(এক)
“হারামির বাচ্চা! দুই টাকার চাপরাশী হয়ে আমার সাথে মুখে মুখে তর্ক করিস! লাত্থি মেরে অফিস থেকে বাইর করে দেবো”
“ছার! কষ্ট কইরা লাথি মারতে হইব না, আমি নিজেই বাইর হইয়া যাইতাছি”
“মানে?”
“আইজ থিকা আমি আর আপনেগো লগে নাই। চাকরিডা ছাইরা দিলাম”
রমজানকে দিয়ে উদয়াস্ত গাধার মতো খাটানো এবং কাজ ভালো করা সত্ত্বেও অকথ্য গালিগালাজ করার মতো অশোভন কাজ করা শোভন চৌধুরীর রোজকার অভ্যাস। এইসব ছোটলোকদের এভাবেই সবসময় পায়ের কাছে রাখতে হয়, নইলে মাথায় ওঠে। রমজান মুখ বুজে এতদিন সবকিছু সয়ে আসছিল বলে কাজটাকে তিনি জন্মাধিকার বলেই ধরে নিয়েছিলেন। ঘুণাক্ষরেও ভাবেন নি কোনো একদিন ‘পুঁচকে’ ছেলেটা মুখের ওপর চাকরিটা ছুঁড়ে মারবে। আজ সেই বেসম্ভব কাজটা করাতে তিনি যার পর নাই বিস্মিত এবং বিস্ময়ের ঘোর কাটার পর ততোধিক ক্রোধান্বিত হলেন। ছোটলোকের বাচ্চাটা তার ইগো হার্ট করেছে
“চাকরি ছাড়বি- যাবি কই? খাবি কী?”
“কী খামু এইডা নিয়া চিন্তা করি না ছার। আল্লায় যেইহানে রিজিক রাখছে সেইহান থিকা আইব”
“বটে! তা তোর মতো এইট ফেল পোলারে চাকরি দিব কে?”
রমজান হাসল
“ছার! আহেন, যাওনের আগে একখান গল্প হুনাই”
(দুই)
১৪ বছর আগের এক কাল রাত্তিরে
দোসর বাহিনীর আসার খবর পেয়ে মোমেনা বেগম সেদিনের মতো আজও পাঁচ বছরের মেয়ে আর এগার বছরের ছেলেকে নিয়ে গোয়ালঘরে গিয়ে লুকাল। কিন্তু ওরা সেদিনের মতো আজ শুধু ঘর তল্লাশি করে রণে ভঙ্গ দিল না। ঘরের পেছন, গোলা, খড়ের গাদা, গোয়াল ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজল। না পেয়ে আজও চলে যাচ্ছিল। কিন্তু আচমকা ময়না কী বুঝে ভয় পেয়ে কান্না জুড়ে দিলো। মোমেনা ওর মুখে হাতচাপা দিয়েও শেষরক্ষা হলো না। প্রস্থানরত পাকদোসরেরা কান্নার আওয়াজ পেয়ে মটকার ভেতর থেকে ওদের বের করে ফেলল। তারপর একজন পিচ্চিটাকে, আরেকজন মোমেনাকে চুল ধরে টেনে নিয়ে চলল। পেটে বাচ্চা, মোমেনা হাতেপায়ে ধরে কেঁদেকেটে বলেও পার পেল না। বাচ্চা তো এক গাদ্দারের, তার জন্যে সমবেদনা কীসের?
আরেক মটকার ভেতরে বসে রমজান সবকিছু শুনল, কিন্তু সাহস করে বের হতে পারল না। বরফখণ্ডের মতো মটকার ভেতর মটকা মেরে পড়ে রইল যতক্ষণ না সূর্যকীরণ এসে চোখে আলত করে টোকা দিয়ে যায়।
ওদিকে রাক্ষসপুরী, মানে পাকবাহিনীর ক্যাম্পের কতগুলো রাক্ষসের লালসা মেটাবার বন্দবস্ত করতে পেরে ওদের দোসরেরা উল্লসিত। হাত বাধা, মুখে কাপড় গোজা মোমেনাকে নিয়ে ওদের কমান্ডারের সামনে এসে হেড রাজাকার তোজাম্মেল শেখ বিনয়ে মাখনের মতো গলে পড়ল
“হুজুর! আপকে লিয়ে এক তোফা লে আয়া হু”
“ক্যায়া?”
“গাদ্দারকি বিবি! উসকো পেট ভি হুয়া হ্যায়”
“বহুত আচ্ছে! হররোজ একহি চিজ খা কার ম্যায় বোর হো চুকা হু। আব নায়া চিজ আ গায়া হ্যায়… বহুত মাজা আয়ে গা”
তোজাম্মেলের হাত থেকে ছুটে মায়ের কাছে যেতে ব্যর্থ জোরাজুরি করছিল ময়না। তোজাম্মেল ওকে আজাদের কাছে দিলো বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্যে
“উসকো কাহা লে জা রাহা হো ভাই?”
কমান্ডার তজুমুদ্দিন হায়দারের হায়েনার মতো জ্বলজ্বলে কামুক চোখজোড়া দেখে তোজাম্মেল ভিরমি খেলো
“ইয়ে বাচ্চা হ্যায় সাহাব!”
“বাচ্চা, লেকিন গাদ্দার কি বাচ্চা! অউর বাচ্চা কো ভি আলাগ মাজা হ্যায়!”
সেই রাতে মা-মেয়ের জীবনে কেয়ামত নেমে এসেছিল। জল্লাদখানা থেকে ওরা আর ফিরে আসে নি। যুদ্ধ ময়দান থেকে ফেরে নি রমজানের বাবাও। যুদ্ধ শেষের আগেই জীবনযুদ্ধ শুরু হলো অনাথ ছেলেটা। পরাধীন দেশের আদরের দুলালের স্বাধীন দেশে ঠাঁই হলো পথে।
(তিন)
“ছার! স্বাধীনতা মানে কারো কাছে লাল-সবুজ পতাকা, কারো কাছে মাথা উঁচু কইরা খাড়ানোর খমতা। আমার কাছে স্বাধীনতা মানে কী আছিল জানেন? ক্ষিদা, অপমান, মাইর, গলাধাক্কা! স্বাধীন দ্যাশে আমি ওইসবই পাইছি সেই ছুটবেলা থিকা। বড় হইতে হইতে বুঝছি বাপে দ্যাশ স্বাধীন করছে বইলাই সবকিছু এমনে এমনে পায়া যামু, এইডা হইব না। জীবনের পদে পদে যুদ্ধু, হেই যুদ্ধে আমার নিজেরই জিততি হবি। যুদ্ধু করতি করতি জীবনের এই পয্যন্ত আইছি। বাকিডাও কইরা যামু”
“বাহ, কথা তো ভালোই শিখছিস! কিন্তু জীবন অত সোজা না রে ব্যাটা”
“সোজা কুনডা ছার? এই যে দুইন্যায় কুটি কুটি মানুষ দেহি, পত্যেকের জন্ম দিতি পত্যেক মায়ের কত কষ্ট! কষ্ট কইরা জন্ম দ্যায় বইলাই তো মায়ের এত ময্যাদা। বড় কিছু পাইতে হইলে কষ্ট তো হবিই! বেদনা ছাড়া কি কিছু পাওন যায়? আহি ছার, ভুলতুরুটি হইলে মাফ কইরা দিয়েন”
হতভম্ব বসকে পেছনে ফেলে সাড়ে তিন বছরের বন্দিশালা ছেড়ে বেরিয়ে এলো রমজান।
(চার)
“মুক্তি তুই!”
রেলস্টেশনে কোনার সিটটায় বসে এতক্ষণ নিজের ভেতর ডুবে থাকা মেয়েটা পরিচিত কণ্ঠ শুনে মুখ তুলে তাকাল। সামনে সে রমজানকে দেখল না, দেখল তার হারানো অতীত। যার মায়াবী কণ্ঠ একদা মনে খুশির লহর তুলত, সেটাই এখন তুলছে আবেগের ঝড়। মুক্তি মাথাটা নিচু করে ফেলল
“এইহানে কী করস এই রাইতের বেলা?”
দুই তরফেই নীরবতা- রমজান উত্তরের খোঁজে নীরব, মুক্তি নীরব উত্তরহীনতার যাতনায়। শত বর্ষের নীরবতা ভেঙে রমজানই মুখ খুলল
“বাড়িত কিছু হইছে? তর জামাই কই?”
মুক্তি এখনও নীরব। রমজান উত্তর খুঁজতে খুঁজতে জাহাজের সার্চলাইটের মতো দৃষ্টি মেলে খুঁজতে থাকে মুক্তির স্বামীকে। তাকে সে কোথাও দেখতে পায় না, কিন্তু দেখতে পায় মুক্তির গলার নিচে কালশিটে দাগটা
“তর গলায় কী হইছে?”
মুক্তি মুক্তকচ্ছ কিশোরের মতো চমকে উঠে তড়িৎহস্তে ঘোমটা টেনে দাগটা ঢাকতে যায়, আর তা করতে গিয়ে অজান্তেই বে-আব্রু করে ফেলে সযত্নে লুকিয়ে রাখা কবজি থেকে কনুই অব্দি লম্বাটে কালো দাগটাকে
“জামাই মারছে?”
মুক্তির নিচু মাথা আরো নিচু হয়ে যায়, কিন্তু জবান থেকে একটা কথাও বের হয় না। রমজান মুক্তির দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। ক্রমশই তার বুকের ভেতর উঠে আসতে থাকে ক্রোধের সুনামি। হায়া-লেহাজের মাথা খেয়ে খপ করে চেপে ধরে মুক্তির লাউডগার মতো চিকন হাতটা
“চল”
“কুথায়?”
“থানায়”
“ক্যান?”
“কমপ্লিন দিতি”
“কমপ্লিন দিলিই সব ঠিক হয়া যাব?”
প্রশ্নটা মুক্তি জবাবের আশায় করে নি। জবাবটা তার জানা।
বাপের ওপর ক্রোধ-অভিমানবশত মুক্তি বাপের বাড়ির রাস্তা ভুলতে বসেছিল। বিয়ের এক বছরের মাথায় স্বামী ব্যবসায় ধরা খেলে সেই মুক্তিই ঘন ঘন বাপের বাড়ি যাওয়া-আসা করে। করতে হয়। ‘বড় ব্যবসায়ী’ জামাইয়ের হাতে মেয়েকে সঁপে দিয়েছিল জয়নাল মিয়া মেয়ের সুখের আশায়। সেই সুখের কথা ভেবে নগদ টাকার জোগান দিয়ে যায়, কিন্তু জামাইয়ের অভাব মেটে না। কৃষক মানুষটা আর কত দেবে! তাই কিছুদিন পর থেকে মুক্তি খালি হাতে ফেরে। স্বামীকে কিছু দিতে না পারলেও স্বামী তাকে দু’ হাতভরে দেয়। তার চিহ্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে মুক্তির দেহময়।
জয়নাল মিয়া এক তাড়া টাকা দিয়ে জামাইয়ের হাত ধরে অনুনয় করে বলেছিল মেয়েকে যেন না মারে। তিন মাস না যেতেই আবার কালশিটে দাগ নিয়ে মুক্তি বাপের বাড়ি ফেরে। জয়নাল মিয়া এইবারে সালিশ বসায়। মুক্তির স্বামী সবার সামনে ওয়াদা করে স্ত্রীর গায়ে হাত না তোলার। তারপর ঘরে ফিরে তাকে মেরে আধমরা করে সালিশ-দরবারের মাধ্যমে সমাজে তার নাক কাটানোর অপরাধে।
এরপরও মুক্তি চেহারায় কালশিটে দাগ নিয়ে বাপের বাড়ি আসে। কিন্তু এবারে তার মুখ বন্ধ, আর জয়নালের বন্ধ চোখ। একদিন সে চিরতরে চোখ বোজে, মুক্তি চিরতরে ভোলে বাপের বাড়ির পথ।
উথালপাথাল ঢেউয়ের মধ্যে সংসারতরী আঁকড়ে ধরে দিন পার করছিল মুক্তি। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সাগর সাঁতরে তীরে ওঠার কথা সে কোনোকালেও ভাবে নি। সাঁতারটাই তো শেখা হয় নি কখনো! বাপ তারে পড়ালেখা শিখিয়ে স্বাবলম্বী করার বদলে প্রায় দ্বিগুণ বয়সী লোকের কাঁধে সঁপে দিয়ে পার করতে চেয়েছিল। কিন্তু মাঝপথেই সংসার তরী থেকে নেমে পড়েছে মুক্তি। হয় সাঁতরে তীরে উঠবে, নয়ত ডুবে যাবে। হেস্তনেস্ত একটা কিছু হবে, কিন্তু ঝুলে থাকবে না।
(পাঁচ)
দুজন অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। একসময় স্টেশনে ট্রেন এসে থামে। রমজান ট্রেনের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে কিছু একটা ভেবে পেছনে ফেরে
“যাবি আমার লগে?”
“কই?”
“কুথায় যামু জানি না। তয় যেইহানেই যাই নিজের মতন কইরা জীবনটাকে গুছায়ে নিমু”
গরীব ছেলের হাতে মেয়েকে সঁপতে নারাজ ছিল মুক্তির বাপ। যদিও তখন রমজানের একটা চাকরি ছিল। এখন সেটাও নেই, তবু সেই হাতটা ধরতে মুক্তি কুণ্ঠিত হয় না। অজানা গন্তব্যের পথে একজন সঙ্গী হলে মন্দ কী!
(ছয়)
“বাজান, যাইছ না!”
দুই বছরের পিচ্চিটা মায়ের নিষেধ অমান্য করে হাসতে হাসতে টলমল পায়ে দৌড়াতে থাকে
“পোলাডা হইছে এক্কেরে বাপের লাহান! সারাক্ষুণ অস্থির”
মুক্তির বিরক্তিভরা কথাটা শুনে রমজান মুচকি হাসে। ডিসপ্লে বক্সে রুটি-বিস্কুট সাজাতে সাজাতে চোখ তুলে তাকায়। স্বাধীনের পেছন পেছন ছুটছে মুক্তি। রমজান মুগ্ধদৃষ্টিতে দেখতে থাকে।
স্ত্রী-সন্তানের সাথে খুনসুটি, বেকারি দোকান আর স্বাধীন জীবনের স্বস্তি নিয়ে দিনগুলো ভালোই কেটে যাচ্ছে।
লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা
ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য
কোনো শত্রুর কবল থেকে স্বাধীন হলেই পুরোপুরি স্বাধীন হওয়া যায় না। স্বাধীনতা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজন আর তার জন্যে প্রয়োজন স্বাধীন হওয়ার ঐকান্তিক ইচ্ছা। গল্পের বিষয়বস্তু এটাই।
৩০ সেপ্টেম্বর - ২০২৩
গল্প/কবিতা:
৫৩ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
আগামী সংখ্যার বিষয়
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ মার্চ,২০২৬