এ গল্পটি একজন পিতা ও তার কন্যার আটপৌরে জীবনকে কেন্দ্র করে লেখা।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১১ নভেম্বর ১৯৯১
গল্প/কবিতা: ৮টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - বাবারা এমনই হয় (জুন ২০১৯)

প্রতিশ্রুতি
বাবারা এমনই হয়

সংখ্যা

আবীর রায়হান

comment ২  favorite ০  import_contacts ৮২
আমজাদ মাষ্টার ঝোপঝাড়ের পেছনটায় দাঁড়িয়ে বাড়ির ভেতর উঁকিঝুঁকি মারছেন। তার মেয়ে অন্তরার ঘরের জানালা খোলা। কিন্তু অন্তরার দেখা নেই। কি করছে মেয়েটা? এতক্ষনে একবার ও জানালার সামনে আসেনি। কোন অসুখবিসুখ করেনি তো?
চৈত্র মাসের বৃষ্টি পোড়ানো রোদ মাথায় নিয়ে আমাজাদ মাষ্টার ঘামতে লাগলেন। অনেকক্ষন ধরে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে পায়ে ঝিঝি ধরে যাচ্ছে। আরো কতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতে হবে কে জানে।
আমজাদ মাষ্টার যখন ভাবছেন সরাসরি বাড়ির ভেতরে গিয়ে দেখবেন ঠিক তখনই অন্তরা খোলা জানালায় এসে দাড়ালো। পিতাকে দেখে হাত নাড়িয়ে কি একটা সংকেত দিলো।
আমাজাদ মাষ্টার দ্রুত পায়ে হেটে রাস্তার ধারে আম গাছের ছায়ার নীচে গিয়ে দাড়ালেন।

মধ্য দুপুরের এ সময়টায় অন্তরার মামাবাড়ির আনাচে কানাচে একটা অসতর্ক ঝিম ভাব থাকে। তাই পিতার সাথে দেখা করতে অন্তরা বরাবরই এ সময়টাকে বেছে নেয়।
অন্তরার সাত মামি এ সময় ঘরের পাকা মেঝেতে মাদুর পেতে শুয়ে থাকে। কেউ কেউ ঘুমায়। বাড়ির কাজের লোকজনও যে যার কাজে ব্যস্ত থাকে। মোটকথা অন্তরার খোঁজ নেয়ার মত লোক থাকেনা এ সময়। অন্তরার সাত মামার মধ্যে তিনজন বিদেশে থাকে। বাকি চারজনের বাজারের উপর বেশ কয়েকটা দোকান আছে। এসময়টাতে তারা যে যার দোকানে ব্যস্ত সময় পার করে। তিনটার আগে কেউ বাজার থেকে ফেরেনা।

কেউ দেখবেনা নিশ্চিত হওয়ার পরে অন্তরা সতর্কপায়ে ওর ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির পেছনদিকের বাগানে এসে একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে এক দৌড়ে বাড়ির বাউন্ডারি পার হয়ে রাস্তায় চলে আসে। তারপর হাপাঁতে হাঁপাতে পিতার সামনে গিয়ে দাড়ায়।
রাস্তার পাশেই বিরাট পুকুর। চৈত্রের প্রখর তাপেও পুকুরের পানি খুব একটা কমেনি। আমজাদ মাষ্টার মেয়েকে নিয়ে পুকুরের পাশে গাছের ছায়ায় বসে আছেন। এমন ভাবে দুজন বসেছেন যাতে রাস্তা থেকে দেখা না যায়।
আমজাদ মাষ্টার বাড়ি থেকে আনা টিফিন বাটিটা অন্তরার হাতে তুলে দিলেন।
বাটির ঢাকনা খুলে দেখেই অন্তরার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। আমজাদ মাষ্টারের আরো দুটি মেয়ে আর দুটি ছেলে আছে। তবু তিনি এত লুকোছাপা করে হলেও অন্তরার কাছে না এসে থাকতে পারেন না।
মামার বাড়িতে অন্তরার খাওয়া পরার কোন কষ্ট তো নেইই বরং ও এখানে এক প্রকার রাজার হালে থাকে।
এমন রুটি আর মাংস অন্তরা চাইলে প্রতি বেলায় খেতে পারে। সেটা আমজাদ মাষ্টারেরও অজানা নয়। তবু প্রতিবার সেই চার পাঁচ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে, প্রচন্ড গরম কিংবা তীব্র শীতে শুধু মাত্র মেয়েকে দেখার জন্য আমজাদ মাষ্টার অন্তরার কাছে ছুটে আসেন।

আজ সকালে নিজের পাতে মুরগির মাংস আর রুটি দেখে আমজাদ মাষ্টারের চোখের সামনে মা মরা মেয়েটার চেহারা বারবার ভেসে উঠেছিলো। চালের আটার রুটি আর মুরগির মাংস খেতে অন্তরা খুব পছন্দ করে। তাই খাবারের থালা সরিয়ে রেখে তিনি উঠে পড়েছিলেন। গত একমাস অসুস্থতার জন্য অন্তরাকে দেখতে আসতে পারেননি। মনটা ক’দিন ধরেই ছটফট করছিলো।
তাই আজ হুট করেই সিদ্ধান্ত নিলেন এখানে আসার।

কাঁপা কাঁপা হাতে অন্তরা একটুকরো রুটি নিজের মুখে পুরে দেয়। যতবার ও পিতার সামনে আসে ততবার ওর বুকের ভেতর থেকে একটা দলা পাকানো কান্না উঠে আসে। প্রতিবার অন্তরা নিজেকে সামলিয়ে নেয় কিন্তু আজ কান্না আটকাতে গিয়ে ওর হেঁচকির মত উঠে গেলো।
আমজাদ মাষ্টার চোখের জল গোপন করে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। তিনি পিতা,একজন পিতার চোখ জলেভেজা মানায় না।
অন্তরার ইচ্ছে করে বাবার কম্পমান হাতটা জড়িয়ে ধরে বলে, “বাবা, তুমি এত ভাল কেন?”
কিন্তু ও কিছু না বলে মাথা নিচু করে রুটি নাড়াচাড়া করতে থাকে। দুই গাল চোখের পানিতে ভেসে যায়।

হঠাৎ জরুরি একটা কথা মনে পড়ে যাওয়াতে ওড়না দিয়ে চোখ মুছে অন্তরা ওর পিতার দিকে মুখ তুলে তাকায়। পিতার কাছে কথাটা বলতে ওর খানিকটা দ্বিধা কাজ করে। তবু অন্তরা সিদ্ধান্ত নেয় কথাটা বলবে। বলতেই হবে ওকে।
আমজাদ মাষ্টারও হয়তো মেয়ের মনের ভাব বুঝতে পারেন। তাই তিনি প্রত্যাশার দৃষ্টিতে অপেক্ষা করতে থাকেন।
সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে অন্তরা মৃদু স্বরে বলে, “বাবা,আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
আমজাদ মাষ্টার মুখে গরম তেলের ছিটে লাগার মত চমকে ওঠেন। তার মেয়ের বিয়ে অথচ তিনি জানেন না! এ বাড়ির কেউ তাকে একবার বলারও প্রয়োজন মনে করেননি?
নিজের প্রতি আমজাদ মাষ্টারের ভীষণ ধিক্কার জন্মে। হ্যা ঠিকই তো। তাকে এবাড়ির মানুষ জানাবেনই বা কেন? পিতা হিসেবে কখনো কি কোন দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন?
আসলে দায়িত্ব পালন করেননি কথাটা ভুল। কারন তাকে দায়িত্ব পালন করতে দেয়া হয়নি। মেয়ের কাছ থেকে বরাবরই তাকে আলাদা করে রাখা হয়েছে।

এ বাড়ির সবাই মিলে তার আর অন্তরার মাঝে একটা কাঠিন্যের দেয়াল তুলে দিয়েছে। সেই দেয়াল ভাংগার ক্ষমতা তার ছিলো না। কিন্তু অন্তরা সবার অলক্ষ্যে একদিন দেয়ালটাকে ভেংগে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে অন্তরা বুঝতে পেরেছে মায়ের মৃত্যুর জন্য ওর বাবা দায়ী নন। ছোটবেলা থেকে ওর মামারা যেটা ওকে শিখিয়েছে সেটা সম্পূর্ণ ভুল।
অন্তরার মা হাস্নাহেনা একদিন নিজ ইচ্ছায়ই গৃহ শিক্ষক আমজাদ মাষ্টারের হাত ধরে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন। সাত ভাইয়ের এক বোন হাস্নাহেনা এ বাড়ির বড় আদরের মেয়ে ছিলেন।
আর দশটা নামকরা পরিবারের মত অন্তরার মামার বাড়ির কেউই এ বিয়ে মেনে নিতে পারেননি। হাস্নাহেনার জন্য তারা চিরস্থায়ীভাবে বাড়ির দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
বিয়ের মাস তিন যেতে না যেতেই হাস্নাহেনা সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েন। আমজাদ মাষ্টার আর হাস্নাহেনার সংসারে তৃতীয় সদস্য যেখানে দারিদ্র সেখানে আরেকজন সদস্যের অনাগত উপস্থিতি মেনে নেয়া হাস্নাহেনার পক্ষে দুঃসহ হয়ে ওঠে।
তাদের দুজনের সংসারে নিত্যদিনের ঝগড়া ফ্যাসাদ আর অশান্তি মাত্রা ছাড়িয়ে যায়।

এভাবে কয়েক মাস কেটে যায়। ততদিনে দুজনের ধৈর্যের বাঁধ প্রায় বিলীন হওয়ার পথে।
তারপর অন্তরার জন্মের বার তের দিন আগে ঝগড়াঝাটির একপর্যায়ে স্বামীকে ছেড়ে রাগের মাথায় হাস্নাহেনা বাপ ভাইয়ের কাছে চলে আসেন।
সন্তান জন্মাবার পরে হয়তো দুই পরিবার জোড়া লাগতো। কিন্তু নিয়তির খেলায় হাস্নাহেনা হেরে গেলেন।
সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান হাস্নাহেনা।
তারপর থেকেই মামা মামিদের কাছে মানুষ হয়েছে অন্তরা। আমজাদ মাষ্টার কয়েকবার পিতৃতের দাবি নিয়ে এ বাড়িতে এসেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই তাকে নেড়ি কুকুরের মত দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে অন্তরার মামারা।
আমজাদ মাষ্টার চাইলে মেয়ের ব্যাপারে আইনিপদক্ষেপ নিতে পারতেন। কিন্তু তার মন সায় দেয়নি। উকিল জজ পুলিশ সব টাকাওয়ালাদের পক্ষে। পিতৃত্বের অধিকার চাইতে গিয়ে শেষমেশ না আবার বিপদে পড়তে হয় কিংবা মেয়েটার কোন ক্ষতি হয়,এসব সাতপাঁচ ভেবে আমজাদ মাষ্টার সবকিছু মেনে নিয়েছেন। অন্তরাকেও বুঝিয়েছেন।
যারা এতটা বছর ধরে নিজেদের জেদ বজায় রেখেছেন তারা চাইলে অনেক কিছুই করতে পারেন।

অন্তরার বিয়ের কথা শুনে আমজাদ মাষ্টার যতটা মর্মাহত হয়েছেন তার থেকেও বড় একটা ভয় তার মনের গভীর থেকে উঠে এলো। অন্তরার এ বিয়েতে মত আছে তো?
না এ বিষয়ে কোন ধোয়াশা থাকলে চলবেনা। পিতা হিসেবে এটা জানা তার কর্তব্য। একটা মেয়ের আসল জীবন শুরু হয় বিয়ের পরে। শুধু ছেলে ভাল হলে হবেনা। পুরো পরিবারকে আদর্শ পরিবার হতে হবে।

আমজাদ মাষ্টার কোন ভূমিকায় না গিয়ে সরাসরি মেয়েকে প্রশ্ন করলেন।
কিন্তু অন্তরা কোন উত্তর না দিয়ে মনযোগ দিয়ে পুকুরের পানি দেখতে লাগলো। ওর দুগালে এখনো জলের ধারা সুস্পষ্ট। চোখ দুটোও ফোলা ফোলা। এখানে আসার আগেও মেয়েটা কেঁদেছে নাকি?
আমজাদ মাষ্টার যা বোঝার বুঝে নিলেন। এ বিয়েতে যেহেতু তার মেয়ের মত নেই, শুধুমাত্র এই একটা কারনই বিয়ে ভাংগার জন্য যথেষ্ট।
আচ্ছা তবে কি অন্তরার নিজের কোন পছন্দের ছেলে আছে?
সে কথাটা মেয়েকে জিজ্ঞেস করাতে মেয়ে চোখ ভরা পানি নিয়ে হেসে ফেললো। “না বাবা। কিন্তু এই ছেলেটাকে আমি কোনভাবেই পছন্দ করতে পারছিনা। তবে পছন্দ না করতে পারার কোন কারন আমি তোমাকে বলতে পারবোনা.....।”
আমজাদ মাষ্টার মেয়েকে থামিয়ে দিয়ে দৃড় গলায় বললেন, “তুই কিছু ভাবিস না। তোর মা নেই কিন্তু আমি তো বেঁচে আছি।”
পিতার দৃড় চোয়াল আর প্রতিশ্রুতি ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে অন্তরার চোখে আবারো পানি আসে। ও আমজাদ মাষ্টারের হাত জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলে, “বাবা,পৃথিবীর সব বাবারা কি এমনই হয়? ঠিক তোমার মত?”

আমজাদ মাষ্টার কোন জবাব দিতে পারলেন না। আমজাদ মাষ্টারের মনে হলো একজন স্বামী হিসেবে তিনি তার কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। একজন পুরুষ তার প্রেমিকা কিংবা স্ত্রীর কাছে ব্যর্থ হতে পারে কিন্তু সেই পুরুষটি পিতা হিসেবে সন্তানের কাছে কখনো ব্যর্থ হয় না। হতে পারেনা। কারন সমস্ত পিতার ভেতরই একজন মোঘল সম্রাট বাবর লুকিয়ে থাকে।

পিতার কাছ থেকে সপ্ন রক্ষার নিশ্চয়তা আর নির্ভরতার বার্তা পেয়ে হাত নেড়ে নেড়ে মনের আনন্দে কথা বলে যাচ্ছে মেয়েটা।
নিজের সন্তানের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে আমজাদ মাষ্টারের বুকের গভীর থেকে ঝরা পাতার মত একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আহারে!










advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement