এটা নিছকই একটা ভালবাসার গল্প।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১১ নভেম্বর ১৯৯১
গল্প/কবিতা: ৭টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভ্যালেন্টাইন (ফেব্রুয়ারী ২০১৯)

একগুচ্ছ গোলাপ ও তুমি
ভ্যালেন্টাইন

সংখ্যা

আবীর রায়হান

comment ৮  favorite ০  import_contacts ২০৪
আজও তুমি রাগের মাথায় তোমার মোবাইলটা আছাড় মেরে ভেঙে ফেললে। ডিসপ্লেটাকে মাকড়সার জালের মত রূপ দেয়ার পরও তোমার রাগ কমলো না। বরং সাই সাই করে বেড়ে গেলো। অন্যান্য সময় কিন্তু জিনিসপত্র ভাঙতে ভাঙতেই তোমার রাগ পড়ে যায় অথচ আজকে হচ্ছে উল্টোটা। ভাংচুরের মাত্রার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তোমার রাগ। বাড়ছে তো বাড়ছেই। বেড়েই চলছে। মোবাইলের পেট থেকে খসে পড়া ব্যাটারির দিকে চোখ রেখেই এবার তুমি ফুলদানীর দিকে হাত বাড়াও।

বেগুনীর মধ্যে সোনালী কাজের এই ফুলদানীটা বছর দুই আগে তোমার জন্মদিনে তোমার স্বামীই তোমাকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলো। জন্মদিন! হাহ! ঠোট বেঁকিয়ে তুমি ভাবো ওসব তো কবেই চুকেবুকে গেছে। পাখি উড়ে গেলে খাঁচা রেখে কি লাভ!

তবু ফুলদানীটা সজোরে ছুড়তে গিয়ে তোমার হাতটা কিঞ্চিত কেঁপে ওঠে। তুমি পাত্তা না দিয়ে আকাশী রঙা টাইলসের মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকো।
ভাঙা ফুলদানীর ছোট বড় নানান সাইজের সিরামিকের টুকরোয় পর্দার ফাঁক গলে আসা সূর্যের কুসুম রঙা আলো পড়ে। ঝিকিমিকি আলোর বিচ্ছুরন তোমার চোখে অপার্থিব রূপে ধরা দেয়। নিজের অজান্তেই দৃশ্যটা তোমার ভারী ভালো লেগে যায়। আর সেই সাথে একটু একটু করে তোমার রাগও নিম্নমুখী হয়। দৃশ্যটা তোমার এত ভালো লেগে যায় যে তুমি ছবি তোলার জন্য মোবাইলের খোঁজে এদিক ওদিক তাকাও। আর তখনি তোমার মনে পড়ে এই নিয়ে তিনটা মোবাইল ভাঙার কথা। প্রতিবারের মত এবারো তুমি কিছুটা অনুতপ্ত হও।

তোমার মনে পড়ে তোমার স্বামী শাহেদ আজ লাঞ্চের টাইমে ফোন দিয়ে তোমাকে পাবেনা। প্রতিবারই দেখবে তোমার ফোন বন্ধ। হয়তো দুশ্চিন্তা করবে,হয়তো করবেনা। তুমি ঠিক বুঝে উঠতে পারোনা যে এখন তোমার কি করা উচিৎ? পাশের বাসায় গিয়ে কারো মোবাইল থেকে তোমার স্বামীকে একটা ফোন দেয়ার কথাও ক্ষনিকের জন্য একবার তোমার মনে হয়। তবে সেটা সাথে সাথেই তুমি বাতিল করে দাও। তোমার স্বামীকে স্বল্পমেয়াদী অস্থিরতার মধ্যে রাখার ইচ্ছেটাই তোমার কাছে প্রাধান্য পায়।

কোন কারন ছাড়াই রেগে যাওয়ার এই স্বভাবটার জন্য তুমি নিজেই মাঝেমাঝে নিজের কাছে বিব্রত হও। মনকে আয়ত্তে আনার কয়েকরকম কৌশল প্রয়োগ করেও তুমি তোমার এই স্বভাবটার একচুল পরিবর্তন করতে পারোনি।

অন্যায়ভাবে জিনিসপত্র ভাংচুরের জন্য তোমার আজও নিজেকে কিছুটা অপরাধী মনে হয়। কিন্তু সেই বোধটা ভেসে ওঠা স্বচ্ছ বুদ্বুদের মতই ক্ষণস্থায়ী। কারন ঘর পরিষ্কার করতে করতেই তোমার মনে পড়ে শাহেদের অনুভূতিহীনতার কথা। সমস্ত ঘরখানাকে আগুনে পুড়িয়ে দিলেও তার মনে কোন প্রশ্ন না জন্মাবার কথা। সে কথা মনে হতেই তোমার তার প্রতি ভারী বিশ্রী একটা ম্যাজম্যাজে অনুভূতি হয়। আর সেই সাথে দুচোখ ভরা শান্ত দিঘীর মত টলটলে পানি নিয়ে তুমি এও ভাবো যে এই ঘর ছাড়া তোমার যাওয়ার কোন জায়গা নেই। সময়ে অসময়ে কথাটা ভাবলেই তোমার পুরো শরীর মুচড়িয়ে কান্না আসে। আর তখন নিজেকেই আঘাত করতে ইচ্ছে করে তোমার।


আজ থেকে চার বছর আগে যখন তুমি তোমার পরিবারকে নির্দয়ভাবে ঝেড়ে ফেলে তোমার ভ্যালেন্টাইন মানে শাহেদের সংগে চলে এসেছিলে তখন তোমার মনে হয়েছিলো শাহেদই তোমার একমাত্র আকাশ,বাতাস,সমুদ্র কিংবা শীতল সবুজ বন। এককথায় পৃথিবীই। বিয়ের দুই বছর পর্যন্ত তাই ই ছিলো। কিন্তু এরপর থেকেই তোমার মনে হয় শাহেদের সংগে তোমার এই সম্পর্কটা আধমরা একটা গাছের ডালের মত লটকে আছে এই সংসারে। যদিও শাহেদের আচার আচরন সব আগের মতই আছে বলে মনে হয় তোমার। কিন্তু তবু যেন কিসের অভাব বোধ করো তুমি। এত বড় পৃথিবীতে এই বাড়িই তোমার একমাত্র আবাস,চিন্তাটা মনে এলেই তুমি যন্ত্রনায় কুকড়ে যাও। তীব্র হতাশায় ভোগা তোমার দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়।

তোমার অবস্থা দেখেই শাহেদ একদিন তোমার বাবার বাড়ির মানুষের সাথে গোপনে যোগাযোগের চেষ্টা করে। কিন্তু তুমি জেনে যাও ব্যাপারটা। আর জেনে গিয়েই প্রচন্ড রাগে ফেটে পড়ো । তুমি শাহেদকে ভুল বোঝো। তোমার শুধু মনে হয় শাহেদ তোমাকে আর বয়ে বেড়াতে পারছেনা। তোমাকে তোমার বাবার বাড়ি পৌছে দিয়ে দায়মুক্ত হতে চায়।
তারপর থেকেই তুমি শাহেদের উপর ঠান্ডা মাথায় অত্যাচার শুরু করো। তোমার নিজের কারনেই শাহেদের সাথে তোমার দূরত্ব দীর্ঘ থেকে দীর্ঘায়িত হয়।


শাহেদ অফিসে চলে যাওয়ার পর আজও অন্য দিনের মত এক কাপ ধূমায়িত দুধ চা হাতে তুমি বারান্দায় এসে দাড়িয়েছিলে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তুমি আনমনে কত কি ভাবছিলে। নিজের কথা,নিজেদের কথা। বহুদিন না দেখা তোমার মায়ের কথা।
কাপের দুই তৃতীয়াংশ চা রেখেই তুমি উঠে পড়েছিলে। তোমার বুক ধড়ফড় করে,মায়ের প্রিয় মুখখানি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার ইচ্ছেয় তোমার দম বন্ধ হয়ে আসে ।
তুমি তখন ক্লান্ত অবসাদে ঘরে এসে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছিলে। তোমার শুধু মনে হতে থাকে এ অবস্থার জন্য শাহেদই দায়ী। তাই সব রাগ গিয়ে পড়ে তার উপর। আর তাই তুমি এক ঝটকায় উঠে পড়েছিলে। এরপর একে একে তোমার প্রিয় জিনিসগুলোর সাথে নিষ্ঠুর খেলায় মেতে ওঠো তুমি।

ছড়ানো ছিটানো অনেক কথাই তোমার মনে হতে থাকে। কিছু কথা তুমি নিজের মত করে ব্যাখাও করে নিয়েছিলে। তারমধ্যে খানিকটা অপব্যাখ্যা যে ছিলো সেটা তুমিও জানতে। আর জেনেশুনেই তুমি ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠো।

তুমি ভাবো চার বছর আগে যদি শাহেদ তোমাকে বোঝাতো,যদি তোমাকে গ্রহনে অস্বীকৃতি জানাতো তবে আজ তোমাকে এমন নাজুক পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না। একা একা আত্মীয় পরিজনহীন জীবনটা বয়ে বেড়ানো যে কতটা জটিল সেটা তুমি ইতিমধ্যেই হাড়েহাড়ে বুঝে গিয়েছো।


শাহেদের চুপচাপ স্বভাব যা একসময় তোমার গোপন ভাললাগা ছিল, আজকাল তা তোমার মিনমিনে টাইপ বলে মনে হয়। তোমার ইচ্ছে করে ওর জন্য ভীষন কোন শাস্তির ব্যবস্থা করতে। এমন শাস্তি যাতে সে সারাক্ষন তোমার পায়ের কাছে পড়ে থাকে। দিনরাত তুমি তাকে হেনস্থা করার নানান ফন্দী আঁটো। তাকে শাস্তি দেয়ার চেষ্টায় তুমি নিজেও কিন্তু ডাঙায় তোলা মাছের মত অনবরত খাবি খেতে থাকো।

আজকাল প্রায় সময়ই শাহেদকে তোমার একজন মানুষ বলেই মনে হয়না। তোমার অন্যায় আবদার মুখ বুঝে নেয়ার ক্ষমতাকে এখন তুমি ভাবো তার ভিরুতা,কাপুরুষতা। তুমি প্রায় কথায়ই এটা নিয়ে তাকে খোঁচা দিতেও কার্পণ্য করোনা। তবে শাহেদের আহত চোখের দৃষ্টি ঠিকই তোমার বুকের গভীরে ছোট্ট একটা কষ্টের ঢেউ তোলে। কিন্তু সেই ঢেউয়ের তরঙ্গ তোমার মনকে এতটুকু দোলাতে পারেনা। তুমি একে একে তোমার হাতে থাকা সবগুলো কথার তীর নির্দয়ের মত ছুড়তে থাকো। শাহেদের ভেতরের রক্তক্ষরণ তুমিও টের পাও। টের পেয়েও না বোঝার ভান করে থাকো।

সেদিন রাগ কমে যাওয়ায় তুমি গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে একটা গল্পের বই নিয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছিলে। কয়েক মিনিট ধরে বারবার একই লাইনে তোমার চোখ ঘোরাফেরা করে। আর মন জুড়ে থাকে শাহেদ। তুমি টের পাও বইয়ের ব্যাপারে তোমার অনাগ্রহতা। তাই বই বন্ধ করে তুমি চোখ বুজে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকো। সাদা জামার উপর তোমার পিঠময় ছড়ানো চুল জমাটবাধা অন্ধকারের মত লাগে। ঠিক তোমার মনের একখন্ড ছায়ার মত।


লাঞ্চ টাইমের আগেই শাহেদ বাসায় চলে এসেছিলো। তোমার ফোন বন্ধ পেয়েই যে তার ছুটে আসা সেটা বুঝতে পেরে তোমার শরীর বেয়ে ভালবাসার চোরাস্রোত নেমে আসে। শাহেদকে তোমার ভীষনভাবে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কোথায় যেন বাধা পেয়ে তোমার তীব্র ইচ্ছেটা আজও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।


তোমার শুধু মনে হয় শাহেদ কেন জোর করেনা? তোমার প্রতি তার অভিমানী জ্যোৎস্নার মত সমস্ত কোমলতা একনিমিষেই কেন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়না? কেন সে তোমার সমস্ত অন্যায়কে শর্তহীন প্রশ্রয়ের দৃষ্টিতে দেখে?
শাহেদ তোমাকে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে গেলে তুমি সে হাত একঝটকায় সরিয়ে দাও। কিন্তু শাহেদ কেন সেটা মেনে নেয়? নিজের অধিকারটুকু ছেড়ে দেয়ার মধ্যে আদৌ কি সে কোন সুখ খুঁজে পায়? এসব ভাবনা বর্ষার জলভরা বিলের মত তোমার মনে থৈথৈ করে,তুমি অনবরত হাবুডুবু খেতে থাকো।

একঘেয়ে সুখের সাথে বসবাস করতে করতে তোমার জীবনকে পুরোপুরিই অর্থহীন মনে হয়। চোরাগোপ্তা অনুভূতির মত প্রায়ই তোমার মনে হয় মা বাবার ঠিক করা পাত্রকে বিয়ে না করাটা তোমার কি ভীষন বোকামি ছিল! সেই অচেনা লোকটার প্রতি মাঝেমাঝে তুমি টান ও অনুভব করো। তোমার মনে হয় সেই লোকটার সাথে যদি তোমার বিয়ে হত,আর বিয়ের পর যদি সে বৌ পেটানো খেতাব পেত তবুও তার সাথে তুমি স্বাস্থ্যকর একটা জীবন কাটাতে পারতে। তোমার জীবনটা বৈচিত্রের বর্ণালী ছোঁয়ায় ভরে উঠতো।

আস্তে আস্তে শাহেদকে তোমার পুরোপুরিই অনুভূতিহীন যন্ত্রের মত লাগে। যার কোন চাওয়া নেই,পাওয়া নেই। না পাওয়ার হাহাকার নেই। তার এত বেশি ভালমানুষি তোমার শিরায় শিরায় বিশ্রী অনুভূতির আগুন ধরিয়ে দেয়। তুমি তোমার ভেতরের সমস্ত রাগ,ক্ষোভ একত্র করে ওর দিকে চরমভাবে ছুড়ে দিতে প্রস্তুত হও। কোনরকম ভণিতা কিংবা পিছুটান ছাড়াই তুমি তোমাদের এতদিনের সম্পর্কটাকে একটানে ছিঁড়েখুড়ে ফেলতে চাও। আর তাই তুমি রুদ্ধশ্বাসে চিৎকার করে তাকে বলে দাও, আমি আর তোমার সাথে থাকতে চাইনা। আমি মুক্তি চাই,মুক্তি।

কথাটা বলে ফেলেই তোমার মনে সংশয় দেখা দেয়, তোমার চলে যাওয়া আদৌ শাহেদের মনে কোন প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেবে কিনা।
ক্ষনিকের জন্য তোমার এও মনে হয় যে শাহেদকে ছাড়া তুমি তোমার নিজস্ব দিন রাত্রিগুলো পার করতে পারবে কিনা। কিংবা আদৌ তুমি এ সংসারটা ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারবে কিনা!

তোমার বুকের গভীর থেকে হুহু করে কান্না আসে। শাহেদের প্রতি তোমার শিরশিরে অনুভূতি হয়।
শাহেদের চোখে চোখ রেখে পূর্ণদৃষ্টি মেলে তাকাতে ইচ্ছে করে। ব্যাকুল হয়ে তার মনের আনাচেকানাচে তোমাদের ভালবাসাবাসির কত কত স্মৃতি হাতড়ে বেড়াতে ইচ্ছে করে।

আজ তিন মাস ধরে তোমার আসিফ নামের একজনের সাথে গোপন প্রণয় চলে। এমন একজন যে তোমাকে শরৎের আকাশে জলশূন্য মেঘের মত এক দিগন্ত থেকে আরেক দিগন্তে ভাসিয়ে নিয়ে বেড়ায়। যার অমোঘ আকর্ষনে তুমি কোন গন্তব্যের দিকে ভেসে চলো নিজেই ঠাহর করতে পারোনা। তবু তুমি অন্ধের মত নিজের শরীরটাকে শিমুল তুলোর বল বানিয়ে ভেসে যেতে দাও। তোমার ভারী ভাল লাগে এই ভিন্ন আকাশে ওড়াওড়ি। নতুন জীবনের স্বাদে তুমি বিভোর হয়ে থাকো।

তোমার শুধু মনে হতে থাকে আসিফই সেই যার জন্য তুমি সাতাশটা বসন্ত ধরে পথ চেয়ে ছিলে। এতটা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তুমি আজ ঠিক গন্তব্যে এসে পৌছেছো। এই ভাবনাটাই তোমাকে মসৃণ স্বস্তি দেয়।

তুমি নিজেকে এই বলে বোঝাও যে শাহেদ তোমার জন্য পার্ফেক্ট ম্যাচ ছিলোনা। শাহেদের মাঝে তুমি যাকে খুঁজে বেড়াতে সে এই আসিফই।
আসিফ! যার কথা ভাবলেই তোমার বুকে ভালবাসার ফোয়ারা ছোটে। ভালবাসার টুংটাং শব্দে তোমার রক্তে নেশা জাগায়। সেই নেশায় তুমি সারাক্ষণ বুঁদ হয়ে থাকো। শাহেদের প্রতি তোমার অন্যমনষ্কতা আরো বাড়ে। তোমার নিজ হাতে গড়া এই ম্যাড়মেড়ে সংসারটার প্রতি আজকাল তুমি কোন টানই অনুভব করোনা।
তুমি ভাবো আর তো মাত্র কদিন,তারপরই চিরদিনের জন্য এই ম্রিয়মাণ সম্পর্কের পাট চুকিয়ে আসিফের সাথে ভালবাসার ভেলায় শুধু ভেসে বেড়ানো….ভালবাসার রাজপথ থেকে গলি ঘুপচির সবটুকু জুড়েই বৃষ্টির প্রথম ফোঁটার মত জ্বলজ্বলে হয়ে থাকবে তোমাদের ভালবাসার নীলপদ্ম।



তোমার এই সুখের পথে শাহেদ আজও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। আজও শাহেদ অন্যমনষ্কতা কিংবা ব্যস্ততার আবরনে তোমার কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখে। তোমার অভিসারের খবর শাহেদের নখদর্পণে,কথাটা জেনে তোমার তার প্রতি তীব্র ঘৃনা হয়। তার এই কাপুরুষতায় তোমার ভেতর প্রতিহিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে। সে আগুনের আঁচ তোমার মনে দগদগে ঘা এর জন্ম দেয়। যা প্রায় সময়ই তোমাকে ভোগায়। আসিফের ভালবাসার কোমল স্পর্শেও যার উপশম হয়না।



তারপর একদিন হঠাৎ করেই তোমার সপ্নের আকাশটাতে হাজার হাজার সূচালো চুড়া নির্মম ভাবে নেমে আসে। মুহূর্তেই তোমার সমস্ত সুখ,কল্পনা ভেঙে তোমার চারপাশেই আছড়ে পড়ে।
তুমি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যাও। তুমি বুঝে উঠতে পারোনা তোমার এখন কি করা উচিত। নিজের প্রতি সুতীব্র ঘৃণা সগর্জনে তোমার দিকেই ধেয়ে আসে। জীবনের প্রতি কি ভীষণ বিতৃষ্ণা জন্মে তোমার! বড় শীর্ণ,বড় মলিন দেখায় তোমার মুখখানা।


আসিফের একটা গোছানো সংসার আছে,ভোরের শিউলীর মত স্নিগ্ধ একটা বউ আছে তা জেনেও তুমি যতটুকু না অবাক হয়েছিলে তার থেকেও বেশি অবাক হয়েছো ওর এই দুঃসাহসী চাওয়া দেখে। যার যার সংসার ঠিক রেখে দুজনের মধ্যকার এই ভালবাসাময় চনমনে সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রাখার প্রতি আসিফের আকুলতা দেখে তোমার তার প্রতি মরণাঘাত হানতে ইচ্ছে করে।

আর তাই সুদৃশ্য টেবিলের উপরে রাখা সবুজাভ ছাতা মাথার অরেঞ্জ জুসের গ্লাসটা নিয়ে তুমি সরাসরি আসিফের মুখ তাক করে ছুড়ে মেরেছিলে। গ্লাস আর মুখের মিলনসূচক কোন আওয়াজের জন্য অপেক্ষা না করেই সেদিন তুমি খসে পড়া উল্কার মত বেরিয়ে এসেছিলে। এমনকি আসিফের দেয়া ভালবাসা দিবসের প্রথম রক্ত গোলাপগুচ্ছের দিকেও তুমি পেছন ফিরে তাকাওনি। তোমাদের পরিচিত রেষ্টুরেন্টের গুটিকতক মানুষ বিস্মিত চোখে তোমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। তোমার কিন্তু কোন দিকেই খেয়াল ছিলোনা। একটুখানি আড়ালের ভীষন প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল তোমার। কোন কিছু না ভেবেই তুমি উদভ্রান্তের মত ঘরের দিকেই ছুটতে শুরু করেছিলে।


ছুটতে ছুটতেই শাহেদের কথা মনে পড়ে তোমার নিজেকে অচ্ছুৎ মনে হয়েছিলো। আর সেই সাথে কলুষিত এক নারী চরিত্র! যে কিনা সুখের অসুখে জর্জরিত! অথচ কত কত নারী আজ দাম্পত্য সম্পর্কের সুখঘর বানাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেদের বুকের ভাঁজে ভাঁজে বৃষ্টি লুকোয়।
তোমার বারেবারে মনে হচ্ছিলো তোমাদের সংসারকে তুমিই দিনের পর দিন অসুখের মুখে ঠেলে দিয়েছো।
শাহেদের নিরব ভালবাসার কথা মনে পড়ে তোমার সারা শরীর ছাপিয়ে কষ্টের প্লাবন নেমেছিল। তোমার মনে হয়ছিলো আত্মীয় পরিজনহীন জীবন তো শাহেদেরও। তোমার মত তার ও তো তুমি ছাড়া কেউ নেই! তবু কখনো অস্ফুটেও তো সে একথা উচ্চারন করেনি!
তোমার দেয়া আঘাত পেয়ে পেয়েও তো সে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের মত কখনো পাল্টা আঘাত করেনি! বরং ধীরে ধীরে নিভৃতচারী থেকে পুরোপুরি অন্তর্মুখী হয়েছে।


বাসার পাশের ফুলের দোকানটার সামনে এসে তুমি কতকটা আনমনেই রিকশা থেকে নেমে পড়েছিলে। তোমার মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা শাহেদের প্রতি ভালবাসার কংকালই হয়তো তোমাকে ফুলের দোকানটার ভেতরে ঠেলে দিয়েছিলো। তোমার সেদিন প্রথমবারের মত মনে হয়েছিলো গোলাপের ঠিকঠাক অর্থ শাহেদের জানা না থাকলেও কোন ক্ষতি নেই।
তাই বহুদিন পরে কিছু টকটকে লাল গোলাপের সাথে ধবধবে সাদা একটা গোলাপ হাতে তুমি সেদিন দ্বিতীয় এবং শেষবারের মত তোমার গোটা অতীতকে দ্বিধাহীন ভাবে পেছনে ফেলে ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছিলে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement