লালের সমাহারে পোষাকের বাহারী বিলাসিতায় রানীমাতাকে অপরুপ লাগছে । যেন----, " লাল দোপাট্টা মল মল কা-------, লাল দোপাট্টা মল---মল " ।
একঝাঁক কচি-কাঁচা তরুন-তরুনীর কাছে রানীমাতা জানতে চাচ্ছে----, " ফেব্রুয়ারী মাস কিসের জন্য বিখ্যাত ?

তারা বলছেঃ প্রেমের জন্য ।

একথা শুনে রানীমাতা অন্তরে একটা ধাক্কা অনুভব করলো । তাহলে তাকে কি Love you-এর মর্ম নোতুন করে বুঝতে হবে ?

রানীমাতা তাদেরকে বোঝাবার জন্য বলতে লাগলোঃ " ১৯৫২ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে অনেক আন্দোলন হয়েছিল । সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে ছালাম , রফিক , বরকত , জব্বার সহ আরো অনেকেই শহীদ হয়েছিল । ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে মেনে নিয়েছিল । সেই থেকে আমরা প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারীকে ভাষা দিবস হিসাবে পালন করে আসছি । এরপর অর্ধ-শতাব্দীরও বেশী সময় পার হলে---, জাতিসংঘ একুশে ফেব্রুয়ারীকে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দান করে । জাতী , ভাষা ও রাষ্ট্রীয় দিক বিবেচনায় আমাদের জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারীর গুরুত্ব অপরিসীম । একে ইতিহাসের একটি চলমান ধারা হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে ।"

রাণীমাতার কথা শুনে তরুন-তরুনীদের হাসী যেন আর থামে না ।
তারা বলতে থাকেঃ----, ১৯৫২ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে যে আন্দোলন হয়েছিল----, তা সফল হয়েছিল । এখন আমাদের করনীয় কি ? আর আমরা করছিই বা কি ? শহীদদের স্মৃতি রক্ষার জন্য যে সৌধ-----, তার নাম " শহীদ মিনার " । আরবী আর ফারসী শব্দ মিলে এটি গঠিত । বাংলাকে বাদ দিয়ে কেন এই দুই ভাষার শব্দ নিয়ে এটা করা হলো----, তার উত্তর সহজে মিলবে না । কিন্তু এটাও ইতিহাসের এক অন্যরকম বাস্তবতা ।
বাংলা গানের বদলে অন্য ভাষার গান । বাংলা সিনেমার বদলে অন্য ভাষার সিনেমা । বাংলা শব্দের পরিবর্তে অন্য ভাষার শব্দ ব্যবহার করা এখন একটা ফ্যাশানে পরিনত হয়ে গেছে ।

তারা আরো বলছেঃ---, ১৪-ই ফেব্রুয়ারী বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের নামে গোটা জাতি এক অন্য রকম আবেগী শিহরনে মেতে উঠে । অথচ একুশের চেতনায় সেইভাবে জাতী জাগতে পারছে কি'না ?--তা ভেবে দেখার সময় এসে গেছে ।
রানীমাতা-----, আপনি শুনলে অবাক হবেন---, জন্মদিন উপলক্ষ্যে গান গাওয়া হয়----, " জন্মদিনে কি আর দিব তোমায় উপহার ? বাংলায় নাও ভালবাসা----, হিন্দিতে নাও পেয়ার ।" ---গানে গানে এরকম প্রকাশভঙ্গি থাকলেও বাস্তবে কিন্তু Love you শব্দটাই ব্যবহার করা হয়ে থাকে । এই Love you-এর তীব্র স্রোত প্রবল হয়ে সমাজ জীবনকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে । We Love you রানীমাতা---, We Love you .

তরুন-তরুনীদের এই অবস্থা দেখে রানীমাতা থমকে গেছে । অবাক হয়ে ভাবছে----, এ জাতীর মুরুব্বীরা এদেরকে কি শেখাচ্ছে ? কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছে ? সব মিলে গোটা জাতী কিসের জোয়াড়ে ভাসছে ?


শীলাদেবী সহ আমরা কয়েকজন শহীদ মিনারের দিকে যাচ্ছি । পথের ধারে এক দম্পতীর ঝগড়া শুরু হয়ে গেছে । স্বামী বলছে---, ফুল দেয়াতো হলো--, চলো বাড়ী যাই । বাচ্চা দুটি মনে হয় কাঁন্নাকাটি করছে । স্ত্রী বলছে----, না । আর একটু ঘুরাফেরা করি ----বুয়া আছে---অসুবিধা নাই । স্বামী রাগ হয়ে বলছে---, এখানে যদি পুরুষ মানুষ না থাকতো---তাহলে এক মুহুর্তও থাকতে না । কিসের কি ফুল দেয়া----, তোমাদের সব কিছু বাহানা । স্ত্রী বলছেঃ---, চুপ করো । আগে বাড়ী যাই---মজা দেখাব ।

এই ঘটনাকে এড়িয়ে সামনে অগ্রসর হতেই লীলাবতীর সাথে দেখা । সে তার বান্ধবীদের সাথে ফুল দিতে এসেছিল । লীলাবতী হলো শীলাদেবীর ছোট বোন । লীলাবতী একটা গোলাপ কিনে দেয়ার জন্য আমার কাছে বায়না ধরলো । শীলাদেবীর মুখের দিকে বাঁকা চোখে দেখে নিয়ে বললাম----, ফুল শুকিয়ে যাবে । নষ্ট হবে । তার চেয়ে ঐ টাকাটা তোর মোবাইলে লোড দিয়ে দিব । এতে টাকাটা নষ্ট হবে না । কেউ না কেউ সুফল পাবে । লীলাবতী মুখ ভেংচিয়ে বলেছিল--" ছোটলোক "--, কোথাকার ?

শীলাদেবীর সাথে আমরা সামনের দিকে চলতে লাগলাম । সবাই কম-বেশী কিছু না কিছু উপহার দিল । বেশীর ভাগই ফুল দিল । আমি তাকে একটি ফুলের গাছ দিতে চাইলাম । সে কিছুটা ধমকের সুরে বললো---, সব কিছুকে অহেতুক প্রতিযোগিতার হালকা পথে চলতে দেয়া ঠিক নয় । তোমার সাথে আমার সর্ম্পক কি ফুল আর গাছের বাঁধনের সাথে সর্ম্পকিত ? সাধনার পথে বার বার দেখা হবে--- নোতুন ভাবে । সেই উপলব্ধিগত অবস্থার চেয়ে আনন্দদায়ক উপহার আর কি হতে পারে ?
আমি কথা আর বাড়ালাম না । তার সাথে চলতে থাকলাম মিথ্যা-মহলের দিকে । যেখানে গুরুমাতা সাধনার অনেক সবক দিবেন ।

যেতে যেতে দেখি এক অবাক কান্ড । এক নেতা একুশের ফুল কেনার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে খুব চেচামেচি শুরু করে দিয়েছে । ছেলে-মেয়ে গুলো বিরুক্তিসহ শুনছে । এরুপ অবস্থা দেখে এক গ্রাম্য মহিলা হুংকার দিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলোঃ----,

" কি বাহে------/ কি হইছে---? আরে শুন কেনে বাহে---? লাল-লাল , ঢুলু-ঢুলু চোখ । অভ্যাস নাই তা ,---- রাইতোত কেনে , দিনোত তো ফুল দিবার পারনেন হয় । থাউক ঐগুলা কথা ।
ফুল তো দিনেন,---- তা লাভ কার হইল ? তোমার ? না, যামার জন্যে দেনেন , তামার ? মুই জানো ! তোমরা কবার পাবার নান । কেনেনা লাভ-লোখসানের আসল হিসাব তো আর স্কুল , কলেজ আর কোচিং সেন্টারোত শিখায় না ।

আচ্ছা বাহে কন তো । ভাষা আন্দোলন হইছে সেই ১৯৫২ সালে । আইজ প্রায় আধখান শতাব্দী যায় যায় অবস্থা । তাও কেনে এই দেশটার বেশীর ভাগ মানুষ ফুল দিবার পারে না ? যত শহীদ মিনার---, খালি শহরোত চোখে পরে । কই ---, গ্রামোত তো মাইলের পর মাইল হাটলেও শহীদ মিনার পাওয়া যায় না । তা হইলে গ্রামের মানুষগুলা যদি শহীদ মিনারোত ফুল দিবার আশা করে । তাহলে ওমার আশা পূরন হইতে আরো কয়খান শতাব্দী নাগবে ?

আচ্ছা বাহে---,। শহীদ মিনারোত ফুল দিবার জন্যে বছরে বছরে লোক বাড়তে আছে । এই মানুষগুলা যদি বছরে বছরে একটা-দুইটা করি শুদ্ধ বাংলা শিখিল হয়---, তা হইলে তো এতদিনে মেলা মানুষ মেলা শুদ্ধ বাংলা শিখবার পাইলে হয় ।

আচ্ছা বাহে---, । হামার ছাওয়াগুলা তো ফুল দেওয়া-নেওয়ার জন্যে রক্ত দেয় নাই । ওমরা রক্ত দেছে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করবার জন্যে । তা হইলে হামরা কেনে খালি ফুল , মিছিল আর নাচ-গান নিয়া পরি আছি ? মাতৃভাষর মর্যাদা রক্ষা করবার জন্যে হামার চেষ্টা নাই কেনে ? হামরা শুদ্ধ বাংলা শিখবার চাই না কেনে ? শুদ্ধ বাংলা কইতে , লিখতে হামার এত অনিহা কেনে ? কেন----, শুদ্ধ বাংলা কইতে কি সবাকে শরম নাগে ?
কি বাহে----, কতায় কইস না যে । তোর হইল কী , ী, ী, ী,----- ??? অসম শালা । অসম শালা ।।

[ = আগের লেখাগুলো পড়া থাকলে এটি বুঝা অনেক সহজ হবে । = ]