লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৭০
গল্প/কবিতা: ৭৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৪

বিচারক স্কোরঃ ২.০৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৩৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগর্ব (অক্টোবর ২০১১)

আমিরাতে দুই হাজার বছর
গর্ব

সংখ্যা

মোট ভোট ১৪১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৪

আযাহা সুলতান

comment ৭২  favorite ৫  import_contacts ১,৩৮১
আমিরাতে দুই হাজার বছর! কথাটা শুধু চিন্তার বিষয়ই নয়, পৃথিবীর সমগ্র মানবকে অবাক করে দেওয়ার মতো একটি উক্তি। এটা কোনও গল্পকারের রূপকথা নয়, না কোনও ইতিহাসের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, না কোনও অলৌকিক কাহিনী। এটা একটি বাস্তব-চিত্র এবং যথার্থ সত্য ঘটনা। এখানে এসে জানতে পারি, আজনবিদের অন্তিমদশা! যারা ছোটখাটো ব্যবসাবাণিজ্য করছে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে! যেখান থেকে তারা এক পাও নড়তে পারছে না! যা রোজগার করছে, বছর শেষে সরকারি ফি : এ ফি- ও ফি- কর-ফি দিতে দিতে জীবনটা অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে রীতিমতো! না পারে ধায়তে : না পারে ফেলে যায়তে। বলার অপেক্ষা রাখে না : পরবাসের চেয়ে নির্বাসন শ্রেয়।

‘আমিরাতে দুই হাজার বছর’ কথাটার রহস্য পরে জানা যাবে। এখানে আমরা অনেকের কথা বাদ দিয়ে এমন একজন অসহায়ের কথা প্রচার করতে চাই, যে জন ছত্রিশ বছর প্রবাসে খেটে ভিখারি ভিখারিই রয়ে গেছে : ঊনিশ শ তিয়াত্তর সালের পহেলা জানোয়ারি, আটার বছর বয়সের এক তরুণবালক অর্থাভাবে এবং দারিদ্র্যোপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে জমিজমা যা ছিল তার বিনিময়ে আমিরাত আগমন করে। নিরুপায় বালক : মাতাপিতা, ভাইবোন, আত্মীয়-পরিজন ও বন্ধুবান্ধবের মমত্ব ত্যাগ করে অনটন সংসারের জন্যে একটু সুখ-সমৃদ্ধি বয়ে আনতে বিভুঁই শ্রীঘরকেই আপন করে নিতে বাধ্য হয় ক্রমান্বয়ে। যেই বয়সে তার হৈ-হল্লায় ও খেলাধুলায় মেতে দিন কাটার কথা; সেই বয়সে তাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ও বছরের পর বছর হাড়ভাঙা খাটুনি করে যুগ যুগ কাটাতে হয় প্রবাসে... ...
সোনার হরিণের খোঁজে ছত্রিশ বছর কেটে যায়, সোনার হরিণের দেখা না-পায়! দিন যায়, মাস আসে, ক্রমান্বয়ে কেটে যাচ্ছে বছর, একটু সুখের দেখা না-মিলে! তবু অপেক্ষায় থাকে সুখ নামক পাখিটির জন্যে! কিন্তু, কোথায় তার সেই সুখপাখি!

...অতঃপর মা মরে গেল! আরেকদিন খবর এল : পিতা নেই! পৃথিবী চৌচির হয়ে- অন্ধকার হয় চারিধার! আকাশ বজ্রসম পড়ে মাথায়! নিরুপায়...ভিসা নামক শিশা কবেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে জানা নেই। চুপিসারে কাজকর্ম করে চলে হেথাহোথা। দেশের কথা ভাবতে অক্ষম! দেশে ফিরে করবে কী : সংশয় সর্বদা। বিন্দুমাত্র সম্পদ নেই যে, নেড়েছেড়ে খায়! সব সময় লেগে থাকে ধরা পড়ার ভয়। ধরা পড়ে দেশফেরত হলে কারও কারও মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনও উপায় থাকে না। কেউ কেউ মনে করেন, লজ্জার চেয়ে মরণ ভাল। অনেকে গ্লাফ এসে নিঃস্বদের প্রতি করুণার সবল হাত বাড়িয়েছে- দানদাক্ষিণ্যতে কোথাও কার্পণ্য দেখা যাচ্ছে না। ...ছোটখাটো ব্যবসাবাণিজ্য করছে। কেউবা চাকরি করছে। এমনিতে...হয়তো একদিন পড়ে গেল বিপদে! ...তাদের যদি এমনি নগণ্য অপরাধে আজীবন নিষিদ্ধ হতে হয় : তবে তাদের প্রতি এটা সুবিচার নয়- ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। কারণ, গ্লাফের আলো-বায়ু-মাটি তার জন্যে চিরদিনের মতো নিষিদ্ধ হয়ে যায়! এ আচরণ কি বর্বরতার আচরণ নয়? এ আচরণ কি নির্মমতার- কৃপণতার পরিচয় নয়? শত্রু শত্রুর প্রতি বিমুখ হয় জানি, তবে এমন আচরণ করে না! মানুষকে ভালবাসা মনুষ্যত্বের পরিচয় : যারা মনুষ্যত্বের পরিচয় দিতে অক্ষম- তারা ঘৃণিত। পৃথিবীতে এমন কতক দেশ আছে, তারা গরিবদের স্বার্থ চিন্তা করে না। তারা শক্তিশালীকে নম নম : আর দুর্বলকে পদাঘাত... ...এই ভয় একজন দুর্বলকে আরও কমজোর করে দেয়। তাই তাকে আজীবন অবৈধ থাকতে বাধ্য করে। এটা কিন্তু গরিবদের প্রতি বড় অত্যাচার : ভিখারিকে ভিক্ষা দেখিয়ে তার ভিক্ষাপাত্র কেড়ে নেওয়া!
আজ সারা গ্লাফে দেখা যাচ্ছে, ভিসা-ব্যবসা একটা অন্যতম ব্যবসায় পরিণত হয়েছে! সরকার যেখানে সামান্য একটা কাগজের বিনিময়ে হাজার হাজার... ...লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে! সেখানে সাধারণ মানুষ কি। সামান্য একটা কাগজের মূল্য যদি এত হয়! তা হলে সোনা-চাঁদি-হিরা-মুক্তার মূল্য তত বেশি অস্বাভাবিক নয়। মজলুমের প্রতি জুলম করা যদি অন্যায় হয়, তা হলে এটা কেমন ন্যায়?

... ...নতুন মানুষের চেয়ে একজন পুরাতন মানুষ সব সময় কার্যকর এবং অগ্রসর- অভিজ্ঞ। যে কথাটা একজন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞই বলতে পারে। মানুষ মনুষের প্রতি বিমুখ হয় স্বাভাবিক, কিন্তু এমন নির্দয় হতে পারে না। এখানে আজনবিরা অপরাধ করে : তবে সকলে এমন অপরাধ করে না যে, যার জন্যে তার ফাঁসির আদেশ জারি করা হোক! আজকাল খুনি আসামীর প্রতিও সহানুভূতি দেখানো হচ্ছে : হয়তো কোনেক পরিস্থিতির শিকার সে। মানুষ কখনও স্বেচ্ছায় বড় অপরাধ করে না- হয়ে যায়। তাই, অপরাধীর অপরাধানুসারে দণ্ডিত করা প্রত্যেক বিচারকের কর্তব্য। বিচারকগণ মনে রাখতে হবে : তাদের এ আদালত শেষ আদালত নয়, তার উপর আরেকটি আদালত আছে এবং আরেকজন মহাবিচারক আছে- সেই বিচারকের আদালতের কার্যক্রম এতই নিখুঁত যে, চুলচেরা বিশ্লেষণ করেও খুঁত পাওয়া যায় না। এ কথাটা দুনিয়ার বিচারকগণ মনে রাখে যেন।

...সকলে নিরাপরাধী : নিতান্ত ভাল মানুষ আমরা বলছি না, সবারই কিছু-না-কিছু অপরাধ থাকে। এবং চুরিডাকাতি, খুনখারাবি, রাহাজানি, প্রবঞ্চনা, ধর্ষণ ইত্যাদি জঘন্য অপরাধ মানি; কিন্তু একস্থানের ভিসায় অন্যস্থানে কর্ম করা কোন্ ধরনের জঘন্য অপরাধ আমাদের জ্ঞানাতীত! যদি তা জঘন্য অপরাধই হয়, তা হলে হত্যা কী ধরনের অপরাধ? যার জন্যে একজন মানুষকে আজীবন নিষেধাজ্ঞার গ্লানি বহন করতে হয়! এই জন্য সকল দেশের দূতাবাসকে সোচ্চার হতে হবে- আলোচনা করতে হবে এসব দেশপ্রধানদের সঙ্গে। মনে রাখতে হবে- স্বীয় জনস্বার্থ যেখানে প্রতিষ্ঠিত নয়, সেখানে কোনও অধিষ্ঠান কল্যাণকর নয়। ঠিক আছে- ভিক্ষুকের জন্য এক দ্বার বদ্ধ হলে সে অন্যদ্বারের আশা রাখে; তবে একি ন্যায়! এখানে যে তার জন্য সকল দুয়ার অবরুদ্ধ! তা হলে ভিখারির ভিক্ষা কোথায়? এ কেমন কানুন? এক দেশের অপরাধে বহু দেশ নিষিদ্ধ! এক অপরাধে যেমন দশবার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় না, তেমনি এক অপরাধে দশ দেশ সাজা দিতে পারে না। “আমরা মানুষকে ভালবাসি- আমরা মানবতার ঊর্ধ্বে- আমরা মুসলিম- আমরা আরব” কিন্তু পশ্চিমা দেশসমূহের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, মধ্যমরা মানবতার কত নিম্নে! পশ্চিমেরা এক দেশের অপরাধীকে কিন্তু আরেক দেশ আশ্রয় দেয়, সাজা দেয় না। তাই সেই আবহমানকাল হতে শোনা যাচ্ছে- মানুষ পশ্চিমের গুণগ্রাহী। আজও দেখা যাচ্ছে- সেই ধারাবাহিকতা জারি রয়েছে! টাকার পাহাড়ের বিনিময়ে মানুষ ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি দিতে প্রস্তুত। কিন্তু, ইদানীং দেখা যাচ্ছে- বিনামূল্যেও মানুষ গ্লাফাগমনে বিমুখ! সেই একটা সময় ছিল, দুবাইয়ের নাম শুনলে মানুষ আশ্চর্য অনুভব করত। আজকাল দেখা যাচ্ছে, তার নামোচ্চারণেও যে-কেউ ঘৃণা প্রকাশ করছে! এটা বৃহত্তর নামি একটি রাষ্ট্রের জন্য কম লজ্জার বিষয় নয় : কালিমার বিষয়ও বটে- কিন্তু, দুর্ভাগ্য তাদের- যারা মানুষের আশ্রয়স্থল তৈরির মাধ্যমে সুনাম অর্জন করতে পারে না! বুঝে নিতে হবে, এখানে তাদের ব্যর্থতা।

আইনের পর আইন : আইনবেড়িতে আবদ্ধ করতে করতে করতে মানুষের অবস্থিতি এমন দুর্বিষহ করে তুলেছে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তারা ফাঁসির কারাবাস অনুভব করছে! চতুর্দিকে হাতিয়ে শূন্য ছাড়া কিছুই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! কোনও সুযোগসুবিধা আজনবিদের প্রতি রাখা হয় নি! এটাই বড় দুঃখের কথা : কালিমার বিষয়। ‘মানুষ পৃথিবীতে এসেছে সুনাম অর্জনের জন্যে, যে সুনাম অর্জন করতে পারে নি সে মানুষ হতে পারে নি।’ এ কথাটা আমরা বা আমি মনে করি।
আমরা এমন বহু লোককে দেখেছি- জেনেছি- শুনেছি : শেষসম্বল- ভিটেবাড়ি বিক্রি করে- বন্ধক রেখে গুপ্তধনের আশায় উপসাগর পাড়ি দিয়েছে! তার গুপ্তধনপ্রাপ্ত তো দূরের কথা, অর্জিত ধনও প্রাপ্ত হয় না! এবার সে নিঃস্বের কথা হৃদয়াপ্লুতে প্রকাশ করব-


আমরা হুজুকে বাঙ্গালি : নাটকে বাকেরের ফাঁসি হলে আন্দোলন করতে পারি! কিন্তু বহুতল ভবন থেকে ছিটকে পড়ে শ্রমিক মরলে তার জন্যি উহু শব্দও করতে পারি না! কারণ, ও তো একজন সামান্য শ্রমিক মাত্র। আমার গরজ কি তার জন্যি আফসোস করা! ও তো আমার কেউ নয়- না আত্মীয়, না জ্ঞাতিভ্রাতা, না কোনও আপনজন- কেউ তো নয় আমার। তা হলে, আমি কেন...এখানে মানবত্বের খর্বতা। এখানে মানুষামানুষের তফাৎ। বিখ্যাত কেউ হুঁ করলে ভুঁ হয়ে যায়! গরিব ডুবে মরলেও কে চায়।
এ পৃথিবী গরিবদের বাসস্থান নয় ভাই। তুমি ডুবে মর তো মরো- তাতে আমার কি, আমি তেতলায় ঘুমাতে পারলে হয়। এ পৃথিবী তাদের জন্য ধন্য ভাই, যারা পশ্চাতে পদাঘাত করে সম্মুখে দাঁড়ায় করজোড়ে।

এই তো সেদিনের কথা : বাংলাদেশ যখন জলোচ্ছ্বাসে ভাসছে- এদিকে আমিরাত ঘোষণা করল, অবৈধ প্রবাসীদেরকে দেশফেরত হওয়ার সাধারণ ক্ষমা। বাংলাদেশ প্লাবনে সমুদ্র হোক অথবা কাঠফাটা রৌদ্রে সাহারা মরুভূমি- তাতে ওঁদের কিছু যায়-আসে না। আর তাঁদের আবশ্যকতা কি? তাঁরা না কোনও আমাদের আত্মীয়, না কোনও প্রতিবেশি। হাঁ, তবে জ্ঞাতিভ্রাতা অবশ্য বলা যেতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে রোদন করা চলে : আশা করা চলে না। নাইবা চলুক তা। কামনাও করি না তার। চাই না কারও আশ্রয়ের। চাই না কারও মুখাপেক্ষী হতে। নাইবা রইল আমার অট্টালিকা-দালানকোঠা, মোটরগাড়ি হাম্মার, ফেরারি, মাইবেগ, রোজরাইচ এবং ধনভাণ্ডার ও প্রাচুর্যের বিলাসভূমি। তবু আনন্দিত আমি- শাকপাতা, ধুলাবালি, কাদামাটি ও পর্ণকুটিরে। আমার প্রয়োজন নেই আয়াস ক্লাবের মদ্য পান, মনোজ্ঞনারীর সংস্রব। আমি ভাল দীনতায়- ক্ষুদ্রতায়। তুমি মানুষ তবে : আমি অমানুষ বটে। তোমার হোক রত্নাগারে বসবাস, আমি নির্ধনে ধন্য- আমার ভাল দৈন্যবাস। ... ...তবু চাইব না কোনও চণ্ডালের কাছে সহায়তা। করব না কোনও অহঙ্কারীর কাছে মাথা নত। কামনা করি না কখনও কৃপণের দানদাক্ষিণ্যের। কিন্তু, কামনা করব : একটু সহানুভূতির। বিশ্বের যে-সকল দারিদ্র্য দেশ থেকে দরিদ্র মানুষেরা এসে এ মরুরাজ্যকে আজ স্বপ্নরাজ্যে পরিণত করেছে, তারা কতটুকু স্বপ্নোত্তীর্ণ হয়েছে? একটু সহানুভূতি চাই তাদের জন্যি।
ভাবলে অবাক লাগে- যারা রক্তঘর্মে স্নান করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এ গ্লাফকে শ্রম দিয়ে, মেহনত দিয়ে- রোড-ঘাট, অফিস-আদালত, টওয়ার-ইমারত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বড় বড় সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করে গেছে, তারা কী পেল? -দুঃখ-লাঞ্ছনা-হাহাকার ছাড়া অন্য কিছুই তো নয়! বিনিময়ে মিলেছে তাদের অন্ধকার গাদর! মিলেছে পদাঘাত! মিলেছে আজীবন নিষেধাজ্ঞার একমাত্র রক্তসিল! নাহয় অতি সামান্যতম অর্থ! যা দিয়ে না তার জীবন গঠন করতে পেরেছে, না তার পরিবারের!

এবার বলি, আমিরাতে দুই হাজার বছরের রহস্যকথা। ঊনিশ শ তিয়াত্তর সালের টগবগে যে যুববালক আমিরাত আগমন করে, ছত্রিশ বছর পর সে বালক আর বালক রয় না : হয়তো রোগাক্রান্ত মৃত্যুপথপথিক, নাহয়তোবা জরাজীর্ণ বক্রদেহী পূর্ণ বয়স্ক একজন বৃদ্ধ।
ঊনিশ শ নিরানব্বই সালের কথা : সুদির্ঘ পথ অতিক্রম করে একটা প্লাটফরমে অবতীর্ণ হয় সে। ছোটখাটো ব্যবসাবাণিজ্য করছে- ভালই অতিবাহিত হচ্ছে দিন। কিন্তু, এ কথা কি অস্বীকার করা যায়? ‘সুখের দ্বারে সব সময় ভূতে হানা দেয়’। এমন সময় উল্লেখিত ব্যক্তিটির ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয় আটকা পড়ে বেড়াজালে; ভিসার কি সমস্যা- সমাধানে উত্তীর্ণ হতে পারছে না! দেশফেরত হতে বাধ্য। ওই আত্মীয়র নবনির্মিত দোকানটির বহনভার গ্রহণ করতে হয় তাকে।
...ছয় মাস কুলুপাবদ্ধ রাখার পর একদিন ইচ্ছে হল দোকানটি খোলার- আত্মীয়কে ভিসা প্রদান করার। কিন্তু, ইতোমধ্যে একটা আইন জারি হয়েছে, যে-কেউ অন্যত্র কর্ম করতে পারবে, তবে (মিনিস্ট্রী অফ ইন্টিরিয়র) লেবারকোর্ট থেকে ছয় মাসের ছাড়পত্র নিতে হবে। সেই আইনানুযায়ী ছয় মাসের ছাড়পত্রও নেওয়া হয়েছে তার। কিন্তু ভিসামেয়াদোত্তীর্ণ-তারিখানুযায়ী সেই ছাড়পত্রটি প্রদান করা হয়েছে চার মাসের জন্যে। বেশ ভাল কথা-

...ক্রমান্বয়ে এসে পড়ল ভিসা ধারণের সেই কান্নাপল! যতই কষ্ট হোক- অশ্রু ঝরুক- টাকার পাহাড় লাগুক- সবকিছুর বিনিময়েও এ কর্মের সমাধান করতে হয়। ...যারা ব্যর্থ তাদের লাঞ্ছনা-বঞ্চনার অবশিষ্ট থাকে না। যাই হোক, এটাই যখন একটি দেশের আইন, এ আইন অমান্য করা চলে না এবং মেনে চলাই কর্তব্য। চললাম-
ইদানীং তার ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ। তাই বেশির ভাগ সময় বন্ধ রাখা হয় দোকানটি। আজ কি কারণে- ভাগ্যবিড়ম্বনে দির্ঘক্ষণ এসে বসল দোকানখুলে। এমন সময় কয়েকজন লেবারকোর্ট-অফিসার এসে হাজির : ‘কর্মানুমতিপত্র চাই’ ছাড়পত্রটা ওদের হাতে দেওয়া হল। নিরীক্ষণে জনৈক অফিসার সঙ্গিদের উদ্দেশ্যে বিস্মিত হয়ে বলল, ‘দেখ! দেখ! এটার মেয়াদ শেষ হয়েছে কবে- প্রায় মাস ছুঁই ছুঁই!’ হয়ে গেল ফাঁসির দণ্ডীয়মান অপরাধ! অপরাধী ভয়াতঙ্কে কম্পিতস্বরে বলল, স্যার, আরেকটা কাগজ তৈরি আছে একটু দেখবেন? অফিসারগণ দেখল, এ কাগজটাও ছাড়পত্র বটে; কিন্তু রেজিস্ট্রেশন্ ফ্রি। অর্থাৎ : নিবন্ধন করা হয় নি।
জনৈক অফিসার বলল, এ কি? পরিহাস করার স্থান এটা নয়।
অপরাধী হাতজোড় করে বলল, স্যার, সাম্মিট করতে পারি নি- আমি অক্ষম- কারণ, আমার পাসপোর্টে ভিসার মেয়াদ শেষ- সম্পূর্ণ না করে... ...
অফিসারগণ বলল, সেই দেখা যাবে- চল-
তারপর সেই দৈত্যাশ্রয়ের গুহায় যত তাণ্ডব : প্রলয়লীলা জীবনে গুজারি গিয়েছে তার, সেই অবাঞ্ছিত দিনগুলোর কথা প্রকাশ করলাম না আর; শুধু এটুকু বললাম : এবার শুরু হয় তার শঙ্খবিষের জীবন : কারাবাস- একেকটি পল যেন তার একেকটি মাস। একেকটি মাস যেন তার একেকটি যুগ। এভাবে পূর্ণ হয়- দুই হাজার বছর।
এ ধরণের সামান্য অপরাধে যদি কোনও মানুষ জঘন্য অপরাধের কারাভোগ করতে হয়, তা হলে এমন দেশে বসবাসের চেয়ে বনবাস শ্রেয়। এখানে সমস্ত পাবন্দি : আইনকানুন কিন্তু পরদেশিদের জন্যে। স্বদেশিরা ইচ্ছে করলে রাতকে দিন : দিনকে রাত অবশ্য করতে পারে। তাদের জন্যে আইন কি আর কানুন কি : যারা লোক্যাল তাদের গর্বাসীম-

কানুন! কানুন!! কানুন!!!
কানুনের এ কর্কশবাণী ভিনদেশিদের কর্ণাবধি শেষ। মুহূর্ত-পর-মুহূর্তে কানুনের পর কানুন বানাতে বানাতে বানাতে পরদেশিদের মন অতিষ্ঠ করে তুলেছে! সকালে এক কানুন! বিকালে আরেক কানুন! প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে নব নব কানুন- নব নব আইন শুধু পরদেশিদের জন্যে! যাকে জিজ্ঞেস করি, কেমন আছ বন্ধু? উত্তর আসে- বেঁচে আছি বন্ধু, একেবারে জীবনের গহিনদ্বারে- দির্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে : বেঁচে আছি!
ব্যবসাবাণিজ্যে এত বেশি কর বসিয়ে দিয়েছে- কারণ, এখানে বেশির ভাগ ব্যবসায়ী ভিনদেশি। তাই ছোটখাটো দোকানদারেরা, ব্যবসায়ীরা মরেই গেল। মাস শেষে হিসাব করে দেখা গেল- এক শ টাকা পুঞ্জিত করতে পারল না! বছর শেষে কান্নাকাটি জোড়তে হল- মোটা অঙ্কের লাইসেন্স ফি, ভিসা ফি, এ ফি, ও ফি, কর-ফি ভরতে ভরতে দেখা যায় অনেক ঋণ হয়ে বসেছে। এসব ঋণ শেষ হতে না হতে আবার ঘুরে আসে বছর! ফি দিতে দিতে অতিষ্ঠ পরদেশিরা! এভাবে চলছে প্রবাসীদের করুণজীবন।


বি. দ্র:- এ গল্পটি : সাধারণত এটাকে গল্প বলা যায় না- হাঁ, কথিকা বা প্রবন্ধ বলা যায়। আমার বেশ কতক প্রবাসী-বন্ধুবান্ধবের অনুরোধে এ কথিকাটি রচনার প্রয়াস। রচনা শুরু করেছিলেম সে অনেক আগে। আমার কয়েকজন বন্ধু ও আত্মীয় এ ধরণের নগণ্য অপরাধে আজীবন গ্লাফ-নিষিদ্ধ হয়ে এখন মানবেতর জীবন যাপন করছে!

এ কথিকাটি সমস্ত প্রবাসীকে উৎসর্গ করলাম।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • রুবিনা আলী
    রুবিনা আলী লেখাটি পড়ে খারাপ লাগলো। আবার অনেক বিষয়ে জান্তে পারলাম। ধন্যবাদ লেখককে।
    প্রত্যুত্তর . ২৫ অক্টোবর, ২০১১
  • আযাহা সুলতান
    আযাহা সুলতান দিগন্ত রেখা এবং রুবিনা আলি আপনাদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ। রুবিনা আলি বোন, আপনাকে অনেক দিন পর পাওয়া গেল--ভাল লাগল.....
    প্রত্যুত্তর . ২৬ অক্টোবর, ২০১১
  • জুয়েল দেব
    জুয়েল দেব মাসের প্রথমে একবার পড়েছিলাম। তখন ভেবেছিলাম, ভালো করে পড়ে এই লেখাকে ভোট দিতে হবে। তা নাহলে লেখককে অপমান করা হবে। সুলতান ভাই, এই লেখার উপর কোনো আলোচনা, সমালোচনা করলে সেটা ধৃষ্টতা হবে। ভেবেছিলাম, আপনার লেখার কয়েকটা লাইন দিয়েই উদ্ধৃতি দেব। মজার ব্যাপার হচ্ছে,...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ২৬ অক্টোবর, ২০১১
  • Raziya Sultana
    Raziya Sultana অনেক অনেক ভালো এবং শিক্ষনীয় একটি লিখা। ধন্যবাদ এমন একটি লিখা সবার সাথে শেয়ার করার জন্য।
    প্রত্যুত্তর . ২৬ অক্টোবর, ২০১১
  • খন্দকার নাহিদ হোসেন
    খন্দকার নাহিদ হোসেন আযহা সুলতান ভাইকে ধন্যবাদ। অনেক কিছু জানলাম। আপনার কথিকাটি পড়ে যতটা না ভালো লাগলো তারচেয়ে বেশি কষ্টই পেলাম।
    প্রত্যুত্তর . ২৭ অক্টোবর, ২০১১
  • আযাহা সুলতান
    আযাহা সুলতান জুয়েল দেব ছোট ভাই, রাজিয়া সুলতানা বোন এবং নাহিদ বন্ধু তোমাদেরকে অনেক অনেক ধন্যবাদ এবং ঢের আন্তরিকতা.....
    প্রত্যুত্তর . ২৭ অক্টোবর, ২০১১
  • রেহানা রিমি
    রেহানা রিমি আমিরাতে দুই হাজার বছর! কথাটা শুধু চিন্তার বিষয়ই নয়, পৃথিবীর সমগ্র মানবকে অবাক করে দেওয়ার মতো একটি উক্তি। এটা কোনও গল্পকারের রূপকথা নয়, না কোনও ইতিহাসের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, না কোনও অলৌকিক কাহিনী। এটা একটি বাস্তব-চিত্র এবং যথার্থ সত্য ঘটনা।// লিখাটি পড়ে আ...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ২৭ অক্টোবর, ২০১১
  • মাহমুদুল হাসান ফেরদৌস
    মাহমুদুল হাসান ফেরদৌস জানার আছে অনেক কিছু
    প্রত্যুত্তর . ২৮ অক্টোবর, ২০১১
  • আযাহা সুলতান
    আযাহা সুলতান রেহেনা রিমি এবং হাসান ফেরদৌস ভাই ও বোনকে আমার অনেক অনেক ধন্যবাদ.......
    প্রত্যুত্তর . ২৯ অক্টোবর, ২০১১
  • ম্যারিনা নাসরিন সীমা
    ম্যারিনা নাসরিন সীমা সেটাও ভাল যে গর্বসংখ্যা দেখেই পূর্ণ করার বাসনাটুকু জাগ্রত হয়েছিল ভাই । নাহলে সুন্দর একটা গল্প মিস করতাম । ভাল লাগলো ।
    প্রত্যুত্তর . ৩০ অক্টোবর, ২০১১

advertisement