শুক্লা দ্বাদশীর শীতরাত তবে গত ক‘দিনের তুলনায় আজ কিছু কম শীত বিরাজ করে আমাদের চরাচরে কুয়াশা আর চাঁদের আলোর রং এক। যেখানে ঘুমত সে আজ এ গা সওয়া শীত রাতে সেখানে ঘুমবে না গেছে চলে অন্য খানে কিন্তু এ শীতরাত - জোসনা কুয়াশার মাখামাখি আর তারই জানালার পাশে সরিষা ক্ষেতের ভরা যৌবনকাল কেঁদে কেঁদে তাকেই ডেকে ফেরে। হয়তোবা রাত জাগা পাখি হাঁকে শিয়ালও ছোটে মুরগির খোঁজে কুকুর ছানাটা সজাগ হয় শুধু তাকেই যায়না পাওয়া যে চলে গেছে গতরাতে গোলাপের ভালবাসা নিয়ে।
কোথায় সে তাজা ফুলগুলো ? হাতের আঙুলগুলো আজ কাকে জড়িয়ে ধরে ? সরিষা ক্ষেত ছেড়ে মাঠে এলে জোসনা-কুয়াশা এখানেও ঘিরে ধরে কোলাহল শূন্য সে মাঠখানা গলা ছেড়ে হাঁকছে - ‘কোথা তুমি হে !!’

বিরহের ২য় দিনের কাহন
সন্ধ্যার সময় কারেন্ট গেলে বাড়ি ফিরে তোমার আর দেখা পাওয়া যাবে না ; তাহলে কি করব তখন ? বাজার আমার ভাল লাগে না কখনো, তাই তো শহর ছেড়ে গ্রামে এসেছি কাজ নিয়ে। পুব আকাশ জুড়ে চাঁদ উঠেছে ডগমগে -চকের (শীতের ফসলী মাঠ) ভিতর হাঁটতে গেলে কেমন হয়, আর তোমাকে যদি পাওয়া যায় সেলে ? আজও কনকনে শীত। রাতে এ বাড়িতেই থাকা লাগবে। চাঁদের আলোয় হালকা কুয়াশা - সাদার ভেতরে সাদার মিশ্রণ, অপূর্ব রং ধরেছে সময়টা। যদি তুমি থাকতে, তোমাকে সাথে নিতাম হাঁটতে (বোধ হয় না তা কখনো বাস্তব হবে)। তবু আমি কল্পনা করলাম - সন্ধ্যা রাতের এ চাঁদের আলোয় সরিষা ফুল ভরে আছে চকের ভেতরে - কোনো মানুষের আনা-গোণা নেই যে পথে এখন সে পথে তুমি হাঁটছো আমার পাশে। এ কল্পনা বেশ মধুর লাগে। যেহেতু উপায় নেই, ব্যাগটা রেখে তাই একাই বেরিয়ে পড়ি সে পথে। অনুভূতিগুলো শেয়ার করতে তোমাকে কানেকশন নিতে চাই কিন্তু ও প্রান্ত থেকে নো এ্যানসার আসে। হয়তো ফোনের ধারে নেই; অন্য কেউ কি মনে করবে সে ভয়ে আর চেষ্টা করি না কানেকশন নিতে। আপন মনে গুনগুন করতে থাকি আর হাঁটি। ঘাস বিছানো পথ এখনো কুয়াশায় ভেজেনি, রাবারের কেডস পরে নিজের পায়ের আওয়াজটিও পাওয়া যায় না। দূরে চক পার হয়ে হাইওয়ে, সেখান দিয়ে গাড়ি চলার শব্দটাই শুধু কানে আসে ; তাছাড়া আর সব শান্ত নিঃস্তব্ধ। দুপাশে প্রায় কোমর ছোঁয়া সরিষা ফুলের সমাবেশ তার মাঝ দিয়ে পথ। যেতে যেতে দেখি, সরিষা ফুলের আল আর তার ভেতরে গম ক্ষেত।এ পথে গরমের দিন হলে মানুষের আনা-গোনা থাকত এ সময়টাতেও; কিন্তু শীতের দিন হওয়ায় পুরো চকটার মধ্যে কোনো মানুষের চিহ্ন মাত্র অনুভব করা যায় না। কোনোরকম মানুষের সংস্পর্শহীন এমন নিরিবিলি পরিবেশই আমি চাচ্ছিলাম খুব মনে মনে। তোমার সাথে সময় দেওয়ার - তোমার ভেতর ডুবে যাওয়ার এই উপযুক্ত পরিবেশ। আমার সমস্ত আস্তিত্ব জুড়ে আমি অনুভব করছি তোমাকে আর নানান কথা, সূর আওড়াচ্ছি শব্দ করে করে। সে তোমাকে অনুভবের স্ফূট অস্ফুট কথা, সুরগুলোর কিছু তোমাকে শুনাতে পারছি না বলে খুব আফসোস হতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে একবারে চলে গেলাম চকের ও প্রান্তে একেবারে রাস্তার পাশে। শুকনো খালটা পার হলেই পিচঢালা মহা সড়ক তো নয় যেন নদী, যার গাড়ির সেৄাতে নিজেকে গলিয়ে দিলে হয়ত ঘন্টা খানেকের মধ্যে পৌঁছানো যাবে - যা আমি এই মুহূর্তে চাই - তোমার শরীর অস্তিত্ব - যার অভাবে সে অভাব পুরণ করতে আমি এসেছি এই চকের ভেতরে তার কাছে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু এখনো অতোটা জ্ঞানশূন্য হয়নি বলে -আর মানুষের চেতন চোখ এড়াতে পারব না বলে- দিতে পারব না কাউকে ঝিলিকের মতো জবাব তাই সে চেষ্টা থেকে বিরত হয়ে আবার পিছন ফিরে হাঁটতে থাকি বাড়ির পথে। আচ্ছা এমন যদি হতো - তুমি আমার সাথে হেঁটে এসেছ এতোদূর এখন ফেরার পথে এটা যেহেতু মানুষ চলাচলের পথ কিন্তু কোনো মানুষের দেখা মেলেনি, আর মেলবেও না বোধ হচ্ছে। তাই আমি বললাম, ‘আচ্ছা আমরা এখন একটু অন্যভাবে হাঁটি’ তুমি বললে, ‘সেটা কিভাবে ? বললাম আমি, ‘তবে আমার হাত ধরো, যদি চাও তো ধরো গলা জড়িয়ে আর আমি হাত দিই তোমার বগলের তল দিয়ে পিঠের কাছ দিয়ে কাঁধে; এখন তুমি আমার দুপায়ের পাতার ওপর তোমার দুপা দাও (আমাদের তো পায়ে হয়েছিল পরিচয় শুরু) সেই তুমি তোমার পা দাও আমার পায়ের পাতার ওপরে অর্থাৎ সম্পূর্ণ তুমি ভর দাও আমার দুপায়ের ওপরে। এখন আমি পা তুললে তুমি তোলো আমি যাব সামনে, আর তুমি যাবে পিছনে পরস্পর মুখোমুখি হয়ে চলবো আমরা এখন বাড়ির দিকে। তবে একটা স্পর্শ এ চলায় এখনো বাকি আছে - তোমার অধর আমার ওষ্ঠ এখন মেশাতে হবে। তবেই এ আঙ্গিকে হাঁটাটা পূর্ণ হবে। সামনে পিছনে কোনো মানুষ আসছে কিনা তা আমরা দেখতে পাব আর যতক্ষণ না দেখতে পাব ততক্ষণ পথ চলবো এভাবে। বেশ দূরে মানুষের মতো কোনো ছায়া দেখা যায় - যেটা আমার সামনে, তোমার নয়। আমি সেটা দেখি কিন্তু বলি না তোমাকে ঠোটের অপূর্ব স্পর্শ থেকে বঞ্চিত করবে তাই র্ভেবে। এমন করে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় সে ছায়াটির কাছে আসি এবং দেখি সেটা মানুষ নয় একটা ছোট তাল গাছ। এ চকের ভেতরে অনেক তাল গাছ আছে। তে-মাথার উঁচু ঢিবিটার ওপর এসে দাঁড়ালে দেখি, তুমি নেই। পুব দিকের আকাশে ডাগর চাঁদখানা পূর্ণরুপে বিরাজ করে।এই জোসনা-আলো-কুয়াশা তালগাছ সরিষা ক্ষেত - এই সময় সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব সৃষ্টি - তাকে প্রশংসা করতে ইচ্ছে করে - ইচ্ছে করে আপন পরিজন-আত্মার আত্মজদের কথা ভাবতে কিন্তু সে-সব কেমন যেন অন্য ভাবনা এনে দেয়- অন্য চিšতা ঢুকতে চায়। আমি তো এখন সম্পূর্ণ তোমার মধ্যে - তোমার অতল সরবরে ডুব-সাঁতার কাটছি আর তুমিও.....। এখানে আমি অন্য কাউকে চাই না। আমার আনন্দই এখানে আমার একমাত্র অবলম্বন এখানে অন্য কারো প্রবেশাধিকার নেই।
এ পথ দিয়ে আমি এর আগে অনেকবার হেঁটেছি - এ রকম সময়েও হয়তো কিন্তু এমন আনন্দ পুলকের অনুভব আমার হয় নি - আজ এ পরিবেশে নতুন ভালবাসার সংস্পর্শে যা পেলাম তা একান্তই আমার হৃদয়ের স্ফূর্তির তরে। মানুষের জীবন - তার বেঁচে থাকার অর্থ পূর্ণতা পায় এমনই আনন্দ পুলকের মধ্যে অবস্থান পারলে।
তাই বলি ভালবাসা কখনো পাপ হয় না। যে যত ভালবাসতে পারে; সে জীবন ও জগৎকে ততই বুঝতে পারে, করতে পারে উপলব্ধি আনন্দকে -যে আনন্দের জন্যই খোদার এ বিশ্ব সংসার সৃষ্টি - যার জন্যে তিনি নিজেও আনন্দময় আছেন।

৩য় এবং উপসংহার
তুমি একদিন মোবাইল,এস,এম,এস-এর মাধ্যমে জানতে চেয়েছিলে - আমার ইত্যাকার কর্মকান্ড দ্বারা আমি ভালবাসা বুঝাতে চাই কি না ? আমি জানিয়েছিলাম, আমি ভালবাসা-টাসা বুঝি না, বুঝি ফিলিংস বা অনুভূতিকে। যে সম্পর্কে বা জানাজানিতে হৃদয়ে অশেষ মধুর অনুভূতি তৈরি হয় আমি তাকে বুঝি। জানিনা তুমি সেদিন আমার কথা বুঝেছিলে কিনা। আজকে সে কথার রেশ ধরে বলতে চাইঃ আমি আসলে চাচ্ছি একটা মধুর সম্পর্ক। প্রেমানুভূতিই তার মূল কিন্তু সেটা সাধারণ প্রেম সম্পর্কের মতো নয়। সাধারণ প্রেম - যেমন, অবিবাহিত যুবক যুবতীর প্রেমঃ তারা বা তাদের প্রেম একটা সাধারণ লক্ষ্যের দিকে এগোয়। সেটা হলো যে, তাদের প্রেম এক সময় পরিণত হবে বিয়েতে - এক সময় তারা করবে ঘর-সংসার - এক সাথে করবে বসবাস। স্বামী-স্ত্রীর প্রেম-ভালবাসা বলে একটা কথা আমাদের সমাজে শুনতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে যদি পারস্পারিক ভালবাসা না থাকে তাহলে তাদের একত্রে বাস করাই ঠিক না। এ রকম ন্যাকামো শোনা যায় যে, স্বামী স্ত্রী পরস্পর বলাবলি করছে - “আমি তোমাকে ভালবাসি, জান।” “না, সোনা তুমি আর এখন আমাকে আগের মতো ভালবাসো না!” ইত্যাদি। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে থাকে পারস্পারিক আস্থা, বোঝা-পোড়া, সংসার জীবনের রিয়ালিটি। সেখানে ভালবাসার যে, মৌল পুলক অনুভব তা কেমন করে হয় তা ঠিক আমার বোধগম্য নয়।
ভালবাসার যে মৌল পুলক অনুভব সেটা কিন্তু একটা গোপনীয়তার মধ্যে বেশি বেড়ে ওঠে। যেখানে সে গোপনীয়তা বজায় থাকে সেখানেই কিন্তু তার মাধুর্যতা বৃদ্ধি পায়। স্বামী স্ত্রী একে অপরকে ভালবাসবে এটা তো সবাই জানে ; তারা একসাথে এক বিছানায় ঘুমায় ঘুমাবে এটাও সবার জানা। সুতরাং এখানে কোনো কৌতুহল বা গোপনীয়তা নেই। আচ্ছা কল্পনা করা যাক - দু জোড়া সম্পর্কের কথা : এক জোড়ার প্রেম চলে গোপনে। অনেক কষ্ট চেষ্টা তদবির করে তাদেরকে সাক্ষাৎ করতে হয়। আর এভাবে যখন তারা একত্রে মিলিত হয় তখন তাদের মধ্যে অনুভূতির গাঢ়তা থাকবে নাকি অন্য জোড়া যাদের প্রেমের কথা আর দশ জানে, এবং তাদের মেলমেশায় কোনো বাঁধা আসে না তাদের অনুভূতি -প্রেমানুভূতির গাঢ়তা থাকবে ? সবাই প্রথম জোড়ার প্রতি এক বাক্যে সমর্থন জানাবে যে তা সহজে বোঝা যায়।
ভাবলাম আমি, এক অপূর্ব প্রেম সম্পর্ক আমাদের হতে পারেঃ আমরা আমাদের নিজেদের অবস্থানে যে যার মতো যেমন আছি তেমন থাকবো। কেউ আমরা ছাড়ব না আমাদের আপন আসন। স্বামী বা স্ত্রী আমরা যে যেমন আছি তেমনি থাকব। নতুন এ সম্পর্কে আমরা যে জড়িয়েছি তার উন্নয়ন আমরা চাইব না। অর্থাৎ এ-সব প্রেম সম্পর্কের যে পরিণতি -বিয়ে তা আমরা কখনো করতে চা‘ব না। তা আমাদের প্রয়োজনও নেই। আর থাকবে সবচেয়ে গোপন। সাধারণ প্রেমের ক্ষেত্রে দেখা যায়। গোপনীয়তার মধ্যেও তা কেউ না কেউ (ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা)জেনে যায়। কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা এমন হবে যে তা কেউ কখনো ক্ষণতরেও জানতে পারবে না - শব্দ ছাড়া ইশারায় কথা হবে সে হয়তো আমরা নিজেরাও জানব না। এত গোপন যেহেতু তাই তার অনুভূতির গাঢ়তা থাকবে সবচেয়ে প্রবল। যেহেতু অন্য বন্ধনে আবদ্ব তাই কেউ কারো কাছে জোর করে কিছু চাইতেও পারব না। যেহেতু কোনো পরিণতি আমরা চাই না তাই এ সম্পর্ক থাকবেও অটুট অনির্দিষ্ট কাল ধরে। শুধু এ অনুভূতির সাগরে ভাসার জন্য - অন্য কোনো কিছুর জন্য নয় । শুধু নিছক আনন্দের তরে হোক আমাদের সরব সংস্পর্শ। যে সংস্পর্শ সরব নিজেদের তো নয়ই, অন্য কোনো মানুষকেও ক্ষণতরে কষ্ট দেবে না। করতেও দেবে না আমাদেরকে কোনো অন্যায় অপকর্ম কখনো।