শহুরে নাগরিকদের কাছে নবান্নের আবেদন এখনও কমেনি। অন্তত শিকড় যার এই বাংলার মাটিতে। মাটি থেকে অনেক দূরে চলে যাওয়ার আগে হয়ত শেষ নবান্নের সময় অনুভূতি নিয়ে এই গল্প।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ মে ১৯৮৫
গল্প/কবিতা: ২০টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - নবান্ন (অক্টোবর ২০১৯)

কার্তিকের নবান্নের দেশে
নবান্ন

সংখ্যা

আহাদ আদনান

comment ১  favorite ০  import_contacts ৪৫
আমাকে তখন নিশিতে পেয়েছে। অগ্রহায়ণের রাতটা কেমন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে। এটা ঢাকা নয়, এটা তপ্ত কোন শহর নয়। আমি এখন উত্তরের একটা গ্রামে। হেমন্ত এখনও এখানে বাংলার সেই দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।
বছরের এই সময়টায় সূর্য ক্লান্ত হতে থাকে। কমতে থাকে তেজ। আর আমরা যারা নাগরিক ‘ঘানি টানি’, ইচ্ছে করে গ্রামে যেতে, শিকড়ে ফিরে যেতে, উৎসব করতে, নবান্ন উৎসব পালন করতে।
কিন্তু আজ কি আমি উৎসব করতে এসেছি? ঢাকায় আমার ঘরে কয়েকটা সুটকেস বেঁধে রেখে এসেছি। আলমারিতে সুইডেনের ভিসা। ইউরোপের বড় একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তির কাগজপত্র। অনেকদিন হয়ত আর মাটির দেখাই পাবনা। মাটির সন্তান মাটির ঘ্রাণ না পেলে বাঁচবে কী করে?
গ্রামের বাড়িতে একটা চাপা উৎসব উৎসব ভাব জাঁকিয়ে বসেছে। উৎসব আমি না আসলেও হত। এখন কার্তিক, গ্রামে গ্রামে উৎসবের মৌসুম। মাঠে মাঠে হলুদ আগুন। কাস্তে দিয়ে ধান কাটার দিন এখন নেই। ধান মাড়ানোর পদ্ধতিও পাল্টে গেছে। ছোটবেলার সেই হেমন্তের জটলার কথা মনে পড়ে খুব। ধান মাড়ানোর জন্য লোকজন জড়ো হত উঠানে। কাঠের একটা চেয়ারে বসে দাদু করতেন দর কষাকষি। ‘না না, রোজে হবে না, চুক্তিতে কাজ করতে হবে মিয়া’। তখন বুঝতাম না, ওই লোকগুলো আসত কারণ ওদের নিজেদের জমি ছিল না। তবু ওদের ঘরেও ‘নবান্ন’ আসত। এই উৎসবের অধিকার বাঙালি মাত্রের জন্মগত। আজ আবার ডিজেলে চলা মাড়াই করার যন্ত্র গুলো দেখে বুকটায় একটা যন্ত্রণা হল।
সেই দিনগুলোতে রাতে দাদুর সাথে যেতাম টঙে। খেতের পাশে ছিল বাঁশের খুঁটির উপর বানানো এসব টঙ। সুপারি আর নারকেলের পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে কামড়ে দিত হেমন্তের রাতের ঠাণ্ডা বাতাস। দাদু তখন হুঁকায় টান দিতেন। কাজের ছেলেটা নিয়ে আসত মুড়ি, নারকেল, খেজুরের গুড়। ‘নবান্ন’ নামের উৎসবটার আগে এরকম একটার পর একটা ‘চাঁদরাত’ নামত ছোট গ্রামটায়।

সেদ্ধ ধানের একটা গন্ধ আছে। বড় বড় মাটির পাতিল যখন মাটির উনুনে জ্বলত, নাকে ভেসে আসত স্বর্গের সুবাস। রাতগুলো তখন দিনের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল। আমাদের ঘুম কোথায় উধাও। আকাশে তারার মিছিল, মেঘ আর কুয়াশার সাথে যুদ্ধ করছে। বাতাসে সুরের মূর্ছনা। বাঁশঝাড়ে সরসর শব্দ। জঙ্গলের পোকাদের ঝিনঝিন জিকির। ঝাউগাছের হাওয়ায় ঝিমিয়ে দোল। পেঁচা, খাটাশ, শেয়াল, কুকুর, বাগডাসার মিলিত কোরাস। দূরে দেখা যাও কোথাও আলো, পাটশলার মশালের আগুনের আলো। আমাকে তখন নিশিতে পেয়ে যায়। আমি হয়ত উঠোনের জটলায় বসে পুঁথিপাঠ শুনছি, নাকি একতারার টোকায় ঠকঠক করছি, নইলে গরম সেদ্ধ ধান হাতে নিয়ে কামড় বসাচ্ছি।
আজ আবার নিশি নেমেছে গ্রামে। শহরের যান্ত্রিকতার অত্যাচারে নাক, কান, চোখে তালা লেগেছে। হেমন্তের এই রাতে ধানক্ষেত ছুঁয়ে আসা বাতাস একটা করে তালা খুলছে। আমি মুক্ত হচ্ছি। চলে যাচ্ছি শৈশবে। চিরদিনের হেমন্তের নবান্নের আমন্ত্রণে আমি বারবার ছুটে আসি।
এক সময় রাত শেষ হয়। ভোর আসে। আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। ভোরের কাকেরা হেমন্তের কুয়াশায় অবগাহন করে। দাদু আর দাদীর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমার চোখে জল জমে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। দাদুকে ছাড়া আমি কোনদিন নবান্নের কথা ভাবতে পারিনি। শহরের প্রতিটা দিন আমি যখন মাটির মানুষ থেকে প্লাস্টিকের যন্ত্র হওয়ার দীক্ষা নিচ্ছিলাম, তখনও নবান্ন আসত আমাকে ছাড়াই। আমাকে ছাড়াই আসবে সামনের বছরগুলোতে।
এই কি আমার শেষ নবান্ন, শেষ কার্তিক, শেষ মাটির ঘ্রাণ? যেদিন গ্রাম ছেড়ে শহরের বাড়িতে পা বাড়িয়েছিলাম, দাদু কানে কানে বলেছিলেন কিছু কথা।
এই বাংলার মাটিতে আসতেই হবেরে দাদু। কালবৈশাখী ঝড়ে আসতে হয়, থৈ থৈ বর্ষায় আসতে হয়, মাঘের দিনে আসতে হয়, বসন্তে আসতে হয়। এই কার্তিকের নবান্নের দেশে আমাদের আবার ফিরতে হয়।
বারবার ফিরতে হয়।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • আশা
    আশা আপনার লেখায় অন্যরকম একটা ফিল হয়। জাত লেখকদের লেখার মত। শুভকামনা।
    প্রত্যুত্তর . ১২ অক্টোবর

advertisement