লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ নভেম্বর ১৯৬৭
গল্প/কবিতা: ৩২টি

সমন্বিত স্কোর

৬.১৩

বিচারক স্কোরঃ ৩.৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৩৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftশীত (জানুয়ারী ২০১২)

ডাক দিয়ে যায়
শীত

সংখ্যা

মোট ভোট ১২৮ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.১৩

মোঃ আক্তারুজ্জামান

comment ১১৪  favorite ১১  import_contacts ২,৬৯৭
পৌষের শেষ সপ্তাহ। শীতের পূর্ণ যৌবন চলছে। দিন কয়েক ধরেই আকাশটার মুখ ভার- সূর্যের আলো কুয়াশার ঘোমটা সরিয়ে কিছুতেই মাটি স্পর্শ করতে পারছে না। বাতাস বিনা জীবন বাঁচে না। মানুষ দমে দমে বাতাসের গুণ কীর্তন করে। সেই বাতাস হিমালয় হতে সবেগে নেমে এসে দেশময় শৈত্যের তেজী ঘোড়া দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে। হাল্কা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিও বাতাসের সঙ্গী হয়ে যেন অদৃশ্য মজা লুটছে! দেশ প্রায় অচল- রাস্তাঘাট মানুষ শুন্য। সবাই স্বইচ্ছায় ঘর বন্দী হয়ে দরজা জানালা, ঘরের ছোট খাট ফাঁক ফোঁকর পর্যন্ত বন্ধ করায় ব্যতিব্যস্ত। কেউ যেন আর একরত্তি বাতাসও চায় না।

রাজধানীর একটা রেলষ্টেশন। বিশাল দক্ষিণমুখী চত্বরে বড় প্ল্যাটফর্ম। সব সময় লোকজন গিজগিজ করে। বিশেষ করে গরমের দিনে। আশে পাশে যখন বিদ্যুৎ থাকে না। লোকজন পিঁপড়ার মত যেন কিলবিল করে ছুটে আসে। ফাঁকা চত্বরের আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থেকে লোকজন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে চেষ্টা করে।

মাত্রাতিরিক্ত শৈত্য প্রবাহ যেন দুর্যোগের রুপ নিয়েছে। সন্ধ্যার আগে থেকেই রেল ষ্টেশনটা একেবারে ফাঁকা হয়ে গেছে। যাত্রী বিশ্রামাগারে গোটা কয়েক দূর পাল্লার যাত্রী গালে হাত দিয়ে কিংবা চাদরে মুখ ঢেকে মুখ বিরস করে বসে আছে । হয়ত ভ্রমণটা কতটুকু পীড়াদায়ক হবে তারই আন্দাজ করার চেষ্টা করছে। শীতের তাড়া খেয়ে আশ্রয় নেয়া পাঁচ সাতটা পথ শিশুর দুষ্টামি, বিশ্রী হাসাহাসিতে ভদ্র যাত্রীগণ ভিতরে ভিতরে সীমাহীন ত্যক্ত বিরক্ত। ওই দলেরই একটা তের চৌদ্দ বছরের মেয়ে একটু দূরে বসে নিজের ছেঁড়া জামাটা টেনে টুনে হাঁটু আর পায়ের গোড়ালি ঢেকে শীতের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করেছে। ক্ষেতের কোণার অনাদরে বেড়ে উঠা লতার মতই মেয়েটার গড়ন। লিকলিকে স্বাস্থ্য- উচ্চতার সাথে শীর্ণকায় শরীর খুব বেখাপ্পা, বেঢপ!

মেয়েটা আগে এই দলের সাথে সমানে তাল মিলিয়ে চলত। ট্রেনের ছাদে চড়ে সিলেট, চট্রগ্রাম দাবড়িয়ে বেড়াত। বয়সটা এখন প্রতিদিন একটু একটু করে ওর বিপদ বাড়িয়ে চলেছে । আগে ছোট বলে লোকজন দু একটা টাকা নয়ত এটা ওটা খেতে দিত এখন ওসব প্রায় বন্ধ। হাত পাতলে লোকজন গালি গালাজ করে, কাজ করে খেতে বলে। প্রায়ই শক্ত হাতের থাবায় নিপীড়িত হয়ে মাঝ রাতের ঘুম ভেঙ্গে যায় মেয়েটার। এসব মিলিয়ে মেয়েটা দলে এখন কেমন যেন খাপ ছাড়া মত হয়ে থাকে।

এরকম একটা মেয়ের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আমাদের সবার মনে প্রথম যে চিন্তাটা আসবে তা হল- একদিন এই মেয়েটার নাম ভাসমান পতিতার খাতায় উঠে যাবে। দিনের পর দিন পড়ে থাকা মালবাহী রেলের বগির আশে পাশে বিশ ত্রিশ টাকার জন্য নেশাখোর, দিন মজুর কিংবা রিক্সাওয়ালাদের কাছে শরীর বিলিয়ে দিবে। ভাগ্যে থাকলে প্রতারকের হাতে পড়ে সীমানা পেরিয়ে ওপারের সোনাগাছি পতিতা পল্লীতেও চলে যেতে পারে। মুখে সস্তা পাউডার, লিপিস্টিক লাগিয়ে লোক পটানোর চেষ্টা করবে- বাবু, আমার ঘরে এস গো! আমি বাংলাদেশের মুসলমান মেয়ে, বিপদে পড়ে এ লাইনে নতুন এসেছি। আমার কোন রোগ বালাই নেই।

হঠাৎ করেই যাত্রীদের সাথে আশ্রয় নেয়া শয়তানের পাঝারাগুলি দুষ্টামি বন্ধ করে একেবারে চুপ মেরে যায়। খরগোশের মত কান খাড়া করে সবাই উৎকীর্ণ ভাবে কিছু একটা শোনার চেষ্টা করে। বন্ধ দরজাটা একটু খুলে ওদের একজন বাইরে উঁকি মেরে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করে পর মুহূর্তেই ছুটে বেরিয়ে যায়। ভেড়ার পালের মত মুহূর্তেই একটার পিছনে একটা করতে করতে সবাই গায়েব। সবার শেষে ওদের দলের ওই মেয়েটাও। বসে থাকা যাত্রীরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, তাঁদের মাঝে বেশ স্বস্তি নেমে আসে।

প্ল্যাটফর্মের এক মাথায় ষ্টেশনের কয়েকজন কর্মচারী জড়ো হয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করছে। পথ শিশুদের পুরো দলটি ওখানে গিয়ে ভিড় করে দাঁড়ায়। মোটা একটা পিলারের পাশে ষাটের কাছাকাছি বয়সের একজন বৃদ্ধা কাত হয়ে পড়ে আছে। শীতে তাঁর খিঁচুনি উঠেছে। পরনে একটা পুরানো আধ ছেঁড়া ময়লা কাপড় গায়ে আর একটা ওই একই রকম কাপড় চাদরের মত করে জড়ানো। এই বৃদ্ধা বছর কয়েক ধরেই এই ষ্টেশনে ভিক্ষে করে, রাতে প্ল্যাটফর্মে ঘুমায়। প্রচণ্ড শীতের রাতে বাইরের খোলা হাওয়ায় তাঁর মরণাপন্ন অবস্থা হয়েছে। সবাই তাঁকে ঘিরে চিৎকার চেঁচামেচি করছে ঠিকই কিন্তু কেউ কাজের কাজ করা তো দুরের কথা ছুঁয়েও দেখছে না। একজন মানুষের মৃত্যুটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা যতটা সহজ একজন ভিখারীনির শরীরে সাহায্যের হাত রাখা যেন তার চেয়ে অনেক কঠিন কাজ!

জাত পাত, উঁচু নীচুর ভেদাভেদ সম্পর্কে সচেতন মানুষগুলির একজন ঘাড় ঘুরিয়ে পথ শিশুদের দলটিকে লক্ষ্য করে দাঁত মুখ খিচিয়ে বলল- ঐ হালার পুতেরা, খাড়াইয়া খাড়াইয়া তামশা দেখতে আছস, না? যা কিছু লইয়া আয়। আগুন ধরা, না হয় এই বুড়ি অহনেই মরব।

হর হামেশা কারণে অকারণে গালি শোনায় অভ্যস্ত শিশুর দল প্রচণ্ড একটা হৈ হৈ রব তুলে এদিক সেদিক ছুটে যায়। হাড় কাঁপানো শীত ওদের শরীর মন কব্জায় রাখতে পারে না। সবার মনে তখন একটা কথা- আগুন না হলে বুড়িটা মরে যাবে।

দলের সেই মেয়েটা এগিয়ে গিয়ে বুড়িকে টেনে তোলার চেষ্টা করে। মিনিট কয়েকের মধ্যে ছেঁড়া ময়লা কাগজ, কাঠের টুকরা, সিগারেটের প্যাকেট, টুকরা কাপড় চোপড়ের একটা স্তুপ জমে উঠে। একজন তাতে দিয়াশলাইয়ের আগুন ধরিয়ে দিতেই পথ শিশুর দলটি আরেক দফা হৈ হৈ করে উঠে। আবার ছুটে গিয়ে আগুনকে বলীয়ান করতে আরও কিছু নিয়ে এসে তা জলন্ত আগুনে ছুড়ে দেয়। এভাবেই চলতে থাকে- যেন একটা ছোটখাট উৎসব।

মেয়েটা আগুনে হাত তাতিয়ে নিয়ে বুড়ির হাত পায়ের তলায় মালিশ করার মত করে ঘষে দেয়। গালে কপালে উষ্ণতার ছোঁয়া দেয়ার চেষ্টা করে। এর একটা ভাল ফলও দেখা যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই বুড়ি ধাতস্থ হয়ে নড়ে চড়ে নিজেই উঠে বসে। আরেক দফা তুমুল হৈ হল্লা করে শিশুর দলটি বুড়ির চির প্রস্থানের দ্বার প্রান্ত থেকে ফিরে আসাকে যেন স্বাগত জানায়।

বেশ রাত অবধি ওরা আগুনের কাছে হৈ চৈ করে কাটায় তারপর সবাই ঐ আগুনটাকে ঘিরে এক একজন কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এক সময় দুর্বল শরীরে উষ্ণতার আঁচ নিয়ে বুড়িটাও ঘুমিয়ে যায়। ঘুমায় না শুধু মেয়েটা। ওর মনে একটা ভয় কাজ করে আগুনটা নিভে গেলে হয়ত বুড়িটা মরে যাবে। সারা রাত ও ষ্টেশন চত্বর ঘুরে ঘুরে এটা ওটা কুড়িয়ে এনে আগুনটাকে বাঁচিয়ে রাখে। সকাল নাগাদ দেখা যায় ষ্টেশন চত্বর ঝকঝকে- আবর্জনা মুক্ত!

বার কয়েকের মৃদু ধাক্কা খেয়ে মেয়েটা ধড়মড় করে উঠে বসে। বেলা প্রায় মাথার উপর উঠে এসেছে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নেই আকাশটা ঝকঝকে পরিস্কার, নেই কোন ঠাণ্ডা বাতাসও। দিনটা কখন যেন নিজের আবরণটা বদলে ফেলেছে।

বুড়ির বাড়িয়ে দেয়া হাত থেকে এক টুকরা রুটি নিতে নিতে তার রাতের সব কথা মনে পড়ে। কিন্তু সকালে ক্লান্ত শরীরে কখন যে নিজেই ঘুমিয়ে পড়েছিল তা মেয়েটা মনে করতে পারে না। সে বাসী মুখে রুটি পুরে দেয়, বুড়িটা তার রুক্ষ লালচে এলো চুলে শীর্ণ আঙ্গুলে মমতা মাখানো বিলি কাটে।

নিঃশব্দ সময় বয়ে যায়। বুড়িটা মনে মনে কী যেন ভাবে হয়ত নিজের অতীত নয়ত মেয়েটার ভবিষ্যৎ! এক সময় বলে- হ্যাঁ রে মা তোর নামডা কী?


মেয়েটার ঠোটের কোণায় লালা শুকিয়ে বিশ্রী রকমের সাদা হয়ে আছে। সে আয়েশী ভাবে রুটি চিবুতে চিবুতে আবেগ, উচ্ছ্বাসহীনভাবে নির্বিকার গলায় নিজের নামটা বলে- তাহেরা।

বুড়িটা আর কিছু জানতে চায় না। হয়ত মেয়েটার অতীত ঘেঁটে যা পাওয়া যাবে তা সে শুনতে চায় না। সে তাহেরার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে এক সময় ঘোলা চোখে খুব মনোযোগ দিয়ে দু’আঙ্গুলের চিমটিতে মস্ত বড় বড় এক একটা উকুন তুলে আনতে থাকে। এক সময় মাথায় আলতো করে একটা চড় দিয়ে অনুশাসনের সুরে বলে- ছিঃ মাইয়ার মাতা না ত যেমুন পোকের বাসা গো!


তাহেরা ফিক করে হেসে ফেলে। বুড়ির দুঃখ, কষ্ট, লাঞ্ছনা, বঞ্চনার জাতাকলে পিষ্ট শ্রীহীন মুখেও এক টুকরা হাসি ছড়িয়ে পড়ে। হয়ত অনেক দিন পর সে হাসে। তাহেরার আরও কাছে এগিয়ে বসে, খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে। যেন দুজন সত্যিকারের মা ও মেয়ে!

খুব তাড়াতাড়ি ওরা দুজন সত্যি সত্যি মা মেয়ে হয়ে উঠে। রক্তের সম্পর্কে নয়, আত্মার বন্ধনে। তাহেরা প্রাণ ভরে মায়ের মমতার আস্বাদ গ্রহণ করে। সারাদিন এখানে ওখানে টো টো করে ঘুরে ঠিকই কিন্তু মনটা পড়ে রয় মায়ের কাছে। কিছু পেলেই মায়ের কাছে ছুটে আসে। কলাটা রুটিটা হলে দুজনে ভাগ করে খায়। দুচারটা টাকা পেলে মায়ের আঁচলে বেঁধে রাখে।

ট্রেনের এক যাত্রী একদিন মাকে একটা চাদর দিয়ে যায়। মা মেয়ে এখন গলা জড়াজড়ি করে চাদরের নীচে থাকে। সঙ্গী থাকায় তাহেরা এখন অনেকটাই নিরাপদ, রাত বিরেতে কেউ ত্যক্ত, বিরক্ত করে না। মায়ের শরীরের উষ্ণতা নিয়ে সে এখন খুব আয়েশী রাত কাটায়।

কোন কোন দিন শেষ রাতের দিকে মা তাহেরাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে- মা রে, আমি বোধ হয় আর বাচুম না রে। শীত আমার কলিজায় কেমন কামড় মারে রে- মা।

তাহেরার কাছে তেমন শীত মনে হয় না তবু মা কেন শীতের কথা বলে সে বুঝতে পারে না। মাঝে মধ্যেই আশে পাশের মসজিদের মাইক থেকে খুব ভোরে শোক সংবাদের ঘোষণা ভেসে আসে। তার খুব ভয় হয় সে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে মায়ের বুকের কাছে ঘনিষ্ঠ হয়, অবিচ্ছেদ্য হয়ে থাকার চেষ্টা চালায়।

একদিন মাঝ রাতে তাহেরার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তলপেটটা কেমন চাকা হয়ে তীব্র ব্যথা করে। সে ব্যথায় কুঁকড়ে যায়। এক সময় অনুভব করে নিম্নাঙ্গের দিকে একটা উষ্ণ তরল প্রবাহমান। ভয়ে সে শব্দ করে কেঁদে ফেলে।

মা ধড়মড় করে উঠে বসে। একসময় ঘটনাটা বুঝতে পেরে তাহেরাকে একটু আড়ালে টেনে নিয়ে যায়। তাঁর গায়ে জড়ানো কাপড়খানা টেনে টেনে ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে। কাপড়ের পাড় দিয়ে টুকরা কাপড়ের দু মাথা বেঁধে নেংটির মত বানায়। তাহেরার কোমরে ওটা বেঁধে দিতে দিতে বলে- এত দিন একটা মাইয়া ছিলি আজ থেকে তুই মাগী! ভুল করছস তো মরছস। একটা কতা মনে রাখিস পুরুষ মানুষ কোন দিন মাইয়া মাইনসের আপন হয় না।

শরীরের ভাঙ্গন মায়ের অনুশাসন- তাহেরা জীবনের এমন একটা মোড়ে এসে হতবাক। ভয়ে অনেকটা কুঁকড়ে যায় সে। ষ্টেশনে ডাব বেচে ছেলেটা সন্ধ্যার পরে হাতে দশটা টাকা গুঁজে দিয়ে দুটো মালগাড়ীর ফাঁকে দাঁড়িয়ে বুক কচলে দিয়েছিল। জাপটে ধরে কেমন ফোঁস ফোঁস করতে করতে কাল আবার যেতে বলেছে, কোথাও সুন্দর একটা জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যাবে।

শীতটা একটু একটু করে কমতে থাকে কিন্তু তাহেরার মায়ের শরীরটা ক্রমেই খুব খারাপ হতে থাকে। একদিন দুপুরের দিকে বার দুই বমি হয়। কাপুনি দিয়ে প্রচণ্ড জ্বর উঠে। তাহেরা কোন মতে ধরে নিয়ে প্ল্যাটফর্মের বাইরে খোলা জায়গায় রোদে শুইয়ে দেয়। সন্ধ্যার দিকে অনেকটা ঘোর লাগা কণ্ঠে সে তাহেরাকে বলে- শীত আমার কলিজায় কামড় দিছে রে মা। আমি আর বাচুম নারে। পারলে একটু আগুন জ্বালা।

তাহেরা ছুটোছুটি করে আগুন জ্বালায়। এক সময় তার মা বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকে। তাহেরা ভাবে মা ঘুমিয়েছে। সে আগুনটাকে মায়ের জন্য সারা রাত জিইয়ে রাখে। যদিও সে বুঝতে পারে না তার মায়ের সব কিছুর প্রয়োজন প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। সকালের দিকে কাঁচা রোদ মা, মেয়ের শরীর স্পর্শ করে। মা শেষ বারের মত চোখ মেলে তাকায়। তাহেরা মায়ের মুখের দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে ডাকে- মা! মা!

মা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা হাত তোলার চেষ্টা করে কাউকে ডাকার মত করে ঠোঁট নাড়ায়। কিন্তু নিস্ফল চেষ্টা দু’ঠোঁটের মাঝেই নিঃশব্দে বিলীন হয়ে যায়!







মোল্লা বাড়ীতে উৎসবের আমেজ। নইমুদ্দিন মোল্লার মেয়ে রহিমা তার স্বামী, ছেলেমেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ী এসেছে। প্রতি বছর সে শীতে একবার আসে। মহাধুমধাম করে আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশীদের খাসি জবাই দিয়ে খাওয়ায়, সদর থেকে ইয়া বড় বড় মাছ কিনে আনে সেই মাছ দেখতে, কুটতে পাড়ার বউঝি’রা বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে ছুটে আসে।

পেট ভরে লোকজনে খায়। রহিমা, রহিমার স্বামীর খুব প্রশংসা করে। যাওয়ার সময় রহিমার স্বামী কী মানুষ কয় দিনে কী হয়ে গেল বলে ভাগ্য নামের অদৃশ্য জিনিসটার গুণগান করে!

নইমুদ্দিনের প্রথম সংসারের সন্তান রহিমা। সে প্রথম সাদী করা পরিবারটা রাখেনি। ভাল লাগল না তাই বাদ দিয়ে দিল। রহিমার মা অবশ্য থাকতে চেয়েছিল। মোল্লার হাত পায়ে ধরে অনেক কান্নাকাটি করেছে- অন্তত দাসী বাদীর মত একটু ঠাই দিতে। সত্যি শুধু ভাল লাগল না বলেই ছ’মাসের মেয়েটাকে রেখে পরিবারকে মোল্লা তালাক দিয়ে দিল।

দ্বিতীয় পরিবারের কোলে পিঠে চড়ে রহিমা বড় হয়েছে। তাকেই রহিমা মা বলে জানে। কেউ যদি বলে মোল্লার দ্বিতীয় পরিবার রহিমার মা না তবে রহিমা কেঁদে বুক ভাসায়।

মেয়ের পনের ষোল বছর বয়সের সময় পাশের গ্রামের এক ছেলের সাথে নইমুদ্দিন তার বিয়ে ঠিক করে। ছেলের ছোট ব্যবসা। বাড়ীতে বিস্কুট, নিমকী, রুটি ইত্যাদি বানিয়ে গ্রামের দোকানগুলিতে বিক্রী করে।

মেয়ের বিয়ের দিন কয়েক আগে মোল্লার কাছে পোস্ট অফিস থেকে পিওন এসে হাজির। একটা ছোট চিঠি আর চল্লিশ হাজার টাকার মানি অর্ডার! মোল্লার চোখ কপালে। তালাক দেয়া পরিবার মেয়ের সুখের জন্য আয়া বুয়াগিরি করে সারা জীবনের সঞ্চয় পাঠিয়েছে।

মোল্লা টাকাটা বিয়ের দিন জামাইর হাতে দিয়ে দিল। একটা টাকাও নিজে রাখল না। তালাক দেয়া বউ আর বউয়ের টাকা দুটোই যে তার জন্য না জায়েজ এ শিক্ষাটুকু তার ঠিকই আছে!

বিয়ের পর সত্যি সত্যি মেয়েটা সুখী হল। কিছু দিনের মধ্যেই জামাই শহরে একটা লোকসানে পড়া রুটি, বিস্কুট ফ্যাক্টরি ভাড়া নিয়ে চালু করল। তারপর তার উন্নতিই উন্নতি!

রহিমা স্বামী সন্তান নিয়ে শহরে চলে যাবে। মোল্লার মন খারাপ, প্রতিবারই এমন হয়। সে গাছিকে খবর দিয়ে খাঁটি খেজুরের রস আনায়। কাজের লোক দিয়ে গাছ থেকে বড় বড় পাকা নারকেল পারায়। রাতে বাড়ীতে বড় বড় চিতল পিঠা বানিয়ে দুধ, নারকেল আর খেজুরের রসে ভিজিয়ে রাখা হয়।

রহিমা খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে। সব কিছু গুছিয়ে ছেলে মেয়েকে ঘুম থেকে তোলে। কাপড় চোপড় পরাতে পরাতে রোদ উঠে যায়।

বারান্দার রোদে খেজুর পাতার পাটিতে স্বামী ছেলেমেয়েকে বসিয়ে রান্না ঘরের দিকে ছুটে যায় রহিমা। নাস্তা করেই তারা বেরিয়ে পড়বে।

একটা চামচ দিয়ে বড় একটা ঝকঝকে ষ্টীলের গামলায় সে একটা একটা করে দুধ পিঠা তোলে। ভরা গামলাটা তুলে নিয়ে রান্না ঘরের বাইরে পা রাখা মাত্র তার হৃদপিণ্ডটা কেমন জানি একটু অস্থির হয়ে উঠে। হৃদপিণ্ডের ছন্দ পতন শরীরকে আন্দোলিত করে। হাত থেকে ষ্টীলের গামলাটা উঠানে আছড়ে পড়ে ঝন ঝন শব্দ তোলে। কোন মতে নিজেকে সামলে নিয়ে রহিমা বুকে হাত রাখে- দূর, দূর, এই সকাল বেলা আবার কোন মড়া নাম নিল গো!



প্রিয় পাঠক জগত সংসারে প্রতিটি দিন, মান, ক্ষণ কত বিচিত্র কিছু ঘটে। তাহেরার মায়ের অন্তিম মুহূর্তে কারো নাম ধরে ডাকার চেষ্টা আর একই সময় রহিমার হাত থেকে গামলাটা মাটিতে পড়ে যাওয়া কোন বিচিত্র ঘটনা না, শ্বাশত সত্য! পিতা মাতা যাওয়ার আগে সব সময়ই সন্তানকে ডাক দিয়ে যায়- বাছা, ওরে মানিক, প্রিয় সন্তান আমার- আমি আসিরে!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement