সন্ধ্যা থেকেই কালো মেঘের ঘনঘটা। ঝাপসা আকাশটা আজ যেন একটু বেশী ঝাপসা লাগে। সন্ধ্যা প্রদীপ নিভে গেছে অনেক আগেই। নিঃশব্দে বেড়ে চলেছে সময়ের ছাঁকা। সে চাকায় ভর দিয়ে বাড়ছে অন্ধকার রাত। তবুও আজও দাড়িয়ে আছে একটা রাত জাগা পাখি। অপেক্ষার প্রহর যত বাড়ছে ততই চাপা পড়ছে তাকে পাওয়ার আশা। কিন্তু কষ্টগুলো বেরিয়ে আসতে চাইছে চোখের লোনাজলে। বুকের ভেতর কষ্টগুলো তীব্র বেগে ছুটে চলছে এপাশ থেকে ওপাশে। নদীর ঢেউ এক কুল ভাঙে তো আরেক কুল গড়ে। কিন্তু হৃদয় নদীতে কষ্টের নিঃশ্চুপ। রাতের ডাহুক পাখিটা ঘুমিয়ে গেছে। তবু রাতজাগা পাখিটা সমস্ত শক্তি নিয়ে দাড়িয়ে আছে। সে আসবে বলে।
কে এই রাত জাগা পাখি? কেনই বা সে এই মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে? এই রাতজাগা পাখিটার নাম অন্তু। ক্লাস সেভেনের খুবই মেধাবী ছাত্রী। মাত্র কিছুদিন আগেও এ সময় সে থাকতো মায়ের কাছে। সন্ধ্যাটা শুরু হতো পড়ার টেবিল দিয়ে। তারপর খাবার টেবিলে। মা গল্প করতো রাজপুত্র রাজকন্যার, কখনো বা রাক্ষসী ডাইনি বুড়ির। আর অন্তু তা মুগ্ধ হয়ে শুনত।
আর মায়ের হাতে খেত। গল্প শেষে তো খাওয়া শেষভ এভাবেই দশটা আদুরে মেয়ের মত সুখের রাজ্যে ছিল অন্তুর বসবাস। কিন্তু আজ সে অন্তুর রাতজাগা পাখি। মা তাকে আদর করে খেতে বলে না, গল্প বলে না। বিছানায় গুনগুন করে মায়ের কণ্ঠে মিষ্টি গান সে আর শুনতে পায় না। প্রতিটা মুহূর্তে যে মেয়েটি মেতে থাকতো মায়ের আচল তলে। মায়ের ভালোবাসা যে মেয়েটিকে ঘিরে রাখতো সব সময়। সে আজ মা হারা।
অন্তুর বাবা তাকে অনেক আদার করে কিন্তু গল্প বলতে পারে না। বানিয়ে বানিয়ে খাবার টেবিলে গল্প বলে সে চুপচাপ থাকে। কিন্তু অন্তুর গলা দিয়ে ভাত যে নামে না। মায়ের কোমল আচল আর আদরের চাদর সে কোথাও পায়না, কারো কাছেই না।
অন্তুর জীবনটা তো এমন ছিল না। আজ কেন এমন হলো? মাত্র মাস খানের আগেও সব ঠিক ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে একদিন অন্তুর মার ভীষণ পেট ব্যথা শুরু হলো। ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অন্তুর বাবা তাকে নিয়ে যায় ডাক্তারের কাছে। শেষ পর্যন্ত সব টেস্ট শেষে মা’র পেটে পাথর ধরা পড়ে। ডাক্তার সান্ত্বনা দিয়ে বলেন অপারেশন করতে হবে তেমন বড় কোন অপারেশন নয়। খুব দ্রুত ভালো হয়ে যাবেন।
অন্তুর মামা বাড়ি সাভারে। সেখানে একটা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয় অন্তুর মাকে। যাতে করে মাসীরা অন্তু এবং তার মায়ের পাশে থাকতে পারে। সব ঠিকই ছিল কিন্তু স্বয়ং বিধাতা মনে হয় অন্তুর সুখে ঈর্ষা করেছিলো। তাই তো একটা সাধারণ অপারেশন করতে গিয়ে ডাক্তার ভুলবশত ধমনী কেটে ফেলে। আর সেই সাথে তীক্ষ্ণ ধারালো সেই ছুরিতে কাটা পড়ে অন্তুর সমস্ত সুখ।প্রচুর রক্তের প্রয়োজন হয়।সেখানে অবস্থা খারাপ দেখে মাকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেলে। কিন্তু ও.টি. তে নেওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। নিভে যায় জীবন প্রদীপ। আর সাথে সাথে চিরদিনের মত নিভে যায় অন্তুর সুখ প্রদীপ।

মামা বলেছে মা নাকি আকাশের তারা হয়ে আছে। অন্তু অনেক দুষ্টুমি করে তো তাই মা চলে গেছে অভিমান করে। মা দূরে থেকে অন্তুকে ঠিকই খেয়াল রাখে। তাই তো অন্তু প্রতি রাতে আকাশের উজ্জ্বল তারাটা খুঁজে বের করে । আর অশ্রুভরা চোখে ডেকে বলে মা তুমি ফিরে এসো। আমি আর দুষ্টুমি করবো না। তুমি যা বলবে তাই শুনব। আমি ভাল করে লেখা পড়া করব মা । মাগো তুমি ফিরে এসো।