মোবাইল ফোনের ব্যবহার মাহিনের জন্য কোনকালেই স্বস্তিকর ছিল না। তার মধ্যে ইদানিং এটা আরো বিরক্তিকর হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সকাল নেই, সন্ধ্যা নেই, রাত নেই যে কোন সময় এটা বেজে উঠতে পারে। এমনকি খাওয়ার মাঝখানে, মিটিং এর মাঝখানে মোবাইলের ডিস্টার্ব এখন নৈমিত্তিক ব্যাপার। আর মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডাররা ও যেভাবে প্রতিযোগীতায় নেমেছেন! বিশেষ করে কে কার চেয়ে কত কম কল রেট দিতে পারে। এই সেদিনের কথাই ধরা যাক। মাহিন ঢাকা থেকে আসছে। রাতের বেলা আসছে সোহাগ ভলভো তে করে। উদ্দেশ্য যাতে করে একটু ঘুমুতে পারে এবং সকালে অফিস করতে পারে। কিন্তু যেই বাজে ভলভো ছাড়লো অমনি শুরু হলো যন্ত্রনা। রাত বারোটার পর থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত ফ্রি। সেই সুযোগ নিতে পেছনের সিটের একটা ছেলে ঘ্যানর ঘ্যানর শুরু করেছে। কথা শুনে মনে হলো একটা মেয়ের সাথে কথা বলছে। এবং মেয়েটা কিংবা ছেলেটার এখন ও দেখা হয় নাই। মোবাইলেই পরিচয়। তো এরকম কথা হচ্ছে-
-কি করছো?
-ঘুমাইছো?
-তাইলে কথা কও ক্যামনে?
-তাইলে তুমি একটা মিথু্যক।
-আচ্ছা যাও তুমি মিথু্যক না।
-ভাত খাইছো?
-কি দিয়া?
-শুটকি খাও না?
-তোমাগো চিটাগাং এ শুটকি নাকি হেভী মজা।
-তা সিনেমাটা দেখছো?
-ক্যান দ্যাখো নাই?
-আমি কিন্তু মাইন্ড করছি।
-সত্যি কইছো! দেখবা! তাইলে আমি মাইন্ড করি নাই।
এভাবে কথা বলতে বলতে ছেলেটা মোটামুটি সকাল ছয়টা বাজিয়ে ফেললো। সেই সাথে বাসের অন্যদের ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। তো এ ধরণের মোবাইলঘটিত অনেক বিড়ম্বনার কারণে মাহিন মোটামুটি মোবাইলের উপর বিরক্ত। ওকে বোধ হয় কয়েকশো ছেলে মেয়ে এর ভেতেরে মিসকল দিয়ে, আলতু ফালতু মেসেজ পাঠিয়ে অতীষ্ট করে তুলেছে। ও একেকজনের সাথে কথা বলে আর মনে হয় একজন আরেকজনের চেয়ে বেশি ন্যাকা। আর টিভি চ্যানেলগুলো ও যা হইছে না। নাটক, টেলিফিল্ম এর নামে যা দেখাচ্ছে- উঠতি ছেলে মেয়েগুলোকে মোটামুটি ন্যাকামি, ছ্যাচরামির ষোলআনা শিখিয়ে দিচ্ছে।
এই কয়েকদিন ধরে নতুন একটা মেয়ে ফোন করছে। প্রথমে মিসকল দিতো, তারপর ম্যাসেজ পাঠানো শুরু করলো। কিন্তু ওর কোন রেসপন্স না পেয়ে শেষে একদিন ফোন করে বসলো। এখন প্রতিদিন ফোন করে। মাহিন পাত্তা দেয় না। তাই সংলাপ ও বেশিদূর আগায় না। আজ মাহিন চিন্তা করছে মেয়েটাকে একটু বাজিয়ে দেখবে। ও একটু ন্যাকামি করে দেখবে। তাই ফোনটা বাজতেই তুলে নেয়। মিষ্টি কন্ঠে বলে-
-হ্যালো।
-হ্যা-লো কেমন যাচ্ছে সব?
-ভালই। তোমার?
-ভাল। কি করা হচ্ছে?
-সেলে কথা বলা হচ্ছে।
-আর কি করা হচ্ছে?
-সেলে কথা বলা হচ্ছে, শুধু কথা বলা হচ্ছে আর কথা বলা হচ্ছে।
-দুষ্টু কোথাকার! বন্ধু হবা?
-হবো। সেজন্য কি করতে হবে?
-বন্ধু হতে হবে। সময় সময় খোঁজ নিতে হবে, দেখা করতে হবে, মাঝে মাঝে বড় বড় রেষ্টুরেন্টে খাওয়াতে হবে, এই অকেশন সেই অকেশনে উইশ করতে হবে, দামী দামী গিফট দিতে হবে।
-দামী দামী গিফট মানে?
-এই আরচিজ, হলমার্কস থেকে সুন্দর সুন্দর কার্ড কিনে দিতে হবে, আড়ং থেকে জামা, চকলেট, মিমি আরো আরো অনেক কিছু।
-আর কি করতে হবে?
-আমাকে নিয়ে প্রায়ই ঘুরতে যেতে হবে।
-কোথায়?
-ফয়েজলেক, পতেঙ্গা, রাঙ্গামাটি, কঙ্বাজার আরো নানান জায়গায়।
-আর কি করতে হবে?
-আমার খোঁজ খবর রাখতে হবে। আমাকে রাত বারোটায় ফোন করতে হবে। প্রতিরাতে আমার সাথে দুই ঘন্টা করে কথা বলতে হবে।
-এতক্ষন কি বলবো?
-যা ইচ্ছে তাই।
-মানে?
-যেমন শাবনুর, রিয়াজ, সালমান খান, ঐশ্বরিয়া, এঞ্জোলিনা, জনি ডোপ, ইত্যাদি কিংবা ব্রায়ান অ্যাডামস, লিংকিন পার্ক, ব্লাক, হাবিব, তাহসান যে কোন কিছু নিয়া কথা বলতে পারো। এমনকি হুমায়ুন আহমেদ, মীরা নায়ার, অরুন্ধতি এদের নিয়া ও কথা বলতে পারো।
-আচ্ছা! তুমি তো দেখি অনেক জানো।
-হু আরো জানি। যেমন তুমি শাহরিয়ার নাফিস, মাশরাফি, শচীন, আফ্রিদি, ক্রিষ্টোফার রোনালদো, বেকহাম, টাইগার উডস্ শারাপোভা এদের নিয়ে ও কথা বলতে পারো।
-বাব্বা আর কিছু বাকি আছে!
-হু আরো আছে- রাজনীতি, পলিটিঙ্,ইকনোমিঙ্, ডঃ ইউনুস সবকিছু।
-আচ্ছা ঠিক আছে সবকিছু মানলাম, তোমার বন্ধু হলাম এবং সবকিছু করলাম। এরপর কি হবে?
-কি হবে! আমার দু'জন একসাথে ঘুরবো, বেড়াবো, খাওয়া দাওয়া করবো। হেভী মজা করবো।
-এরপর।
-এরপর আর কি। আমি একটা আমেরিকান সিটিজেন ছেলেকে বিয়ে করে আমেরিকা চলে যাবো। সেখানে আমরা খুব সুখে থাকবো। খুব খুব মজা করে জীবন কাটাবো।
-তুমি আমেরিকা চলে যাবে মানে?
-তুমি কি বলছো! আমি আমেরিকা যাবো না! সারাজীবন এই পঁচা দেশে পড়ে থাকবো! কক্ষনো না। আমার স্বপ্নই হচ্ছে আমি আমেরিকার সিটিজেন বিয়ে করে আমেরিকা গিয়ে থাকবো।
-তাহলে আমাদের বন্ধুত্ব?
-সেটা যেমন আছে থাকবে। আমি তোমাকে মেইল করবো, ফোন করবো। তুমি আমাকে মেইল করবা, ফোন করবা। আর আমি যখন দেশে আসবো তুমি তখন আমাকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে যাবা।
-আচ্ছা।
-আর আমেরিকায় আমার খুব সুন্দর ফুটফুটে একটা ছেলে হবে। ভেরী কিউট। তোমার ও একটা কিউট মেয়ে হবে। আমার কিউট ছেলের সাথে তোমার কিউট মেয়ের বিয়ে হবে। আমি হবো তোমার মেয়ের শাশুড়ী।
-এ্যাঁ এর ভেতর ছেলে ও হবে!
-হুঁ।
-মেয়ে ও হবে!
-কেন হবে না! আমি বিয়ে করলে আমার ছেলে হবে না! তুমি বিয়ে করলে তোমার মেয়ে হবে না!
-হু। হবে। বেশ হবে। কিন্তু আমার যে মেয়ে পছন্দ না।
-কেন?
-কারণ মেয়েরা ছেলেদের পটায়।
-ছেলেরা বুঝি মেয়েদের পটায় না?
-পটায়। তবে ছেলেরা একটা মেয়েকে পটায়-দুইটা মেয়েকে পটায়। কিন্তু মেয়েরা পাঁচটা-সাতটা ছেলেওে পটায়-অনেক অনেক ছেলেরে পটায়।
-যাও তোমার সাথে আর কথা বলবো না। তুমি একটা আস্ত ফাজিল।
-তাই নাকি?
-তুমি একটা অসভ্য, বর্বর, ন্যারো মাইন্ডের লোক। তোমার সাথে কোন মেয়েরই কথা বলা উচিৎ না। তুমি একটা অশিক্ষিত। তুমি কোনদিন কোন মাইয়ারে বিয়া করতে পারবা না।
-হাঃ হাঃ তোমার ছেলের শাশুড়ীর সাথে কথা বলবা?
-ফাজিল, ইতর কোথাকার। নো মেরা ওয়ার্ডস উইথ ইউ।
লাইনটা কেটে যায়। এর ভেতরে শর্মি এসে রূমে ঢুকে। মাহিন বলে- আমরা অনেক ভাল ছিলাম-না!
শর্মি কিছু বুঝতে পারে না- মানে?
-কিছূ না চলো বারান্দায় যাই-জোছনা দেখি।
অদ্ভুত শুভ্র জোছনায় দুজনেই অন্য এক জগতে হারিয়ে যায়।