গল্পটিতে একটি শিশুর এতিম হওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৯ নভেম্বর ১৯৮৬
গল্প/কবিতা: ২৫টি

সমন্বিত স্কোর

২.৬৯

বিচারক স্কোরঃ ০.৮৯ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - শিশু (সেপ্টেম্বর ২০১৯)

গল্পের সেই ছেলেটি
শিশু

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.৬৯

মাহমুদুল হাসান ফেরদৌস

comment ২  favorite ১  import_contacts ৮১
রাতুল হাসান সৌখিন লেখক। প্রায়শই বিভিন্ন পত্রিকাও ও সাপ্তাহিক কাগজে তার লেখা বের হয়। পরিচিত মহল তার লেখাগুলো মনোযোগের সাথেই পড়ে এবং ভালো লাগা মন্দ লাগা অনূভূতিটুকু তাকে জানায়। আজও তার একটি লেখা একটি দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর থেকেই তার পরিচিত মহল তাকে ফোন করে তাদের অনূভুতির জানাচ্ছে। গল্পটি ছিল একটি ছোট ছেলেকে নিয়ে যার বাবা মা সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়। বেঁচে থাকে কেবল সেই শিশুটি একা। পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাটি একটি ছোট গল্প ছিল। যেখানে ছেলেটির পরিণতি উল্লেখ করা ছিল না।
রাতুল হাসানের লেখা পড়লে যে কেউ ভাববে এটি কোন একটি বাস্তব ঘটনা থেকে নেওয়া। সে তার গল্পকে এমনভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করে যে পাঠক প্রায়শই ধোঁকার ভেতর হাটতে থাকে এটি বাস্তব নাকি কল্পনা। এই গল্পটিও ঠিক সেভাবেই লেখা। তাই এই গল্পের পাঠকগণ ভেবেছেন এটি কোন একটি বাস্তব ঘটনা নিয়ে লেখা। তাই অনেকে রাতুল হাসানকে ফোন করে ছেলেটির জন্য সহানুভূতি জানাচ্ছে। অনেকে ছেলেটির ব্যথায় ব্যথিত। অনেকে জানতে চাচ্ছে ছেলেটি এখন কোথায় কার তত্ত্বাবধানে রয়েছে। কিন্তু এটি যে বাস্তব কোন ঘটনা নয় তা পাঠকদের বুঝাতে রাতুল হাসানের বেগ পেতে হচ্ছে। অনেকে আবার অবিশ্বাসের স্বরে জানতে চাচ্ছে এটি যদি কেবল গল্পই হয় তাহলে কিভাবে সে এই গল্প লিখল। এসব প্রশ্ন রাতুল হাসানকে লেখালেখির শুরুর অবস্থায় বিব্রত করত। কিন্তু এখন সে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। সে জানে অনেকে সাহিত্যকে কেবল সাহিত্য হিসেবেই দেখেনা। অনেকের কাছে সাহিত্য জীবনেরই একটি অংশ।
রাতুল হাসানের এক ভাবী যাকে সে মাধবী ভাবী নামে ডাকে যদিও উনার সাথে রাতুল হাসানের তেমন ভাব নেই। তিনি গল্পটি পড়ে রাতুল হাসানকে ফোন দিয়ে সরাসরি বললেন গল্পের সেই ছেলেটিকে উনার বাড়িতে নিয়ে যেতে, তিনি ছেলেটিকে এক বেলা খাওয়াবেন। যদি সম্ভব হয় তাহলে নিজের কাছেই রেখে দিবেন। উনার আবার নাকি-কান্নার স্বভাব। তাই গল্পটি পড়ার পর থেকে তিনি কেবল কেঁদেই চলছেন। যে করেই হোক তিনি সেই ছেলেটিকে চান। রাতুল হাসানের কোন কথায় তিনি শুনতে রাজি নন। রাতুল হাসান যতই বলেন এটি ছিল গল্প আর গল্পটি লেখা হয়েছে কল্পনা থেকে কিন্তু উনার ভাবীর বিশ্বাস কল্পনা থেকে এমন গল্প লেখা সম্ভব নয়। নিশ্চয় রাতুল কিছু লুকাচ্ছে। তাই যে করেই হোক তিনি সেই ছেলেটিকে চান। রাতুল বুঝাতে ব্যর্থ হয়ে বলল আচ্ছা আমি চেষ্টা করছি।
রাতুল হাসান পরিকল্পনা করে পথ থেকে কোন একটি ছেলেকে তুলে নিয়ে এসে তার ভাবীর হাতে দিয়ে বলবে এই সেই ছেলে এবং ছেলেটি এখন অন্য একজনের তত্তাবধানে রয়েছে, তাতেই হয়ত কাজ হয়ে যাবে। এটি ভেবেই সে বাসা থেকে বের হয়।
একজন ভালো লেখক হতে হলে সব ধরনের মানুষের সাথে মিশতে হয়। ধনী থেকে গরীব, শ্রমজীবি হতে পরজীবি সবার সাথে মিশে তাদের আচার আচরণ কথা বলার ধরন তীক্ষ্ণ নজরে মনের গভীরে ধারণ করতে হয়। তাতেই গল্পের বর্ণনাগুলো হয়ে উঠে একদম জীবন্ত ও বাস্তব। একজন ভালো লেখক হতে হলে ভালো ও বড় মনের মানুষ হতে হয়। যে মানুষ কখনো কাউকে ছোট করেনা, কখনো কাউকে আঘাত করেনা, কখনো কারো মনে কষ্ট দেয় না।
এতকিছু মেনে কেউ চলতে পারেনা কিন্তু রাতুল হাসান সবকিছু মেনে চলতে চেষ্টা করে। তাই সে কারো সাথে একবার মিশলে সে তাকে আপন করে নেয়। রাতুলের মেলামেশা সমাজের নিম্নস্তরে মানুষগুলোর সাথেই বেশী। সমাজের নিম্নস্তরের মানুষগুলোই তাকে কাছে টানে, তার কাছে মনে হয় যেন এরাই প্রাণ সম্পন্ন ব্যক্তি। সমাজের উচুস্থরের মানুষগুলোর সাথে মিশে সে যেন তাদের মাঝে কোন প্রাণ খুঁজে পায় না। তাই তার সমস্ত লেখায় সমাজের নিম্নস্তরের মানুষগুলো কষ্টগুলোয় বেশী উঠে আসে।
রাতুল হাসান বাসা থেকে বের হয়। সে একা পথ চলতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোদ করে। তাতে কারো কষ্টের কারণ হতে হয়না এবং মন যেখানে যেতে চায় সেদিকেই যাওয়া যায়। যার সাথে ইচ্ছে হয় মেশা যায়। পথে হাটতে হাটতেই তার সাথে পরিচিত একজনের দেখা হয়। তার নাম ইশান থাকে রাতুলের পাশের বাসায়। প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট গলায় ঝুলানোর পর এখন বেকারত্বের সার্টিফিকেট গলায় ঝুলিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। কিন্তু কোথায় কোন চাকরির ব্যবস্থা করতে পারছে না। এই বাজারে টাকা দিয়েই টাকা কামাতে হয় এই সহজ হিসাব ইশান বুঝতে চায় না। এজন্যই হয়থ তার চাকরি জুটে না। রাতুল হাসান অবশ্য ইশানকে এজন্যই পছন্দ করে। সে রাতুল হাসানকে সালাম জানিয়ে জানতে চায় "কেমন আছেন, রাতুল ভাই?"
এই প্রশ্নের উত্তর তার তৈরিই থাকে কারণ দিনে এই প্রশ্ন তাকে অনেকবারই শুনতে হয়। সে সব সময় একই রকম উত্তর দেয় তা নয় তবে কথার মূলভাবটুকু একই থাকে। আর এই প্রশ্নের উত্তরে সব সময় সত্যটুকু দেওয়া হয় না। অনেকসময় মানুষকে খুশী রাখতে মিথ্যা ভাবে উত্তর দিতে হয়।
এই যেমন এখন রাতুল হাসান মিথ্যা উত্তর দিল। সে বলল ভালো আছে। কিন্তু সত্যিই কি সে ভালো আছে? তার ভেতর যে চিন্তার ঝর বয়ে যাচ্ছে, মাথায় চিন্তার বোঝা নিয়ে কি কেউ ভালো থাকতে পারে!
ইশান রাতুলের কাছে জানতে চাইল, "কোথায় যাচ্ছেন?"
"বাচ্চা, খুঁজতে?" রাতুল আগ্রহহীনভাবে উত্তর দেয়।
"তাহলে কি আপনার গল্পের বাচ্চার কাহিনীটি সত্য! আমি ভেবেছিলাম এটি হয়ত একটি বানোয়াট গল্প" ইশানের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠে।
"হুম, সেটা বানোয়াট গল্প। এখন সত্যিকার গল্প খুঁজতে যাচ্ছি।"
"বানোয়াট গল্প, তাহলে আবার বাচ্চা খুঁজতে যাচ্ছেন কেন সেটা বুঝলাম না। আমি কি আসব আপনার সাথে?"
রাতুল তাকে নিভৃত করতে চাইলেও ইশান নাজোরবান্দা। সে রাতুল হাসানের সাথে এসে কিভাবে সত্যিকারে গল্প খুঁজতে যাচ্ছে তা সে দেখতে চাই। রাতুল হাসান তার আগ্রহকে মূল্য দিয়ে তাকে নিয়ে পথে হাটতে থাকে।

পথে ইশানকে সে জানাই কেন সে বাচ্চা খুঁজতে যাচ্ছে। ইশান তাকে জানাই এমন বাচ্চা পাওয়াতো দুষ্কর হবে।
"পথে তো অনেক শিশু আছে যাদের বাবা মা নেই। ফুটপাতে পরে থাকে, ফুল বেঁচে চলে।"
"তা আছে, কিন্তু তারা স্বাধীনভাবে চলছে তাই আবদ্ধ জীবনে থাকতে চাইবে না।"

রাতুল হাসান বুঝতে পারে মুক্ত পাখিকে খাঁচায় বন্ধি করে রাখলে তার সহজাত প্রভৃতি নষ্ট হয়। তবুও সে আশা করে ফুটপাতে পরে থাকা এসব শিশুকে বুঝাতে পারলে ও একটি নিশ্চিন্ত জীবনের সন্ধান দিতে পারলে তারা নিশ্চয় আসবে।

রাতুল হাসানের আশায় তারা হাটতে থাকে একটি শিশুর খুঁজে। যে শিশুটিকে তারা হয়ত ভবিষৎ দেখাতে পারবে। কিন্তু তাদের বেশীদূর যাওয়া সম্ভব হয় না। কিছুদূর সামনে রাস্তায় তারা অনেক মানুষকে জড়ো হয়ে থাকতে দেখতে পায়। কোনকিছু ঘটার পর সেখানে মানুষ ভীর না করাটাই রহস্যজনক। আর রাস্তার মাঝে এত ভীর তাহলে নিশ্চয় কোন দূর্ঘটনা ঘটেছে। তবে রাতুল হাসান ও ইশানকে সবচেয়ে বেশী যেটা অবাক করছে সেটা হলো ভীড়ের কেন্দ্রস্থল থেকে একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ আসছে।

রাতুল ও ইশান কি ঘটেছে দেখতে তাড়াতাড়ি ভীড়ের কাছে পৌছে। ভীড়ে কাছে গিয়েই জানতে পারে রাস্তা পার হওয়ার সময় ছুটন্ত ট্রাকের ধাক্কায় দুজন মারা যায়। মারা যাওয়া দুজন ছিল স্বামী স্ত্রী কিন্তু তাদের কোলের শিশুটি কোনভাবে বেঁচে যায়। রাতুল হাসান অবাক হয় কারণ পাশেই ফুটওভার ব্রীজ রয়েছে। ঐ ব্রীজ দিয়ে রাস্তা পার হলেই এই দুর্ঘটনাটুকু ঘটতো না। হয়ত ওভার ব্রীজ দিয়ে রাস্তা পার হলে একটু দেরী হবে বা একটু পরিশ্রম হবে কিন্তু তাতে জীবনতো বাঁচবে। রাস্তার উপর দিয়ে পার হতে হলেও তো দেরী হয়ই, লক্ষ রাখতে হয় গাড়ি কখন কম পরিমাণে আসবে, কখন গাড়ির গতি কম থাকবে। ততক্ষণে হয়ত সে ওভারব্রীজ দিয়ে রাস্তা পার হয়ে যেতে পারবে।

রাতুল আরো জানতে পারে নিহত স্বামীটি ছিল অন্ধ, সে তার স্ত্রী ও বাচ্চাকে নিয়ে ভিক্ষা করে চলতো। ভিক্ষাবৃত্তি সবচেয়ে সহজ পেশা যেখানে প্রয়োজন নেই কোন শিক্ষার আবার এটিই সবচেয়ে সহজ ব্যবসা যেখানে প্রয়োজন নেই কোন মূলধনের। তবে এই পেশা কিংবা ব্যবসায় প্রয়োজন কেবল হাত বাড়িয়ে থাকার মতো সাহসিকতা। আর এই পেশায় কোন সংকোচ থাকতে নেই। রাতুল হাসান অবাক হয় একজন অন্ধ ব্যক্তি কেন তার স্ত্রী সন্তান সবাইকে নিয়েই ভিক্ষাবৃত্তিতে বের হবে। তার স্ত্রীতো পারত অন্যের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করে অর্থ উপার্জন করতে অথবা কোন রেষ্টুরেন্টে রান্নার কাজ করতে। এই ব্যাপারগুলো রাতুল হাসানকে কষ্ট দেয়।

ভীড় সরিয়ে ভেতরে উঁকি দিতেই তারা দুজন দেখতে পায় জনগণ এসে লাশদুটো কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। লাশদুটোর পাশেই প্রায় দু বছর বয়সের একটি ছেলে বসে নিরলসভাবে কেঁদে চলছে। ততক্ষণে পুলিশের গাড়ি লাশ নেওয়া জন্য চলে আসে। লাশ গাড়িতে তোলার পর পুলিশ ছেলেটির ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। আশে পাশের সবাইকে জিজ্ঞ্যাস করছে এদের বাড়ির ঠিকানা কেউ জানে কিনা কিন্তু কেউই কিছু বলতে পারছে না। ছেলেটিও কান্না ব্যাতিত আর কিছু বলতে পারছে না। এই বয়সে এর তেমন কিছু বলতে পারার কথাও না।

রাতুল হাসান ইতমধ্যে সিদ্ধান্ত নেয় এই ছেলেটিকেই সে তার ভাবীর কাছে নিয়ে যাবে এবং ভাবীকে বলবে যেন একে তাদের কাছে রেখে দেয়। ইশানকেও সে একথা জানায় এবং ইশানও তাতে রাজি। তারা দুজন পুলিশকে তাদের ইচ্ছার কথা জানাতে গেলে পুলিশ রাজি হয়না।
"আপনারা বাচ্চা নিয়ে কি করবেন?" পুলিশ জানতে চায়। চোখে শন্দেহের দৃষ্টি। পুলিশের চোখে যেন সবাই অপরাধী।
"বাচ্চাটিকে আমাদের কাছে রেখে আমরা বড় করব" রাতুল হাসান উত্তর দেয়।
"এর আগে কয়টা বাচ্চা নিয়ে বড় করেছেন আপনারা?" পুলিশের চোখ থেকে শন্দেহের দৃষ্টি সরেনি।
"আগে একটিও নেওয়া হয়নি, এখন একটি বিশেষ প্রয়োজনে নিতে হচ্ছে"।
"আগে কি বাচ্চা সুবিধাজনকভাবে পাননি? নাকি বিদেশে পাঠানোর লাইসেন্স পেতে দেরি হইছে?" পুলিশ যাকে শন্দেহ করে তাকে সহজে বিশ্বাস করে না। অবশেষে রাতুল হাসান নিজের পরিচয় পুলিশকে দেয় এবং কেন তার বাচ্চা নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে সব বিস্তারিত বললে পুলিশ অফিসার তা বিশ্বাস করে। তাদের বাসার ঠিকানা রেখে দিয়ে অন্য একজন পুলিশ অফিসারসহ ছেলেটিকে নিয়ে তাদের মাধবী ভাবীর বাসার সামনে যায়। পুলিশ অফিসারটি তাদের সেখানে রেখে ফিরে যায়।

ছেলেটির কান্না এখন কিছুটা কমেছে তবে সে ক্লান্ত। দুচোখে লেগে রয়েছে ঘুম, হয়ত এখুনি ঘুমিয়ে যাবে। রাতুল তাকে নিজের কোলে তুলে রেখেছে। ছেলেটির পরনে ময়লা গেন্জি ও ছেড়া হাফ প্যান্ট। মাথায় উস্কশুষ্ক চুল। রাতুল হাসান মাধবী ভাবীর বাসার দরজায় কলিংবেল চাপে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর দরজা খুলে দেন আফসার সাহেব।
আফসার সাহেব মাধবী ভাবীর স্বামী। তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা।
"আরে রাতুল কি মনে করে?" আফসার সাহেব জানতে চান।
রাতুল ঘড়ি দেখে সময় বিকাল প্রায় সাড়ে তিনটা। আজতো কোন ছুটির দিন নয় তাহলে অসময়ে আফসার সাহেব বাসায় কেন?
"ভাবীর কাছে একটু প্রয়োজনে আসতে হলো। তা আপনি অফিসে যাননি আজ?" রাতুল জানতে চায়।
"শরীরটা ভালো যাচ্ছেনা, তাই চলে এসেছি। ভেতরে আসো তারপর কথা বলি। তা তোমার কোলের বাচ্চাটা কে?"
"ভাবী আনতে বলেছিল তাই এনেছি"। ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে রাতুল হাসান জবাব দেয়।
ভেতরে প্রবেশ করে রাতুল অবাক হয়। ঘরের মেঝেতে নতুন টাইলস বসানো হয়েছে। ঘরের দেয়ালে ঝুলানো হয়েছে ৩১ ইঞ্চি প্লাজমা টিভি। পাল্টিয়ে ফেলা হয়েছে সোফা ও ডাইনিং সেট, লাগানো হয়েছে এয়ারকন্ডিশন। সরকারি চাকরিজীবি হিসেবে তিনি অনেক ধন সম্পত্তির মালিক হয়েছেন কিন্তু উনাদের কোন সন্তান নেই।
ইশান ও রাতুল সোফায় বসে আফসার সাহেবের সাথে কথা বলতে থাকে। তখন মাধবী ভাবী এসে তাদের আলোচনায় যোগ দেয়। রাতুলের কোলের বাচ্চাটির দিকে নজর পরতেই মাধবী ভাবী বলে এই কি তোমার গল্পের ছেলে, দাওতো আমার কোলে দাও। রাতুল ঘুমন্ত ছেলেটিকে মাধবী ভাবীর কোলে দেয়।
"ওর গায়ে এত ময়লা কাপড় চোপড় কেন? কোথা থেকে ওকে কুড়িয়ে দিয়ে এসেছ?" মাধবী ভাবী জানতে চায়। রাতুল হাসান ও ইশান ছেলেটিকে কিভাবে পেল তার বিস্তারিত জানায়।
"ভাবী আপনাদের যেহেতু সন্তান নেই সেক্ষেত্রে আপনারা এই ছেলেটিকে নিজেদের কাছে রেখে নিজেদের সন্তানের মতো দেখাশোনা করতে পারেন" রাতুল প্রস্তাব দেয়।
"তাই বলে একটি ভিখারীর ছেলেকে রাখব" মাধবী ভাবী আপত্তি জানায়।
"তুমি চাইলে রাখতে পারো আমার আপত্তি নেই। আমাদের অবশ্যই একজন ভবিষৎ প্রতিনিধি দরকার" আফসার সাহেবও সম্মতি জানান।
"যাই হোক, আমি কোন ভিখারীর ছেলেকে পেলে পুষে বড় করতে পারব না। যদি দরকার হয় তবে অন্য কোথাও থেকে সন্তান দত্তক নেব।"
"ভাবী, ছেলেটির বাবা মা ভিখারী ছিল। এতে ছেলেটির কোন হাত ছিল না। সে ভিখারীর ঘরে জন্ম নিবে নাকি বড়লোকের আদরের দুলাল হবে তা বিধাতাই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এখন তার বাবা-মায়ের অপরাধে ছেলেটিকে দুরে সরিয়ে দেওয়া আমার দৃষ্টিতে ঠিক হচ্ছে না" ইশান পাশ থেকে ভাবীকে বুঝাতে চেষ্টা করে।
কিন্তু মাধবী কোনভাবেই ছেলেটিকে নিজের কাছে রাখতে নারাজ। তিনি বলেন "আমি ছেলেটিকে রাখলে বাহিরের লোকজন কি বলবে? আমাদের দিকে আঙুল তুলে বলবে সন্তান হয়না তাই ভিখারীর ছেলেকে ঘরে তুলেছে। আমি এসব কথা শোনতে পারব না। তাই তোমরা ছেলেটিকে অন্য কোথায় নিয়ে যাও"।
রাতুল হাসান লক্ষ্য করে মাধবী ভাবী চোখের কোণে জল ছল ছল করছে। তাই সে ছেলেটিকে নিজের কোলে নিয়ে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে যায়। রাতুলের পেছন পেছন ইশান বেরিয়ে আসে।
রাস্তায় হাটতে হাটতে রাতুলের গল্পের শেষ অংশটুকুর কথা মনে পরে যায়। যেখানে সে লিখেছিল "ছেলেটিকে সাথে নিয়ে আমি হাটতে থাকি অনির্দিষ্ট গন্তব্যের পথে। এই বিশাল ভূমন্ডলে বিধাতা সবার জন্যই একটি নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে রেখেছেন। নিঃস্ব এতিম এই শিশুটিও নিশ্চয় তার জন্য নির্ধারিত স্থানটুকু খুঁজে পাবে।"

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • কাজী প্রিয়াংকা সিলমী
    কাজী প্রিয়াংকা সিলমী গল্পটা খুব ভাল লেগেছে।
    প্রত্যুত্তর . ২ সেপ্টেম্বর
  • মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী
    মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী চমৎকার একটি গল্প উপহার দেওয়ার জন্য লেখককে সাধুবাদ জানাই। আপনি আপনার গল্পের ভিতরে বাস্তব গল্প লেখার যে চিত্রলিপি তা নিয়ে এসেছেন। আসলে কাল্পনিকটাই পাঠকের সামনে বাস্তবের মতো ফুটে উঠে। শেষে মাধবী ভাবীর কটুক্তি যেন সমাজের অহংকারীদের আক্রমণাত্মক গরীবদের প্রতি ব...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ১৭ সেপ্টেম্বর

advertisement