সংগ্রাম আমার মধ্যেও আছে। বাঁচার সংগ্রাম, ক্ষুধার সংগ্রাম, স্বাধীনতাকে খুব কাছ থেকে দেখার সংগ্রাম। তাকে খুঁজে পেয়েছি রাস্তার ফুটপাতে। না খেয়ে পড়ে আছে। বাংলা মা’কে দেখেছি পুড়ে যেতে, ধর্ষিত হতে। তবু সংগ্রামকে নিয়ে বেঁচে থাকতেই চাই। বাংলাদেশ অনেক তো হারিয়েছে, আর কত হারালে সোনার বাংলা মা’কে দেখা যাবে? তবু এটুকুই সান্তনা তারই রক্তে গড়া সংগ্রাম কে কাছে টেনে নেয়া, আপন করে নেয়া। সুন্দর ‘বাংলাদেশ’ নামক মাকে উপহার দেয়া। তাই তো বাংলা মায়ে’র আজকের সংগ্রাম আমার, আমাদের সকলের। তাকে যত্ন করতে হবে। আর যেন বাংলা মাকে ধর্ষিত হতে না হয়, ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাঁদতে না হয়, ভিক্ষে করতে না হয়। যদি তাই হয় তবে তো আমি আপনি কেউ ‘বাংলাদেশ’ নামক মায়ে’র অভিশম্পাত থেকে মুক্ত হবো না। আর স্বাধীনতার স্বাদও পাবো না।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৪টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - বাংলাদেশ (ডিসেম্বর ২০১৯)

আজকের সংগ্রাম
বাংলাদেশ

সংখ্যা

nani das

comment ০  favorite ০  import_contacts ১১
এক চটকানা দিমু, হালার বেডা, তরে না কইছি খাইয়া এহন ঘুমা, তর পুলিশ বাপে আইলে এইহানে ঘুমাইবার দিবো না। লাইথ্থাইয়া খেদাইবো। তাইলে তুই এহন মাসি পিসির গানহান গা, হেলে ঘুম পাইবো। হারাদিন রাইত ঘুমাইতে পারুম । একজন মায়ের বুইন, আরেক জন বাপের বুইন। আইচ্ছা! হেরা কি হুদাই ঘুম পাড়ায় ? হেরা কিন্তু খারাপ কাম করে না, নাকি কস ? তুই যেমন ঢং কইরা, কাইন্দা, মায়ার নাহান মুখহান কইরা মাইনসেরতন হাত পাতো হেরা কিন্তু হেমন না । জন্মের পরতোন কাপড় মুড়ি দিয়া হুইয়া থাহি, মাইনসে পয়সা ফিক্কা মারে, তর হাতে দেয়, ক্যান তুই কাম করতে পারো না ? কই আমারে ঘুম পারানোর গানতো তর গাইতেই হয় না।

লাশের লালসায় আঁধার জাগে
জিবন্ত মানুষের ক্ষতে বৈশাখী ঝড়ে
দিনে-দুপুরে নিশাচরের আনাগোনা,
দূর্বৃত্তের হাতে আলোর মশাল।

শেষ কথা-
‘রক্ত দাও,নইলে মানচিত্র খাবো’
লাশের বুকে দামি বুটের ছাপ।
আঘাতে আঘাতে নর হাঁড়ের প্রাসাদে-
ধর্ষিতার বুকে লাল-সবুজের অবক্ষয়।

কোন বারন নেই, তুমি তো স্বাধীন,
লাল দালানে হাজার বিচার ঝুলে আছে।
তুমি দিনের বেলা ভিক্ষে করো
আঁধার হলেই সুরা ধরো,
সুর-সুরায় রাত্রমাখা
স্বাধীনতা তুমি বড্ড একচোখা।

বেশি রাইতে আবার চুপ মাইরা পার্কে লইয়া যাও, ভালো মন্দ খাওয়াও তারপর আমি নিজেই ঘুমাইয়া পড়ি, তহন কি আর ঘুম পায় ? হারাডা দিন তো ঘুমাছি । আইচ্ছা প্রতিদিন সকালে কি খাওয়াছ; যে আবার ঘুমাইয়া পরি ? কই তুই তো ঘুমাছ না । মা! ওমা ! তুই কি জানস আমার বাপ কেডা ?

মায়ের দেহের অনেক অংশ পুড়ে গেছে; আমি তার পোশাক দেখেই চিনেছে ; গত মাসেই সদরঘাট এলাকায় জজকোর্টের সামনের গেটে এদের দেখেছি, মনে আছে খুচরো পাঁচটা টাকাও দিয়েছিলাম। পার্ট টাইম জব নিয়েছি একটা সাপ্তাহিক পত্রিকাতে। ক্রাইম রির্পোটার। বেশি বেতন না, তবু কিছুটাতো সংসারের চেহারা ফেরাতে পারবো । ক্রাইমের উপর বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করতে ওখানে যাওয়া। ওখানে নাকি বড় বড় সন্ত্রাসীদের দেখতে পাওয়া যায় । যদিও হাতকড়া পরিহিত থাকে, চোখগুলো বড় বড় আর লাল, । সবাই সেখানে অপরাধি না, আবার সবাই সাধুও না।
একমাস আগে বাহদুর শাহ্ পার্ক বেলা দেড়টা, আমি রুটি কলা খেয়ে ওখানেই বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। ক্যামেরাটা একহাতে, আরেক হাতে বেনসন রেগুলার। ইস ! কি নির্মম ! বাচ্চাটার বয়স হয়তো সাত/আট হবে। বাহাদুর শাহ্ পার্কে ওরা একপলিথিন আইঠা আর বাসি বিরিয়ানি মজা করে খাচ্ছিল । এখনও চোখের সামনে সেই দৃশ্য জ্বল জ্বল করে…..

অবেলায় ভিক্ষুকের আবেদন
‘ভাত খাবো, ভাত দে’;
চৈতালি মুখর আলসে বেলায়-
কাকেদের সেকি নিবেদন!
হাভাতে কুকুর জিব লকায়।

তুই রাইতের কালে এত হাজস ক্যান ? আমারে ঘুমাইতে কইয়া তুই কই যাস?
এমন হাজারও প্রশ্নের জবাব ছেলেটির মা দিতে পারে নি।
বাপজান একক্ষান গল্প কই হোন তাইলে
হয় হেডাই কও, শুনি…..
এক গ্রামে একটা সুন্দরি মাইয়া ছিল, বয়স আর কত; পনের-ষোল হইবো। হে ঢাহা শহরে আইছে, কামের ধান্দায়।

হেরপর কি ?
হেরপর আবার কি, বড়লোকের বাসায় কাম নিলো, বড় বাড়ি, বাড়িয়ালা বেডায় ভালোই আসিল, কিন্তু হের যে, ছোড ব্যাডা, হালায় একটা শয়তানের বাসা।
কেন মা? হালায় কি করছে ?
সুন্দরী মাইডারে একদিন খাইল্লা বাসা পাইয়া; উু …….উু……..উু..
এ মা কান্দস ক্যান, এইডা তো গল্প, তয় তুই কান্দস কেন? নাকি আবার মায়া শুরু করলি? গল্পডা কনা হুনি, ভালোই তো,
মাইডারে হালায় ছিইড়া খাইলো, হালায় মানুষ খোড়, কুত্তা।
কও কি? মানুষের মাংস মানুষে খায়!
খায়রে খায়, ওরা হামগো নাহান আইঠা খাবার খায় না। ওরা তাজা মানুষ খায়।
এ মা ওরা কি রাক্ষস নাকি ?
হয় রে বাপ ওরা রাক্ষস। মাইয়াডারে বড়লোক শালা কামড়াই কামড়াই খাইছিল। কি রক্ত ! কি রক্ত ! দৌড়াইয়া কোন রহমে পলাইছে, দোহানে গিয়া কাইন্দা কাইন্দা কইলো-
ভাই হামাক এক্কান ফোন করতে দেবেন?
দোহানদারের মোবাইল দিয়া হ্যাছে ফোন দিয়া কইলো-
“ মারে হামাক ঢাকাত তোন লিয়ে যা, মা”
হেরপর কি মাইডারে নিছে ?
আরে না, কেউ আসে নাই। হেইডা তো মাইডার সৎ মা, বাহে তো কবেই মরছে।
মাইয়াডারে আর কেউ নিতে আসে নাই।
মাইয়াডা এহন কোতায়; মা ?

আমি ততক্ষণ মহিলাটির গল্পটা শুনলাম, তবে ছেলের উত্তর মা আর দিতে পারে নি। ছেলেটি অনেকক্ষন চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ছেলেটির মা তাকে সেই মেয়েটি কে, সেটি আর বলেনি।হয়তো নিজেরই জীবনের কষ্টের কথাগুলোই তার সন্তানকে বলেছে। কি করে বলবে? সেই ধর্ষিতা মেয়েটি আর কেউ নয় সে নিজেই।

আজ একমাস পর ছেলেটির মা চীর নিদ্রায়। বস্তির আগুনে পুড়ে মরেছে সে, অনেক লোকজনের ভীড়ে তার নিথর পোড়া দেহ পড়ে আছে। চেয়ে আছে আকাশের দিকে, দাঁতগুলো কেলিয়ে বিদ্রুপ হাসিতে তাকিয়ে আছে। অভিশম্পাতে অভিশম্পাতে ভরিয়ে দিচ্ছে সমগ্র বাংলাদেশকে, মাটি, মানুষকে। আমি নিজেও সেই অভিশাপ থেকে মুক্ত নই, কেউ মুক্ত নয়।

নিমতলী থেকে চুরি হাট্টা
কত হাজার স্বপ্ন লাশে-
চক্ষুগুলো বিদ্রুপ হাসে,
জীবিত লাশ ব্যস্ত শহরে
কার কি-বা যায় আশে
চায়ের কাপে গরম ধোঁয়াতে-
মানুষ পোড়া ঘ্রাণ ভাসে।
কোনটা কুয়াশা নতুবা কু-আশা
আশার জটে শুধু ধুয়াশা ।

পাশে বসে ছেলেটি কি যেন খুঁজেছে, আমি আস্তে করে তার কাছে গিয়ে বললাম –
এটা কি তোমার মা ?
হয়; আপনে কেডা?
আমি রণ ;
তোমার নাম কি ?
নাম নাই; রণ মানেকি ?
রণ মানে যুদ্ধ; তোমারও একটা নাম দিতে হবে, তোমার নাম দিলাম “সংগ্রাম”।
হেডার মানে কি ?
এখন বুঝবে না, পড়ে বুঝবে।
আমি যদি তোমাকে আমার সাথে নিয়ে যাই, তুমি কি যাবে ?
আমি তো ভালো্ই আছি, মা নাই তাইলে কি ? রাস্তায় ঘুমাইয়া নিজে নিজে ভিক্ষা করুম।
আমি আপনার লগে যামু না;
আমি তো তোমাকে সুন্দর পোশাক দেবো, স্বাধীনতাও দেবো, দেবো সুন্দর দেশ। ভালো ভালো খাবার খেতে দেবো। পড়াশুনা করাবো । ভালো থাকবে, চলো….
সংগ্রাম মুক্ত মনে হাসলো।
সেদিনের মতো আজকের সংগ্রামকে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement