লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ মে ১৯৬৮
গল্প/কবিতা: ১১৩টি

সমন্বিত স্কোর

৬.১৪

বিচারক স্কোরঃ ৪.০৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৬ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - কি যেন একটা (জানুয়ারী ২০১৭)

রামদুলালের ঢোল
কি যেন একটা

সংখ্যা

মোট ভোট ২৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.১৪

মিলন বনিক

comment ১৬  favorite ১  import_contacts ১,৪৩৪
আজ রামদুলালের দিনটা ভালোই যাবে মনে হচ্ছে।
মনটা বেশ ফুরফুরে। সকালটা খুব ভালো লাগছে। দেহে কোনো ক্লান্তি নেই। প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হয়, তাও হয়নি। প্রায়ই রাত জাগতে হয়। গতকালও সারারাত জেগে ছিলো। ঘুমাতে পারেনি। নির্ঘুম রক্তজবার মতো লাল লাল চোখু দু’টো দিয়ে সকালের সৌন্দর্যটা ভালোই লাগছে। ঢোলের তালটাই হচ্ছে রামদুলালের কাছে সকল ভালোলাগার উৎস।

অসহায় রামদুলালের ভালোলাগা, মন্দলাগা, সান্ত¦না সবটাতেই ভগবানের শ্রীচরণ। মনের সান্ত¦না, আজ হয়নি তো কী হয়েছে। আরেকদিন হবে। বাঁচতে তো হবে। আর বাঁচতে হলে গায়ে গতরে খেটে বাঁচতে হবে। উণা পেট, ভরা পেট যেদিন যাই হোক। সবই তাঁর ইচ্ছা। সম্বল বলতে একটা মাত্র জোড়খাই।

ঢোলে হাত দিলেই রামদুলাল একর পর এক ঢেউ তুলে। ফেনিল ঢেউ শন্ শন্ শব্দে খেলা করে তার আঙ্গুলগুলোতে। মোহনীয় জাদুর মতো ঢোলের টনটনে শব্দ তরঙ্গ। বাঁয়ার শব্দটা পরে গেলে আবার দড়ি টেনে সুর মিলিয়ে নেয়। ডানার বোলটা মোটা। আঙ্গুলের মাথায় প্লাষ্টিক টেপ প্যাঁচিয়ে বেতের সরু কাটি বেঁধে তালের জাদু দেখায়। সাথে ঘন কালো বাবড়ি চুলের দুলুনি মানুষকে মোহিত করে রাখে।

ঢোলের সাথে রামদুলালের সখ্যতা রাধা কৃষ্ণের প্রেমের মতোই। তবে রামদুলালের তুলনা ভিন্নরকম। তার মতে “ঢোল হচ্ছে আমার প্রথম বউ, প্রথম ভালোবাসা। এই জোড়খাইয়ে যেদিন তাল উঠবে না, সেদিন রামদুলাল আর পৃথিবীতে থাকবে না”।

পৈতৃক সুত্রে পাওয়া এই ঢোলের সাথেই রামদুলালের আজন্ম বেড়ে ওঠা। স্ত্রী রাধারানীকেও একই ভাবে তালিম দিয়েছে। বিয়ের পর থেকে বার বার বলে এসেছে, “ও রাধা, এই ঢোল হইলো আমার প্রথম বউ। আমার এই বউটারে কখনও কষ্ট দিবা না। কখনও পর ভাববা না। তাইলে মনে করব, তুমি আমারেই কষ্ট দিতাছ।”

রাধারানীও আইজতক কখনও এই বুড়ো সতীনটাকে বাঁকা চোখে দেখিনি। রক্তচক্ষু দেখায়নি। যখনই সময় সুযোগ পেয়েছে, ঢোলটাকে রোদে দিয়ে দড়ি টেনে রেখেছে। শাড়ির আঁচল ভিজিয়ে ঢোলের কাঁচায় জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার করেছে। হাতের তালুতে সরিষার তেল মেখে ঢোলের চামড়ায় লাগিয়ে তা আবার রোদে শুকিয়েছে। ঢোলের গায়ে যখন সরষের তেল মাখাতো রাধারানীর বেশ ভালো লাগতো। মনে হতো যেন নিজের নাদুস নুদুস ছেলেটাকে রোদে বসিয়ে গা টিপে টিপে তেল মাখাচ্ছে। রাধারানী এসব ভাবতো আর হাসতো। রামদুলাল বাউনি থেকে আসলে ঢোলের কাপড়টা খুলে ধুয়ে মুছে রোদে শুকিয়ে রাখতো।

সংসারের বাইরে একাজগুলো রাধারানীর কাছে কখনই বাড়তি কিছু মনে হয়নি। কষ্টও মনে হয়নি। এই ঢোলটাই যেন এ ঘরের লক্ষী। বিয়ের পর প্রথম বাসর রাত। ছোট্ট বেড়ার ঘর রামদুলালের। ছনের ছাউনির ফাঁক দিয়ে ফুটফুটে চাঁদের আলো এসে পড়েছে বাসর ঘরে। রাধারানীও সেই আলো দেখছিলো। এমন সময় বাইরে বারান্দায় বসে ঢোলে তালিম দিচ্ছিল রামদুলাল। অপূর্ব মোহনীয় সেই তাল। লিকলিকে দশ আঙ্গুলের মোহনীয় জাদু। চাঁদ দেখার সাথে রাধারানী ঢোলের বাজনার একটা যোগসুত্র খুঁজে পেয়েছিলো। রাধারানীর চোখে মুখে আনন্দের আভা ফুঠে উঠলো। ভগবানের কাছে প্রার্থণা করলো “এমন আনন্দ যেন সারাজীবন থাকে”।

ঢোল গলায় নিয়ে বাসর ঘরে ঢুকলো রামদুলাল। এবারের তালটা কোমল, মিষ্টি। কড়কড়ে টনটনে শব্দ নেয়। ধীরলয়ে বাজছে। ছোট ছোট বোল। একবারে ডিমেতালে এক অপূর্ব মাধুরী। কী মিষ্টি সেই সুর, তাল, লয়! ঢোলের বোলগুলো যেন চুপিচুপি কথা বলছে রাধারানীর সাথে। রাধারানীও জেলের মেয়ে। ছোটবেলা থেকে ঢোলের সাথে বেড়ে উঠা। ঢোলের যে এত মোহনীয় জাদু থাকতে পারে, তা আজ বুঝলো। ঢোলটা যেন সুরে সুরে তার মনের কথাগুলোই রাধারানীকে বলছে-
“আমি তোমায় নিয়ে বৃন্দাবনে, এবার হবো ব্রজবাসি,
আমি ব্রজবাসি হবো-----
তোমায় নিয়ে আমি ব্রজবাসি হবো।
মাঠে মাঠে, হাটে ঘাটে, বাজিয়ে প্রেমের মোহন বাঁশি,
তোমায় নিয়ে বৃন্দাবনে, এবার হবো ব্রজবাসি।”

বাজনা শেষ হলো। ঢোলটাকে ছুঁেয় দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করে মাথার দিকে বেড়ার সাথে ঝুলিয়ে রাখলো।
রামদুলালের হৃষ্টপুষ্ট বলিষ্ঠ শরীর। মাথা ভর্তি বাবড়ি দোলানো ঝাঁকড়া কালো চুল। চিকচিকে কালো কুচকুচে শরীরে তার চেয়েও ঘন কালো লোমশ বুক। বলিষ্ঠ শরীর দুলিয়ে কাঁধ পর্যন্ত চুলটা যেভাবে নাড়া দিয়েছিলো, তাতে রাধারানীর দেহমন চনমনে হয়ে উঠেছিলো।

সেদিন রাধারানী ঘন লোমশ বুকে কীভাবে মুখ লুকিয়েছিলো তা মনে পড়লে আজো গা শিউড়ে ওঠে। শেষতক রাধা চেয়েছিলো পালিয়ে বাঁচতে। লোকলজ্জার ভয়ে তাও সম্ভব হয়নি। সারারাত হারিকেন জ্বালিয়ে তেল খরচ করার প্রয়োজন পড়েনি। চাঁদের আবছা আলো আঁধারিতে রামদুলাল সমস্ত সুখ ঢেলে দিয়েছিলো রাধারানীকে। পাশেই খর¯্রােতা হালদার শন্ শন্ শব্দ যেন শাঁখ বাজিয়ে সারারাত পাহারা দিচ্ছিল। এই হালদার সাথে মিশে আছে রামদুলালের জীবন ও জীবিকা।

হালদার বাঁকে ডোমখালি হয়ে নতুন শাখা মেলেছে মগদাই খাল। শুরুতেই নদীর পাড়ে রামদুলালের ছোট্ট কুঁড়েঘর। রাতে শুয়ে নদীর জোয়ার ভাটার কলকল ধ্বনি শোনা যায়। জোয়ারের পানি যখন বাড়ে কিংবা ভাটার টানে পানি যখন নামতে শুরু করে তখন হিজল কিংবা পিটলি গাছের শিখড়ের সাথে জলের ধাক্কা লেগে সুন্দর এক জলতরঙ্গের সৃষ্টি হয়। এই সময়টাতে রামদুলাল খালের মোহনায় ঝুপড়ি জাল বসিয়ে রাখে। রাধারানী এসে মাঝে মাঝে দু’টো খুদ খুড়া ছিটিয়ে দেয় জালে। তাতে ক’টা গলদা, ট্যাংরা, বেলে, বাতাসি মাছ উঠে আসে। গলদা কিংবা বেলে মাছ পেলেও সচরাচর খাওয়া হয় না। রামদুলাল ঐ ক’টা মাছ বাঁশের ঝাঁকিতে করে মগদাই বাজারে নিয়ে যায়। ভালো দামও পাওয়া যায়। তাতে টানাপোড়েনের সংসারে কিছুটা হলেও অভাব ঘুছে। চাল, ডাল, নুন, তেল, মরিচ এসব কিনতে হয়। পরিবারের পাঁচটা অভাবী মুখ রামদুলালের একার দিকে চেয়ে থাকে। রামদুলালের গতর আছে। খাটাখাটুনিও করতে পারে।

রামদুলালের বাবা হরিপদ বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছেন। ঘর থেকে বের হতে পারে না। প্রায়ই ঘরে বসে থাকে। জেলেপাড়ার নিয়মানুযায়ী হরিপদ জাল বাউনি দল থেকে অবসর নিয়েছেন। তাই বলে কাউকে বিমুখ করতে নেই। এখন দলের সর্দার সুখলাল। বাউনি থেকে ফিরে সুখলাল একজনকে দিয়ে পেঁজা-গোঁজাসহ তলা কুড়ানো কিছু পাঁচমিশালি মাছ পাঠিয়ে দেয়। তাতে কাদা-মাটি আর পুকুর পঁচা পাতার সংখ্যায় বেশি। রাধারানী ওগুলো নিয়ে খালের পাড়ে ছোট্ট উঠোনে বাঁছতে বসে। কুটা-বাঁছা শেষ হলে একটু পাঁচমিশালি মাছের ঝোল রান্না হয়। সবাই তাজা মাছের ঝোল খেয়ে ভগবানের নামে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে।

ছেলে বাসুরামের বারো বছর হলো। স্থানীয় এনজিও স্কুলে থ্রি পর্যন্ত লেখাপড়া শেষ করে ইস্তফা দিয়েছে। এখন বাপের সাথে নৌকার ছইয়ে বসে গতর খাটে। মেয়ে শশীবালা ক্লাস থ্রিতে। দূরের কোনো গাঁ থেকে যখন বিয়ের বায়না আসে তখন রামদুলালের সাথে বাসুরামকেও সাথে করে নিয়ে যায়। তাতে কিছুটা লাভও আছে। আস্তে আস্তে ছেলেটার তালিমও হলো। পেট ভরে দু’টো ভালোমন্দ খেতেও পারলো।

একটা কাপড়ের থলেতে রামদুলালের লুঙ্গি, গামছা আর বাজনার পোষাক নিয়ে বাবার সাথে সাথে থাকতে হয়। বিয়ের বাজনার আলাদা পোষাক থাকে। জরির আস্তর লাগানো। মনে হয় রাজা-বাদশার পোষাক। সেই পোষাক পরলে রামদুলালের খুব গর্ব হয়। নিজেকে রাজা রাজা মনে হয়। রামদুলালের প্যান্টের কোমড়ের সাইজ অনেক বড়। তাই কোমড়ের সাইজে প্যান্টের হুকের সাথে পাটের সুতলি বেঁধে নেয়। কোনো সময় রাধারানীর শাড়ির ছেঁড়া আঁচলও বেঁধে নিয়ে আসে।

এই পোষাকে রামদুলাল কাঁধে জোড়খাঁই ঝুলিয়ে যখন বোল তুলে তখন তার দশ আঙ্গুলে রীতিমতো ঝড় উঠে। নিজের কাপড়টাও খুব ভারি মনে হয়। ছেলেটা থাকলে থলেটাও সামলে রাখে। বিয়ে বাড়ির অথিতিরা দাঁড়িয়ে ঢোলের তালে তালে রামদুলালের বাজনা শুনে মুগ্ধ হয়। কোমড় দুলিয়ে রাদুলালের নাচ দেখে। খুব সুন্দর করে নাচতে পারে। সেই সাথে বাবড়ি চুলের চমক। বাপের সাথে বাসুরামও তালে তালে কোমড় দুলায়। এক আধটু নাচে। রামদুলালও ছেলের সাথে ঘুরে ঘুরে বাজনার তালে তালে নাচতে থাকে। দলের লোক কম থাকলে সর্দার ঢাউস সাইজের খঞ্জনিটা বাসুরামের হাতে ধরিয়ে দেয়। তাতে বিশ পঞ্চাশ টাকা পায়।


ঢোল বাজানোর কেরামতির জন্য রামদুলালের কদরও বেশি। বিয়ে-শাদীতে ঢুলি বায়না করার সময় অনেকে শর্ত জুড়ে দেয়, রামঢুলির জোড়খাঁই থাকতে হবে। শর্তের কারণে দরদামটাও একটু বাড়িয়ে নেয়। রামদুলাল নিজের গ্রামের দল ছাড়াও বাইরের দলের সাথে বায়না করে। বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। এই পরিচিতির জন্য রামদুলাল জলদাসকে এখন সবাই রামঢুলি হিসাবেই চেনে।

বাড়ি বলতে খালের পাড়ে রামদুলালের পৈতৃক ভিটেটুকু। নদীর এপাড়টাই ভাঙ্গন ধরেছে। ভাঙ্গন ধরেছে রামদুলাল আর রাধারানীর মনেও। আস্তে আস্তে নদীর এপাড়টা বীলিন হয়ে যাচ্ছিল। তিল তিল করে ভাঙ্গনের শব্দ শুনতো রাধারানী। ভিটিটা উঁচু হলেও বারান্দার বেড়ার নীচ থেকে যেদিন একদলা মাটি ধপ্ করে খসে পড়লো সেদিন রাধারানীর বুকে কে যেন শক্ত নুড়ি পাথর বার বার আঘাত করেছিলো। দৌঁড়ে নদী পাড়ের অশ্বথ তলায় সাক্ষাত মগদেশ্বরীর মন্দিরে ছুটে গিয়েছিলো রাধারানী। জোড়া মোমবাতি জ্বালিয়ে মানত করেছিলো, “মা, এবারের মতো রক্ষা করো। ছেলে মেয়ে নিয়ে কোথায় যাবো”?

মা মগদেশ্বরী রক্ষা করতে পারেনি। কয়েকদিনের মাথায় ভেঙ্গে পড়েছিল পুরো ঘর। বাধ্য হয়ে হালদার পাড়ে জেগে উঠা চরে গিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখলো। কোনোরকমে চারটে বেড়া দিয়ে ঘর বাঁধলো। সহায় সম্বল নেই। একমাত্র সম্বল ঢোল। স্থানীয় প্রশাসনও অনুমতি দিলো। তাতে কিছুটা ভরসা পেলো। শুরু করলো নতুন জীবন।

মেম্বার শফি রামদুলালের মতো নদীভাঙ্গা আরো অনেকের সাহায্যে এগিয়ে এলো। সেই সাথে ঘরপিছু পাঁচহাজার টাকা করে মেম্বারকে দিতে হবে। তাও এক বৎসরের মধ্যে। একেবারে অলিখিত চুক্তি। উপায়ান্তর না দেখে রাজী হতে হলো রামদুলালকে। কোথায় যাবে? রামদুলাল জানে, এক বৎসর কেন? পাঁচ বছরেও সেই দেনা পরিশোধ করতে পারবে না। ধার দেনার সাথে অভাবী মানুষের সখ্যতা ঘরের বউয়ের চাইতেও বেশি। তারা অনুনয়-বিনয়, কাকুতি-মিনতি করে ধার নেয়, পরে আর শোধ করা হয় না। সারা জীবন সেই ধার দেনার বেড়াজালে আটকে থাকতে হয়।

তাই হয়েছিলো। নতুন চরে নতুন জীবন শুরু করে কিছুটা দাঁড়াতে পেরেছিলো রামঢুলি। ঢোল বাজানোর সুখ্যাতি তার আকাশ ছোঁয়া। সে আর কতদিন। যতদিন গতরে জোড় আছে ততদিন। একসময় বাসুরাম হয়তো সেই ঢোল তুলে নেবে। এমনকি ধার-দেনার ভারটাও।

ঘরের চালাটা বাঁশের খুঁটি দিয়ে শক্ত করা হয়েছে। বার বার বেড়া পাল্টাতে হয়েছে। স্থানীয় এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বেড়া পাল্টে মাটির দেওয়াল তুলেছে। তাতে কয়েকবছর লেগে গেলো। এদিকে পাঁচহাজার টাকার জন্য শফি মেম্বারের চোখ রাঙানি। বার বার শাসিয়ে যাচ্ছে, “হয় টাকা দে, নয়তো উচ্ছেদ করবো”। নদীর চর সরকারের খাস জমি। উচ্ছেদ করলে সরকার করবে। মেম্বার কে? ভীষণ ক্ষেপে গেলো মেম্বার। “একচোট দেখে নেবে” বলে হুমকি দিলো মেম্বার। বিচার হলো। বিচারের রায় মেম¦ারের পক্ষে। দফে দফে সুদ সমেত পাঁচ হাজার টাকায় আট হাজার টাকা ফেরত দিতে হবে। তাও আট মাসে।

আবারও অন্ধকার। কোনো কুলকিনারা নেই। সম্বল বলতে রাধারানীর একটা স্বর্ণের নথ, দু’টো নাকফুল আর দু’আনি ওজনের একজোড়া কানফুল। রাধারানী তাই দিয়ে প্রথম কিস্তির টাকা শোধ করতে চাইলো। রামদুলাল না করে দিয়ে বলেছে, “না খাইয়া থাকবো, তবু তোর ওইগুলা বেঁচতে পারবো না। কিছুইতো দিতে পারি নাই, বেঁচবো কোন আক্কেলে?”।

এই সপ্তাহে পর পর চারদিন বিয়ের বায়না আছে। দুটো বিয়ের লগ্ন। অধিবাস সহ চারদিন। বর পক্ষের দাবী, “রামঢুলির জোড়খাঁই থাকতে হবে”। পরপর চার রাত নির্ঘুম কাটাতে হবে। সাথে বাসুও থাকবে। নেচে গেয়ে একটু মন ভরাতে পারলে কিছু বকশিষও পাওয়া যাবে। বায়নার বাইরে গৃহস্থরা খুশি হয়ে কিছু দিলে সেটা বাড়তি পাওনা। অনেক সময় ভূজ্যদান হিসাবে কিছু চাল-ডাল, তরি-তরকারি দেয়। সাথে নগদ কিছু দক্ষিনাও দেয়। চাল-ডাল দিয়ে অন্তত দু’একদিনের খাওয়াটা চলে যায়।

প্রথম বিয়েটাতে আসর মাত করে দিয়েছে রামদুলাল। ঢোলের যতরকম খসরত, যত জারিজুরি আসে সব উজাড় করে দিয়েছে। সেই সাথে বাসুরামও খঞ্জনি হাতে ঢোলের তালে তালে নেচে সবাইকে মুগ্ধ করে দিয়েছে। বকশীষটাও পেয়েছে ভালো। আসর থেকে একজন উঠে এসে প্রথমে রামদুলালের গলায় একটা একশ টাকার নোট আলপিন দিয়ে গেঁথে বুকের সাথে ঝুলিয়ে দিলো। তারপর বাসুরামের গলায়ও একশ টাকার নোট। তারপর বাপবেটার সে কী নাচন। পুরো আসর শুদ্ধ মানুষ পাগলের মতো একতালে নাচছে। এমন আনন্দ বাসুরাম কখনও দেখেনি। নাচ থামিয়ে রামদুলাল বাসুরামের মাথায় হাত বুরিয়ে বললো, “বাপরে এই টাকা দিয়ে তুই তোর ইচ্ছামতো কিছু কিনে খাবি”।
পরের বিয়েটাতে রামদুলালের শক্তি সাহস আরো বেড়ে গেলো। যেভাবে হোক এই আসরটা শেষ করে মেম্বারের প্রথম কিস্তির টাকাটা শোধ করতে হবে। না ঘুমানোর কোনো ক্লান্তি নেই। সাথে বাসুরাম আছে। সেও খুব খুশি। সেও মনে মনে ভাবছে, “এই আসরে বাড়তি কিছু বকশীষ পেলে, বাবার হাতে দেবে”।

বরযাত্রী এলো। দলীয় বাজনার পর শুরু হলো রামদুলালের ঢোলের যাদুকরি খেলা। ঘুরে ঘুরে সে কী বাজনা! সাথে খঞ্জনি হাতে নাচছে বাসুরাম। এখানেও বকশীষ জুটলো। দু’শো টাকা। আনন্দে রামদুলালের চোখে জল এলো। এ যেন ভগবানই সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। মনে সাহস এলো। গামছার কোণা দিয়ে চোখের জল মুছে ভাবলো, “এবার দেনাটা শোধ করতে পারবো। মেম্বার আর আমাদের তুলে দিতে পারবে না”। কাঁধের ঢোলে হাত ছুঁইয়ে মাথায় ঠেকিয়ে প্রণাম করলো।

এবার বিয়েতে বসবে বর কনে। কী নিয়ে যেন বাক-বিত-া শুরু হলো। প্রথম প্রথম বিষয়টা উভয় পক্ষের কানাঘুষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। একসময় তুমুল কথা কাটাকাটি। বরের বাবা বাড়িশুদ্ধ লোকের সামনে এসে ষ্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, “নগদ টাকা এখন না দিলে, ছেলে বিয়ের পীড়িতে বসবে না। এই আমার সাফ কথা”।

লগ্ন বয়ে যাচ্ছে। সময় থেমে থাকছে না। টিক সময়ে লগ্ন ধরতে না পারলে বিয়ে হবে না। মেয়ে লগ্নভ্রষ্টা হবে। কনের বাবা হাজারো কাকুতি মিনতি করেও কোন সুরাহা করতে পারছে না। বার বার মিনতি করে বলছে, “দাদা, যেভাবে হোক, আমি শুভরাত্রির দিন আপনার হাতে টাকা পৌঁছাবো। আমাকে দয়া করুন”।

দয়া হলো না। এক পর্যায়ে হাতাহাতি। মারামারি। চেয়ার ছোড়াছুড়ি। যে যেদিকে পারছে পালিয়ে যাচ্ছে। রামদুলালও তার সবেদন নীলমনি বাসুরাম আর জোড়খাঁইটা নিয়ে কোনোভাবে পালিয়ে বাঁচলো। ক্লান্ত অবসন্ন শরীর মন নিয়ে অনেকটা পথ পায়ে হেঁটে যখন সোনাপুর বাজারে এলো তখন সবেমাত্র পুবাকাশে ভোরের লালচে আভা উঁকি মারছে। লোকজন ফজরের নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে যাচ্ছে। নাঙ্গল জোয়াল কাঁধে নিয়ে ক্ষেতে যাচ্ছে কৃষক। গৃহিনীরা সবেমাত্র বাড়ির চারপাশে গোবর ছিটা দিয়ে বাড়ি সূচি করে নিচ্ছে। বাজারের দোকানপাট তখনও খোলেনি।

রামদুলাল বাজারের মাঝখানে বসে বিড়বিড় করে মুখে ঢোলের বোল তুলছে। বাসুরাম জিজ্ঞাসা করলো, কি বাবা, বাড়ি যাইবা না? রামদুলাল চোখ বড় করে তাকায় বাসুরামের দিকে। বাসুরাম ভয় পেয়ে যায়। বাবার এ চোখের চাহনি তার অচেনা লাগে।

ঢোলটা কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় রামদুলাল। পাগলের মতো ঢোলের তাল তুলছে একের পর এক। আশে পাশে কেউ নেই। বাসুরাম অবাক হয়ে দেখছে। বাবার হাতের এমন জাদু বাসুরাম কখনও দেখেনি। ভাবছে, “বাবা কি পাগল হয়ে গেলো?” রামদুলালের কোনোদিকে খেয়াল নেই। চোখ দুটো বন্ধ। দেখতে দেখতে চারিদিকে অসংখ্য মানুষ। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছে। কেউ কেউ বলছে, “রামঢুলির আজ হঠাৎ এ কী খেয়াল হলো?”। একসময় রামদুলাল ঢোলসমেত মাটিতে লুটিয়ে পরে। ঢোলের বোলের রেশ তখনও কাটেনি। সমঝদার লোকজন সমস্বরে বলছে, “বাজাও---বাজাও----ঢোল তুলো---বাজাও----”।

বাসুরাম ঢোলটাকে প্রণাম করে কাঁধে তুলে নিলো। তখন পূবের আকাশটা আরো বেশি ফর্সা হয়ে উঠলো।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement