ভয়াবহ কোভিট-১৯ অদৃশ্য ভাইরাসটি তামাম পৃথিবীটাকে ওলট-পালট করে দিয়েছে। পৃথিবীর সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, জীবনের চেয়ে মহামূল্যবান আর কিছু নেই। কিন্তু পৃথিবী কি তা বুঝতে পেরেছে... ?
রাজধানীর পিচঢালা কালো পথ ধরে ছুটছে অনেকেই। সবারই একটা ঠিকানা আছে। ঠিকানা নেই ওদের দু’জনের। ওরা গন্তব্যহীন গন্তব্যে ছুটে চলছে। পাঁচ মাসের ঘর ভাড়া বকেয়া পরিশোধ করতে না পারায় বাড়ীওয়ালা আজ সকালে ওদের বের করে দিয়েছে। করোনা ভাইরাসের কারনে দীর্ঘদিন ধরে কোনো কাজ না থাকায় চরম অভাবে পড়ে গেছে। তালতলা বস্তিতে একটি খুপড়ির মতো ঘরে ভাড়া থাকতো ওরা। বাড়ীওয়ালাকে আকবর আলী কত মিনতি করে বলেছে, ছয় মাসের অন্ত:সত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে কোথায় যাবে সে...। একটু দয়া করার জন্য বাড়ীওয়ালার পা ধরে কতইনা কান্নাকাটি করলো ওরা- বাড়ীওয়ালার দয়া হলো না। হাঁটতে হাঁটতে ওরা চিড়িয়াখানার সামনে এসে দাঁড়ায়। চলি¬শার্ধো আকবর আলীর স্ত্রী কমলা খাতুনের মুখে হতাশার চিহ্ন নেই। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, যেনো সে ঘুরতে বেরিয়েছে। শহরের আকাশ ছোঁয়া এতো অট্রালিকা...এমনকি দুর্গন্ধময় বস্তির মধ্যেও মাথা গোঁজার ঠাঁটুকু নেই। গ্রামে ফিরে যাবে, সেই সুযোগও নেই। আড়িয়ালখাঁ নদী সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এমন পরিসস্থিতিতেও কমলা খাতুনের আবদার-আপনে না একদিন কইছলাইন, আমারে চিড়িয়াখানা দেহাইবাইন...আজগা লইন দ্যাহি।
ঃ তর আসলে মাইট্রা কইলজা নাই। ইমুন অব¯হায় তুই আজগা চিড়িয়াখানা দেহুনের কতা ক্যামনে কইলে ?
ঃ মনডা চায়ছে, হের লাইগগা কইলাম। এই লইন ট্যাহা,দুইডা টিকট কাইট্টা লইয়াইন।
চিড়িয়াখানা দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে যায়। কখন শরীরে ওরা বানরের খাঁচার সামনে এসে বসে। পাঁচ টাকার বাদাম কিনে ক্ষুধা নিবারনের ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কমলার কাছে বানরের লাফালাফি ভাল লেগেছে খুব। তাই শেষ বারের মতো বানর গুলিকে দেখে নিচ্ছে। এভাবে সব জীব-জনÍ দর্শনেই কমলার চোখে-মুখে ছিল বিশ্বয় আর আনন্দ। তবে আকবর আলীর মাঝে তেমন কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় নি। তার কেবলি মনে হয়েছিল, এসব জন্তুর চেয়ে বরং সে নিজেই আজব এক প্রাণী। তার ঘর নেই, বাড়ী নেই। জঙ্গলে বাস করার জমি নেই। জেলখানায় বাস করার মতো অপরাধ নেই। এমন কি জীব-জানোয়ারের সাথে বাস করবে, সেই বিধানও নেই।
চিড়িয়াখানার দাড়োয়ান বাঁশি বাজাচ্ছে। চিড়িয়াখানা দেখার সময় ফুরিযে এসেছে। দর্শনার্থীদেরকে চলে যাওয়ার জন্য দাড়োয়ান বাঁশি বাজাচ্ছে।
কমলা বিষয়টি বুঝতে পেরে আকবর আলীকে বললো, লইন উইট্টা পড়ি...চিড়িখানা দেহুনের টাইম শেষ অইয়া গ্যাছেগা।
আকবর আলী নিরুত্তর। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বানর গুলির দিকে।
কমলা এবার কিছুটা বিরক্তির সুরে বললো, উড্ইুন্না কেরে...হুনতাছ্ইুন্না টাইম শেষ..
ঃ হ হুনছি, কমলাৃ
ঃ হু..
ঃ কই যাইবামরে কমলা...
ঃ আল্লার দুইন্নাডা অনেক বুইত্তামর, লইন উডি। একটা উপায় এক বা না এক বা অইবই অনব।
ঃ কমলা, দ্যাখ দ্যাখ বান্দরগুলি কি সুন্দর কইরা যার যার ঘরঅ যাইতাছেগা। আমি যদি বান্দর অইতামরে কমলা...তঅ ভালা আছিন! চিড়িখানাত আশ্রয় পাইতাম!
ঃ আর আমি বুঝি অইতাম বান্দরনী! থুবাস-থুবাস! কি পাগল-ছাগলের মতন কতা কইতাছুইন। কমলা অবুঝ কিশোরী মেয়ের মতো হাসতে লাগলো।
স্মীত হেসে আকবর আলী বললো, হাসলে তরে জবর ছুন্দর লাগেরে কমলা। জানছ কমলা, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব ্এই কারনেঅই-আমডা হাসতাম পারি বইল্লা। দুইন্নার আর কুনু জীব হাসত পারে না। চিড়িখানাত কত কিসিমের জীব-জানোয়ারইনা দ্যাখলি, কই কেউরে হাসত দ্যাখছস ..?
ঃ হ, হাছই ত বাঘ, ভাল্লুক,হাতি,ঘোড়া,হাপ..কেউরেওত হাসত দ্যাখলাম না। জবর দামী কতা কইছুনগো। কইত্তে হুনলাইনগো কতাডা ?
কথাগুলো বলেই হঠাৎ চিৎকার কওে উঠে কমলা। পেটের ব্যাথাটা শুরু হয়ে গেছে। কমলা একেতো দীর্ঘদিনের গ্যাস্ট্রিকের রোগী, দ্বিতীয়ত: অন্ত:সত্ত্বা। ব্যাথাটা তার ক্রমেই বাড়ছে। ডাক্তার আরো তিন মাস আগেই বলেছিল, কমলার ষ্টোমাকে আলসার হয়ে গেছে। জরুরী ভিত্তিতে তাকে অপারেশন করাতে হবে। দিন মজুর আকবর আলীর পক্ষে দশ হাজার টাকা যোগাড় করা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছেনা বলে আজো আপারেশন করা হয়নি কমলার।
আকবর আলী কমলাকে নিয়ে একটা রিকশায় উঠে। রিকশা ছুটে চলেছে হাসপাতালের দিক্।ে পঞ্চাশোর্ধ বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা সর্ব শক্তি দিয়ে প্যাডেলে চাপ দিচ্ছে। কমলার চিৎকারের শব্দে রিকশা’ই যেনো হয়ে উঠেছে এ্যাম্বুলেন্স। এক জীবন্ত এ্যাম্বুলেন্স । এহাসপাতাল ওহাসপাতাল করে করে কোনো হাসপাতালেই জায়গা হয়নি তার। কর্তৃপক্ষের এক কথা- কোভিড-১৯ নিগেটিভ সার্টিফিকেট লাগবে। আকরর আলী কোভিড কি জিনিস, এর অর্থই জানে না। যতদূর জানে, করোনা নামক ছোঁয়াচে একটা রোগ দেশে আইছে। কিন্তু তার বউয়েরতো পেটের ব্যাথা। আবারও ছুটে চলে অন্যকোনো হাসপাতালে।
শ্যামলীতে এসে রিকশা পড়ে গেল ট্য্রাফিক জ্যামে। শত শত যানবাহন থামিয়ে দিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ। পাশের রাস্তা দিয়ে পাটমন্ত্রী যাবেন। মনন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য জনসাধারনের যানবাহন থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি জানার পর চেঁচিয়ে উঠে কমলার রিকশাওয়ালা।
রাগে-ক্ষোভে সে চিৎকার করে বলতে লাগলো, মাগার আমাগো দেশ নাকি গনতান্ত্রীক...? গনতন্ত্র থাকলে রাস্তা বন্ধ করে ক্যামতে ? পাটের মিলকারখানাত সব লাল বাত্তি, সেই দেশে পাটমন্ত্রী দরকার কি...? মাইয়্যাটা পেটের ব্যাথায় চিক্কুর পাইরা মরতাচে, কেউ হুনবার লাগচে না। লাল বাত্তি পাটমন্ত্রী নিরাপত্তা আছে আমাগো নিরাপত্তা নাই...? আমরা কি হালায় কুত্তা বিলাই নাকি!
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত হয়ে যায়। জরুরী বিভাগের বারান্দায় পড়ে আছে কমলা। কমলা ব্যাথায় হাউমাউ করে কাঁদছে, তবুও কেউ এগিয়ে আসছে না। ডাক্তারের জন্য আকবর আলী ভেতরে গেলে কম্পাউন্ডার তাকে ব্ইারে অপেক্ষা করতে বলে। ডাক্তার সাহেব ক্যান্টিন থেকে এলে তাদের ডাকা হবে।
অসহায় আকবর আলী বিভিন্ন দোয়া-দুরুদ পড়ে কমলার শরীরে ফু দিতে লাগলো। ভুল উচ্চারণে এই দুরুদ পড়তে দেখে দুঃষহ ব্যাথার মধ্যেও কমলা হি হি করে হেসে উঠে। তার হাসিতে আকবর আলী শিশুর মতো কেঁদে উঠে।
ঃ কমলা তুই একটা অজগুবী মাইয়্যারে...মরনের সময় ও তুই হাসছ।
ঃ হ, ঠিক অই কইছুইন। আমর সময় শেষ। আমারে বিদায় দেইন। আপনেরে আমি কত কতা কইছি. কত জ্বালাইছি...আমারে ক্ষ্যামা দেইন। অরে আল্লারে...অরে মাইয়্যারে ...
ঃ না কমলা না, এ্যাই কতা কইছ না। তরে আমি মরুনের লাইগগা দিতাম না। ডাকটর অহনেঅই আইয়্যা পড়ব।
ঃ ডাকটর আইলে আর কি অইব..অপারেশনের অত ট্যাহা আপনে কই পাইবাইন ? অরে আল্লাগো...
ঃ ট্যাহার কতা তুই কুনু চিন্তা করিছ না। আমার লক্ত বেইচ্চা তর অপারেশনের ট্যাহা বাউ করবাম।
স্বামীর এই কথায় কমলা এবার বেশ শব্দ করে হাসতে লাগলো। দু’চোখে শ্রাবণের বৃষ্টি- ঠোঁটে তার হাঁসি। এই দৃশ্য দেখে আকবর আলীর বুকটা হু হু করে উঠে।
আকবর আলী ছুটে যায় দোকানে। কাবার সোডা খেলে কমলার ব্যাথাটা কিছু কমে। অনেক খোঁজাখুজির পর এক পুটলা খাবার সোডা এনে দেখে-কমলার চারপাশে মনুষের ভীড়। কমলার কান্নার কোন শব্দ নেই। নেই হাসির শব্দও। আকবর আলীর পা আর সামনে এগুচ্ছে না। তার লাশের কাছে যাওয়ার মতো কেন যেন সাহস পাচ্ছে না সে।
রাত বাড়ার সাথে সাথে মানুষের জটলা কমতে শুরু করে। এক সময় জনশূণ্য হয়ে পড়ে হাসপাতালের বারান্দা। বারান্দায় শুধু পড়ে রয়েছে কমলার নিথর দেহ। লাশের দিকে লাল পিঁপড়ার দল লাইন বাঁধতে শুরু করেছে। কিছুক্ষন পর কয়টা তেলাপোকা রাশের উপর দিয়ে হাঁটছে। ওর মুখের উপর একশো পাওয়ারের একটি বাতি ঝুলছে। বাতির আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কমলাকে। মৃত কমলাকে এখন কেমন যেন এক অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। হাসিটি এখনো ফুটে আছে তার ঠোঁটে।
আকবর আলী কিছুতেই সাহস পাচ্ছে না কমরার লাশের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর। লাশ বহনের গাড়ি ভাড়ার টাকা নেই তার কাছে। এছাড়া লাশ দাফনের জন্য এক খন্ড জমি পর্যন্ত নেই। লাশের পরিচয় দিলেই তাকে তা বহন করতে হবে। সেই জন্য আকবর আলী ভিন্ন এক দর্শকের মতো দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
গভীর রাতেও যখন লাশের পরিচয় এবং আত্বীয়-স্বজন কাউকে পাওয়া গেল না, তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাশটি বেওয়ারিশ হিসাবে লাশ কাটা ঘরে পাঠিয়ে দেয়। কমলার লাশ কেটে কাল সকালে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা প্র্যাকটিকেল একটা ক্লাশ করবে। তারপর লাশটি কঙ্গাল হিসাবে সংরক্ষণ করে রাখা হবে।
বিষয়টি জানার পর আকবর হাসে আর বিড় বিড় করে বলতে লাগলো, তর কি ভাগ্যরে কমলা..! তর লাশ কাইট্টা ছাত্ররা ডাকতরি হিকব! তুই কি ছুন্দর ঘর-অ আশ্রয় পাইছসরে...তর কি ভাগ্যরে কমলা...
আকবর আলীর এ কথাগুলো শুনে ফেলেন জরুরী ভিবাগে পরিদর্শনে আসা প্রফেসর ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন।
ঃ মহিলার লাশটি কি তোমার ?
চমকে উঠে আকবর। বড় বড় চোখে টপবগিয়ে মৃদু মাথা নাড়িয়ে সে এর সত্যতা স্বীকার করে নিলো।
ঃ লাশটি কি হয় তোমার ?
ঃ আমার বউ ছ্যার বলেই কেঁদে উঠে সে।
ঃ শুনেছি লাশটি দীর্ঘক্ষণ ধরে বারান্দায় পড়েছিল। এতোক্ষণ পরিচয় দাওনি কেন ?
ঃ ছ্যার, আমার কাছে লাশটা নিওনের গাড়ি ভাড়ার ট্যাহা নাই।
ঃ কি বলছো তুমি ! লাশ নেওয়ার মতো ক’টা টাকা নেই তোমার কাছে ?
ঃ হ ছ্যার, হাছা কইছি। লক্ত বেচতাম গেছলাম, আমার লক্ত বলে ভালা না, –কি জানি একটা দোষ আছে। হের লাইগগা আর লক্ত বেচতাম পারলাম না। লক্ত বেচতারলে আমার কমলারে আমি এইহানো ফালাইয়া রাখতাম না। কিছুতেই না।
ঃ আচ্ছা ঠিক আছে, গাড়ি ভাড়ার টাকা আমি দিচ্ছি- তুমি লাশ নিয়ে বাড়ি যাও। এসো আমার সাথে এসো, আমি সব ব্যাব¯্হা করে দিচ্ছি।
ঃ বাড়ি ঘরতো নাই ছ্যার, লাশ নিয়া কই রাখবাম.. হুনছি কমলার লাশ কাইট্টা ছাত্র-ছাত্রীরা ডাকতরি হিকব।
একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে প্রফেসর ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন বললেন, হু তোমাদের মতো গরীব মানুষের লাশ কেটেই আমরা ডাক্তারি শিখি। ধনী মানুষের লাশ কাটার সুযোগ আমরা কখনো পাই না। অথচ সেই তোমরাই বিনা চিকিৎসায় মারা যাও। তোমাদের জন্য আমরা কিছুই করি না। আমরা ব্যস থাকি ধনী মানুষের জন্য। আমরা টাকার মোহে অধিকাংশ চিকিৎসকই আজ অন্ধ হয়ে গেছি। আমাদের মতো এ জাতীয় চিকিৎসকদের তোমরা কখনো ক্ষমা করো না। কখনো না।
প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন কমলার লাশ থেকে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বড় একটা শিক্ষা নিলেন আজ। বিনা চিকিৎসায় অকালে মৃত্যুবরনকারী কমলার লাশ হওয়ার পেছনে শুধু কি চিকিৎসকরাই দায়ী...? এর মূল বাধাগুলি আবিস্কার করতে হবে। মানুষকে হত্যা করার জন্য পৃথিবীতে যে পরিমাণ গবেষণা আর অর্থ ব্যয় করা হয়, তার ছিঁেটফোটাও করা হয়না মানুষকে বাঁচানোর জন্য। কোভিড-১৯ তার বাস্তব উদাহারণ। এর উত্তরণ ঘটাতে হবে। শুরু করতে হবে আন্দোলন- মানবতার নতুন সূর্যের প্রত্যাশায়..