নবান্ন উৎসবকে ঘিরে গল্পটি নিজের মত এগিয়েছে...
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১১ নভেম্বর ১৯৯১
গল্প/কবিতা: ১২টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - নবান্ন (অক্টোবর ২০১৯)

দিন যার শিশিরের সুতোয় বোনা
নবান্ন

সংখ্যা

আশা

comment ১  favorite ০  import_contacts ৬৩
প্রায় মাসখানেক জ্বরে ভোগার পর আজ শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে। কারো সহায়তা ছাড়াই ঠিক আগের মত ছুটতে ছুটতে সিড়ির সবগুলো ধাপ টপকে ছাদে চলে এলাম। ছাদে ওঠার পর টের পেলাম একটু একটু মাথা ঘুরছে। তারমানে জ্বরের শেষ ধাক্কাটা এখনো শরীরের কোন এক কোণে রয়ে গেছে।
মধ্যদুপুর হলেও রোদের তেজ প্রায় নেই। উপরন্তু একটা হিম হিম বাতাস হঠাৎ এসে ঝাপটা মারছে শরীরে। শীত কি চলে এলো? অনেক দিন পর আজ সরাসরি রোদ গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে আছি। একটা আশ্চর্য নরম উষ্ণতায় মনটা ফুরফুরে হয়ে গেলো।

ছাদ থেকেই দেখতে পেলাম মেজমামার প্রকান্ড মাইক্রোবাসটা বন্ধ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে হর্ন দিচ্ছে। আমি রেলিং আকড়ে ধরে গলা বাড়িয়ে ড্রাইভারকে দেখার চেষ্টা করলাম। মামা নাকি অন্যকেউ? তিনতলার ছাদ থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা। তবুও ঝুকে রইলাম। দারোয়ান চাচা এসে গেট খুলে দিলেন।
গাড়ি ভিতরে না ঢুকিয়ে গাড়ির দরজা খুলে সায়ন ভাই বেরিয়ে এলো। মেজমামার যমজ ছেলেদের একজন। যার সাথে আমার বিয়ে ঠিক সে। এই কাক ঘুমানো দুপুরে সায়ন ভাই এখানে কেন?
আসার কারন যাই হোক, সায়ন ভাইকে দেখে এক দৌড়ে নীচে নেমে এলাম। এই কুচকানো আটপৌরে জামা পরে ওনার সামনে যাওয়ার মানে হয়না।
নিজের ঘরে গিয়ে গোলাপী সিল্কের উপর বেগুনি কাজের একটা সালওয়ার কামিজ পড়ে নিলাম তড়িঘড়ি। মুখে একটু প্রসাধনী ব্যাবহার করে আলতো হাতে চুলগুলো কপালের দুপাশে ঝুলিয়ে দিলাম। চুলের ভারী ডগা গুলো কোমরের সামনে পেছনে মালঞ্চ লতার মত হেলছে দুলছে। অনেকদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি এভাবে চুল আঁচড়ালে আমাকে সবচেয়ে আকর্ষণীয়া লাগে। চোখ ফেরাতে মানুষকে দুবার ভাবতে হয়।

মুখে একটা লাজুক হাসি এনে বসার ঘরে গেলাম। সায়ন ভাই ওখানে বসে আছেন। আগে এ বাড়িতে এলে হুটহাট যার তার ঘরে ঢুকে গল্প জুড়ে দিতেন। কিন্তু এখন সে এ বাড়ির একমাত্র জামাই হতে চলেছে। মনে হচ্ছে এখন থেকেই বেশ একটা ভারিক্কি ভাব আনার চেষ্টা করছেন নিজের চালচলনে।
সায়ন ভাই মুখ গম্ভীর করে মেঝেতে রাখা বেলজিয়াম কাটের ফুলদানীটা মনযোগ দিয়ে দেখছিলেন।
আমাকে ঢুকতে দেখে উজ্জ্বল হাসি হেসে এগিয়ে এলেন। আমিও চেষ্টাকৃত স্নিগ্ধ লাজুক হাসিটা ঠোটের কোণে ঝুলিয়ে রেখে মায়ের পাশে ভালমানুষের মত সোফায় জড়সড় হয়ে বসলাম। সায়ন ভাই কি ভাবলেন জানিনা তবে তার পরিতৃপ্ত মুখ দেখে মনে হলো আমার এ লজ্জাটা বেশ উপভোগ করছেন।
সায়ন ভাইয়ের এখানে আসার কারন আমার অজানা হলেও মা'র নিশ্চয়ই জানা ছিলো। দেখলাম মা আর সায়ন ভাই সেভাবেই গল্প করছেন। দুজনের গল্পের টুকিটাকি অংশ জোড়া দিয়ে বুঝলাম সবাই মিলে কোথাও যাওয়ার প্লান করছে। কিন্তু কোথায়?
এতক্ষনে বোঝা গেল কোথায়। বাগেরহাটে। মানে আমার নানা বাড়ি। কিন্তু এ অসময়ে কেন? এখন তো সবার স্কুল কলেজ খোলা।
সায়ন ভাইয়ের সামনে আমি কথা বাড়ালাম না। সে এসেছে আমার যাওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করতে। সামনে আমার ছোটভাইয়ের এসএসসির টেস্ট পরীক্ষা। তাই মা যেতে পারছেননা। মেজ মামার নাকি খুব ইচ্ছে অন্তত আমি যেন তাদের সাথে যাই। ইচ্ছেটা যে মেজমামার না অন্যকারো সেটা অবশ্য আমি খুব ভাল করেই বুঝতে পারছি।
কিন্তু মুখে কুলুপ এঁটে বসে রইলাম। দেখাই যাক না কোথাকার জল কোথায় গড়ায়।

সচরাচর আমি মাকে ছাড়া কোথাও যাই না। বিশেষ করে নানা বাড়িতে তো নাই।
মায়ের জোরাজুরিতে রাজি হলাম ঠিকই তবু মনের ভেতর আঁটসাঁট লাগছে। সায়ন ভাই সংগে না থাকলে হয়তো খুশিমনে চলে যেতাম।
সায়ন ভাই আমার অতটা পছন্দের পাত্র না। আমার পছন্দের তালিকার সবার উপরে ছিল ভার্সিটির এক বড় ভাইয়ের নাম। তারপর অয়ন ভাই। তালিকার মাঝামাঝি দিকে ছিলো সায়ন ভাই। কিন্তু কথায় আছে না অতি চালাকের গলায় দড়ি। আমি এখন সেই দড়ি গলায় নিয়ে ঘুরছি। আজীবন দড়ি গলায় নিয়েই ঘুরতে হবে।

আমাদের যাত্রার আগের দিন ঠিক হলো আমরা ঢাকা থেকে প্লেনে করে প্রথমে যশোর যাবো। সেখানে বড় মামা আর ছোট মামার বাড়ি। যশোরে একদিন থেকে বড় মামা আর ছোট মামাদের নিয়ে সবাই মিলে সোজা বাগেরহাট চলে যাবো। সেজ মামা আর ছোট খালা নানা বাড়িতেই আছেন। মায়ের ভাইবোনদের মধ্যে একমাত্র মা এ যাত্রায় রয়ে গেলেন।
বিমানবন্দরে এসে মায়ের জন্য একটু মন কেমন করছিলো। তারউপর অয়ন ভাই মাঝেসাঝে যেমন জ্বলজ্বলে বুনো দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন তাতে ভয়ই লাগছে।
আমি মেজ মামির গা ঘেঁষে বসে আছি। শুধু অয়ন ভাইকে না,সায়ন ভাইকেও ভয় পাচ্ছি। মামার এই ছেলেদুটো ছোটবেলা থেকেই পাজির পা-ঝাড়া। তবে পড়াশুনায় অত্যন্ত ভালো হওয়াতে কেউ কখনো তাদের দিকে শাসনের আংগুল তোলেনি। একটা ঢিলেঢালা ভাব নিয়ে দুজনে বড় হয়েছেন। যখন তখন যার তার উপর শাসনের খড়গ ঝুলিয়ে দিতে এতটুকুও কার্পণ্য করতেন না। আমিও বাদ পড়িনি। আর এ ব্যাপারটাই আমার ভারী বিশ্রী লাগতো।
যেদিন দুই ভাইয়ের চোখেই সেই দৃষ্টি দেখি,মানে যে দৃষ্টি শুধু একটা মেয়ে একটা ছেলের চোখেই দেখে সেদিনই একটা দুর্দান্ত পরিকল্পনা মাথার ভেতর লাফিয়ে উঠেছিলো।
প্রেমের ফাঁদে ফেলে দুজনকেই আলাদা আলাদা ভাবে শায়েস্তা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা যে কত বড় ভুল ছিলো সেটা যখন বুঝতে পারলাম ততক্ষণে তীর ছোড়া হয়ে গেছে। এখন হাত পা কামড়ালেও ফলাফল একই থাকবে। তবুও আশা ছাড়িনি। শেষ আশার উপর ভরসা আছে আমার। দেখাই যাক না।

অয়ন ভাই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। চোখ দিয়েই হয়তো আমাকে ফাঁসি কাঠে ঝুলাতে চাইছেন। আমি মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে দেখেও না দেখার ভান করে রইলাম। কিন্তু কতক্ষণ!
মামি পাশের এক মহিলার সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছেন। আমি কিছুক্ষণ উশখুশ করে উঠে পড়লাম। প্লেন নাকি আধঘন্টা লেট। কিছুক্ষণ ওয়াশরুমে কাটিয়ে আসলে কেমন হয়?
ভয়ে ভয়ে আমি উঠে দাড়ালাম। অয়ন ভাই পেছন পেছন আসবেন নাকি? নাহ। এত ভয় পেলে চলবেনা। এলে কড়া কোন কথা শুনিয়ে দেব। কারন আমি এখন অন্য কারো বাগদত্তা। আর তাছাড়া অয়ন ভাইকে বিয়ে করতে পারছি না বলে আমার মনে তেমন কোন দুঃখ ও নেই।

প্লেনে উঠে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আমাকে সায়ন ভাইয়ের পাশে বসতে হয়েছে। তারমানে এই আধঘন্টার ভ্রমনে আমাকে নানান উপদেশ শুনতে হবে। সায়ন ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার। পেশা আর ঘরোয়া জীবন গুলিয়ে ফেলাই তার পক্ষে স্বাভাবিক। শুধু উপদেশ নাহয় শোনা যায় কিন্তু আচমকা হাত টাত ধরাটাই আমার সবথেকে অসহ্য লাগে। কিছু করার নেই। দড়ি গলায় দিয়েছি সাধ করে। এখন দড়ির টান তো সহ্য করতেই হবে।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। চারদিকে ভসমান জলশূন্য মেঘ ছাপিয়েও সূর্যের সপ্রতিভ বিচ্ছুরন চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। এখন অঘ্রহায়ন মাস। এ সময় বৃষ্টি হবার সম্ভাবনা তেমন নেই। হিমালয়ের মত ধবধবে সাদা মেঘ দেখে আমার বুকের মধ্যে বিদ্যুৎ চমকালো। আমি তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। সেই বিকেলের কথা মনে পড়ে হঠাৎ প্রচন্ড পানির পিপাসা পেল আমার।


প্রায় দুদিন দুই মামার বাড়ি বেড়িয়ে অবশেষে আমরা নানাবাড়িতে পৌছালাম। সায়ন ভাই সারা পথই আমার পাশে সেঁটে ছিলেন। অয়ন ভাই আর আমাকে নিয়ে তার মনে কিছুটা সংশয় আছে। সে আমাকে চোখের আড়াল করতে চাইছে না। আর আমাকে বোধহয় পুরোপুরি বিশ্বাস ও করতে পারছেনা। বেচারা!

নানাবাড়ি এসেও এমনভাবে আমাকে চোখে চোখে রাখা শুরু করলেন যে অল্পসময়ের ভেতরই সায়ন ভাই সবার হাসি ঠাট্টার পাত্র হয়ে গেলেন। খুব লজ্জা লাগছিলো আমার। মায়ের কথা শুনে কেন যে আসলাম!
আমরা আসার দিন থেকেই নানাবাড়িতে শুরু হয়ে গেলো উৎসব। এখানে এসে বুঝতে পারলাম কেন নানা এবার তার সব ছেলেমেয়েকে এক সাথে আসতে বলেছেন।
এ বছরের প্রথম ফসল উঠেছে বাড়িতে। নানাদের উঠান ভরা ধানে। বাড়িভর্তী মানুষ। চারদিকে উৎসবের আমেজ। তবু বাড়িটাকে ঘিরে এক অদ্ভুত বিষন্নতা ঘুরপাক খাচ্ছে। নানার বলা কথাগুলো দীর্ঘশ্বাসের মত কানে বাজছে।
নানা তার ছেলেমেয়েদের জানিয়ে দিয়েছেন এবারই শেষ। এরপর আর কখনো নতুন ফসল এ বাড়িতে উঠবেনা। নানা তার সমস্ত ফসলী জমি আগামী বছর থেকেই লিজ দিয়ে দেবেন। তাই শেষবারের সব আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে নবান্ন উৎসব পালন করতে চান।
আমার কাছে নানার জমিজমার কোন গুরুত্ব নেই। তবু কেন যেন মন খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে এটা নানার অভিমানী সিদ্ধান্ত। শেষ বয়সে এখনো একা একা সব আগলে বসে থাকতে হয় বলে ছেলেদের সাথে এই বুড়ো মানুষটা হয়ত নিঃশব্দে অভিমান করেছেন।

সন্ধ্যার পরে ছাদে আমরা কাজিনরা মিলে আড্ডা জমিয়েছি। মিশমিশে কালো আকাশ ঝিকিমিকি তারায় ছাওয়া। দু চারটা জোনাকি জ্বলছে নিভছে। একটু একটু করে হেমন্তের হাওয়া দিচ্ছে।
ছোট মামার মেয়ে মৌ রবীন্দ্র সংগীত খুব ভাল গায়। পরপর তিনটা গাওয়ার পরে আর সাধাসাধি করেও লাভ হলোনা। গলা ব্যাথার অযুহাত দিয়ে এড়িয়ে গেলো। অয়ন ভাইও একটা রবীন্দ্র সংগীত গাইলেন। এরপর সায়ন ভাই তার ভরাট গলায় কিটস এর বিখ্যাত কবিতা ' Ode to a Nightingale ' এর কিছু অংশ আবৃত্তি করলেন। কবিতা শেষ হলেও আমরা অনেকক্ষন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে রইলাম। শিউলি ফুলের মাতাল গন্ধের সাথে '.... And with thee fade away into the forest dim...' এই লাইনটা মিলেমিশে পরিবেশটাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

এরপর এল আমার পালা। আমি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলাম। ছোটবেলা প্রতিদিন গানের শিক্ষক এসে দুঘন্টা করে শিখিয়ে যেতেন। এখন খুব বেশি রেওয়াজ না করলেও গলায় সুর আছে।
গান শুরু করার আগে একবার চোরা চাহনিতে দেখে নিলাম অয়ন ভাইকে। তারপর চোখ বন্ধ করে বুকের উপর দুহাত আড়াআড়ি রেখে গাইতে শুরু করলাম অনুপম রায়ের গান 'আমাকে আমার মত থাকতে দাও,আমি নিজেকে নিজের মত গুছিয়ে নিয়েছি.....।'

গান শেষ করার আগেই আমার নাম ধরে কেউ ডাকলো। সাথে সাথে গান থামিয়ে নীচে নেমে এলাম। মা! মা এসেছে!
আচমকা মাকে দেখে আমার এত আনন্দ হচ্চিলো যে আমি বাচ্চা মেয়ের মত মাকে জড়িয়ে ধরলাম। এই দুই তিনদিন যে পরিমান মানসিক চাপে ছিলাম তা যেন এক মুহূর্তে হাওয়ায় উড়ে গেল।
মা এসে গেছে এই বোধটা আমাকে এতটা স্বস্তি দিলো যা বলার মত নয়। এখন আমি ফুরফুরে মনে খাই দাই ঘুমাই। অয়ন ভাইকে নিয়েও আপাতত কোন দুঃস্বপ্ন দেখছিনা।

আজ শুক্রবার। আজ নানা শেষবারের মত ভোজের আয়োজন করেছেন। নতুন চালের পিঠা,পোলাও,পায়েস প্রায় সমস্ত গ্রামবাসীকে খাওয়ানো হবে।
সকাল থেকেই বাড়ি ভরে গেল আত্মীয়ে অনাত্মীয়ে। একদিকে কয়েকজন মহিলা ঢেকিতে চাল গুড়ো করছিলো। সারা গ্রামে শুধু নানা বাড়িতেই এখনো ঢেকিতে চাল ভাংগা হয়। আমি মোবাইল হাতে নিয়ে এলোমেলো ঘুরছি। মাঝে মাঝে লতাপাতা কিংবা ধান,হাঁসের সাথে সেলফি তুলছি।
সায়ন ভাই আর অয়ন ভাইয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য রান্নাঘরের আশেপাশেই ঘোরাঘুরি করছি। চালের গুড়ো তৈরি হলে সবার সাথে পিঠা বানাতে বসে যাবো। পিঠার সাথে দু’চারটা সেলফি তুলে ফেইসবুকে দিতে পারলে দারুন হত! ক্যাপশন হবে 'নবান্ন ও আমি'। সেলফির তাপে আমার ভার্সিটির বন্ধুরা ঠিক জ্বলেপুড়ে যাবে নিশ্চিত।

সবসময় দেখেছি মা নানাবাড়ীতে এলে ঠিক যেন উচ্ছল এক কিশোরী মেয়েতে পরিনত হন। সারাক্ষণই মামিদের সাথে গুজগুজ,ফিসফাস আর তারপরেই হাসির ঝনঝনানি। কি একটা নিয়ে হাসি ঠাট্টা করতে করতেই প্রমান সাইজের শীতলপাটিতে বসে মা,খালা,মামিরা দুই রকমের পুলি আর হাতে কাটা সেমাই পিঠা বানাচ্ছেন। আমাকে হাত ধুয়ে আঁট ঘাট বেধে বসতে দেখে মা ধমকে উঠলেন। মায়ের ধারনা আমি এখনো ততটা সুস্থ হইনি।
কি আর করা! পিঠা বানাতে বানাতে সেলফি তুলতে পারলাম না বলে খানিকটা দুঃখ হলো। কিন্তু এ দুঃখ যে ছেঁড়া কাগজের মত উড়ে যাবে সেটাও বুঝতে পারছি। তাই একটা কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দুঃখ দুঃখ মুখ করে কয়েকটা সেলফি তুলে ফেললাম। কোন না কোন সময় সেলফি গুলো ঠিক কাজে দেবে।
এখন কাজিনদের হৈ-হল্লার খোঁজে না গিয়ে বরং মেজ মামার কাছে যাওয়া যায়। মেজ মামা বাড়ির পাশের এক বিলে সকাল থেকে মাছ ধরছেন। মাছ ধরা মামার এক অদ্ভুত নেশা। খাওয়া দাওয়া ভুলে ঘন্টার পর ঘন্টা বড়শি হাতে নিয়ে বসে থাকতে পারেন। ঢাকায় বসেও প্রায়ই ধানমন্ডি লেকে চলে যান মাছ ধরতে।

রোদ থেকে বাঁচতে ওড়নার আঁচল মাথায় তুলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। শীত গ্রামের প্রতিটা ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে রোদের প্রচন্ড আঁচ লাগছে।
মামার কাছে পৌছানোর আগেই পেছন থেকে অয়ন ভাইয়ের ডাক শুনতে পেলাম। আমি না দাঁড়িয়ে হাটার গতি আরো বাড়িয়ে দিলাম। না। একা একা অয়ন ভাইয়ের মুখোমুখি আমি হতে চাইনা।

অয়ন ভাইয়ের সাথে দূরত্ব বাড়াতে পারবো না বুঝে একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পড়লাম। তার চোখের দিকে না তাকিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নির্বিকার থাকার চেষ্টা করছি। কারন অয়ন ভাইয়ের চোখে আবারো সেই বুনো দৃষ্টি ফিরে এসেছে।












advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement