই নাতাশার সাথে দেখা করে। খুলে বলে। সমস্যা সব সুপনের নিজের সেটা নাতাশাকে বোঝাতে লাগলো মাত্র আধামানিট। নাতাশাতো কেঁদেই আকুল। বলে- বিয়েতে কি আর সে রাজী। তাকেও তো জ্বালিয়ে মারছে তারা।

এইসব নিয়ে খালার সেই যে অপমান বোধ জাগল আর মন খারাপ হলো, আর সে এ মুখো হয় না। হঠাৎ আজ কি মনে করে খালা এসেছেন বোনের সাথে দেখা করতে।

এসেই তো উচ্চ স্বরে শুরু করলেন- কি বউ, শুনলাম তুমি নাকি পোয়াতি হইছো। ভালো খুব ভালো। একটু খেয়াল টেয়াল রাইখো। প্রথম বাচ্চা। তা চাকরিটা ছাড়ছো তো।

কথা গুলো বলে নীলার দিকে একবার তাকিয়ে সুপনের মা-র ঘরে ঢুকে গেলো। খালার দৃষ্টির অর্থ ঠিক নীলা ধরতে পারলো না।

বোনের ঘরে ঢুকেই তার কাছে এগিয়ে গেলেন। কানের কাছে ফিস ফিস করে বলতে শুরু করলেন, বুবু তোমাগো তো জাত পাত গেলো, মাইনসে জানলে আমাগোর ধর্মও কি থাকবো। সুপনের তো বাচ্চা হবার ক্ষেমতাই নাই। হেইডা তো তুমি জানো না। আমার উনি খোঁজ নিছে। ঐ যে নাতাশার প্রস্তাব যে নিয়া আসলাম তারপর হেরে সুপন কইছে সুপনের ই বলে বাচ্চা হবার ক্ষমতা নাই। তোমার বউ বলে একদম ঠিকঠাক। কি কলি কাল জোয়ান পোলাও বলে ক্ষমতা ছাড়া। বুঝলা যেই ডাক্তাররে সুপন আর নীলা দেখাইতো হেইখানের এক এসিসটেন্টরে তোমার জামাই চেনে। হের কাছে খোঁজ নেয়াইছি। কথা নাকি সত্যই। তাইলে এইবার কও, এইবার হিসাব মেলাও ।কেমনে হইলো। কেমনে? অধর্ম ? অধর্ম।

যা, তুই এইসব কি কইছো? আমার তো মাথায় কিছুই ঢুকতাছে নারে।

ঢুকবো কেমনে বুবু। সুপনরে আইতো দাও। জিগাও হেরে। জিগাও। দেখি কি জবাব হের কাছে।


সুপন আসতেই মা তাকে ডাকলেন। নীলার হাতে ব্যাগটা দিয়ে সোজা মার ঘরে গিয়ে ঢুকলো। প্রথমেই চোখ পড়ল খালার উপর।

খালা তাইলে তুমি অবশেষে আসলা। খুব খুশি হয়েছি। খুব। যা হয়েছে ভুলে যাও। এখনতো খুশি হও সবাই। নীলা পোয়াতি। তোমাদের সবার দুশ্চিন্তা শেষ।

শেষ! সব জানছিগো সুপন। তুমিইতো কইছ তোমার বলে বাচ্চা জন্ম দেয়ার ক্ষেমতা নেই। কইছো না। কও? আমরা সব জানি। এখন কও নীলা তাইলে বাচ্চা পাইলো কই পেটে। ভালো কইরা দেখছো তো। টিউমার না তো আবার।

না খালা , সব ঠিকাছে। বাচ্চার অবস্থাও ভালো পেটে।

তাইলে কেমনে কি হইলো, তুমি তোমার মারে খুইলা কও। আমার সামনে কইতে না পারলে আমি ওদিকে যাই।

খালা, দূর তুমি আপন মানুষ। তোমার কাছে কি গোপন। ডাক্তারের পরামর্শে আমরা টেস্ট টিউব বেবি নিছি। এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানে এইসব খুব সোজা। টেস্ট টিউব মানে হলো- কেমনে বুঝাই। আসলে একজন ডোনারের শুক্রানু নিয়ে সেটা টেস্ট টিউবে নীরার ডিম্বানুর সাথে মিলিয়ে ভ্রুণ তৈরী করেছে, সেখান থেকে ভ্রুণ পরে নীলার পেটে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই হলো সংক্ষেপে প্রসেসটা। কিন্তু খালা বিষয়টা একটু গোপন থাকা দরকার। মানুষের মুখ তো। অপপ্রচার করে বেড়াবে। কি দরকার। আর কাউকে বলো না আবার।

তোমার খালু এইটাই কইছিলো। উনি অনেক জানে। শুনেই বুঝেছে। টেসট টিউব ফিউবের কথাই কইছিলো। হেয় তো আবার জানো পাক্কা পরহেজগার। ধর্ম কর্ম সব হের নখদর্পনে। হেয় কইছে এইটা ঠিক হয় নাই। এইটা বলে ধর্মের বিরোধী।

দূর! খালা। পৃথিবী অনেক আগাইছে। ধর্মে কোথায় টেস্ট টিউবের বিষয়ে সরাসরি বিধান আছে? ওনাকে কইও আমাকে দেখাতে। আর তারে আরও বলবা, সৃষ্টিকর্তা যদি এই পদ্ধতির বিপক্ষেই হবেন তবে টেস্ট টিউবের মধ্যে ঘটা একটি প্রসেসে আত্মার সঞ্চার হলো কি করে। আত্মা বা প্রাণতো সৃষ্টিকর্তাই কেবল সঞ্চার করতে পারেন, তাই না?

কি জানি বাপু। কি কইতাছ। তোমার খালু না জাইনা কয়নাই নিশ্চয়। কার না কার থেকে বাচ্চা হবার বীজ নিছ, বউ অন্য বেগানা পুরষের লগে থাকার মতো হইয়া গেলো না বিষয়টা।

খালা, প্লিজ এই নিয়ে আপনার সাথে আমার কিছু বলতে ইচ্ছা করছে না। আমি গেলাম। মা তুমি চিন্তা করবা না। যা হইছে ভালোর জন্যই হইছে।


তিন.
খালা জেনেছে। আর কি কেউ জানার বাকী থাকে। নীলার পেটে বাচ্চা পাঁচ মাস পড়তে না পড়তেই টেস্ট টিউবের কথা পুরো পাড়ায় চাউর হয়ে গেলো। কেউ কেউ এসে সাধু বাদ দিয়ে যায়। কেউ আবার ছিঃ ছিঃ করতেও ছাড়ে না। সামনা সামনি না পারলেও আড়ালে ছিঃ ছিঃ করা লোকের সংখ্যাই বেশি।

নীলা বোঝে। তবুও তার মনের মাঝে এক নতুন এই কষ্ট । বাচ্চা পেটে আসার পর যে তীব্র উচ্ছ্বাস জেগেছিল। তা যেন সমুদ্রের ভাটার মত নেমে গেছে। জোয়ার আর আসেই না। এর মধ্যে তানিশা একদিন এসেছিলো। খুব খুশি হয়েছে। বলেছে, ঘুনে ধরা সমাজের প্রতি এ তেমার আর সুপন ভাইয়ের এক চরম আঘাত। তোমরা লুকিয়ে রাখতে না পারার জন্য কষ্ট পাচ্ছ কেনো। ভালোই তো হলো। সমাজের চোখ খুলুক। কুসংস্কার সব দূর হোক। এই দেখো আমি আর বিয়ে করব না ঠিক করেছি। তা নিয়েও সমাজের জ্বালা। ঠিক করেছি একটা চাকরি নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাব। একটা এতিম বাচ্চা যোগাড় করে পালব। আচ্ছা এতিম বাচ্চা কেনো, আমিও তো একটা টেস্টটিউব বেবি নিতে পারি। কি বলো?

নীলা অনেকদিন পর সেই হেসেছিলো। বলেছিলো। স্বামী পাশে, তাই মানুষের মুখ বন্ধ করতে পারছি না। আর তুমি একা একা মেয়ে বাচ্চা পয়দা করবে। তবেই হয়েছে।

তানিশা বলল, দেখো ঠিকই আমি করে দেখাবো। আমাকে তোমাদের ডাক্তারের এড্রেসটা দাও তো।

নীলা দিয়েছিল এড্রেস। তানিশার সাথে আর দেখা হয়নি। কয়েকদিনের মধ্যেই সে সত্যি একটা স্কুলে চাকরি নিয়ে নেত্রকোণায় চলে গিয়েছিল। রাস্তাঘাটে বের হতে পারছিলনা। একেতো পেটটা হযেছিল বেজায় উঁচু। হাঁটতেই কষ্ট হয়। তারোপর মানুষের কানাঘুষা। বিরক্তির। সুপণকে বলেছিল, আগে যখণ কানে আসত তাকে কেউ বন্ধ্যা বলে গালি দিচ্ছে তখন যে কষ্ট হতো এখন যেন তার চেয়ে বেশি কষ্ট। কি লাভ হলো তবে।

সুপন বলেছিলো, বাচ্চা কি তাদের জন্য নিযেছি, নাকি তাদের কানাঘুষা বন্ধ করা জন্য। এতো কেবল তোমার আমার নিজের জন্য। আমাদের স্বপ্ন পূরণের জন্য। তবে আমারও কষ্ট হয়। এই এত কষ্ট তোমার । মাও বলছিলো তাকেও মানুষ বিরক্ত করে খুব এসব কথা বলে বলে। সব আমার জন্য। আমার একটা সমস্যার জন্য। তুমি আমাকে মাফ করে দাও নীলা।

ছিঃ সুপন। ছিঃ। এসব বলছো কেনো। চল বরং আমরা এই এলাকা ছেড়ে চলে যাই। আরও দূরে। অনেক দূরে। যেখানে কেউ কানাঘুষা শুনবে না।

সুপন পালাতে রাজী হয়নি প্রথমে। তবে আলোচনা করছিল দু’জন পালানোর বিষয়ে। ছোট পৃথিবী , পালিয়ে কোথায় যাবে। সন্তান নিয়েছেতো সম জে সুন্দর ভাবে একটা জীবন গড়ার জন্য। পালানোর জন্য তো নয় মোটেও।

কিন্তু দুশ্চিন্তায় নীলা ভীষন অসুস্থ হয়ে উঠছিলো। ডাক্তার ও বলছিলেণ, টেনশন না করতে। মা-ও আজকাল কেমন মন মড়া হয়ে থাক। নাতি হবার উচ্ছ্বাসেও তার ভাটা পড়েছে। খালার নিয়মিত প্যানপ্যানিতো আছেই। সুপন খুব বেশি ভাবতে লাগলো। ভাবলো মাকে নিয়ে ঢাকা শহরের অন্য প্রান্তে একটা বাসা ভাড়া করে চলে গেলে কেমন হয়?

পেটটা এখন খুব উঁচু হয়েছে। আটমাস চলছে। আল্ট্রাসোনোগ্রাফে স্পষ্ট টের পাওয়া গেছে পেটের ভেতর তার ছেলে সন্তান। সুপনের মা কিঞ্চিৎ খুশি হয়েছে সে কথা শুনে বোঝা গেলো। কিন্তু তার মনে তবুও খচখচ- কার না কার বাচ্চা-এটুকু সে বুঝেছে। সব মিলিয়ে নীলার মনের প্রশান্তি ঝড়ো বাতাসের মত এলোপাথাড়ি ঘোরে আজকাল। দূরন্ত শান্তির বারতায় মন ছুটে বেড়াতে পারে না।

বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে আছে নীলা। সময়টা সেই বিকেল আর দুপুরের মধ্যক্ষণ। খোলা চোখ। বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। নিজেকে উদাস উদাস লাগে। নিঃসঙ্গ লাগে। হঠাৎ আবার মনে হয় শত শত বছর আগে এইখানে যেন এক রাণীর পালকি থেমেছিল। এক ঘোড় সওয়ার দূত এসে খবর দিয়েছিল মহারাজা যুদ্ধে আহত হয়েছেন। তিনি তার পুরুষাঙ্গ হারিয়েছেন যুদ্ধে। মহারাণী কান্নায় ফেঁটে পড়েছেন। হঠাৎ সেই আঘাতে বনের মাঝেই তার প্রসব বেদনা উঠে গেলো। কি সুন্দর ফুটফুটে একটা বাচ্চা জন্ম নিলো। দূত দ্রুত সে খবর নিয়ে এগিয়ে গেলো। আহত রাজা যদি এই খবরেও কিছুটা প্রসন্ন হন। বাচ্চার দিকে তাকিয়ে রাণী মহারাজার কথা বেশি বেশি মনে করলেন। তবুও তিনি হাসছেন। নবজন্ম শিশুটাও হাসছে। হঠাৎ যেন রাণীর চেহারাটা হুবহু নিজের চেহারার সাথে মিলে যেতে দেখলো নীলা। ঠিক সে সময় পেটের মধ্যে নড়াচড়া টের পেলেন। ছেলেটা লাথি মারছে। জানান দিচ্ছে তার প্রাণের গতি। নীলার মুখে স্পষ্ট হাসির রেখা ফুটলো বহুদিন পরে।

এক চরম উচ্ছ্বাসে সে এক ছূটে ঘরে এসে ঢোকে। টেবিল থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে সুপণ করে কল করে বলে ওঠে-জানো ও না পেটের মধ্যে লাথি দিয়েছে, আমাদের সন্তান সুপন, আমাদের-আমি সব কষ্ট ভুলে গেছি সে উচ্ছ্বাসে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • রনীল
    রনীল নীলার গর্ভ হতে শিশুটি লাথি মেরে অস্তিত্ব জানিয়েছিল, আর গল্পের ভেতর লেখক প্রকাশ করলেন খুব সুক্ষ এক অনুভূতির কথা। এ সমাজে সুপন আর নীলাদের মত স্বপ্নবাজ মানুষের আবির্ভাব যেমন ঘটেছে, সে সাথে তাল মিলিয়ে খালারা যেন আরো তাদের পশ্চাৎপদ অবস্থানটি শক্তভাবে আঁকড়ে ধরছ...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ১ জুন, ২০১৪
  • এফ, আই , জুয়েল
    এফ, আই , জুয়েল # বেশ ভালো -----,, অনেক সুন্দর একটি গল্প ।।কবিতার চেয়ে গল্পের হাতই একটু বেশী পাঁকা । ধন্যবাদ ।।।
    প্রত্যুত্তর . ১ জুন, ২০১৪
  • জাকিয়া জেসমিন যূথী
    জাকিয়া জেসমিন যূথী একটা বিষয় খেয়াল করে মজা পেলাম। আপনার সব লেখার মধ্যেই ইদানিং ঐতিহাসিক বা রাজা প্রজা ঢুকে যাচ্ছে! গল্পটা খুবই ভালো লাগলো। টেস্টটিউব বেবি নিয়ে যে কুসংস্কার আর উচ্ছ্বাস বা বিষাদের দানা বাধে মানুষের মনে সবকিছুই উঠে এসেছে আপনার গল্পটায়। পছন্দের তালিকায় নিতে হবে।
    প্রত্যুত্তর . ১ জুন, ২০১৪
  • সালমা সিদ্দিকা
    সালমা সিদ্দিকা ভালো লেগেছে আপনার গল্প, টেস্ট টিউব বেবি নিয়ে এখনো অনেকে খারাপ ধারণা রাখে কিন্তু আপনার কথা সত্যি , যদি এটা পাপ হতো সেখানে আল্লাহ প্রাণ সৃষ্টি করতেন না. সুন্দর একটা বিষয়ে লিখেছেন, তবে গল্পে একটি চরিত্র প্রথমে নাতাশা ছিল, পরে লিখলেন তানিশা।
    প্রত্যুত্তর . ১ জুন, ২০১৪
  • মামুন ম. আজিজ
    মামুন ম. আজিজ গল্পে ২ অনুচ্ছেদেএকটি চরিত্র "নাতাশ", ৩য় অনুচ্ছেদে ভুল ক্রমে তানিশা হয়ে গেছে। ভুলটির জন্য মার্জনা করবেন প্রিয় পাঠক।
    প্রত্যুত্তর . ২ জুন, ২০১৪
  • রাজিব ফেরদৌস
    রাজিব ফেরদৌস কুসংস্কারের গালে দারুন এক চপেটাঘাত লক্ষ্য করলাম গল্পে। ধর্মীও গোড়ামিটাকেউ বশে ভালই মুখ থুবড়ে ফেলে দিয়েছেন। সুপন যখন অশিক্ষিত আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন খালাকে টেষ্ট টিউব বেবি সম্পর্কে বোঝাচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল, ইস সুপন কেন বলল যে অন্যের শুক্রানু দিয়ে বাচ্চা হবে? ...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ২ জুন, ২০১৪
  • আপেল মাহমুদ
    আপেল মাহমুদ গল্পের ভিন্নতা আর সুন্দর গাথুনী মুগ্ধ করলো। অনেক অনেক শুভকামনা মামুন ভাই।
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ৭ জুন, ২০১৪
  • ওয়াহিদ  মামুন লাভলু
    ওয়াহিদ মামুন লাভলু স্বপ্ন পূরণের চমৎকার গল্প। শ্রদ্ধা জানবেন।
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ৯ জুন, ২০১৪
  • সকাল  রয়
    সকাল রয় অন্যরকম ভালোএকটা লেখা
    প্রত্যুত্তর . ১৩ জুন, ২০১৪
  • ম্যারিনা নাসরিন সীমা
    ম্যারিনা নাসরিন সীমা চমৎকার থিমে লিখেছেন মামুন ভাই । ভাল লাগলো অনেক ।
    প্রত্যুত্তর . ২৭ জুন, ২০১৪

advertisement