আসসালাতু খায়রুম মিনান নাওম
আসসালাতু খায়রুম মিনান নাওম।
মুয়াজ্জিন জসিম মোল্লার কণ্ঠ নিঃসৃত সুশীল আওয়াজ রূপার কানে ভাসছে। রাজছত্র পল্লব লতা শাঁখায় শাঁখায় আত্ম প্রসন্নতায় ঈষৎ কল্লোল প্রভায় জ্বলজ্বল বিগ্রহে অমোঘ ইশারায় বাতাসে দুর্বিসহ নেত্রে শুল্ক বাণীর তীক্ষ্ণ আভাস। অনুভবের ব্যাকুলতায় তান্ডবদাহ হার মানে নত দেহ শিরে। সংস্থাপিত ছায়ায় প্রভাত কোমল ছাপ রূপার নেত্রে অদৃষ্টে প্রবেশ করল। রাত্রির আঁধারে মৃত্যু ঘটল। নিষ্ক্রিয় মৌনতার ভাবনাগুলো আবার পূর্ব অবস্থানে জেগে উঠল। গতানুগতিক ভাবলেশে শ্লথগতিতে নীরবতার অদম্য শক্তি। রূপা আয়নার বিন্দু বিসর্গে দাড়িয়ে নিজেকে গভীর ভাবে আবিষ্কার করতে চেষ্টা করছে। হঠাৎ নজর কাড়ে মুখের চোয়ালের ডান পাশে কুচ কুচে কালো দাগটার উপরে। সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার পাহাড় উথলে উঠে। কি বিশ্রী দাগরে বাবা, রূপার লেপন চেহারায় দাগটা যেন পরম সৌন্দর্যের অপমৃত্যু। উদ্যোক্তার অভিশাপ।
গগণ জুড়ে প্রস্ফুটিত আলো। জানালার ফাঁকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রূপা দেখে বাবা জসিম মোল্লার কানে কানে ফিস ফিস করে কথা বলছেন। ফিস ফিস বাক্যালাপগুলো খুবই স্পষ্ট। পাশের রুম থেকে রূপার আর আড়ি পেতে শুনার প্রয়োজন হচ্ছে না। বাবাটা যে কি? বয়সের গভীরতায় বিচার বুদ্ধিও যেন তলিয়ে যাচ্ছে, দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছেন। ছেলেমানুষি ভাবটা প্রকট আকার ধারণ করছে। ফিস ফিস করে বলার মত কথা। ভাইসাব, পাত্র শিক্ষিত, মার্জিত, ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকুরী করে। বেতনও ভালো, বাবা রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার। আশে পাশে খোঁজ খবর নিয়ে জানলাম ছেলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। একটু দোয়া করবেন। এমন পাত্র যাতে হাতছাড়া না হয়। জসিম মোল্লা হেসে হেসে চায়ে চুমুক দিয়ে রাসভারি গলায় বলল- নিশ্চয়ই দোয়া করব.... আল্লাহ যেন আপনার খাস নিয়ত কবুল করে। আপনার মেয়ে তো কোন অংশে কম না। মাস্টার্স পড়ছে। মির্জা তরফদারের চোখেমুখে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠে।
বেলা ধীরে ধীরে বাড়ছে। শহর থেকে এক সপ্তাহ ছুটি নিয়ে ছেলে, ছেলের বউ, একমাত্র নাতি সানজিদ এসেছে। কাজের মেয়ে জুলেখা সানজিদকে নিয়ে ব্যস্ত। চোখেমুখে ভাব চাপা রেখে খেলছে। তবু সানজিদের শোকর নেই, একটু সুযোগ পেলে আম্মু আম্মু বলে চিৎকার করে। জুলেখা তখন অন্তরঙ্গ মনোভাবে কোলে তুলে নেয় সানজিদকে। বিশাল দেহাকৃতি আম গাছটার দিকে তাকিয়ে বলে- দেখ, দেখ সানজিদ ঐ গাছ, ডালে একটা কালো ভূত লুকিয়ে আছে। আমরা ওকে ধরে খপ করে খেয়ে ফেলবো। সানজিদ হাসে, অবুঝ মিষ্টি হাসি।
শান্ত বিকেল। বাতাসে বাতাসে সোনালী ধানের আভা ঝিলিক মারে। অস্পষ্ট কলগুঞ্জন। বড় আম গাছটার ছায়া দ্বিগুণ আকারে ধারণ করেছে। এলোমেলো বাতাসে সবুজ পল্লবগুলো নাচছে। মির্জা তরফদারের অস্থিরতার মাত্রা দ্বিগুণ বেড়ে গেল। লাঠি হাতে একবার পুকুর পাড়ে আরেকবার ঘরে, আবার পুকুরপাড়ে মন না মতি পায়চারি। আর যাকে যেখানে পাচ্ছেন উপদেশের নোলক দিচ্ছেন। এটা কর ওটা কর, এটা কর না, ওটা কর না। মনে মনে সান্ত্বনাসূচক হরেক রকম বালা মুসিবতের দোয়া দরূদও পড়ছেন। বাড়ীর পরিবেশ খণ্ড প্রলয়। লোক সমাগম ধীর গতিতে বেড়েই চলছে। তার মাঝে চার বছরের সানজিদ যেন যোগ সংযোগের দূত। কথায় কথায় কাঁদছে, কারণে অকারণে কাঁদছে, ধরলে আরো বেশী কাঁদছে। মাঝে মাঝে গায়ে হাত তুলছে, লাথিও মারছে, জুলেখা আদর করে কোলে নিতে চাইলে চট করে দেয় এক থাপ্পড়। থাপ্পড় খেয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে জুলেখা। সানজিদ এবার হাসে, হি হি করে হাসে, লাফিয়ে লাফিয়ে দুহাতে তালি দিয়ে হাসে। আম্মুর আঁচল টেনে টেনে হাসে। জুলেখা প্রথমে একটু রাগলেও এখন অবশ্য হাসছে, লজ্জার হাসি মনে হয়। মেয়েটি নিজের অবস্থান সম্পর্কে খুবই সচেতন।
সুনীল আকাশে শান্ত চাঁদের দীঘল আবেশ, বাতাসে এখন উত্তাপের গন্ধ নেই। রূপা হলুদ শাড়ী পড়ে খোঁপায় সোনালী রঙের কয়েকটি ফুল গুজে একেবারে পাত্রের মুখোমুখি লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বসে আছে। পাত্র পক্ষের অতিথিরা বিরতিহীন এক্রপ্রেসের মত এক একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে মারছে। প্রশ্নের ওজন বুঝে কিছু প্রশ্নের উত্তর (কর্তব্যবোধে) সাজ্জাদ দিতে লাগল। আর কিছু স্বয়ং রূপাকে দিতে হল। মির্জা তরফদার বাহিরে গদাইলস্করি চালে হাঁটছেন। সময় অপচয়ের হাঁটা। পুকুর পাড়ের নারিকেল গাছের ডালগুলো ঝির ঝির বাতাসে নড়ছে। পুকুরের মাছগুলো চুপি চুপি কথা বলছে। অলস মনে ভাবছে মির্জা তরফদার।
দেখতে দেখতে কেমন করে সোনালী দিনগুলোর মৃত্যু ঘটল। ক্ষণিকের জন্য টেরই পেলেন না। হাঁটি হাঁটি পা ফেলে দেহগুলো আজ কত বড় হয়ে গেছে। ভাবতে অবাক লাগে। সময়ের একচোটিয়া আধিপত্যে পৃথিবীর মানুষগুলো একেবারেই অসহায়। মির্জা তরফদার গদাইলস্করি চালে ঘরে প্রবেশ করলেন। টেবিলে সারি সারি আয়োজন। এতক্ষণে পাত্র পক্ষ (হয়ত) একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। ভাবের লেশে মির্জা তরফদারের তাই মনে হল। পাত্রের বাবা স্মিত সুরে মির্জা তরফদারকে কাছে ডাকলেন। ডাকটা শুনে মুখে মুচকি হাসির রেশ ফুটে উঠলেও অন্তরে ধক করে একটা ধকল খেলেন। বয়সের ধারে এখন তিনি খুব সহজে কিছু আগাম আঁচ করতে পারেন। কিছু প্রকাশ করেন, কিছু প্রকাশ করেন না। পরিবেশ থমথমে। দুপক্ষের গতি কমে এসেছে। আগ্রহের খাতায় ছিদ্র এখনো প্রকাশ পায়নি। কনের পক্ষে এখানেই স্বস্তি, ভরসা। কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কেউবা বসে আছে। হাসতে হাসতে দুপক্ষের মাঝে হালকা রসিকতা চলছে। এই ফাঁকে পাত্রের বাবা রূপার হাতে কয়েক হাজার টাকা গুছে দিলেন। এমন ভাবে দিলেন, উপস্থিত কৌতুহলী দর্শকদেরও টাকার অংকটা নজরে পড়ল না। মির্জা তরফদারের দুচোখে ব্যর্থতার গ্লানি। পরাজয়ের নির্মম হতাশা। ভেতর থেকে কয়েকজন পরিচিত নারীর সহানুভূতি উড়ে আসল রূপার কর্ণকুহরে। (বড় ভাই) মির্জা তরফ সাজ্জাদ লৌহ মানব আকৃতিতে দেয়ালে পিট ছেঁড়ে দাঁড়িয়ে রইল। অনুভূতিহীন, নির্লিপ্ত, জড়। নিজেকে শুধু বাবার মত অপারগতার কাতারে একজন সদস্য মনে করলো, আর কিছু না। জুলেখা কাঁদছে। এক এক করে টেবিলের সারি সারি আয়োজন সব সরিয়ে নিচ্ছে। মুখের ভাব দমিয়ে রাখতে সচেষ্ট হলেও চোখের ভাব দমিয়ে রাখতে পারছে না। ওড়না দিয়ে বার বার আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে।
রূপার রূপের সৌন্দর্যে পাত্রপক্ষের সবকিছু পছন্দ হল, শুধু সহ্য হল না মুখের চোয়ালের ডানপাশে কালো দাগটা।