লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ নভেম্বর ১৯৬৭
গল্প/কবিতা: ৩২টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৫

বিচারক স্কোরঃ ১.৪৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবাংলার রূপ (এপ্রিল ২০১৪)

নগর, গ্রাম এবং আমরা
বাংলার রূপ

সংখ্যা

মোট ভোট ২৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৫

মোঃ আক্তারুজ্জামান

comment ২১  favorite ২  import_contacts ১,১৫৬
(১)
একটু বৃষ্টি হইলেই আমাদের মহল্লার রাস্তাগুলি যেন আস্ত এক একটা খাল হইয়া উঠে! রাস্তা নোংরা পানির নীচে হারাইয়া যায়। ইহাতে বিশেষ কিছু কিছু জায়গায় কম বেশি স্রোতও গড়াইতে দেখা যায়। ছোট ছোট গাড়ি আর রিক্সার চাকার আঘাতে পানিতে ঢেউয়েরও সৃষ্টি হয়। এই অভিনব খালে যেই পরিমাণ শিক্ষা বঞ্চিত দরিদ্র শিশুর দল চিৎকার চেঁচামেচি করিয়া সাঁতার কাটার কসরত করে তাহাদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নহে।

প্রকৃত খালে যাহা না থাকে সচরাচর সেই সকলই এই অদ্ভুত খালে দেখিতে পাওয়া যায়। কলার খোসা, পচিয়া যাওয়া পটল কুমড়া থেকে শুরু করিয়া মানুষের মলও ভাসিতে দেখা যায় এই পানিতে। অভিজাতরা নাকে মুখে কাপড় গুঁজিয়া চেহারা বড়ই বেজার করিয়া আর অভদ্র গরীবরা বত্রিশ পাটি দাঁত বাহির করিয়া নানান কৌতুকপূর্ণ কথা বার্তা বলিয়া হাসিতে হাসিতে এই খালের উপর দিয়া চলাফেরা করে।

তিন চার বছর আগে দেখিয়াছিলাম সবখানে রীতিমত যেন ঝড় বহিতেছে। ঘটনা কী? খবর লইয়া জানিলাম- ড্যাপ! রাজউক প্রণীত আধুনিক নগর পরিকল্পনা। ইহা লইয়া আমাদের এলাকায় মহা হুলস্থুল পড়িয়া গেল। কেউ ফকির হইয়া যাওয়ার আশঙ্কায় মাতম করিয়া মরে তো কেউ বুকের রক্ত দিয়া ড্যাপ প্রতিহত করিবার শপথ নেয়।

ড্যাপ লইয়া যতদূর বুঝিলাম জানিলাম তাহাতে আমি যারপরনাই খুশিই হইলাম। আমার পছন্দ একটা পরিচ্ছন্ন গোছানো সুন্দর আধুনিক শহর। ছয়তলা বাড়ির কোণায় একশতাংশ জমির মালিকানা লইয়া ঝুপড়ি তোলা যায়। কিন্তু ইহাতে শহরের দশা যে কী হয় তাহা চোখের সামনে দেখিয়া দেখিয়া শ্রান্ত ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছি। এখন স্বল্প জায়গায় পরিকল্পিতভাবে বেশি লোকের আবাসন নিশ্চিত করিয়া সুন্দর, সুস্থ পরিবেশের একখানা মনোমুগ্ধকর শহর বিনির্মাণ হোক ইহাই কামনা করি।

আমি স্বপ্ন দেখি সুশৃংখলভাবে গড়িয়া উঠা সারি সারি আকাশ ছোঁয়া ইমারত। বিশ পঞ্চাশ তলা ভবনে দুই একশ পরিবার বসবাস করিতেছে। কিন্তু তাহার হাঁপাইয়া উঠিতেছে না। রোদ আলো বাতাস সকলের ঘরে উঁকি মারিয়া নাচিয়া খেলিয়া বেড়াইতেছে। নগরবাসীরা সকাল বিকাল বিশাল রাস্তার পাশের যে চওড়া ফুটপাত দিয়া হাঁটাহাঁটি করিয়া বেড়াইতেছে ইহাকে পুষ্পকানন বলিলেও অত্যুক্তি করা হইবে না ।

বাড়ির একপাশে বিশাল রাস্তা তো অন্যপাশে তেমনি বড় ঝিল। মাঠ ঘাট স্কুল কলেজ সকলই নিজ নীড়ে বসিয়া দৃষ্টি গোচর করা যায়। রাস্তার জ্যামে আটকাইয়া রোগী মারা যাওয়া তো দুরের কথা বিছানা হইতে চিকিৎসা লইতে লইতে রোগী কখন যে হাসপাতালে পৌঁছাইয়া যাইতেছে তাহা সে নিজেও মালুম করিতে পারিতেছে না।

ড্যাপ লইয়া আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সাথেও সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার উপক্রম হইল। সে চরম বিরক্ত হইয়া ঘাড় বাঁকাইয়া আমাকে তিরস্কার করিয়া কহিল- তোমার চার কাঠার আস্তানা হাত ছাড়া হইলেই কি আর না হইলেই বা কি! আমাদের বাপ দাদার এত্ত এত্ত সম্পত্তি, লক্ষ লক্ষ টাকা বাড়ি ভাড়া তুলিতেছি। সরকারের কলমের এক খোঁচায় রাস্তার ফকির হইয়া পড়ি আর কি!

কোনভাবেই বন্ধু প্রবরটিকে বুঝাইতে পারিলাম না যে সরকার তাহাদের জমিজমা তো আর মূল্য না দিয়া জোর করিয়া কাড়িয়া লইবে না। যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিয়া যে শহর গড়া হইবে সেই শহরে জমির মালিকদেরই অগ্রাধিকারভাবে আবাসন সুনিশ্চিত করিবে ইত্যাদি ইত্যাদি..।

আমার মত নগণ্যের যুক্তি অনেকেই মানিতে চাহিল না। অতপর যখন দেখিলাম ড্যাপ প্রতিহত করিতে দল মত নির্বিশেষে সকলেই রাস্তায় নামিয়া পড়িয়াছে তখন একটি শুভ চিন্তার অপমৃত্যুর আশংকায় আমার বুক কাঁপিয়া উঠিল। ড্যাপ ইস্যুতে কিছু কিছু সংসদ সদস্যকে পর্যন্ত যখন রাস্তায় নামিয়া আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে নিবৃত্ত করিতে দেখিলাম তখন আমার বুঝিতে আর বাকি রহিল না যে পৃথিবীর সব চাইতে নোংরা শহরের কলঙ্ক হইতে মুক্তি লইয়া এই নগর কোনদিনই তিলোত্তমা রূপে সাজিতে পারিবে না।



(২)
গত রাত্রিতে ঘরের টিনের চালায় যখন বৃষ্টি ছমছম শব্দ তুলিয়া নাচিয়া আমার ঘুম ভাঙাইয়া দিল তখন সময় কত তাহা জানি না। অন্য সময় হইলে বালিশের পাশে রাখা মোবাইল ফোনখানা জাগাইয়া তুলিয়া ইহার স্ক্রিনে সময় দেখিতাম কিন্তু কাল তাহা করিতে মন চাহিল না। অন্য কারণে ঘুম ভাঙিলে আমার প্রচণ্ড রাগ হইত, বিরক্ত হইত কিন্তু কাল তাহা হইল না। বরং অন্যরকম আনন্দে আমার চিত্ত বড় চঞ্চল অস্থির হইয়া উঠিল। আধো ঘুম আধো জাগ্রত অবস্থায় আমি ছুটিয়া চলিলাম। বেড়াইলাম, ঘুরিয়া ঘুরিয়া রূপসী বাংলা দেখিলাম।

দেখিলাম বৃষ্টিতে গ্রামের আম গাছের ছোট ছোট শাখায় শুঁকাইয়া কাল হইয়া যাওয়া মুকুলগুলি ঝরিয়া পড়িয়াছে, আমের ছোট ছোট গুটিগুলি মুক্ত স্বাধীনভাবে দুলিতেছে। লতানো সজনেগুলি গায়ের ধুলোবালি মুছিয়া ফেলিয়া যেন সতেজ আর অধিকতর সবুজ হইয়া উঠিয়াছে। ঘাস দূর্বা শন গাছগুলি শীতে খরায় জীর্ণশীর্ণ ওষ্ঠাগত প্রাণ অবস্থা হইতে যেন মুহূর্তে মুক্ত হইয়া হু হু করিয়া সবুজ পাতা লইয়া বাড়িয়া উঠিতেছে। জাম্বুরা গাছ খোশবু ছড়াইয়া তাহার নীচ দিয়া যাহারাই যাইতেছে তাহাদের উপর শুভ্র ফুল ঝরাইতেছে। জামগাছ পাতায় আর ফুলের কুঁড়িতে সবুজের অন্যরকম আয়োজন করিতেছে। পাতার ফাঁক দিয়া অসংখ্য ফুলকলির লম্বা লম্বা ডাটা ঝুলাইয়া দিয়া হিজল গাছ যেন ঝুমকোর দোকান সাজাইয়া বসিয়াছে।

কিশোরীর গায়েহলুদ হইয়া গেলে সে যেমন এক লাফে পূর্ণ যুবতী হইয়া উঠে। তেমনি করিয়া স্রষ্টা এক পশলা বৃষ্টি দিয়া ধুইয়া প্রকৃতিকে যেন যৌবন দান করিয়াছেন।

আরও একটু অগ্রসর হইয়া দেখিলাম বিস্তৃত মাঠে সবুজ ধানক্ষেত। ধানের শীষ বাতাসে মাথা তুলিয়া দুলিবার নিমিত্তে ব্যাকুল প্রহর গুনিতেছে। শুস্ক প্রায় ছোট নদীতে জোয়ারের স্বচ্ছ ক্ষীণ ধারা ঠেলিয়া উজানে উঠিতেছে পুঁটি টেংরার দল স্রোতের অগ্রভাগে নাচিয়া খেলিয়া হুড়োহুড়ি করিতেছে।

নদীর তীরে মিষ্টি কুমড়ার খেতে হলুদ ফুলগুলি মৃদুমন্দ বাতাসে দুলিতেছে। তাহারই পাশ দিয়া একটি কুমারী বালিকা ছাগশাবক কোলে তুলিয়া লইয়া উহার মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে বাড়ির পথ ধরিয়াছে। এক মা নদীর পাড়ে তাঁহার কচি ডাটা গাছগুলি নিজের সন্তানের মতই শেষবেলা আরেকবার পরিচর্যা করিয়া লইতেছেন। দূরে একটা ষাঁড় লেজ তুলিয়া ভোঁ দৌড় মারিয়া তাহার মালিককে চটাইতেছে।

একটি বড় আইলের উপর লাঠিতে ভর করিয়া দাঁড়াইয়া পশ্চিমাকাশের দিকে মুখ করিয়া একজন বৃদ্ধ গভীরভাবে গোধূলি অতিক্রান্ত হইতে আর কত বাকি তাহা আন্দাজ করিবার চেষ্টা করিতেছেন। সূর্য যেন সবকিছু অবলোকন করিয়া দিনের শেষ হাসিখানা ছড়াইয়া দিয়া ঢলিয়া পড়িতেছে!

(৩)

আজকে স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি মহলের কারণে সুপরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন একটা আধুনিক শহর দেশবাসী কোনদিন পাইবে বলিয়া আমার বিশ্বাস করিতে মন চায় না। স্বপ্নের গ্রামই এখন ভরসা। গ্রামের মানুষেরা অন্তত তাঁহাদের প্রিয় গ্রামগুলির মৌলিকত্ব রক্ষা করিয়া যেন আবহমান বাংলার মান বজাইয়া রাখে।

তাহাতেই হয়ত শহর নামের ভাগাড় থেকে বাহির হইয়া কোনদিন কোন গ্রামের সুশোভিত প্রান্তে দাঁড়াইয়া বলিতে পারিব-বাংলা মা আমার, তুমি সত্যি অপরূপা অতুলনীয়া। স্বর্গ শুধু পুণ্যবানদের ভাগ্যে জোটে অথচ তুমি পাপী তাপী সকলের! সোনার বাংলা, মা আমার তাইতো তোমায় এত ভালবাসি!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • জান্নাতি বেগম
    জান্নাতি বেগম নদীর তীরে মিষ্টি কুমড়ার খেতে হলুদ ফুলগুলি মৃদুমন্দ বাতাসে দুলিতেছে। তাহারই পাশ দিয়া একটি কুমারী বালিকা ছাগশাবক কোলে তুলিয়া লইয়া উহার মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে বাড়ির পথ ধরিয়াছে। খুব ভালো লাগলো । ( আপনার সুখ টাক চরিত্রের গ ল্প টির পড়ে বো দ হয় এটি পড়লাম । )
    প্রত্যুত্তর . ৫ এপ্রিল, ২০১৪
  • রনীল
    রনীল ভিন্ন এঙ্গেলে লিখেছেন। আমার এখানে জানালা দিয়ে তাকালে গাছপালা, শস্যখেত দেখতে পাই। দূরের পাহাড়, ছোটখাট একটা বিল ও দেখতে পাই। এই সুখ কয়দিন কপালে জুটবে জানিনা, ঢাকায় ফেরার কথা ভাবলেই মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। দ্বিতীয় পরিচ্ছদটি অপূর্ব। আপনার এখন ভালো ফর্ম যাচ্ছে,...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৮ এপ্রিল, ২০১৪
  • দীপঙ্কর বেরা
    দীপঙ্কর বেরা Lekhay valobasa jhore porche
    khub bhalo laglo
    প্রত্যুত্তর . ৯ এপ্রিল, ২০১৪
  • রোদের ছায়া
    রোদের ছায়া আপনি তো ভয় ধরাইয়া দিলেন,স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি মহলের কারণে যেরূপে নগর বসবাসের অযোগ্য হইয়া পরিয়াছে, এই স্বার্থান্বেষী মহলের কৃপা দৃষ্টি হয়তো অচিরেই আমাদের সবুজ পল্লীর দিকে পরিবে। শেষে না আবার স্বপ্নের গ্রামগুল বাস্তব দৃশ্যপট হইতে হারাইয়া কেবলমাত্র স্বপ্নলো...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৯ এপ্রিল, ২০১৪
  • ফেরদৌসী বেগম (শিল্পী )
    ফেরদৌসী বেগম (শিল্পী ) কি চমৎকারভাবে আমাদের দেশের নগর জীবন, গ্রামীন জীবন এবং আমরা মানুষদের বর্তমান ভয়াল জীবন-যাপনের দৃশ্যের চিত্রগুলো অঙ্কন করেছেন আপনার এই গল্পে, তা সত্যিই অসাধারণ। আমি তো ভাই, দেশের বাইরে থাকি অনেক অনেক বছর ধরে, তাই আমার দেশটাকে আমি মনে রেখেছি স্বপ্নের মত করে...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ১১ এপ্রিল, ২০১৪
  • biplobi biplob
    biplobi biplob Nagoric jibonar chitro chitritho hoyasha sundor vaba.
    প্রত্যুত্তর . ১২ এপ্রিল, ২০১৪
  • প্রজ্ঞা  মৌসুমী
    প্রজ্ঞা মৌসুমী আমাদের রুচিও কেমন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। শহর নোংরা করার প্রবণতা দেশের বাইরেও দেখেছি। ট্যাক্স, গার্বেজ-বিল আর প্রতি শুক্রবার মধ্যরাত থেকে বিশাল বিশাল ট্রাকগুলা না নামলে কি যে হতো। পরিষ্কার রাখার দায় যেন বাড়িওয়ালা আর সরকারের বেশি। আসলে শহরকে আমরা ইউজ করি, ধারণ কর...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ২২ এপ্রিল, ২০১৪
  • এশরার লতিফ
    এশরার লতিফ মানে দাঁড়ালো এই যে সরকারী সদিচ্ছা থাকলেও আমরা নিজেদের স্বার্থে নগর উন্নয়নকে ব্যাহত করি। ভালো লাগলো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর এই উপস্থাপনা।
    প্রত্যুত্তর . ২২ এপ্রিল, ২০১৪
  • মোহাম্মদ ওয়াহিদ হুসাইন
    মোহাম্মদ ওয়াহিদ হুসাইন সরকারের সদিচ্ছা থাকিলেও থাকিতে পারে, কিন্তু সেখানকার গদি নসিনগণ আপনাপন উদর স্ফীত করার লক্ষে নানাবিধ...থাকগে। চমতকার বর্ণনা- চমতকার লিখেছেন। শুভেচ্ছা রইল
    প্রত্যুত্তর . ২৫ এপ্রিল, ২০১৪
  • এফ, আই , জুয়েল
    এফ, আই , জুয়েল # অনেকটা রচনার মত-----, বেশ সুন্দর একটি লেখা ।।
    প্রত্যুত্তর . ২৯ এপ্রিল, ২০১৪

advertisement