লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৯১
গল্প/কবিতা: ১টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

১৪

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_left২১শে ফেব্রুয়ারী (ফেব্রুয়ারী ২০১২)

অমলিন একুশ
২১শে ফেব্রুয়ারী

সংখ্যা

মোট ভোট ১৪

Md. Zihad Jony

comment ৯  favorite ৪  import_contacts ১,২১০
ব্যস্ত দিনের শেষে বাড়ি ফিরছি। ভার্সিটির বাসটা বড় রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে ভোঁ করে টান দিয়ে চলে গেল। বাড়ির সদর দরজাটা দু’মিনিটেরও পথ না, তবুও এই পথটুকু হাঁটতেই ব্যাপক কষ্ট হয় আমার। সকাল থেকে টানা ক্লাস আর সারাটা দুপুর-বিকাল জুড়ে ল্যাব করে এসে এই পথটুকু পাড়ি দেওয়ার সবচেয়ে বিরক্তিকর অংশটা হল পাশের ‘সওদাগর মিউজিক স্টোর’-এর সাউন্ডবক্সটা। কাকতালীয় ভাবেই হোক বা না-ই হোক, মজার বিষয় হল, আমার চরম ক্লান্তিকর সময়ে প্রায়ই ঐ সাউন্ডবক্সটাতে বাজতে থাকে-‘এই পথ যদি না শেষ হয়…………’। কানে আসার পরপরই আমার ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠে-‘তাহলে খুব-ই খারাপ হত’। আজকে এর ব্যতিক্রম হওয়ায় আমি কিঞ্চিত খুশিই বটে! মাঝখান থেকে মোবাইলটা বিপত্তি বাধিয়ে বসল-লিনার কল। লিনা আমার দুঃসম্পর্কের খালাতো বোন। বয়সে আমার চেয়ে ষোল দিনের ছোট। এক পাড়াতে পাশাপাশি থাকি। আত্মীয়তা ছাপিয়ে সম্পর্কটা বন্ধুত্বেই জমে বেশি। হয়তোবা বন্ধুত্বের চেয়েও বেশি কিছু!

‘হ্যালো, কি খবর?’ কন্ঠে ক্লান্তির ছাপ। বেশ ক’সেকেন্ড উত্তর নাই দেখে বিরক্তিই লাগলো। একবার মনে হল এর চাইতে গানটাই ভালো ছিল, হাজার হোক গান তো! মানুষের মন বড় আজব জিনিস, কত দ্রুত ভাবতে পারে!
যা হোক, ওপার থেকে উত্তর এলো বেশ গুরুগম্ভীরভাবে-‘আজকে কয় তারিখ?’ আমি বললাম-‘কেন, বিশ তারিখ’। একই স্বরে আবারো শুনতে পেলাম-‘এটা কোন মাস?’ বিরক্তি চেপে বললাম-‘ফেব্রুয়ারি মাস’। ‘আচ্ছা, তোমার কি কিচ্ছু মনে নাই?’-এবার কন্ঠে আক্ষেপ। ‘কেন, কি হয়েছে? ২১শে ফেব্রুয়ারি তো কাল।’-কথা বলতে বলতেই বাড়িতে ঢুকলাম। ‘আজ আমার জন্মদিন’।–লিনা বললো। আমি চট করে বললাম-‘ও, সরি-ইইই, আমি একদমই ভুলে গেছি। শুভ জন্মদিন। Have a blast!’ এরপর চটজলদি কথা শেষ করলাম।

মাগরিবের আযান দিচ্ছে। নামাজ পড়লাম। চা-নাস্তার ফাঁকে আগামিকালকের ‘প্ল্যান-প্রোগ্রাম’ সাজিয়ে ফেললাম। কাল ২১শে ফেব্রুয়ারি। আমার প্রিয় দিনগুলোর মাঝে অন্যতম। প্রিয় দিনের ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। ছোটকাল থেকেই আমি বেশ সংস্কৃতিমনা। নানান প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অনেক পুরস্কারও পেয়েছি। আমি তখন ক্লাস সেভেন-এ। ২১শে ফেব্রুয়ারিতে তিনটা প্রতিযোগিতাই অংশ নিয়েছিলাম-রচনা লিখন, কবিতা আবৃত্তি আর উপস্থিত বক্তৃতা। সেবার তিনটাতেই প্রথম হয়েছিলাম। আমি তো মহাখুশি। তারপর থেকেই ২১শে ফেব্রুয়ারি আমার ‘লাকি ডে’ হয়ে গেল। মজার বিষয় হল, আমি রচনা লিখনে পরপর তিনবছরই প্রথম হয়েছিলাম। চারবারের বেলায় আর দিইনি। মনে হয় ভয় পেয়েছিলাম, এইবার যদি প্রথম স্থানটা হাথছাড়া হয়ে যায়। বারবার রচনা প্রস্তুত করতে করতে আর লিখতে লিখতে কখন যে ২১শে ফেব্রুয়ারির আনন্দ-অশ্রুর কাহিনীটা প্রাণে গেঁথে গিয়েছিল বুঝতেই পারিনি। সময়ের সাথে এই বাংলাপ্রীতিটা বাড়তেই থাকে। এইতো কয়েকদিন আগেও একটা কোচিং-এ বাংলার ক্লাস নিলাম, যদিও আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি। অনেকে এই নিয়ে নানান প্রশ্নও করে। ভালোলাগাটা ভেতর থেকে আসে, লোকদেখানো বাইরের উচ্ছ্বাস দিয়ে কি হবে? আজকাল তো ‘ডরিমন (হিন্দি কার্টুন)’-এর যুগ হয়ে গেছে। আমাদের পাশের বাড়ির পিচ্চিটাও কথায় কথায় চটাং চটাং হিন্দি বলে যার উচ্চারণই এখনো শুদ্ধ হয়নি; এরকম বলে-‘আইয়ে(রে) আই টিয়ে, নায়ে ভয়া(রা) দিয়ে……।’ এত কথার পেছনে ছন্দ কিন্তু ঠিকই আছে। কালকের সব পরিকল্পনাতো এই একুশকে ঘিরেই।

আজ লিনার একুশতম জন্মদিন। কাল হবে তার একুশতম বছরের প্রথম দিন। এই সুযোগে দেখি - মেয়েটার মধ্যে কোন একুশের চেতনা, বাংলা প্রীতি ঢোকানো যায় কিনা। কারন, যতদিন ওকে দেখছি, কখনো বাংলাকে নিয়ে ও গর্ব করেনি, মুল্য বোঝেনি। ভাষার জন্য রক্তদানের যে বিরল ইতিহাস তা ও এখনো ভেতর থেকে অনুভব করেনি। আর করবেই বা কি করে? এ বিষয়ে ওর জ্ঞান তো নবম-দশম শ্রেণির সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের কয়েক পাতা পর্যন্তই। একগাদা ইংলিশ ব্যান্ডের নাম মুখস্ত থাকলেও বাংলা গানের ধারে কাছেও সে নাই। তার কম্পিউটারে শ’খানেক ইংরেজি মুভি থাকলেও বাংলার জন্য একটা ফোল্ডারও নাই। অথচ আমাদের দেশের অবানিজ্যিক বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র শিল্পকর্মে স্থান করে নিয়েছে যা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। চালচলনে পশ্চিমা না হলেও মননে সে অনেক খানিই তাই। বিষয়টা বেশ চিন্তার। কিছু একটা করা দরকার। সবকিছু ঠিকঠাক করে রাতে একটা ‘মুঠোফোন বার্তা’ পাঠালাম-‘কাল সারাদিন তোমার জন্মদিন উদযাপন করব একুশের আমেজে। তৈরি থেকো।’

কাকডাকা ভোরের একুশে হালকা শীতের আমেজ। ঘুম থেকে উঠে পুবের জানালাটা খুলে দিলাম। সুয্যি মামার ঘুম এখনো ভাঙ্গেনি। মিনিট বিশেক পরের কথা। আমাদের বাগান থেকে বেশ কয়েকটা গোলাপ, কিছু সাদা জবা, গোটা তিনেক চন্দ্রমল্লিকা আর গাঁদা মিলিয়ে সর্বমোট একুশটা ফুল দিয়ে ভরিয়ে তুললাম গত পহেলা বৈশাখে কেনা ছোট্ট ডালিটা। কালোর উপর সাদা সুতোর কারুকাজ করা পাঞ্জাবিটা চটজলদি গায়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সঙ্গে ছোট্ট ডালিটা। তার আগে আম্মাকে আলাদা করে তুলে আনা দুইটা টকটকে গোলাপ দিয়ে বললাম-‘একটা তোমার জন্য, আরেকটা আমার পিচ্চি আদুরে বোনটার জন্য-একুশের শুভেচ্ছা।’ লিনাদের বাসায় নক করতেই খালা বেরিয়ে আসলেন, পিছু পিছু লিনাও এসেছে। খালাকে সালাম দিয়ে লিনাকে রেডি হতে বললাম। ও মোটামুটি তৈরিই ছিল। খালাকে সারাদিনের প্ল্যান বলে বিদায় জানালাম-‘দেখো খালা, তোমার মেয়ে আজ বাঙ্গালি হয়েই ঘরে ফিরবে। চললাম।’ লিনাকে ফুল সাজানো ডালিটা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটু উচ্চৈস্বরে বললাম-‘একবিংশ শতাব্দীর এক আধুনিকমনা মেয়ের একুশতম বছরে পদার্পণ উপলক্ষে একুশটা ফুলের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।’ এবার মুখ নামিয়ে ওর কানের কাছে আস্তে করে বললাম-‘এবং আজ একুশে ফেব্রুয়ারি-আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।’ হুমম্ বলে মাথা ঝাঁকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিল লিনা। দিনটা ভালোই যাবে মনে হচ্ছে, শুরুটাতো মন্দ হলো না! ‘তারপর, সারাদিনের কি এত পরিকল্পনা শুনি-’ জানতে চাইলো লিনা। আমি বললাম-‘শুনে কাজ নাই, দেখতেই তো পাবে।’ হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তায় এসে পড়লাম। মিনিট কয়েক হাঁটার পরে তিন রাস্তার মোড়ে এসে পড়লাম। একদিক থেকে একটা বড় দল এগিয়ে আসছে। সবার হাতে ফুল, কারো কারো মাথায় বাংলাদেশের পতাকা, অন্তরে-বাহিরে একটাই সুর-


‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো
একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি?’
লিনা দেখে বললো-‘কি সুন্দর! তাই না?’ আমি শুধু মাথা ঝাঁকালাম। দলটা কাছে আসতেই লিনা চোখ নাচিয়ে বললো-‘যাবে?’ মনে মনে এটাই চাইছিলাম। ওকে ইশারায় ডেকে আমি ততক্ষণে হাঁটা ধরেছি। সেন্ডেল জোড়া হাতে। লিনা এর আগে কখনোই এরকম মিছিলে যোগ দেয়নি। বইয়ের পাতায় পড়ে থাকলেও খালি পায়ে হাঁটতে হবে এইটা খেয়াল করেনি। আমি বলতেই সেণ্ডেল জোড়া খুলে হাতে নিল। ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম গানটাও গাইতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে আমার কাজটা খুব একটা কঠিন হবেনা। পায়ে পায়ে মিছিলটা শহীদ মিনারে পৌঁছে গেল। সবাই শহীদদের স্মরণে মিনারে ফুল দিচ্ছে। লিনা একটু পাশে ঘেঁষে ফুলভর্তি ডালিটা দেখিয়ে বললো-‘এটা আসলে আমার জন্যে নয়, তাই না?’ স্মিত হেসে বললাম-‘উঁহু, তোমার জন্যই। তবে আমি চাই-’ । লিনা আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে শহীদ মিনারটার দিকে ইঙ্গিত করে বললো-‘তুমি চাও, এগুলো ওখানে অর্পণ করি, তাই তো?’ আমি বললাম-‘ঠিক তাই’। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই ও আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললো শহীদ মিনারটার দিকে। আমরা একসাথে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করলাম। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় লিনা বললো-‘এক কাপ চা খাওয়াতে পারবে?’ হাতের সেন্ডেল জোড়া পায়ে দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললাম-‘কেন নয়?’ কিছুদূরে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে ধোঁয়া ওঠা গরম চা খেতে খেতে বললাম-‘লিনা জানো, আজকের দিনটাতে গোটা বিশ্বে এই গানটা কিন্তু বাংলাতেই গাওয়া হয়। ইংরেজিতে নয়। আর আমাদের বাংলা ভাষাতেও এমন চমৎকার সব গান আছে যে তুমি মুগ্ধ না হয়ে পারবেনা।’ লিনা চট করে বললো-‘আমি কিন্তু বাংলা বিদ্বেষী নয়।’ সুযোগে আমি আরেকটু সাহসী হয়ে উঠলাম-‘একুশে ফেব্রুয়ারির পুরো ব্যাপারটা জানতে চাও?’ লিনা মাথা ঝাঁকিয়ে বললো-‘’৪৮ থেকে শুরু করতে পারো।’ একটু হাসলাম বটে! বইয়ের পড়া ভুলে যায়নি তাহলে! বললাম-‘চলো’। ‘কোথায়?’-লিনা জানতে চাইলো। ‘এমন একজনের বাসায় যিনি আজকের এই দিনটাকে ’৫২ তে অনেক কাছে থেকে দেখেছেন।’ এবার লিনা বেশ আগ্রহভরে জিজ্ঞাসা করলো-‘ভাষাশহীদ?’ ‘আরে ধুর্, শহীদ হতে যাবেন কেন, উনি ভাষাসৈনিক। আগে আমাদের ক্যাম্পাসে একটা চায়ের দোকান চালাতেন। এখন বয়স হয়েছে। আর পেরে উঠেন না। উনার তিন ছেলে। বড় ছেলে ব্যবসা করে। অন্য দুজন ছোটখাটো সরকারি চাকরি করে। এখন ছেলেরাই উনার দেখাশুনা করে। চলো, উনার কাছেই শুনবে সেদিনটা কেমন ছিল?’ লিনা বেশ গম্ভীরভাবে বললো-‘চলো’। এরপর সারাটা দুপুর ওখানেই কাটলো। কথায় কথায় একুশ যেন উঠে এসেছিল ’৫২ থেকে বর্তমানে। ওখান থেকে বেরিয়ে লিনার মুখের দিকে তাকাতেই বুঝলাম আমার কাংক্ষিত পরিকল্পনা সফল হয়েছে। ওকে বললাম-‘সিনেমা দেখতে যাবে?’ ও বুঝতে না পেরে বললো-‘সিনেমা?’ ‘হুম্, সিনেমা। বাংলা সিনেমা মানে চলচ্চিত্র আর কি।’ লিনা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে বললো-‘কী সিনেমা?’‘আমার বন্ধু রাশেদ। উপন্যাসটা পড়েছ?’‘না। উপন্যাস থেকে বুঝি?’ ‘জাফর ইকবাল স্যারের লেখা উপন্যাস। অনেক ভালো একটা উপন্যাস।’ অতঃপর সিনেমা দেখা শেষ করে বাড়ির রাস্তাটুকুতে ও আমার কান ঝালাপালা করে দিল রাশেদের কথা বলে। আমি অবশ্য এই সুযোগে ওকে আরো কয়েকটা সিনেমার নাম বলে দিলাম-ওরা ১১জন, মাটির ময়না, গেরিলা এবং আরো কএকটা। আর ভাবলাম বাড়িতে গিয়ে আমার বুকশেলফ থেকে ওকে জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’টাও পড়তে দেব। মজার বিষয় হল, বড় রাস্তার মোড়ের ‘সওদাগর মিউজিক স্টোরে’ আজকেও ঐ গানটাই বাজছিল-‘এই পথ যদি না শেষ হয়………’।মনে মনে বললাম-‘মন্দ হত না।’ রাত্রে ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটা ম্যাসেজ পেলাম-‘একুশে ফেরুয়ারিটা আমার জীবনে আর কখনোই মলিন হবেনা। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। শুভ রাত্রি।’

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement