লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ মে ১৯৬৮
গল্প/কবিতা: ১১৩টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৬৭

বিচারক স্কোরঃ ১.৮৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগভীরতা (সেপ্টেম্বর ২০১৫)

একদিন অন্যদিন
গভীরতা

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৬৭

মিলন বনিক

comment ৬  favorite ১  import_contacts ১,১২৬
হিমু আগামীকাল চলে যাবে।
মনে হলো কথাটা কেউ একজন পেছন থেকে বলে দ্রুত সরে গেল। শৈবাল পেছন ফিরে দেখল। কারও ছায়া দেখতে পেল না। অথচ কথাটা ষ্পষ্ট কানে বাজছে। হিমু চলে যাবে, হিমু মানে হৈমন্তি। কথাটি বার বার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। শৈবালের প্রতিবিম্ব^টি আয়নায় স্থির হয়ে আছে। প্রতি উত্তরে কিছুই বলতে পারছে না। শুধু এটুকু উপলব্দি করতে পারছে, আমি একজনকে গভীর ভাবে ভালোবেসেছি। যে কথাটি এতদিন মনের গভীরে অস্পষ্ট ছায়া ফেলেছিল, আজ সেটিই যেন স্পষ্ট হয়ে মনটাকে ভীষণ ব্যথিত করে তুলল।

যাবে যাক। তাতে কী হয়েছে? এই ভেবে মনটাকে সান্তনা দেবার চেষ্টা করল। মনের গভীরে একটা ক্ষুদ্র আলোকশিখা জ্বলে উঠে আবার মূহুর্তেই নিভে গেল। অর্ন্তনিহিত বেদনায় নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করল। বুঝতে পারছে না, আসলে এই মূহুর্তে কী ঘটল। মনে হলো, কষ্টের রাত শেষে সকাল হতে এখনও অনেক সময় বাকী। এ দীর্ঘ রাত কাটবে কীভাবে?

নিজের কাজে মনোযোগ দিতে পারছে না। কেবল মনে হচ্ছে, সময় ফুরাচ্ছে না। শরতের মেঘের মত শেভিং ক্রিমের শুভ্র ফেনাগুলো মুখমন্ডলে শুকিয়ে চৌচির হয়ে আছে। তাতে মনে হচ্ছে দাড়ি গোঁফে ভর্তি মুখটা যৌবন হারিয়েছে। দ্বীতিয়বার শেভিং ক্রীম লাগানোর প্রয়োজন মনে করেনি। ইচ্ছাও নেই। ফ্যাকাশে মুখের উপর খুরের আঁচড় পড়ল। চোয়াল থেকে থুত্নি বরাবর একটা প্রশস্ত রাজপথ তৈরী হয়েছে। মনে হচ্ছে, দু’চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামবে। নামল না। মনের কোণে সাঁজিয়ে রাখা স্বপ্ন গুলো যেন কাল বৈশাখীর প্রস্তুতি নিচ্ছে। যে কোন মূহুর্তে সব লন্ড ভন্ড করে দেবে।

ইচ্ছা হল, এক্ষুনি টুটি চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করি-হিমু কোথায় যাবে? কেন যাবে? তার কিছুই করল না। চোখ দুটি জলে ছল ছল করে উঠল। আয়নায় ভালো ভাবে নিজেকে দেখার চেষ্টা করল। দু’চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। অসাবধানতায় বাম গাল অনেকটা কেটে গেছে। লাল রক্তের ধারা নেমে এসেছে। তাতে মোটেও বিচলিত হল না। একবার ভাবল অসংযত মুহুর্তে এমনটি হওয়াই স্বাভাবিক।

মনের আয়নায় হিমুর ষ্পষ্ট ছায়া পড়েছে। ধীরে ধীরে সেটা মন থেকে সরে গিয়ে চোখের সামনের আয়নায় আশ্রয় নিয়েছে। তাতে রংধনুর সাত রং মিশেছে। জোৎ¯œালোকিত মায়াময় পৃথিবীর কোমল ¯িœগ্ধতা এসে ভর করেছে। মুখমন্ডল রক্তাক্ত। ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। শৈবালের মনে হল, এই বুঝি অসীম সমুদ্রের পাড়ে নিঃসঙ্গ কোন পথহারা পথিককে কপাল কুন্ডলা বেশী কেউ একজন পেছন থেকে ডেকে জিজ্ঞাসা করবে, “পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ”? কারও শব্দ শোনা গেল না। কেউ জিজ্ঞাসাও করল না।

শৈবাল আয়নায় বার বার নিজের চেহারা দেখার ব্যার্থ চেষ্টা করল। যতই চেষ্টা করছে, আয়নার ভেতর থেকে সেই অধরা মুখশ্রী হেসে খুন হচ্ছে। আর বলছে, তুমি শুধু আমাকে দেখছ, তোমাকে নয়। আমি তোমার সবকিছু জয় করে নিয়েছি।
শৈবাল জিজ্ঞাসা করল,
- তুমি কি কোথাও চলে যাচ্ছ?
- হুঁম।
- আর ফিরবে না?
- কী করে বলব? ফেরার কোন পথ নেই।
- আমি কী তাহলে শূণ্য হাতে ফিরে যাব?
হিমু চুপ করে আছে। কোন কথা বলল না। চোখের ভাষা তিক্ত বিষাদে পরিপূর্ণ। শৈবাল ডাকল-হিমু। হিমু কথা বলল না। দু’ফোটা অশ্রু ঝরে পড়ল দু’গন্ড বেয়ে। তাতে চোখের দৃষ্টি কিছুটা পরিষ্কার হয়েছে। শৈবাল আবার বলল-
- হিমু, আজ আমি যে সত্য উপলব্দি করেছি, তা কি চির দিনের জন্য নিভে যাবে? এ সত্য কি মিথ্যা প্রমাণিত হবে? আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। এ যে চির সত্য। চির শ্বাশত। কত দিন কত রাত ভেবেছি, তোমাকে সব কিছু খুলে বলব। বলা হয়নি। আমি বলতে পারিনি। তবে আজ তোমার চলে যাওয়ার কথা শুনে আমার হৃদয়ে এমন করে ব্যাথার সুর বেজে উঠল কেন?

ব্যাঙ্গ করে হাসল হিমু। বলল, এখানে আমরা মানুষরা বড় অসহায়। আমাদের কামনা বাসনাগুলো কর্পুরের মত মুহুর্তেই উড়ে যায়। প্রতি পদে পদে সমাজের সমালোচনা। পায়ে পায়ে সংস্কারের শিকল জড়িয়ে থাকে। অনিচ্ছা স্বত্বেও এড়িয়ে চলতে পারি না। সমাজ সংস্কার সব যেন মনের উপর পাথর চাপা দিয়ে রাখে। উপেক্ষা করলে দ্বিধা দ্বন্দ সংকোচ এসে আমাদের গতিরোধ করে দাঁড়ায়।

হিমু কিছু সময় থামল। কান্নায় কন্ঠনালী ধরে আসছে। যে কথা বলতে চেষ্টা করল, তাতে মনের আবেগের চেয়ে চাপা উত্তেজনাটাই বেশী। চোখের জলই যেন নারীদের প্রতিবাদের ভাষা। হিমু চোখের জলে প্রতিবাদ করল। নিষ্ঠুর কুসংস্কারের জন্য এ সমাজকে ধিক্কার দিল। তাতে সামাজিক কুসংস্কার কতটুকুই বা কমবে? কিছুক্ষন থেমে আবার বলল, বিশ্বাস করো, আমি বড় অসহায়। কতবার কত কিছু বলতে গিয়ে পিছন ফিরে ভয়ে ভয়ে তাকিয়েছি, কেউ দেখল কিনা ? অথচ কোন পাপের কথা বলার জন্য এত ভয় ছিল না। নিতান্ত সত্য কথাটায় বলতে পারতাম না। ভয় হত। মনের আকর্ষনটা দুর্বল চিত্তে কান্না হয়ে বাজত। আজ চলে যাচ্ছি বলে ভেবো না। আবার ফিরে আসব।

শৈবালের অন্তরে কত স্মৃতিই রোমন্থিত হচ্ছে। একটি মধু যামিনীর স্মৃতি মনের আয়নায় ভেসে উঠল। ভাবছে, এরকম আর একটা রাত যেদিন আসবে, সেদিন নিজেকে সম্পুর্ন উজাড় করে দেব। নিজের বলে আর কিছুই রাখব না। হিমুর মধ্যে আমার আমিকে খুঁজে নেব। সব বলতে গিয়ে হয়তো সময় হবে না। সব কিছু দিয়ে সহসা নিজেকে নিঃস্ব করে নেব। মুখে বলল, তবে যাচ্ছ যখন একটু দাড়াও।

শৈবাল চোয়ালের টলটলে রক্ত বিন্দু দিয়ে অনামিকার অগ্রভাগ রাঙিয়ে নিল। তারপর শরৎ শশীর শুন্য সিঁথিতে অনামিকা স্পর্শ করে বলল, তবে এই তোমাকে দিলাম। হিমুর চোখে জল আসল। হাসবার চেষ্টা করেও নিজের সাথে প্রতারিত হল। মন যা ভেবেছে মুখে তার ছায়া পড়ল। হিমু আয়না হতে সরে দাড়াল বটে, শৈবালের মন থেকে মুছে গেল না।

স্যান্ডেল পড়তে গিয়ে গোলমাল বাঁধল। একটা স্যান্ডেল নেই। কোথায় আছে খুঁজেও পাচ্ছে না। কিংবা মনের অজান্তে কোথায় পড়ে আছে খেয়াল করতে পারছে না। সকালে পান্তাভাত মুখে দিয়েও খেতে পারল না। খেতে বসে শুধু পানি খেয়ে পেট ভরাল। দেহের উপর একটা লঘু চাপ উপলব্দি করল। দেহের সাথে মনের কোন মিল খুঁজে পাচ্ছে না। দু’টোই অবশ। মাসের শেষ দিন। টেনে হিচঁড়ে কোন ভাবে শরীরটাকে নিয়ে অফিসের দিকে রওয়ানা দিল।

বেলা দশটা বাজে।
অফিসে পৌঁছাতে দেরী হল। বড়কর্তা চোখ কপালে তুলে বললেন, অফিসটা মামার বাড়ী নয়। যখন খুশি আসবেন, আবার চলে যাবেন। ভালো লাগে তো চাকরী করুন, নয়তো অন্য রাস্তা দেখুন। শৈবাল এ অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করতে পারল না। দেরী হওয়ার নির্দ্দিষ্ট কোন কারন বলতে পারল না। মাথা নিচু করে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসল। ভয় হচ্ছে, যদি চাকরীটা হারাতে হয়। কয়েকটা ফাইল নাড়া চাড়া করে বসে থাকল।

অবনী বাবু পুরানো কর্মচারী। গলা উচুঁ করে জিজ্ঞাসা করলেন, কী বাবু, কী হয়েছে? মনে আর মুখে তো শ্রাবণের মেঘ জমেছে। বলি, এখনও বিয়ে-থা করেননি। মনোযোগ দিয়ে কাজ করে যান। ভবিষ্যতে সুখ পাবেন। আমাকে দেখছেন তো, একই চেয়ারে ত্রিশ বছর ধরে আছি। আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। ডেপুটি ম্যানেজার ভুবন বাবু থামিয়ে দিয়ে বললেন, অত জ্ঞান দিচ্ছেন কেন মশায়? পারলে নিজের ভাগ্যটা ফেরান। এখন পাজামা পাঞ্জাবীর দিন শেষ, পারলে গায়ে কোট প্যান্ট তুলুন। ভুবন বাবু বিদ্রুপের হাসি হাসলেন। একটা ফাইল শৈবালকে দিয়ে বললেন, এই মাসের সেলারির বিলটা আজ রেডি করে দিন, কাল বেতন দিতে হবে।

ফাইল খুলে কাজে মনোযোগ দিতে চেষ্টা করল। পারল না। একজন হিমু সবকিছু ওলট পালট করে দিযেছে। নিজের মনে ভিড়ভিড় করে বলল, হিমু, তুমি চলে গেলে আমার খুব কষ্ট হবে। আমি কী করে বোঝাব? আমি যেদিন প্রথম শহরে এসেছি, সেদিন তোমার কষ্ট বুঝেছি। অন্তর দিয়ে সেদিন এত গভীরভাবে ভাবার শক্তি ছিল না। এতবড় সত্যটা সেদিন অনাবিষ্কৃত ছিল। কিছুটা বুঝতে পারলেও তোমার কাছে প্রকাশ করতে পারিনি। শহরে চলে এলাম। ভাবলাম সময় হলে সবকিছু খুলে বলব।

সপ্তাহ পরে আবার দেখা হল। তোমার কীভাবে কাটল জানি না। আমার খুব কষ্ট হল। কেবলই মনে হচ্ছিল, আগামী সপ্তাহ বুঝি আর আসবে না। দু’কলম চিটিও লিখেছিলাম। তুমি কী ভাববে মনে করে দেওয়া হয়নি। যেদিন দেখা হল, তুমি পাগলের মত আমাকে জড়িয়ে ধরলে। আনন্দে আমার চোখ দু’টো ছল ছল করে উঠল। তোমার আবেগ আপ্লুত হৃদয়ে একটি নতুন বেদনা আবিষ্কার করলাম। আর তা হলো, আমার ফিরে যাবার অপেক্ষা। সেই মুহুর্তে ভগবান বুঝি পৃথিবীর সমস্ত সোন্দর্য্য তোমার মধ্যে সঁপে দিয়েছিল।

তুমি বোধ হয় ভেবেছিলে, শহরের সব নতুনত্বের মধ্যে আমি সব ভুলে যাবো। আসলে কিছুই ভুলতে পারিনি। সেদিন আমারও খুব কষ্ট হল। চোখে জল আসল। আমি পুরুষ মানুষ বলে, তোমার কাছে প্রকাশ করিনি। গোপনে মুছে নিয়েছিলাম। তুমি শত কষ্টের মধ্যেও আমাকে হাসতে হাসতে বিদায় দিলে।

ভূবন বাবু এসে আরেকবার মনে করিয়ে দিল, এমডি স্যারের নির্দেশ, বিলটা আজই রেডি করতে হবে। নাহলে চাকরি যেতে পারে। এমনিতে মিলের শ্রমিকরা বকেয়া বেতনের জন্য আন্দোলন শুরু করেছে। শৈবাল মাথা নিচু করে বলল-আর বলতে হবে না। আমি অবশ্যই কাজটা শেষ করে যাবো।

প্রাইভেট অফিসের চাকরী। শুরুটা যথাসময়ে হলেও শেষটা কতক্ষণে হবে, তা কেবল বড়কর্তাই জানেন। মানুষের দেহের উপর জোড় খাটানো যায়, মনের উপর নয়। শৈবাল যা করেছে, তাতে যোগ বিয়োগে সামান্য ভূল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। সুতরাং চাকরী হারানোর আশংকাও মনের মধ্যে ঘনীভূত হচ্ছে।

রাত দশটা বাজে।
দুপুরেও খাওয়া হয়নি। শৈবাল বাইরে এসে খোলা আকাশের ছাদটা একবার ভালো করে দেখে নিল। হালকা মেঘ জমেছে। বৃষ্টি আসতে পারে। অন্ধকারটা অন্ধকার বলে মনে হলো না। চারদিকে বৈদ্যুতিক বাতির ঝিলিক। আলোয় আলোয় ভরে গেছে সারা শহর। শৈবালের অন্তরেই শুধু নিশ্চিদ্র জমাট বাঁধা অন্ধকার। ঘোর অমানিশা চিরজীবনের জন্য বুঝি আসন পেতে বসেছে। কোনভাবে তাড়ানো যাচ্ছে না।


পথে বৃষ্টি নামল। প্রবল বৃষ্টি।
শৈবাল নিরাপদ আশ্রয়ে যাবার চেষ্টা করল না। বৃষ্টি থামার জন্যও অপেক্ষা করল না। অনেক্ষণ সময় পায়ে হেঁটে বৃষ্টিতে ভিজে বাসায় ফিরল। গা মুছল। কাপড় পাল্টাতে গিয়ে শীতে সারা শরীর কেঁপে উঠল। মন ছুটল হিমুর পিছনে। হিমু কোথায় যাবে? কেন যাবে?
হিমুর রক্তবর্ণ মুখের উপর নিয়ন বাতির একটুকরো আলো এসে লুকোচুরি খেলছে। কাঁচের জানালা খোলা রেখে বার কয়েক বাইরে তাকাল। তাতে মন ভরল না। অন্য সময় হলে বেশ লাগত। চুপ চাপ মুড়ির টিনটা হাতের কাছে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টির শব্দ শুনত। আর ভাবত, কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আকাশটা বুঝি এভাবে কেঁদে কেঁটে বুক ভাসাচ্ছে। হিমুর যাত্রা দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। একটা যন্ত্রদানব হিমুকে টেনে হিঁচড়ে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে।

শৈবালের শরীর কাঁপছে। খাটের উপরে যা ছিল তার উপর একটা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। পাশের কোন বাসায় উঁচু ভলিউমে রবীন্দ্র সংগীত বেজে উঠল-আমি তোমারি বিরহে রহিব বিলীন, তোমাতে করিব বাস, দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষ মাস।

রাতে শরীর কেঁপে প্রচন্ড জ্বর আসল। ঘরে গরম কাঁথা কম্বল তেমন কিছু নেই, যা দিয়ে শরীরের উষ্ণতা ফিরে আসবে। তবুও চেষ্টার ত্রুটি করল না। দড়িতে ঝুলানো সমস্ত জামা কাপড়গুলি এক এক করে গায়ে জড়িয়ে নিল। তারপর মায়ের হাতে সেলাই করা ফুলের পাতলা কাঁথাটা গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। তাতে মনের ভয়টা আরও বেড়ে গেল। এই বুঝি মরে গেলাম। যমরাজ এসে দরজায় কড়া নাড়ছে। মৃত্য এসে আলিঙ্গন করবে। ভুবন বাবুও যেন ঘুমের ঘোরে মৃদু হেসে বলে গেল, তোমার আর চাকরি করার প্রয়োজন নেই। বড়কর্তা চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন।

শৈবালের মনে একটা প্রশ্ন জাগল। বড়কর্তা একাবারও ভাবলেন না, কেন এমন হলো? মানুষের ভূল হতেই পারে। এবং যা হয়েছে তা অনিচ্ছাসত্বে হয়েছে। প্রতিদিন যদি শৈবালের এমন ভূল হত, তবে এতদিন চাকরি থেকে বিদায় নিতে হতো। তেমন ভূলতো কখনও হয়নি। বরং যতদিন কাজ করেছে বড়কর্তার বিশ্বাস ভাজন হয়েই করেছে। আজ এই সমান্য ভূলটা বড়কর্তা নিশ্চয় ক্ষমা করতে পারতেন।

যমদূত এসে মাথার উপর হাতছানি দিয়ে ডাকল। শৈবাল অনেক কষ্টে যাবে না বলে আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ল। যমদূত খালি হাতে ফিরবে না। যাকে পৃথিবী থেকে তুলে নিতে আদেশ হয়েছে তাকে নিয়ে যেতে হবে। তা না হলে বড়কর্তার মত যমরাজও ক্রুদ্ধ হয়ে যমদূতকে রাজসভা থেকে বিতাড়িত করবেন।

মৃত্য যন্ত্রনা বড় কষ্টের। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। এই বুঝি জ্ব¡রটা ছাড়ল। ব্যচেলর বাসা। আর একজন রুমমেট ছিল। ক’দিন ধরে সেও নেই। মাও পাশে নেই। থাকলে হয়তো মাথায় জলপট্টি দিয়ে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারত। মাথার উপর মায়ের আদরমাখা, চোখ ছলছল করা মুখখানা ভেসে উঠল। গভীর রাত। এখনই হয়তো ছুটে গিয়ে ডাক্তার ডেকে আনত। আকুল হয়ে ভগবানের কাছে ছেলের আরোগ্য প্রার্থনা করত। মায়ের অস্তির চিত্তের একটা ছবি ভেসে উঠল মনের মধ্যে। শৈবাল ভাবল, আমি চলে গেলে মা’টা কী নিয়ে বাঁচবে। মা’র খুব কষ্ট হবে। আমার মৃত্য সংবাদে মা নিশ্চয় পাগল হয়ে যাবে। বদ্ধ উম্মাদ পাগল মায়ের প্রতিচ্ছবিটাও চোখের সামনে ভেসে উঠল। তা শৈবালকে আরও কষ্ট দিচ্ছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে শৈবাল। সারা পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসছে। হয়তো পুত্রশোকে মা’ও ইহধাম ছেড়ে চলে যাবেন। সবাই চলে যাবে। কিন্তু এভাবে চলে যেতে কেউ চাই না। শৈবাল আগে চলে গেলে, মা’র কী ঘটবে, কীভাবে দিন কাটবে, তা কীভাবে জানবে। তবে এটা নিশ্চিত যে, মায়ের মত করে আর কেউ এভাবে বিচলিত হবে না।

হিমুর কথা মনে হল। কত কষ্টই না হবে। নিজেকে কেমন করে সান্তনা দেবে। অল্প ক’দিনের জন্য দুরে সরে এসে আমি হিমুর কষ্ট বুঝেছি। আমার মৃত্যসংবাদে হিমু কী পাগল হয়ে যাবে? কীভাবে কাটবে হিমুর বাকি দিনগুলো? খুব জানতে ইচ্ছে করছে। বোকার মত চোখের জলে সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে শৈবাল কিছুটা সুস্থ বোধ করল। মৃত্য চিন্তা কিছুটা লাঘব হল, কিন্তু জ্বর কমল না।

জ্বরের বেগ দ্রুত বাড়ছে। বগলে থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মাপার কেউ নেই। বিছানার ছারপোকারা এখন স্বাধীন। আরশোলার দল নির্বিঘেœ ছোটাছুটি করছে। দল বেঁধে রান্নার বাসি হাড়ি পাতিলগুলোর উপড় সমানে আক্রমন চালাচ্ছে। ধাঁড়ি ইদুঁরের দল আলোর সামনে এসে উৎপাত করার সৎ-সাহস পাচ্ছে না। চৌকির নীচে জমে থাকা আবর্জনাগুলো ছিঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে। তারই প্রতিক্রিয়া এসে শৈবালের কানে লাগছে। খট্ ... খট্ ... খট্র ... খট্র ...। খট্ ... খট্ ... খট্র ... খট্র ...।

তাড়ানোর ইচ্ছা নেই। সে শক্তিও নেই। ভাবল ওরা মনের আনন্দে বিচরন করছে করুক। তাতে আমার কী যায় আসে? জীবনের কত আবর্জনাইতো কতভাবে পড়ে থাকে। তা সাফ করার লোক কই? সময়ের প্রয়োজনে এসব ক্ষুদ্র জঞ্জাল গুলিও নিঃসঙ্গ মানুষটির কাছে বড় আপন মনে হয়। রাত দ্বীতিয় প্রহর গেল। এর মধ্যে শরীরে ঘাম দিয়ে জ্বর কমেছে। তন্দ্রার ঘোর লাগল দু’চোখে। তাতে জীবনের সমস্ত চিন্তা ভাবনাগুলো এক এক করে মিলিয়ে গেল। শৈবাল বুঝতে পারল না, কখন কী ঘটলো।

ভোরের আলো ফুটতে আর দেরি নেয়। বাহির থেকে দরজার কড়া নাড়ার শব্দ। অবচেতন মনে শৈবাল জিজ্ঞাসা করল-কে? কোন সাড়া না পেয়েও দরজা খুলে দিল। একটি নারী মুর্তি ধীর পায়ে ভিতরে প্রবেশ করে ক্ষীণ স্বরে বলল-দরজাটা বন্ধ করে দাও।

শৈবাল দরজা বন্ধ করল। নারী মুর্তির সামনে এসে জিজ্ঞাসা করল-কে তুমি? কেন এসেছ? নারী মুর্তি উপুড় হয়ে প্রনাম করে উঠে দাড়াল। মাথার ঘোমটাটা সরিয়ে বলল-আমি হিমু। আমি পালিয়ে এসেছি। আমাকে ঠাঁই দাও। হঠাৎ হিমুর সান্নিধ্য শৈবালকে বিচলিত করে তুলল। নিজেকে সংযত করে বলল, আসছ যখন থাক। ক’দিন পর ফিরে যেও। কাকা বাবু শুনলে মনে কষ্ট পাবে।

হিমু প্রতিবাদ করল। না, আমি ফিরে যাবো না। তুমি না আমার সিথিঁতে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছ। আমি তোমার কাছে চলে এসেছি। ফিরে যেতে আসি নি।
- তাহলে পালিয়ে আসলে কেন?
- সে কথা পরে বলছি।
- না, এখন বল।
তবে শোন, বলে হিমু মাথার কাপড় পুরোটা সরিয়ে ফেলল। তুমিতো জান, কাকীমার ঘরে আমি মানুষ। বড় হয়েছি। এতকাল জেনেছি, কাকীমা-ই আমার মা। আজ সে ভূল ভেঙ্গেছ। আমার কাকাতো বোন মিনুদি। বিয়ের পাত্র আসে। কিন্তু বিয়ে হয় না। বাবার কথা মনে নেই। কাকার আদর পেয়ে বাবার অভাবটা ভুলেছি। সে যাক্গে। হিমুর দু’চোখ বেয়ে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। হাতের তালুতে মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল।
- তারপর? জিজ্ঞাসা করল শৈবাল।
মিনুদিকে দেখার জন্য পাত্র আসে। দেখার পর পাত্র পক্ষ দেখি, দেখব, পরে জানাবো, এসব বলে চলে যায়। এ সমাজে মেয়েদের হাতের পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত খুটে খুটে দেখে নেয়ার চেষ্টা করে পাত্র পক্ষ। পছন্দ হলেও সন্দেহ থেকে যায়, ঠকলাম না তো? অদৃশ্য কোন খুঁত থেকে গেল কী না? অথচ মনটা একবারও কেউ দেখার চেষ্টা করে না। এ যেন পুরুষের মনোরঞ্জনে নারী-সমাজের প্রানান্তকর প্রচেষ্টা। মিনুদিকে কারও পছন্দ হচ্ছে না বলে দাবী-দাওয়াটাও বেশি। আমার কাকার পক্ষে তা মেটানো সম্ভব নয়। দু’একজন আমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠাল। সবাই ভাবল, আমার জন্য মিনুদির বিয়ে হচ্ছে না। মিনুদিকে দেখতে আসলে আমাকে ঘরে বন্দি করে রাখতো।

চোখের জল কারও বাঁধা মানে না। হিমু চোখের জল মুছে বলল, আর বলতে পারব না। আমাকে ক্ষমা করো।
- হিমু। শৈবাল ডাকল।
- কী ?
- ওরা কি তোমার বিয়ে ঠিক করেছিল?
- হ্যাঁ। লোকটা মাতাল। আগের সংসারে একটা ছেলেও আছে।
- হিমু, শান্ত হও। কাকা বাবুকে বুঝিয়ে বললে নিশ্চয় বুঝবেন। আমি জানি তিনি এত নিষ্ঠুুর হতে পারবেন না। আমি একবার বলে দেখব। প্লিজ, তুমি ধৈর্য ধরো। অস্থির হলে চলবে না।
হিমু শৈবালের আরও কাছে এসে বলল-
- না না। তার দরকার নেই। তুমি ফিরিয়ে দিলে, তবে ঐ মাতালের ঘর করতে যাব। হাজার হোক কাকা-কাকীমা আমার গুরুজন। পেটে না ধরলেও তারা আমাকে ¯েœহ-মমতা দিয়ে মানুষ করেছেন। শুধু তুমি আমাকে অনুমতি দাও।
- আমার অনুমতি? কেন ?
- জানি না। আমি জানি না, বলে হিমু শৈবালের বুকে লুটিয়ে পড়ল।

শৈবাল হাত দিয়ে চিবুক স্পর্শ করল। আরও কাছে এসে বলল, অনুমতির দরকার নেই। তুমি আমার হয়ে আমাকে সুখী করো। পৃথিবীর আর কোন সুখ আমার প্রয়োজন নেই। আমার সত্যটা বেঁচে থাক চিরকাল। ভগবানের কাছে শুধু এই মিনতি।

সুর্য্য উঠেছে অনেক আগে।
বেলা বাড়ছে দেখে ক’জন প্রতিবেশী অনেক ডাকা ডাকি করল। দরজা ধাক্কা দিল। কোন সাড়া পাওয়া গেল না। অবশেষে দরজা ভেঙ্গে শৈবালের ঘরে ঢুকল। আরশোলা গুলো দ্রুত সরে গেল নিরাপদ আশ্রয়ে। ইদুঁরের দল সরে পড়ল চৌকির নীচে। সারারাত ধরে আলোটা জ্বলছিল। শৈবাল ঘুমিয়ে আছে। গায়ে জড়ানো কাঁথার পাশ থেকে আরও কয়েকটা আরশোলা দ্রুত বের হয়ে এলো। একজন শৈবালের মাথার কাপড় সরিয়ে দেখল। শৈবাল নিশ্চল, নিথর। ঘুমিয়ে আছে গভীর ঘুমে। আর কখনও জাগবে না।

থানার বড়কর্তা এসে শৈবালকে দেখলেন। সেন্ট্রিদের আদেশ করলেন-লাশ মর্গে নিয়ে যাও। পোষ্ট মর্টেম রিপোর্ট তৈরী করতে হবে। আপনারাও থানায় চলুন। টেবিলের উপর আয়নাটা পড়ে আছে। আয়নার মাঝখানে রক্তমাখা একটি আংগুলের ছাপ। রক্তের দাগটা শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে। বড়কর্তা আলামত হিসাবে আয়নাটি নিজের কাছে রেখে দিলেন।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement