লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৫১টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৪৩

বিচারক স্কোরঃ ৩.৯৬ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৪৭ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftনতুন (এপ্রিল ২০১২)

বিম্বিসার ধূসর জগতে
নতুন

সংখ্যা

মোট ভোট ৪৯ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৪৩

লুতফুল বারি পান্না

comment ৩০  favorite ১  import_contacts ১,৩৯১
এক.
প্রথমে ফিসফাস, পরিচিতজনদের মধ্যে কানাকানি পেরিয়ে মুখে মুখে ঘটনাটা ক্রমেই কিছুটা শহরের, কিছুটা দেশের- আলোচিত ঘটনার দিকে পিছলে যেতে শুরু করার পর লোকজন স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় কিছুদিন মাতামাতি করল, ভড়ং জাতীয় বিচিত্র সব সন্দেহ প্রকাশ করল। এমনকি দূরদর্শী কেউ কেউ তার চিন্তা চেতনার মধ্যে সুদূর প্রসারী পরিকল্পনাও আবিষ্কার করে ফেলল এবং আবারো মানবিক স্বভাব ধর্মে তা এক পর্যায়ে মেনে নিতে শুরু করল। ব্যাপারটা এমন একটা বেকায়দা জায়গায় গোত্তা খেল যে এরপর যদি কোনদিন উল্টোদিকে ঘুরে আগের অবস্থানে ফিরে আসার চেষ্টা করে তবে সেটাই আবার একটা ভাঙচুর খবরে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। কথাগুলো খানিক পানি ঘোলা করে ফেলার মতই শোনা যাচ্ছে বোধ হয়। আরো একটু ঘোলা হোক। তারপর দেখেন এই ঘোলা পানিতেই কি চমৎকার একটা রাঘব বোয়াল শিকার করে ফেলি।

যাকে নিয়ে এত্ত এত্ত বিশেষ বিশ্লেষণ তিনি আসলে রাঘব বোয়াল গোত্রীয়ই। অনর্থক ঠুকঠাক রেখে আমরা বরং সরাসরি বিস্তারে চলে যাই। আমাদের নায়ক একজন সত্যিকারের নায়কই বটে। মুখে প্লাটিনামের চামচ নিয়ে জন্মানোর মত বিরল সৌভাগ্যধারীদের একজন। চিনতে পারছেন না তো? আরে আমাদের মিডিয়া টাইকুন কাম শিল্পপতি নাভিদ সারোয়ারের একমাত্র পুত্র ইভান সারোয়ার। নামকরা একটা ইলেক্ট্রনিক, একটা প্রিন্ট মিডিয়া ছাড়াও নাভিদ সারোয়ারের বৈধ এবং অবৈধ ব্যবসা অনেক। বাড়াবাড়ি হতে পারে, তবে গুজব বলে তিনি কখনো দাবা বোর্ডের ঘুঁটি হতে রাজী নন, খেলোয়াড়। আঙুলের ইংগিতে কখনো সাদা রাজা কোণঠাসা হয় কখনো কালো। তিনি কোন পক্ষে খেলছেন সেটাই বিবেচ্য। স্মার্ট সুদর্শন একটা ছেলে যদি এইরকম একটা ব্যাকগ্রাউন্ড প্রোফাইল নিয়ে ঘোরাফেরা করে তবে তার পক্ষে মরিয়া হয়ে ওঠা সুন্দরীতমা বান্ধবীদের ডেডলি বাউন্সারগুলো এড়ানো একটু কঠিনই। তাছাড়া এড়ানোর সদিচ্ছাও থাকতে হবে তো। উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি নিজেও একটু শিকারি গোছের। এখন কে শিকারি, কে শিকার- সেটা গৌণ। মূল কথা হচ্ছে শিকারের কাজ চলছিল এবং ভালই চলছিল।

নাভিদ সারোয়ার পুত্রের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে নির্বিকার হলেও উদাসীন নন। কোনো ব্যাপারে উদাসীন হলে এত বড় সাম্রাজ্য চালানো কঠিন হত তার পক্ষে। ছেলে কোথায় যায়, কি করে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তার কাছে নিয়মিত পৌঁছে যায়। তিনি সন্তুষ্টই ছিলেন। ছেলে বড় হয়েছে, হাই সোসাইটির ধুম ধারাক্কা মেয়েরা তার সুদর্শন ছেলের পেছনে ঘুর ঘুর করবে। ছেলে ইচ্ছেমত তাদের বাজিয়ে দেখে নেবে, প্রয়োজনে চেখে নেবে। তারপর বাছাই করে তাদের একজনকে বিয়ে করবে অথবা তিনি নিজেই পছন্দ করে ছেলের শ্বশুর হিসেবে ইনফ্লুয়েন্সিয়াল কাউকে খুঁজে নেবেন। ছেলে বিশেষ কোথাও পড়ে থাকলে সেটা কঠিন হয়ে যেত। ওর এখনকার বয়স হল নির্বিঘ্নে এনজয় করার। সে তাই করছে। নিজের এই বয়সটা মনে পড়ে যায় তার। টাকার অভাবে সাধ থাকলেও এরকম উদ্দাম একটা জীবন যাপন করতে পারেন নি তিনি। তবু চেষ্টার খামতি ছিল না। ছেলে তার অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে যাচ্ছে। মনে মনে পিঠ চাপড়ে দেন তিনি মাঝে মাঝে,- ব্রাভো বয়। ছেলে যখন পুরনো ঢাকার একটা ঘিঞ্জি গলিতে, একটা মিডল ক্লাস ফ্যামিলিতে আসা যাওয়া শুরু করল তখনো তিনি ততটা উদ্বিগ্ন হলেন না। মাঝে মাঝে রুচি বদলানোর সাধ তো তারও হয়।

দুই.
নবাবপুর রোড, মহাজনপুর লেনের সেই সামনে এক চিলতে উঠোনঅলা বাড়িটা একটা বনেদী বাড়িই বটে। যে উঠোনে রীতিমত একটা আমগাছও আছে। তবে বাড়িটার এখনকার পড়পড় অবস্থার মতই এর বাসিন্দাদের আর্থিক অবস্থাও ইদানীং বেশ নড়বড়ে। এখানে আসার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল- গলিটা এত চিকন যে কোন গাড়ি এখানে ঢোকানো সম্ভব না। ড্রাইভারকে মেইন রোডে রেখে ভেতরে ঢুকতে হয়। সেটা অবশ্য খারাপ লাগেনা ইভানের। বরং গলির মুখ থেকে লম্বা একটা পথ বেশ স্বপ্নিল একটা ঘোরের মধ্যে কেটে যায়। সমস্যা হয় ফেরার সময়। কিছুতেই পা চলতে চায় না। ও বাড়িতে ঢোকার আগে ভুলেও নেশা করে না ও, সিগ্রেটও না। ব্যাপারটা মিথিলা পছন্দ করে না। কিন্তু বের হবার পরে সব সংযম ভেঙে যায়, পকেট থেকে একটা বিশেষ ট্যাবলেট বের করে। কোন বান্ধবীকে ফোন দেয়। শারীরিক উত্তেজনা থেকে মুক্তি দরকার হয়। মানসিক অক্ষমতা কাটানো দরকার পড়ে। কোন উৎকণ্ঠা অপরাধবোধ কাজ করেনা। জীবনের নানা অনুষঙ্গের মত এগুলোও খুব প্রাত্যহিক ওর কাছে।

মিথিলাদের ড্রয়িংরুমে বসে আছে ও। বাইরে থেকে বিধ্বস্ত লাগলেও ভেতরটা পরিপাটি। দেয়ালে নীল ডিসটেম্পার। আসবাব সামান্যই, একটা সাধারণ সোফাসেট, শোকেস, টিভি, সিডি সেট, একপাশের দেয়ালে একটা বড়সড় পেইন্টিং, শোকেসের ওপরে কিছু চমৎকার শোপিস সুন্দর করে সাজানো। সামনে মিথিলা। খুব একটা লম্বা না মেয়েটা। তবে মুখের ডোলটা ভরাট, কাটাকাটা- আকর্ষণীয়, ফিগারটাও দারুণ। রং ফর্সা, ত্বক এত মসৃণ আর উজ্জ্বল যে স্রেফ একটা পতঙ্গের মত আগুনে ঝাঁপ দিতে ডাকে ওকে। তবু ওর অন্যান্য বান্ধবীদের মত স্মার্ট বলা যাবেনা মিথিলাকে। পোশাকে ভীষণ কনজারভেটিভ। কথাবার্তাও ধীর স্থির। তবে কণ্ঠটা এত মিষ্টি আর কি যে চমৎকার গান গায় বলে বোঝানো যাবে না। কিন্তু এসবও তেমন ব্যাপার না। ওর কাছে এমন অনেক মেয়ে নিজের সব কিছু উজাড় করে দিতে আসে। যেটা ব্যাপার সেটা ব্যক্তিত্ব। কি যেন দুর্গম্য একটা রহস্য আছে ওর।

প্রথমে খেলা খেলা ভাব নিয়ে মেয়েটাকে পটাতে এসেছিল ও, বন্ধু সেজে। এক রাজনীতি করা বন্ধুর সাথে একটা রাজধানীর একটা নামকরা কলেজের ছাত্রসংসদ নির্বাচনের দিন গিয়ে মেয়েটাকে দেখে মজে যায় মনে মনে। স্বভাবমতোই পরিচিত হয়। ঐ কলেজেই ইন্টারমিডিয়েট ফার্ষ্ট ইয়ারের ছাত্রী। খুব ফ্রেন্ডলি মেয়েটা। সহজেই আপন করে নেয় ওকে। ইভানকে ঘনিষ্ঠ হতে দেখেই বোধ হয় অন্যান্য প্রণয়াকাঙ্ক্ষীরা কেটে পড়ে। ভয় ওকে সবাই পায়, কম আর বেশী। যে কারণে পায়- সেটা ওর ক্রেডিট না, ওর বাবার। একমাত্র ছেলের অদৃশ্য বডিগার্ডদের সব রকমের লাইসেন্স দিয়ে রেখেছেন তিনি। ওর সাথে কেউ কোনরকম ঝামেলা করলে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে এসেছে তারা। ওর অজান্তেই। সে ব্যাপারগুলোতে সচেতন না ইভান। শুধু টের পায় ওকে সবাই সমঝে চলে। সাধারণদের কথা বাদ, বড় বড় লিডার ক্যাডাররাই লাইনে আসে না। টের পায় বললে ভুল বলা হবে। আসলে এভাবেই অভ্যস্ত ও। এটাকে খুব স্বাভাবিক বলে জানে।

সুন্দরী মেয়েদের ব্যাপারেও একটা ধারণায় অভ্যস্ত ও। কিছুদিন গেলেই তারা ওর প্রেমে পড়ে যাবে। আকারে ইংগিতে ঘনিষ্ঠ হতে চাইবে। তারপর বাকি সব কিছু এমনি এমনি ঘটে যাবে। বিশেষ কোন চেষ্টা ছাড়াই। মিথিলার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু কিছুদিন যেতেই ধন্দে পড়ে গেল। মিলছে না। এতদিনকার নিয়ম-কানুন বদলে যাচ্ছে। একটা সূক্ষ্ম দূরত্ব ঠিক ধরে রাখছে মেয়েটা। অদৃশ্য কাঁচের মত। কাঁচ অথচ ভাঙা যাচ্ছে না। ভাঙতে চাইলেই আহত হয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ অমোঘ আকর্ষণ মেয়েটার। এই প্রথম না পাওয়ার অনুভূতির কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে ইভান। ছাড়তে পারছে না তবু। সময় পেলেই সপ্তাহে দু-তিনবার বাসায় চলে আসে।
মিথিলা ছোট্ট করে বলল, 'গান শুনবে?'

মাথা নাড়ল ইভান, 'শুনব।'

সিডি প্লেয়ার ছাড়তে যাচ্ছে দেখে হাত তুলে নিষেধ করল। 'তোমার গলায় শুনব। প্লেয়ার না।'

ঝকঝকে সুগঠিত দাঁত মেলে হেসে ফেলল মেয়েটা। জলতরঙ্গের শব্দ ওর অনুভূতিকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। 'খালি গলায় কেমন যেন লাগে।'

'তা হোক', বলল ইভান। 'খালি গলায়ই শুনি।'

বাসায় আজ কেউ নেই মিথিলার। দুপুরের আগে আগে মামাতো ভাইয়ের বিয়েতে গিয়েছে সবাই। রাত হবে ফিরতে। শরীর খারাপ বলে যায়নি ও। ইভান ফোন করে জেনেশুনেই বিকেলের দিকে চলে এসেছে। এই মেয়েটার মুখোমুখি হলে কেমন যেন বদলে যায় ও। অনেক ইচ্ছে মাথা কুটে দাপাদাপি করে তবু কিছুতেই ভেতরের পশুটা জেগে ওঠে না। বরং অচেনা একটা অনুভূতি টের পায়। জাপটে ধরে বুকের ভেতর জড়িয়ে নিতে ইচ্ছে করে। বোঝে ইভান খুব তীব্র হলেও নির্দোষ এই নিবিড় বোধটুকু। হাত বাড়াতে গিয়েও আটকে যায় তবু। কিছু একটা আছে মেয়েটার মধ্যে। সরল সুন্দর- অথচ দুর্ভেদ্য।

ইভানকে চমকে দিয়ে সেই মাতাল করা কিন্নর কণ্ঠ বেজে ওঠে, 'আমারও পরাণ যাহা চায়, তুমি তাই, তুমি তাই গো.....।' প্যানপ্যানানি রবীন্দ্র সংগীত এমনিতেই ভীষণ অপছন্দ ওর। তারপর এমন বহুল চর্চিত। তবু কি যেন একটা ওলটপালট হয়ে যায় ওর। কি যে যাদু ঐ কণ্ঠে। যা শোনায় তাই ভাল লাগে। কি হচ্ছে ওর। প্রেমে পড়ে যাচ্ছে। প্রেম কি? ওর বুকের মধ্যে, চোখের মধ্যে, মস্তিষ্কের মধ্যে কি যে তীব্র ভাঙচুর, অচেনা সব রঙের ঝলকানি। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে কোন ধরনের নেশা করেনি। তবু কেন এমন নেশা নেশা লাগছে। ডুবে যাচ্ছে, ডুবে যাচ্ছে গভীর কোন গভীরতায়। তীব্র কোন তীব্রতায়। এত ভাল লাগছে কেন ওর। এত হাল্কা লাগছে কেন নিজেকে?

'কি হল তোমার?'

চমকে বাস্তবে ফিরে আসে ইভান। তারপর অনুরোধের ঢঙে বলে, 'থামলে কেন? আর একটা শোনাও।'

'বুঝেছি নেশায় পেয়েছে তোমাকে। সন্ধ্যে পার হয়ে গেছে। বাবা মা ফিরে এসে রাতে খালি বাসায় তোমার সাথে দেখলে খুব রাগ করবে। ওঠো এখন।' বেশ জোরের সংগে কথা কটা বলে নিজে উঠতে গিয়ে বেকায়দায় পা ফসকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হতেই স্বাভাবিক রিফ্লেক্সে হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলে ইভান। এতই আকস্মিক যে যখন বুঝতে পারল তখন মিথিলা ওর পেতে দেয়া দুই হাতের মধ্যে শুয়ে আছে। দুটো মুখ পরস্পরের খুব কাছাকাছি। না ঠোঁট স্পর্শ করল না ইভান। বরং এটুকু স্পর্শই ওর সমস্ত শরীরের মধ্যে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে কোন একটা অলৌকিক অনুভূতির ভেতর ডুব দিয়ে ওঠাল। মিথিলার শরীরে খুব মিষ্টি একটা গন্ধ। পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে ওরা পলকহীন। কতক্ষণ? এক মুহূর্ত? নাকি হাজার হাজার পল-অণুপল-বছর পার হয়ে গেল।

নারী শরীর ওর অনেক দেখা। কিন্তু এ তো শরীর নয়, দেবী স্পর্শ। এ স্পর্শে কোন অশুচিবোধ জন্মে না। ব্রহ্মাণ্ডের ওপাড়ের কোন অলৌকিক সূচি শুভ্র মগ্নতা চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তারপর ওকে সোজা করে ছেড়ে দেয় ইভান। কিছুক্ষণের জন্য পরস্পরের চোখে চোখে তাকাতে লজ্জা পায় ওরা। তারপর সব দ্বিধা কাটিয়ে সোজাসুজি বলে ইভান, 'আসি তাহলে আজকে।'

'এসো।' এক মুহূর্ত দ্বিধায় আঙুলে ওড়নার গিঁট জড়াল। তারপর ছোট্ট করে বলল, 'ধন্যবাদ।' চোখে চোখ রেখে চোখের ভাষায় ইভানও একটা নীরব কৃতজ্ঞতার ভঙ্গী ফোটাল; তারপর বেরিয়ে এলো। মনে হল ওর সমস্ত অশুচি জীবন এই এক মুহূর্তের ছোঁয়ায় পবিত্র হয়ে গেছে। ঘোরের মধ্যে দরজা পেরিয়ে উঠোন, গেট পেরিয়ে লেনে বেরোল ইভান। পাশের দুএকটা বাড়ি থেকে চুইয়ে আসা আলো ছাড়া পথ দেখানোর কিছু নাই।

প্রায়ান্ধকার গলিতে ঘোরের মধ্যে হেঁটে হেঁটে মেইন রোডের দিকে চলল। লেনটায় একটা পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী অ্যাঙ্গেলের বাঁক আছে। সেটা একেবারেই অন্ধকার। দুপাশের বাড়িতে আলো তো জ্বলছেই না উল্টো আলো আসার পথ আটকে আছে। ঠিক তার মুখে আসতেই একটা ঘাড়ে একটা মাথায় দুটো লাঠির ঘা পড়ল ওর ওপর। পড়ে যেতে যেতে ওর পাশে আরও একজনকে পড়ে যেতে দেখল ইভান। দুজনই মুখোমুখি পড়ে আছে। এই সিল্যুয়েট অন্ধকারেও মানুষটাকে স্পষ্ট দেখতে পেল ও। ইভানের পরিচর্যিত চেহারা, আধুনিকতম পোশাক আশাকের বিপরীতে ছেলেটা ভীষণ সাধারণ। মুখে অনেক সময় আর দারিদ্রের দাগ। তবু কেন যেন খুব খুব চেনা মনে হচ্ছিল। কেন? কেন?? তারপর বিদ্যুৎচমকের মত মনে পড়ল মুখটা ওর খুবই পরিচিত কারণ এটা অসংখ্যবার দেখেছে ও। বাসার প্রমাণ সাইজের আয়নায়।

তিন.
ওরা ভাড়াটে গুণ্ডা। নির্দেশ ছিল কাজ শেষ করেই যত দ্রুত সম্ভব এলাকা ছেড়ে যেতে হবে। উদ্দেশ্য শুধু ভয় দেখানো। তবে যে উদ্দেশ্যে ভয়টা দেখানো হবে সেটা একটা চিরকুটে লেখা আছে। চিরকুটটা ভিকটিমের পকেটে ঢুকিয়ে দিতে হবে। সে উদ্দেশ্যে একজন নিচু হয়ে একেবারে ঘাবড়ে গেল। ছেলেটা পড়ে গিয়ে যেখানে থাকার কথা সেখানে নেই। দ্রুত পেন্সিল টর্চ বের করে ঘুরিয়ে দেখল। না কোত্থাও দেখা যাচ্ছে না। পাশে কোন ড্রেনও নেই যে গড়িয়ে যেতে পারে। তাহলে গেল কোথায়? ওর সঙ্গীও দেখাদেখি টর্চ জ্বেলে খুঁজতে শুরু করল। দুজনেই মাথা নিচু অবস্থায়। এসময় দুজনেই টের পেল কেউ ঘাড় ধরে টেনে তুলছে। এইমাত্র একটা জলজ্যান্ত মানুষ গায়েব হয়ে যাবার পরে স্বভাবতই একটা অন্যরকম ভয় দুজনকেই ভীষণরকম চমকে দিল। ব্যাপারটা আরো সাংঘাতিক কারণ আকাশের আবছা আলোয় দুজনে অবাক হয়ে দেখল যে একই সংগে দুজনকেই উঁচু করে তোলা হয়েছে। যখন টের পেল দুজনকে তুলেছে একজনেরই দুটো হাত, তখন ভয় আরো বাড়ল। প্রাথমিক আশংকা অনুযায়ী কোন ভূত প্রেত বা পিশাচের কারবার নয়ত? তবে কি ছেলেটাকেও? কিন্তু ছেলেটা গেল কোথায়?

'যারে মারছ হে কই?' ওদের অনুচ্চারিত প্রশ্নটা যখন হাতের মালিকের কণ্ঠ্য থেকেও এই দানবীয় শক্তির সংগে বেমানান কিঞ্চিৎ শ্লেষাজড়িত চিকন কণ্ঠে বেরিয়ে এলো- তখন যে সন্দেহ হচ্ছিল সেটুকু উবে গিয়ে এক ধরনের স্বস্তি ওদের মাথা বেয়ে ঘাম হয়ে শরীরে বয়ে যেতে শুরু করল। একজন একটু অতি উৎসাহের সংগে বলল, 'সত্য কইতাছি ওস্তাদ। আমরাও তাজ্জব মাইরা গেছি। এই মারলাম, এই দেহি নাই। ভুত প্রেতের কারবার নিহি?'

পা তুলে বেটার অণ্ডকোষে হাল্কা একটা টোকা মারল শ্লেষাকন্ঠ। তাতেই 'মাগো' বলে চেঁচিয়ে উঠল লোকটা। 'বেশী কতা কইলে খুন কইরা হালামু। আমি বরিশাইল্যা আইজ্যা।'

'মাফ কইরা দেন ওস্তাদ, চেনতে পারি নাই। বিশ্বাস করেন ওস্তাদ আমরাও খুজতাছি।'

আবারো মারতে যাচ্ছিল। ওকে বাধা দিল আর একটা কণ্ঠ। 'আইজ্যা অগো গোডাউনে নিয়া যা। আর তোরা দুইজন এইখানে পাহাড়ায় থাক আর খোজ। অগো রগড়াইয়া খবর বাইর করন লাগব। আরো মানুষ আনতেছি। যেমনে হউক ছোড সাবেরে খুইজা বাইর না করলে খবর আছে। স্যারে সব কয়ডারে শ্যাষ করব।'

চার.
পড়ে যাওয়ার সংগে সংগে এত আলো কোত্থেকে আসল- সেটা ইভানকেও একটু অবাক করেছে বইকি। তারপর আরো অবাক হয়ে দেখল ও আসলে পড়ে নেই। প্রায় আলো ঝলমল একটা ধূ ধূ মাঠে দাঁড়ানো। চারদিকে কুয়াশার ভেতর আলো পড়লে যেমন লাগে তেমন একটা ধবধবে উজ্জ্বলতা। সে সময় যে ছেলেটিকে দেখেছিল সে তখনো ওর মুখোমুখি। ওরই মত অবাক হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কোন সন্দেহ নেই ছেলেটা ওর ডুপ্লিকেট। পোশাকের দৈন্য, মুখের অযত্ন বাদ দিলে হুবহু আর একজন ইভান ওর সামনে। তারপর হঠাৎ ছেলেটা দূরে সরে যেতে শুরু করল। তেমন দাঁড়ানো অবস্থায়ই। যেন ভেসে ভেসে পিছিয়ে যাচ্ছে ওর ডুপ্লিকেট। পিছিয়ে যাচ্ছে আর ওর মুখটা ক্রমেই সাদা অন্ধকারে সিল্যুয়েট একটা রূপ নিচ্ছে।


'গুড সরিয়ে নেও ওদেরকে। প্রকৃতিকে ঠিকঠাক হতে দেও।'

কথাগুলো ভেসে আসছে। অথচ সত্যিকারের কোন শব্দ শুনছে বলে মনে হচ্ছে না ইভানের। সম্ভবত ওর মস্তিষ্কের ভেতর বেজে উঠল কণ্ঠস্বর। একটু ইতস্তত করে বলেই ফেলল ইভান, 'কে আপনি? কে কথা বলছেন? আমি কোথায়?'

'একটা ভুল সময়ে ভুল জায়গায় ছিলেন আপনি। সময় মাত্রার একটা ফোকরের মধ্যে পড়ে গেছেন। একটু ধৈর্য্য ধরেন। সব ঠিক হয়ে যাবে।'

'কিছু বুঝতে পারছি না তো আমি। সময় মাত্রার ফোকরটা আবার কি? কে আপনি?'

'আমাকে চেনা ঠিক সম্ভব না আপনার পক্ষে। আমি একজন সময়ের দ্বাররক্ষী। মাত্রা পাহাড়া দেই। আপনি একটা খোলা দরজার মধ্যে পড়ে গেছেন। যেখানে আমি পাহাড়ায় ছিলাম। এটা একটা রেয়ার দুর্ঘটনা। কোটিতে একটা ঘটার চান্স থাকে। আপনি এই মুহূর্তে একটা সময় নিরপেক্ষ অঞ্চলে দাঁড়িয়ে আছেন। একটু ধৈর্য ধরুন। ফিরিয়ে দিতে হবে আপনাদের হিসেবে দশ মিনিট পরে। তবে এখানে আপনি সেটা ধরতে পারবেন না। আমি কি আপনাকে ঘুম পারিয়ে দেব? তাহলে এই গ্যাপটা আপনার কাছে এক মুহূর্তের মত মনে হবে। না হলে এটা আপনার কাছে অনেক বড় একটা সময় বলে মনে হবে।'

বাপের মতই একটা গুণ আছে ইভানের। যে কোন পরিস্থিতিতে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে পারে। যদিও কথাগুলো ওকে কিছুটা হকচকিয়ে দিচ্ছে। তবু ভেবে দেখল, একটু বোঝার চেষ্টা করেই দেখা যাক না। না বুঝলে না বুঝল। কিন্তু বুঝে ফেললে নতুন একটা জিনিস জানা যেতেই পারে। জানার আগ্রহ ওর সীমাহীন।

'একটু কি বুঝিয়ে বলা যায়? আমি ব্যাপারটা বুঝতে চাই।'

'তা যায়। তবে বোঝাটা কঠিন হবে। আগেই বলেছি। তাছাড়া এ তথ্যগুলো আপনার মস্তিষ্ক ধরে রাখতে পারবে না। শুধু অনুভূতিগুলো থেকে যাবে।'

'তা হোক। আমি শুনতে চাই।'

'আচ্ছা তাহলে বলি, সময় ব্যাপারটা আপনারা একটা সরলরেখার মত দেখেন।'

'কি রকম?'

'অতীত থেকে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে। যেমন আপনি জন্ম নেবার পর থেকে এ পর্যন্ত একটা সরলরেখা ধরে বর্তমানের এ সময়টা পর্যন্ত এসেছেন।"

'ঠিক।'

'কিন্তু সময় আপনাদের স্থানের মতই একটা ত্রিমাত্রিক অঞ্চল।'

'বুঝিয়ে বলুন।'

'আমি জানি আপনি অনেকবার হাড়িভাঙ্গা খেলেছেন।'

'পিকনিকে বেশ কয়েকবার।'

'কখনো ভাঙতে পারেননি কিন্তু।'

'না। আমার মনে হয় হাড়ি বরাবরই যাচ্ছি। কিন্তু বেশ কয়েকটা বাঁক নিয়ে ফেলি। আমার ব্যাল্যান্স খুব দুর্বল।'

'গুড সময়ের ক্ষেত্রেও এমন হয়। আপনি মনে করছেন আপনি সময়ের একটা সরলরেখা ধরে এগোচ্ছেন। আসলে অনেক বাঁক নিচ্ছেন নিজের অজান্তেই।'

'হুম। হতে পারে।'

'তাই হয়। কিন্তু সে অঞ্চলটুকুও প্রতিটা মানুষের জন্য সীমিত। ধরেন হাড়ি ভাঙতে গেলেও আপনি যেমন খুব বেশী এদিক ওদিক হন না। তেমন। সেটাকে আসলে একটা সরলরেখার মতই কল্পনা করা যায়। এই বিশেষ অঞ্চলটুকু আপনার সরলরেখা। আপনি যত এদিক ওদিক করেন না কেন সেই সরলরেখার সীমানা পেরোতে পারবেন না।'

'একটু উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়?'

'যায়। যেমন ধরেন, সকালে পড়াশোনার পর আপনি সচরাচর ক্লাবে যান। বন্ধু বান্ধবীদের সংগে সময় দেন। এটা হচ্ছে আপনার জীবনের স্ট্রেট লাইন। কিন্তু আপনি চাইলে এদিক ওদিক করতে পারেন। যেমন একদিন হঠাৎ মনে হল আজ একটু ভার্সিটি থেকে ঘুরে আসি। কিংবা কোন বান্ধবীকে নিয়ে লং ড্রাইভে যাই। কিংবা কোন বন্ধুর সাথে দূরে কোথাও কয়েকদিনের জন্য ঘুরে আসি। এটা হচ্ছে আপনার নিজস্ব স্ট্রেট লাইনের সীমানা। আপনি চাইলেই এই স্ট্রেট লাইনের সীমানা ধরে যা খুশী তাই করতে পারেন।'

'আমার মনে হয় এ সীমানাও আমি ভেঙে ফেলেছি অনেকবার। যেমন হঠাৎ সিঙ্গাপুর চলে গেছি, কিংবা প্যারিস, জাপান, চায়না....। এরকম কম ঘুরিনি কিন্তু। আমার সীমানা আমি ভেঙেছি।'

'না ভাঙেননি। আপনার এরিয়াটা অনেকের চাইতে বড়। কিন্তু আপনি এরিয়ার মধ্যে থাকতে বাধ্য। যে সীমানা আপনি কখনোই ভাঙতে পারবেন না, সেটা একটু আলাদা।'

'বুঝিয়ে বলেন।'

'ধরুন আপনার বাবা একসময় খুবই অর্থসংকটে বড় হয়েছেন। খুব অল্প বয়সে প্রেম করে বিয়ে করে বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন। আপনাকে জন্ম দিতে গিয়ে আপনার মা মারা যান। তিনি আপনাকে নিয়ে ভাগ্যান্বেষণে শহরে চলে আসেন। একটা প্রাইভেট ফার্মে মোটামুটি একটা চাকরী জুটিয়ে নেন। আবার প্রেমে পড়েন এক বিত্তবানের কন্যার। কিন্তু সেই মেয়ে তাকে ছেড়ে চলে যায়। তিনি জেদের বশে টাকার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। কিছুদিন সৎপথে চেষ্টা করে বার্থ হয়ে অপরাধ জগতের সাথে জড়িয়ে পড়েন। তারপরের ইতিহাস তার ক্রমাগত উত্থানের ইতিহাস। আর এখনকার জীবন তার সেই বাঁক বদলের ফলাফল।'

'হুম, এটা তার জীবন, আমার নয়।'

'কিন্তু সেই জীবন থেকে তিনি এখন যে জীবনে এসেছেন সেটার সাথে আপনার ইতিহাস জড়িত। তিনি যদি জীবন বদলাতে না পারতেন তাহলে আপনার জীবনও অন্য একটা মোহনায় চলে যেত।'

'হুম, কিন্তু তা তো ঘটেনি।'

'সেটা তার এই জীবনে। প্রকৃতিতে প্রত্যেকটি প্রবাবিলিটিই থেকে যায়। তার সেই সম্ভাব্য জীবনটিও তার একটা বাঁক হয়ে সময়ের অন্য একটা অংশে রয়ে গেছে। যেটাকে বিজ্ঞানের ভাষায় প্যারালাল ওয়ার্ল্ড বলে। সেখানে তিনি আগের মতই দরিদ্র। জীবনের নানান হতাশা, দারিদ্রের সংগে যুদ্ধ করছেন, আপোষ করছেন। আপনিও একজন অক্ষম বাবার পুত্রের মত জীবনটাকে চালিয়ে নিচ্ছেন- নানান অভাব অভিযোগ মেনে নিয়ে।"

ইভানের মাথায় হঠাৎই খেলে যায় ব্যাপারটা। 'তাহলে একটু আগে যাকে দেখলাম সে কি আমি মানে সেই জগতের আমি?'

'ঠিক তাই। তবে সেটা আপনার জীবনের সরলরেখার বাইরের একটা প্যারালাল অংশ। যেখানে আপনি কখনোই যেতে পারবেন না।'

'তাহলে ওকে আমি দেখলাম কিভাবে?'

'সেটাই বলছিলাম যে আপনি হঠাৎ করে সময়ের একটা ফোকরের মধ্যে পড়ে গেছেন। ধরেন পাশাপাশি রাখা দুইটা পাইপের দুটোর গায়েই যদি একটা ছিদ্র করা হয়- তাহলে সে ছিদ্র গলিয়ে একটা জীবন থেকে অন্য একটা জীবনে চলে আসার মত। তবে ছিদ্রের অঞ্চলটাও বেশ বড়। এটাকে আমরা সময় নিরপেক্ষ অঞ্চল বলতে পারি। আপনি এখন যেখানে আছেন। তবে আমাদের বিশ্লেষণ বলছে আপনার এই গর্তে পড়ার মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে।'

'কি ধরনের যোগসূত্র।'

'আপনার মতই সেই প্যারালাল পৃথিবীর আপনিও সেই পৃথিবীর নবাবপুর রোডস্থ মহাজনপুর লেনের মিথিলা নামের একটা মেয়ের প্রেমে পড়েছে। ঠিক যে সময়ে যে স্থানে আপনার মাথায় আঘাত করা হয় একই সময়ে একই স্থানে তার মাথায়ও আঘাত করা হয়। আর ঘটনাক্রমে সেখানে সেই সময়ে আমাদের প্যারালাল পৃথিবীর একটা দরজা ছিল। আপনারা দুজনই বেকায়দায় ঘুরে গিয়ে সেই দরজা ধরে এই নিউট্রাল জোনে চলে এসেছেন। আপনার আর কিছু জানার আছে?'

'আপনি আসলে কে? আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?'

'আমি আপনাদের মত দেহধারী নই। তাই দেখতে পাচ্ছেন না। আমি এই সময় মাত্রার নিয়ন্ত্রক, পাহারাদার বা দ্বাররক্ষী যা খুশী বলতে পারেন। আমি আসলে একটা সিস্টেম। আপনি হিন্দু হলে বলতাম আমি একজন দেবতা। যেমন এখন ধরে নিতে পারেন আমি একজন ফেরেশতা। যদিও ধর্ম নিয়ে আপনাকে কখনোই মাথা ঘামাতে দেখা যায়নি। আর কিছু জানতে চান?'

'না তবে দেখতে চাই।'

'আপনার ডুপ্লিকেটের জীবনধারা তো। দেখাটা কষ্টকর হবে আপনার জন্য। সেটা আপনার কাছে একটা প্রতিবিম্বের মত জীবন মনে হবে। দেখবেন অথচ ছুঁতে পারবেন না। আপনি যখন বন্ধুদের সাথে লং ড্রাইভে যাচ্ছেন তখন সে হয়ত টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়ে বাপের কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করছে। ভীষণ কষ্টের আর সংগ্রামী একটা জীবন। আর সবচেয়ে বড় কথা সেই মানুষটা হলেন আপনি নিজেই।'

'আমি তবু দেখব।'

'কোনভাবে সাহায্য করতে পারবেন না কিন্তু। একবার ভাবুনতো, আপনি নিজে কষ্ট পাচ্ছেন কিন্তু আপনার নিজেরই সাধ্য নেই নিজেকে সাহায্য করার। অথচ আপনার অমিত বিলাসী জীবনের এক কানাকড়ি পেলেই বর্তে যেত সে। আপনার কষ্ট হবে না?'

'আমি দেখতে চাই।'

'ঠিক আছে দেখুন।'

সামনের কুয়াশার স্তর কেটে গিয়ে ধীরে ধীরে কিছু দৃশ্য ফুটতে শুরু করে। ইভান সম্মোহিতের মত তাকিয়ে থাকে নতুন এক জীবন, নতুন এক সত্যের দিকে।

পাঁচ.
অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর ওরা যখন হাল ছেড়ে দিচ্ছিল তখন হঠাৎ করেই একজন রাস্তার যেদিকে খুঁজছিল তার উল্টোদিকে হাত দশেক দূরে একটা দেয়ালের ফোকরের ভেতর ঘন অন্ধকারের মত কিছু দেখতে পেয়ে হাতের টর্চ তাক করল। তারপর আবিষ্কারের আনন্দে চেঁচিয়ে উঠে বলল, ওস্তাদ দেখেন তো?

সবাই এগিয়ে গিয়ে ইভানের দেহটা তুলে নিল। ভাল করে খেয়াল করে দেখল ইনজুরি খুব মারাত্মক মনে হচ্ছে না। তারপরও ইভানের গাড়ীতেই কাছাকাছি সবচেয়ে আধুনিক ক্লিনিকে পাঠিয়ে দিল। বাকিরা গোডাউনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল। ওরা যখন পৌঁছুল তখন এক তরফা রগড়ানো শেষ হয়েছে। দুজনের একজনের চেহারাও চেনা যাচ্ছে না।

ওদের ইন চার্জ আঙ্গুল কাটা কলিম জিজ্ঞেস করল, 'কি অবস্থা আইজ্যা?'

'সব বাইর করছি ওস্তাদ। অগো ভাড়া করছে লেনের ঐ আফার এক প্রাইভেট মাস্টর। হালার এট্টু খবর লওন লাগে।' কলিম করিৎকর্মা মানুষ। দশ মিনিটের মধ্যে মাষ্টারের সব তথ্য পেয়ে গেল। ছাত্র জীবনে সরকারী দলের এক ক্যাডার ছিল। এখন একটা নামকরা কলেজের শিক্ষক। সেখানেই মিথিলা পড়ে। প্রাইভেট টিউশনি চালায় আর ছাত্রীদের ব্লাকমেইল করে অনৈতিক কাজে বাধ্য করে। মিথিলার সাথে সুবিধা করতে না পেরে নজরদারীর ব্যবস্থা করে। আন্ডারগ্রাউন্ডে তার বেশ হাত আছে শোনা গেল।

আজিজ বলল, 'হালারে এহনই ধইর‍্যা আনি ওস্তাদ।' হাত তুলে ওকে থামায় কলিম। নাভিদ সারোয়ার এখন অস্ট্রেলিয়া। তার পিএসকে ফোন দিয়ে বসকে চায়। তিনি লাইনে আসতেই সব খুলে বলে। নাভিদের অবস্থা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নেন তিনি। তারপর সোজাসুজি আদেশ দেন- 'ওকে ধরে আনো। ট্রিটমেন্টটা যেন মিনিমাম থার্ড ডিগ্রীতে ওঠে। তবে সাবধানে, মেরে ফেলো না। কাজ শেষ করে ওকে জানিয়ে দিও কার ছেলের গায়ে হাত দিয়েছে। সবশেষে ওর আমলনামার ডিটেলস হাতে ধরিয়ে দিও। বলে দেবে কোনরকম বাড়াবাড়ি করলে তার ফল হবে ভয়াবহ। কোন দয়া দেখাবে না।' এই নির্দেশটুকুই দরকার ছিল কলিমের।

পরের দিন বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় একটা খবর বেরোয় ..... কলেজের সম্মানিত শিক্ষক ......... কে নবাবপুর রোডের মহাজনপুর লেন নামক একটা গলি থেকে মারাত্মক আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তিনি জানান কিছু কাজের জন্য নবাবপুর রোডে গেলে কয়েকজন সন্ত্রাসী তাকে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে অন্ধকার লেনের ভেতর নিয়ে যায় এবং মারধোর করে টাকা পয়সা কেড়ে নেয়। তবে তিনি কোন মামলা করতে রাজী হন নি। তাকে খুবই ভীত দেখাচ্ছিল।

ছয়.
ইভান আর মিথিলা এখন বিবাহিত। কোন কৌশলে পিতাকে রাজী করিয়ে ইভান এই অসাধ্য সাধন করেছে সেটা একটা রহস্য। তবে আমরা ধরে নিতে পারি নাভিদ সারোয়ারের এখনকার কঠোর মানুষটার আড়ালে সেই প্রেমিক পুরুষটি হয়ত কোনো কৌশলে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল। তবে ইভানের মধ্যে যে পরিবর্তনটি এসেছে- তা অভাবনীয়। সেই বিলাসী জীবন যাপনে অভ্যস্ত মারকাটারী প্লেবয়টি এখন সম্পূর্ণ নতুন এক মানুষ। নয়ত কেনই বা সে গ্রাজুয়েশন শেষ করেই শহরের অভ্যস্ত চাকচিক্য, ক্লাব-পার্টি, স্বল্পবসনা বান্ধবীদের আকর্ষণ ছেড়ে গ্রামে গিয়ে কলেজ, হাসপাতাল গড়ে তুলবে। গ্রামের নেশারু, অকর্মা বেকার ছেলেদের ধরে ধরে নানান উন্নয়ন কাজে লাগিয়ে দেবে। গ্রামের স্বার্থান্বেষী চেয়ারম্যান মাদবরদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, কুটিল ষড়যন্ত্র ভেদ করে হাসিমুখে গ্রামের মানুষদের পাশে গিয়ে দাঁড়াবে। পরিচিত ইমেজের বিপরীতে এই যে সম্পূর্ণ নতুন একটা জীবনধারা বেছে নেয়া সেটাকে ওর বন্ধুবান্ধবরা কিংবা কাছ থেকে পরিচিত অন্যরা তার প্রেমের প্রভাবই বলবে; সেটা ভাবতে আমাদেরও আপত্তি নেই। তবে সেই হারিয়ে যাওয়া দশ মিনিটের ভূমিকার কথাটুকুও তো আমরা ভুলতে পারব না তাই না?

আমরা অবশ্য জানি না, নাভিদ সারোয়ার ছেলের এই অধঃপতনকে কোন দৃষ্টিতে দেখছেন। হয়ত তিনি ছেলের নতুন জীবনের সাথীটির প্রভাবটিকেই দায়ী করবেন। তবে একমাত্র ছেলের সব ধরনের কাজেই তার প্রশ্রয়ের হাতটি বরাবর উদার ছিল। নয়ত ছেলের অদৃশ্য দেহরক্ষীদের বিশাল এক বাহিনী তিনি ছেলের কাজে সাহায্যের নাম করে গ্রামে পাঠাতেন না। তারাও নিষ্ঠার সংগে ইভানকে সব ধরনের প্রটেকশন দিয়ে আসছে। তার বন্ধু-বান্ধবরা সবাই অবশ্য যা ভাবার তাই ভাবছে। ছেলের হাত দিয়ে নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সূচনা করা। তিনি মনে মনে হাসেন। তিনি খেলোয়াড় আছেন খেলোয়াড়ই থাকতে চান। ঘুঁটি হবার কোনরকম আকাঙ্ক্ষাই তার নেই। তাছাড়া ছেলে ভাল হয়ে গেছে বলে নিজে তো ভাল হতে পারেন নি। রাজনীতিতে ঢুকে প্রতিপক্ষের কূটকৌশলে নিজের গোপন জীবন স্পট লাইটের নীচে ফেলতে তিনি কোনক্রমেই রাজী নন। তবে ছেলের এইসব কান্ডকীর্তি নিয়ে যখন ভাবতে বসেন তখন তার ঠোঁটের কোনায় যে একটা সূক্ষ্ম তৃপ্তির হাসি খেলে যায় সেটা তার একান্ত নিজস্ব চিন্তা বলে আমরা আর সেটা নিয়ে টানাটানি করার চেষ্টা করব না।

বরং ইভান কিভাবে গ্রামে ফিরে গিয়ে দাদা দাদীর অভিমান ভাঙিয়ে একটা আবেগময় পরিবেশ সৃষ্টি করে পারিবারিক এন্ট্রি নিয়েছিল। মিথিলা কিভাবে সেই পরিবারে নিজের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে। সর্বোপরি ঠাণ্ডা মাথায় এত বড় একটা কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে, নানান প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছে- গল্প হিসেবে সেটা কোনভাবেই কম আকর্ষণীয় নয়। আগামী কোন একদিন আপনাদের সেই কাহিনী নিশ্চয়ই শোনাব।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • কনা
    কনা এখন আমি বিশ্বাস করতে পারছি যে,একজন কবি ভালো,...না... অনেক ভালো গল্প ও লিখতে পারেন ... :)) .ভীষন পছন্দ হয়েছে গল্পটা.........
    প্রত্যুত্তর . ২১ এপ্রিল, ২০১২
  • পারভেজ রূপক
    পারভেজ রূপক অদ্ভুত রকম সুন্দর লাগল গল্প।
    প্রত্যুত্তর . ২২ এপ্রিল, ২০১২
  • Shuvro
    Shuvro অনেক ভাল লাগলো আপনার প্রায়-উপন্যাস গল্পটি। লেখার মুন্সিয়ানা পুরোটা জুড়ে।
    প্রত্যুত্তর . ২২ এপ্রিল, ২০১২
  • নিলাঞ্জনা নীল
    নিলাঞ্জনা নীল অনেক বড় গল্প, তবু পড়ে খুব মজা পেলাম ভাইয়া।
    প্রত্যুত্তর . ২২ এপ্রিল, ২০১২
  • রনীল
    রনীল গল্পের এঙ্গেলটা যেভাবে বাঁক নিয়েছে- তাতে বেশ চমকে গেলাম. গল্পের মাঝামাঝি এসে ইভানের দ্বিতীয় জীবনের প্রতি একটা আগ্রহ জন্মেছিল... এক ইভানের এঙ্গেল থেকে অনি ইভানের বর্ননা- বেশ আকর্ষনীয় হবার কথা ছিল... কিন্তু সে অংশটুকু এড়িয়ে গেছেন অবলীলায়... লেখনীর স্টাইলটি ...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ২৪ এপ্রিল, ২০১২
    • লুতফুল বারি পান্না ধন্যবাদ রনীল। গল্পটির একটা উদ্দেশ্য ছিল। সেটাকে ঠিক রাখতে গিয়ে আর গল্পকবিতার সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে বেশ কিছু বিসর্জন দিতে হয়েছে। তবে আগেও বলেছি এটাকে একটা উপন্যাস করার কাজ চলছে। সেটা সম্পূর্ণ হলে আশা করি তোমার অপূর্ণ শখটি পূর্ণ হয়ে যাবে। যেখানে এটা ধারাবাহিকভাবে বেরোচ্ছে সেখানকার লিংকটা দিয়ে দেব।
      প্রত্যুত্তর . ২৪ এপ্রিল, ২০১২
  • খন্দকার আনিসুর রহমান জ্যোতি
    খন্দকার আনিসুর রহমান জ্যোতি Akjon Prokito Golpo Karer Kachh Theke Jothartho Golpo Pawai Savabik...Tri Noyon er Boktobbe Ami Akmot ...Tai Mon Khule Valo Basha ...( ) Modhdhe Mullayon Korlam...(5)
    প্রত্যুত্তর . ২৫ এপ্রিল, ২০১২
  • মামুন ম. আজিজ
    মামুন ম. আজিজ সায়েন্স ফিকশন, রিয়েলিটি ডেসক্রাইবড ..কতি বলব..অসাধরণ...পান্না ভাই গভীর জলের লেখক হয়ে উঠেছেন। মুগ্ধথ হবার মত বনর্না শৈলী যা পাঠককে টানবেই..এই টানার ব্যাপারটা এখনও শিখতে পারলাম না।
    প্রত্যুত্তর . ২৫ এপ্রিল, ২০১২
    • লুতফুল বারি পান্না "এই টানার ব্যাপারটা এখনও শিখতে পারলাম না। "- এ রিয়েল ট্রাজেডী যে, আপনার গল্পগুলো বিশেষ করে শেষ সাইন্সফিকশন দুটো পড়েছি আর মনে মনে ভীষণরকম ঈর্ষাকাতর হয়েছি। যদি নিজের হাতটা কি বুঝতেন তাহলে এমন আফসোস করতেন না ভাই। কী ভীষণ বেগেই না টেনেছে। হাতির নিজের শরীর না দেখতে পাওয়ার প্যারাডক্সটা মনে পড়ে গেল ভাই। হা হা হা।
      প্রত্যুত্তর . ২৬ এপ্রিল, ২০১২
  • হাছান ছাদেক
    হাছান ছাদেক টান টান উত্তেজনায় ঠাসা গল্প । প্রিয় কবি পান্না ভাইয়ের এমন আমূল পরিবর্তনে যতটা না খুশি হয়েছি, তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছি সেরা তাস গুলো কি সুন্দর করে ঝোলায় পুরে আমাদের ঠকিয়ে এসেছেন এদ্দিন । ওস্তাদের মার শেষ রাতে ভালই দেখালেন । হেভ এ গ্রেট স্যলুট তো উ ।
    প্রত্যুত্তর . ২৫ এপ্রিল, ২০১২
  • মোঃ আক্তারুজ্জামান
    মোঃ আক্তারুজ্জামান সাবের ভাই যেন আমার মনের কথাগুলি সব বলে দিলেন| তবে একটা সত্যি এই যে এভাবে আধুনিক গল্প আমিও লিখতে পারি না হয়ত আমাকে দিয়ে আর কোনদিন হয়ে উঠবেও না| আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে|
    প্রত্যুত্তর . ২৬ এপ্রিল, ২০১২
  • ফয়সাল বারী
    ফয়সাল বারী সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকের অপূর্ব একটা গল্প পড়লাম।
    প্রত্যুত্তর . ২৮ এপ্রিল, ২০১২

advertisement