এ্যা বদরের পো বদর। হালায় খালি মুহেই চোটপাট। ভুদ্দার পো ভুদ্দা গামলা গামলা খাও আর গামলা গামলা হাগো। তোগো জীবনডাই গেল এমনেরে।
দৌড়ে এসে বদরের বদনা ভর্তি পানি নিয়ে সুপুরি গাছের ঘন আবডালে যাওয়া দেখে কথাগুলো বলে ইসকান খাঁ। সকালবেলাই ভ্যাপসা গরম লাগছে। দেহের প্রতিটি রোমকূপ যেন জ্বলছে। মনে হয় কেউ যেন বাটনা মরিচ ডলে দিয়েছে। জোয়াল আর লাঙল উঠিয়ে নেয় ইসকান। বউয়ের উদোম পিঠ দেখা যায়। চাল বাছতে উপুর হয়ে আছে। ফর্সা পিঠের সৈকত জ্বলতে থাকে ইসকানের চোখে। দিনের আলোয় ইসকান্দরের তবনের সম্মুখ ভাগ তাঁবুর মত বেরিয়ে থাকে। আজ সে দ্বিতীয়বার ওদিকে ফিরে তাকাবে না বলে নিজেকে জোর করে হাঁটিয়ে নিয়ে যায় পুবের বিলে।
পায়ের বড় বড় পাতাগুলো ধূলায় ধূসরিত হয়। পরমুহূর্তেই মনে হয় বালিগুলো যেন খৈ ফুটছে। রাগে গজরাতে থাকে সে বদমেজাজি ষাঁড়ের মত। তবুও জমিতে পা রেখে বাঁচোয়া। মাঠে সেচের কারণে পানি জমেছে। ভাতিজা বতু কিছুক্ষণ আগে আনা গরুর কাঁধে জোয়াল লাগিয়েছে।
জোয়াল ঠিক মত না লাগলে ইসকানেরমেজাজ চড়ে যায়।
এই বতু হারামজাদা জোয়াল বান্ধা হইছেনি?
ইসকান্দর জানে জোয়াল বাঁধা না হলে, লাঙলে যুত হয় না। আর গরু দুটোও দিকদারি দেয়। ইসকান্দর নিজেই জোয়াল ঠিকমত বেঁধে নেয়। তারপর লাঙল ঠেলতে শুরু করে। এমনিতেই তার শরীরের রং কালো। রোদেপুড়ে আরো ছারখার হয়েছে। দিন দিন চামড়া পুড়ে আরো কালো হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পঁচিশের তাগড়া জোয়ানকি যেন শরীরটার মধ্যে উপচে পড়ে। সে তুলনায় রেজিয়া অনেক রোগা পটকা। পাঁজরের হাঁড়গুলো বেরিয়ে পড়েছে। চেহারাখান বৃষ্টি ধোয়া আকাশের মত ফ্যাকাসে।
শক্ত মাটিতে লাঙল ঠেলতে কব্জির জোর লাগে। সকাল বেলার পান্তার ঢেকুর ওঠে। ছোটমাছের চড়চড়ি বড় সোয়াদের তরকারি হয়েছে। গতকাল বেলা এগারটার দিকে বালিয়াহাটির বাজার থেকে চল্লিশ টাকা দিয়ে মাছগুলো কিনেছে। এমন সময় মনে সুখ নামে। জোলা পাড়ার সুফিয়ার কথা মনে পড়ে। শুধু তাদের গ্রাম নয়, গোটা ইউনিয়ন জুড়ে সুফিয়ার মতো মেয়ে হয় না। যেমনি চেহাড়া সুরত, তেমনি শরীর। মাশাল্লাহ! এক্কেবারে বোম্বের নায়িকাদের মতো। ডিম্বাকৃতির মুখ, মাথাভর্তি কালো চুল একেবারে হাঁটু পর্যন্ত।
বালিয়াহাটির মেলায় যখন গানের আসর বসে তখন তার চোখজোড়া থির হয়ে থাকে। তার খটখটে আগুনপোড়া চোখে কী সুধা পায় কে জানে? সবাই যখন গানে মগ্ন হয় তখন হাত ইশারায় সে ওকে ডাকে। প্যাণ্ডেলের আড়ালের নির্জনতায় ঝাপটে ধরে যে আদরটুকু করে তাতে মেয়েটি একবারে হকচকিয়ে যায়। কিন্তু কোন প্রতিবাদ আসে না। এক ধরনের আবেশে তখন তার সাহস অজগরের মত ফুঁসতে থাকে। কিন্তু হঠাৎ মেয়েটি জোর হাত করে ক্ষমা প্রার্থনা করলে ইসকান্দর কেমন মিইয়ে যায়। তাই আর কিছু বলে না।
কাইল বারডায় তোগো বাঁশবাগানের তলে আসপি?
ক্যা?
আসিস, কবানে।
সে বোঝে, তার ডাক উপেক্ষা করার মত শক্তি সুফিয়ার নেই।
সে মেয়েটির চোখের ভাষা পড়তে পারে। এই ডাকেই তো রেজিয়াকে গত বছর ঘরের বাইরে এনেছে। আজ বছর ঘুরে এল রেজিয়া তার ঘরে। সংসারে নতুন মুখ আসবে।
রেজিয়ার চোখে মুখে স্বপ্ন। রাতভর কানের কাছে প্যান প্যান করে। ছেলের নাম কী রাখবে, মেয়ের নাম কী হবে _ এই সব। মাঝে মধ্যে তার খুব রাগ ওঠে। আর সে রকম হলেই রেজিয়া বাপের বাড়ি চলে যায়। বাপের বাড়ি কাছে হলেও জ্বালা, দূরে হলেও জ্বালা। তবে কাছে হলে সুবিধা যে একবারে নেই তা সে বলতে চায় না। এটা-ওটা হলেই চলে আসে। ঠেকায় বেঠকায় ওবাড়ির চাল, ডালও চলে আসে সহজেই।
তো সে রাতেই সুফিয়াকে একান্তে কাছে পাওয়া। প্রথমে একটু গাইগুই করেছিল, পরে অবশ্য সমর্পিতা। সে কথা ভাবতে গিয়েই লাঙলের ফলা বাম পায়ে লাগে। বেশি কিছু না চামড়ার ছাল নুন উটে গেছে। লাল রক্ত চুঁইয়ে নামে। জ্বালা করে ওঠ্ ঠে;িক তখন বড় রাস্তা থেকে নারী পুরুষের সম্মিলিত কণ্ঠ শোনা যায়। কোষাভাঙার ওদিক থেকে একদল লোক আসছে। ইসকান্দর কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভাতিজা বতু জমির আল ধরে দৌড়ে আসে। হাঁপাতে হাঁপাতে ও বলে, কাকা, খায় গো হাতে লাগছে শিকদাররা, যাবা না?
-হ, তুই জোয়াল খুইল্লা গরু নিয় যা। আমি গেলাম।
বতু দেখে কাকা এক দৌড়ে বড় রাস্তায় উঠে গেছে। ইসকান্দর গলা উচিয়ে ডাকে, এ্যাই আয়নাল কাকা, বিল্লাল কাকা ঢাল কাৎরা নিয়া আসো। পুরুষরা আগে আগে যায় আর মেয়েরা ও বাচ্চা-কাচ্চারা পিছে পিছে। সবার চেঁচামেচিতে বাতাসে হট্টগোলের ডংকা। মানুষের স্রোতটা খুব দ্রুত এগিয়ে চলে। অাঁড়িয়াল খাঁর জেগে ওঠা নতুন চড়ে লেগে যায় মারপিট। শিশু আর মহিলারদের চিৎকারে আকাশ ভারি হয়ে ওঠে। নয়ন খাঁ গুরুতর জখম হলে রণে ভঙ্গ দেয় উভয় পক্ষ। অতঃপর নয়ন খাঁকে নিয়ে জমে মানুষে টনাটনি। সদরে নেয়ার আগেই নয়ন খাঁ পথে মারা যায়। থানায় খুনের মামলা হয়। শিকদার বাড়ির পুরুষেরা গা ঢাকা দেয়। পুলিশ এসে ঘুরে ফিরে কাউকে না পেয়ে ডাবের পানিতে সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যায়। এবার শুরু হয় পুলিশের সঙ্গে দরকষাকষি। প্রতিনিয়ত এবার অনেককেই দেখা যায় থানায় যাতায়াত করতে। ভিতরে ভিতরে সবাই খবর নেয় কে কি করছে। শুধু ফিসফাস চলতে থাকে একান আর ওকান। এ নিয়ে অনেকেই দালালি করেতে চায়। যতটুকু পারা যায় অন্যের পকেট খসাতে ব্যস্ত থাকে কয়েকজন। এদের মধ্যে ফিরেজের নামটা চলে আসে সবার আগে। কুটচালে ওর সঙ্গে কেউ পারে না। সহজেই ঝগরা লাগিয়ে দিতে ফিরোজ ওস্তাদ। গ্রামে ফিরোজের নাম ডাক আছে। দালালি সে যেভাবেই হোক আদায় করে নেয়। তাই তার দৃষ্টিটা থাকে সব সময় অন্যের পকেটের দিকে।

ইসকান্দর খাঁ কেমন ঝিমিয়ে থাকে। পুরো গ্রাম জুড়ে শোকের মাতম। থমথমে একটা ভাব। রেজিয়া বলে, অত চিন্তা করো কি? চিন্তা কইরা আমাগো কি? নিজের খাইয়া বনের মোষ তাড়াইতে যাইতে কয় কিডা? ঘরে চাইল - ডাইল নাই হেদিকে তো খেয়াল রাহো না।
ইসকান কোন কথা বলে না। বেড়ার চিপা থেকে বাঁশিটা নেয় তারপর নিকষ অন্ধকারে বেড়িয়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে সে পুবের মাঠে এসে থামে। বাদমের ঘন সবুজ পাতা থোক থোক অন্ধকারে ঢাকা। সে দিকে তাকিয়ে থেকে বুকের ভিতরে সে একধরনের কষ্ট অনুভব করে। মনে পড়ে যায় মায়ের কথা। মায়ের কাহিনি অনেকেই জানে। মায়ের ভাষ্যমতে, সে রাতে জোছনা ছিল না। 'বাঁশ ঝাড়ে বাদুরের পোলাপান ছোট্ট মানুষের মত গোঙইয়া কানবার লাগছে। এইর মইদ্যে রোকনের বউয়ের কান্দন।' সেই কান্নার শব্দেই তার ঘুম ভেঙে যায়। দরজা খুলে মা বাইরে আসেন। দেখেন বারান্দার থামে মুখ আড়াল করে রোকনের বউ কাঁদছে। মা জিজ্ঞস করে, এঁ্যা রোকনের বউ, কান্দস ক্যা হঁ্যা?
মা, একবার জিগায়
দুইবার
তিনবার।
রোকনের বউ কথা কয় না।
মা তাকে ধরতে চাইলে সে হন হন করে হাঁটা শুরু করে। মাও নিশি পাওয়া মানুষের মত পিছে পিছে যান। রোকনের বউ বড় রাস্তায় ওঠে। বাঁশ বাগানের নিচে নামতে থাকে। মার তখন সন্দেহ হয়। কিন্তু মা তাতেও দমেন না। দুর্দান্ত সাহসী আর শক্তিশালি মা রোকনের বউয়ের পিছে পিছে যান।

হঠাৎ করেই রোকনের বউ মার দিকে তেড়ে আসে। মা হকচকিয়ে যান। কিন্তু তাতে কী! শুরু হয়ে যায় মা আর রোকনের বউয়ের পাছরাপাছরি। মা বোঝেন তার সাথে এক অশরীরী আত্মার অসম যুদ্ধ চলছে। কিন্তু সেই আত্মা কিছুতেই পেরে ওঠে না। এদিকে ফজরের সময় হয়ে আসে। মা, ক্লান্ত আর বুঝি পারেন না। এক্ষুণি বুঝি অশুভ আত্মা মাকে কাদার মধ্যে গেড়ে দেয়। মা অশুভ আত্মার চালাকি বুঝতে পেরে তখনি চেঁচিয়ে ওঠেন, ইসকান, জামাল, ফোরকান তোরা বাইরে আয়রে বাপ।
মায়ের ডাক ছেলেদের কানে যায়। দৌড়ে বের হয় সবাই। মা কাদার মধ্যে আধাপুতা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। তবে কোমর বাঁকা। পরে মা বলেছিল, না পাইরা প্রেতাত্মা তারে কাদার মধ্যে চাপ দেয়। এতে তার পিঠের হাড় ভেঙে যায়। আসল উদ্দেশ্য ছিল মাকে মেরে ফেলানো। কিন্তু তা না হওয়ায় মার বড় একটা ক্ষতি করে দিল। তারপর মুমূষর্ু অবস্থায় মা বেঁচে থাকেন ছমাস। কত ডাক্তার,হেকিম কিছুতেই কিছু হল না। অবশেষে এক ঘনঘোর বর্ষার দিনে মা মারা যান। ইসকানের তখন বয়স মাত্র সাত বছর। ইসকান বাঁশিতে ফুঁ দেয়। দু চোখে লোনা জল খেলা করে। কতক্ষণ সময় কাটে বোঝে না। আচমকা কারো হাতের স্পর্শে চমকে ওঠে। কল্পনা নয়, রূপকথাও নয়, বাস্তব। শোনা যায়, বাঁশির সুর পরীকন্যা নেমে আসে। তাই চোখ বুজে ইসকান চমকে ওঠে। বাঁশির সুর বন্ধ করে না। যদি পরীকন্যা রেগে গিয়ে বাঁশিঅলাকে মেরে ফেলে। একটা ভয় থাবা মেরে কিছুক্ষণের জন্য তার রক্ত হিম করে দেয়।
অতঃপর পরীকন্যা কথা বলে, এই ইসকান ভাই যাবা না?
ইসকান ফিরে আসে নিজের ভিতর। বুকের ধুকপুকানিটা থামে।
হ, যামু
রাইত কয়ডা বাজে, জানো?
কয়ডা?
দশটা।
তাইলে চল।
দরগার বাজার। এখন আর এর অস্তিত্ত্ব টের পাওয়া যায় না। গাঙে একের পর এক গিলছেই। মুনাইর দরগা, হায়দার গোঁসাই কবর দরগা সব এখন রাক্ষসী পদ্মার পেটে। দরগা বাজার থেকে রাস্তাটা বেকে তারপর সোজা চলে এসেছে আবদুল্লাবাদ। আবদুল্লাবাদ হাই স্কুলের মাঠে হ্যাজাক ধরিয়ে প্যান্ডেল করা হয়েছে। গান হচ্ছে। সুরের মূর্ছনায় সবাই ঢুলছে। ইসকান ঘুরে ঘুরে মানুষ দেখে। অনেক মানুষ। গান শোনার জন্য প্রচুর মানুষের ভিড় জমেছে। সন্ধ্যারাতে ই তাই আসর জমে উঠেছে। গান শেষ হতে হতে রাত দুটো হবে। ইসকান, সুফিয়াকে নিয়ে আড়িয়াল খাঁর পাড়ে চলে আসে। বাদাম ক্ষেতের মধ্যে সে সুফিয়ার গায়ের গন্ধ নেয়। সুফিয়াও দীর্ঘদিন বুভুক্ষ ছিল। তাই ওদিক থেকেও খুব একটা বাঁধা আসে না।

জোয়াল ঠিক ঠাক মত না বসলে ভালভাবে মাটি চাষ হয়না। আর ভাল করে মাটি চাষ না হলে তাতে চারা উদগম হয় না।এক সময় দুটি শরীরের উত্তেজনা কমে। নিজেদের মধ্যে আলাপ- আলোচনা হয়।
ইসকান কা তুমি আমারে বিয়া করবা
ক্যা বিয়ার দরকার পড়ল ক্যা?
দেহদি কি কয়?
তয় কি কবে?
চুদমারানির পো, কাম করার আগে মেয়া মাইনষের মুত পর্যন্ত খাইতে পারো। কাম শেষ তোমাগো পোলাগো মিষ্টি মিষ্টি কথাও শেষ।
এদ্দে শোন রাগ করস ক্যা?
যাও, যাও তোমাগো বেবাকটিরে আমার চিনা আছে।
ইসকান সুফিয়াকে ধরতে গেলে সে আরো জ্বলে ওঠে।
খবরদার চুদমরানির পোলা গায়ে হাত দিবি না।
জামা কাপড় গুছিয়ে নিয়ে সুফিয়া অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। ইসকান অন্ধকারে ঝিম মেরে বসে থাকলে পেছনে কারো পায়ের শব্দ পায়। ইসকান হাঁক দেয়- ঐ কিডারে?
আমি বদর।
দূর হলার বেডা হালা।
এই কিডা, কাজাকাজি কর ক্যা?
তোর বাপে।
এদে এদি ইসকান কা। বিলের মইধ্যে বইসা রইছ ক্যা?
সুহে।
ধুৎ কাহা ফাইজলামি করো ক্যা? আকেটু দেরি করলে তো একসাথে ফিরতে পারতাম।
তোগো কোনায় ভাত-টাত কি কিছু আছে?
এদে কি কয়, এহনো কিছু খাও নাই কাহা?
নারে।
তাগাদা চলোদি, দেকপানে কি আছে, না আছে।
অনেকটা দৌড়ে বিল পাড়ি দেয় ওরা। নিরামিষ তরকারি আর আউশ ধানের মোটা চালের ভাত। গো গ্রাসে গিলে ইসকান। পেটের ক্ষিদেয় এই তরকারিকেই অমৃত মনে হয়। আর পেট পুরলে শরীরে নেমে আসে অবসাদ। বদর ওদের ওখানেই থাকতে বলে কিন্তু ইসকান থাকে না।
ঘরে ফিরে বিশেষ কৌশলে দরজা খোলে ইসকান খাঁ। আলগোছে শুতে গিয়ে বাপ দাদার আমলের চৌকিটা আর্তনাদ করে ওঠে। টান টান হয়ে শুয়ে পড়ে। চোখে ভাসে একজোড়া হালের বলদ। বলদ জোড়ার কাধে জোয়াল চাপিয়ে হাফটা দিচ্ছে। পেছনে কাদামিশ্রিত মাটি সমান হয়ে আসে। তাতে বীজ ছিটায়। কচি ধানের চারা হাওয়ায় দোলে। বাবার উথাল হাতে বীজ বোনার দৃশ্য চোখে ভাসে। গুক্ষুর সাপের মত পাশেই অাঁড়য়াল খাঁ। একের পর এক ভেঙে চলেছে। কত জনকে যে সর্বশান্ত করেছে, আর কতজনই যে পথের ফকির হয়েছে। তবুও নদীটার পেট ভরলো না। একটা দীর্ঘশ্বাস চাপে সে।
ভেবেছিল রেজিয়া ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু না,হঠাৎ ফোঁস করে ওঠে, কি রাইত পসাইছে নি? আর এট্টু থাকলেই তো হইত,ঘরে আসার দরকার আছিল নি।
ক্যাট ক্যাট করিস না কইলাম।
না ক্যাট ক্যাট করবে না। বউ রাইক্কা রাইত- বিরাইতে মাইনষের মেয়ারগা নিয়া গান হুনে, জানালা দিয়া কতা কয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা আর ঘরে আইলে লাট সাহেব, কতা কওয়া যাবে না। ভরণ পোষণের মুরদ নাই তার আবার বিয়ার শখ।
এই চুদমারানি থামলিনিরে, নাইলে দেহিসনে কি করি।
তুমি করবা কোন বালডা? মাইগ্গা বেডা কুনহারকার।

ইসকানের মাথায় ধা করে রক্ত চরে যায়। অনেকটা ধাক্কা মেরে খাট থেকে ফেলে দেয়। 'মা-গো' বলে একটা চিৎকার বের রেজিয়ার মুখ দিয়ে। এরপর রেজিয়া খুব করুন ভাবে দাঁদতে থাকে। ইনিয়ে বিনিয়ে বেশ মায়া লাগিয়ে কান্নার সুর পঁ্যাচিয়ে প্যাচিয়ে ওঠে। কান্নাটা ক্রমশ সংক্রমিত হতে থাকে ইসকানের বুকে। তখন তার অনুশোচনা হয়। ভাবে কাজটা ঠিক হয়নি। কারণ বউটা পোয়াতি। ঠাণ্ডা মাটিতেই রেজিয়া পড়ে থাকে। তার চোখ লেগে আসে। ঘুম নামে, গভীর ঘুম।

একজোড়া তাগড়া গরু। আম কাঠের জোয়াল। বিস্তীর্ণ জমি গরুজোড়া জোয়াল টানে না। আসলে জোয়াল ঠিকমত বসেনি। গরুর মূল শক্তি জোয়ালে। জোয়ালের অসুবিধার কারণে গরু দুটো কাবু। অথচ গরু দুটো তাগড়া। এই দৃশ্যের মধ্যে ইঠে আসে রূপকথার রাজকন্যা। সেই মেয়ের দেহের গাথুনি অটুট,স্বাস্থ্যবান। জোয়ালটিকে নেড়েচেড়ে ঠিকমত বসায়। হাতের মুঠোয় লাঙল নিয়ে গরু দুটোকে ছুটিয়ে দেয়। গরু গুলো এখন অনায়াসে ছুটে। ফালি ফালি মাটি চিরে ওঠে। ইসকান উঠে আসে রূপকথার মেয়ের হাত ধরে। না, যতোটা ভেবেছিল ততোটা শক্ত নয়। পুরুষের শক্তির তুলনায় মেয়েদের শক্তি কিছই নয়।

মেয়েটির সবল বাহু ইসকান চিনতে পারে। মেয়েটির চোখ, নাক, ভ্রূ, গলা সব কিছুই তার পরিচিত লাগে। হঁ্যা তো এই মেয়ে সুফিয়া। লম্বা মাথার চুল, গুরু গম্ভীর পশ্চাৎদেশ্ চুলের বেণী গুরু নিতম্বে বাম ডান, বাম ডান করে। ওকে দেখতে কেমন পুরুষখেকো পুরুষখেকো বলে মনে হয়। তবে সবাই বলে অন্যকথা। মেয়েটি খুবই মায়াবি । তার চেহারায় ছিল সতেজ মায়া। যে কেউ ওর মোহিনি রূপে মুগ্ধ হতে পারে। তবে যে কথাটি গ্রামবাসী চাউর করে বেড়ায় সেটি হল। মেয়েটির একটা বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পাঁচ মাসের মধ্যে স্বামীকে খুইেেয়ছে।তারকারনমেয়েটি। কি সে কারণ। কারণ হল,'সুফিয়ার জামাই ধ্বজ ভংঙ্গ,আর এদিকে সুফিয়ার ভাব হইছে জামাইর মাম তো ভইয়ের হাথে। এহন ঠেলা সামলাও। চোরের দশ দিন গৃহস্থের একদিন। সুফিয়া একদিন ধরা পড়ল জমাইর হাতে। হেই দুঃখে জামাই বাবাজি বিষ খাইয়া মরলো। সুফিয়ার পোলাপান নাই। তাই যথারীতি গ্রামে ফিরে আসে। আর সকলেই যে যা বলুক আড়ালে আবডালে সবাই সুফিয়ার কাছে ভিড়থে চায়। আর তা ছাড়া ওর আচার ব্যবহার খুব ভাল। তাই দিনকে দিন সুফিয়াকে নিয়ে মজার মজার কাহিনির জন্ম হতে থাকে। কেউ কাছে ভিড়তে পারে, আবার কেউ ভিড়তে পারে না। পথে যেতে যেতে কেউ এক টুকরো কথা বিনিময় করতে পারলেও নিজেকে সুখি ভাবে। তবে সবার চেয়ে ইসকান আলাদা। সুফিয়াকে সেই বধ করেছে। এবং সে কাহিনি অন্যদের কাছে জানা। তাই যুবক কূলে ইসকানের একটা সম্মান আছে।

সে রাতে ইসকানের ফুরফুরে মেজাজ ছিল। বউয়ের সঙ্গেও ভাব হয়েছে। অকারণে বউয়ের প্যানপ্যানানিও সে রাতে প্রশ্রয় পেয়েছিল। সকালে উঠে বদর-ই প্রথম খবরটা দেয়।
হুনছনি কাহা,
কি?
সুফিয়া কাইল রাইতে পলাইছে।
কিডা কইলো?
কিডা আবার কবে, আমি নিজে হুইন্না আইলাম।
ইসকানের জন্য তখনও মারাত্মক খবরটি অপেক্ষা করছিল। সে ভাবতেও পারেনি এমন একটা খবর পাবে সাত সকালে।
কার হাতে পলাইছে হুনবানি কাহা?
এই চোৎমারানির পোলা কতা এত টিপ্পা টিপ্পা কছ ক্যা, একচোডে কইতে পারছ না। ইসকানের মেজাজ ধা করে উঠে যায়।
ওর বুইনের জামাই জুলহাসের হাতে পলাইছে। ওর বুইন কানবা লাগছে।
এবার ইসকান কোন কথা বলে না। মুখখানা কেমন ছাই বর্ণ হয়ে গেছে। শুধু রেজিয়া ঠোঁট বাঁকায়। বলে, খাইলি তো খাইলি শেষ- মেষ বুইনের জামাইরে খাইলি! একটা কাক নারকেল গাছের ডালে কা-কা রব করতে থাকে। আর কারো সাড়া এই মুহূর্তে মেলে না।