রাত হল সৃষ্টির এক অপুর্ব অংশ । দিনমানে যে পল্লি মুখরিত থাকে তাই মাঝরাতে হয়ে যায় মৌনমুখর । কর্মচঞ্চল দিনের পর কোলাহলহীন ,শান্ত , সমাহিত রাত মানুষের দেহে মনে এনে দেয় পরম শান্তি । মাঝ রাত তার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নিস্তব্ধতায় সমহিমায় বিরাজ করে । অশরীরী আত্মারা এই মাঝরাতেই চলাচল করে ! তৃতীয় প্রহরের জাগরূকরাও সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকে মাঝরাত থেকেই । শ্রীপতিও রাতজাগা রোগে আক্রান্ত হয়ে মাঝরাতেই রাতের মৌনতার সঙ্গী হয় । মৃত শ্রীলেখার উপস্থিতি সেই মাঝরাতেই শ্রীপতিকে এক আবেশে জড়িয়ে রাখে , জাগিয়ে রাখে । এক মাঝরাতেই ঘটে যায় শ্রীপতির জীবনে চরম অঘটন ।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ডিসেম্বর ১৯৬২
গল্প/কবিতা: ৭টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - মাঝ রাত (সেপ্টেম্বর ২০১৮)

নিশি নিঝুম
মাঝ রাত

সংখ্যা

ARJUN SARMA

comment ৭  favorite ০  import_contacts ১৪৪
ফায়ার সার্ভিসের ঘন্টায় ঢং ঢং করে দুটো বাজলে শ্রীপতি জেগে উঠে । আসলে ঘন্টা ধ্বনি শোনে ঘুম ভাঙে নাকি ঘুম ভেঙে ঘন্টাধ্বনি শোনে তা শ্রীপতি নিজেই বুঝে উঠতে পারে না । বিছানায় ছটপট করে । চোখ বুজে থাকে । কিন্তু ঘুম আসে না । শেষরাতে আবার কখন যে চোখ লেগে যায় বুঝতে পারে না । মাঝের সময়টা যে কী দুর্বিসহ সে শুধু শ্রীপতিই বুঝে ।

কোন কোন চাঁদনী রাতে উঠে হুইলচেয়ারে চড়ে জানালায় বসে । খোলা জানালায় চাঁদ হাসে । চাঁদের আলোয় চারপাশ কেমন স্নিগ্ধ লাগে । শ্রীপতি চোখ ভরে দেখে শান্ত সমাহিত রাতকে । এর সঙ্গে কারো তুলনা হয়না । দিনের আলোয় কত কোলাহল , মুখর পল্লি । কত ঝগড়া, কত অশ্লীল শব্দরা ঘুরে বেড়ায় । কত হিংসা ভেসে যায় বাতাসে । কত স্বপ্ন বুনন হয়,কত আশার জাল বিছানো হয় । অথচ এই দুপ্রহর পেরোনো রাতে কোথাও কিছু নেই । আছে প্রশান্তি ,নিস্তব্ধতা । মলিনতাহীন দ্বেষহীন এক আবেশের পরশ বুলিয়ে দেয় রাত । এক সম্মোহনের প্রলেপ যেন বুলিয়ে দিয়ে যায় কোন এক অজানা কিছু । শ্রীপতির মনে হয় রাত না থাকলে মানুষ পাগল হয়ে যেত । কিন্তু রাত থেকেও তো তার কাছে নেই।

সামনের গলির মোড়ে পর পর পাঁচটি কামারশালা । সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি একটানা ঠুস ঠাস ঠুস ঠাস চলতেই থাকে । বিরামহীন এই শব্দ শ্রীপতির ঘরে ঢুকে যায় বিনা অনুমতিতে । সন্ধ্যের পর অবশ্য বন্ধ হয়ে যায় । কিন্তু আরো প্রায় দু’শো হাত দূরেই গাড়ি স্ট্যান্ড । বাস, অটোরিক্সা জিপ সব আছে । যাত্রীর সমবেত কলরব ছাড়াও সারাক্ষন মাইকের ঘোষনায় চারপাশ সরগরম থাকে । আজন্ম এই এলাকা চষে বেড়িয়েছে । আর এখন কল্পনায় দেখে । দিনমানে শ্রীপতি জানালায় এলেই অদূরে শব্দমুখর ব্যস্ত জনপদ দেখে । সেই একই এলাকা এই মাঝরাতে প্রেতপুরি মনে হয় ।

প্রেতাত্মারা এই মাঝরাতেই চলাফেরা করে । ন’জেঠি বলতেন, নিশিরাতে প্রেতাত্মারা ফেলে যাওয়া আপনজনদের কাছে আসে । নিকষ কালো সাঁঝরাতে ন’জেঠির গা ঘেঁষে ঘন হয়ে বসে শুনতো ,
শুনশান চারপাশ,
প্রেত চরে দুদ্দাড়,
বাগে পেলে খায় ঘাড়,
গিলে খায় হাড়মাস ।
শুনতে শুনতে গায়ে কাঁটা দিত । প্রেতদের কাছে আগের আপনজনরা নাকি শ্ত্রু হয়ে যায়।

হরেন জেঠুকে তো ঘাড় মটকিয়েই শেষ করে দিয়েছিল । জেঠু এসব প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করত না । জেঠুর ছিল বায়ুচড়া রোগ । রাতে ঘুমোতে পারত না । সাহসী জেঠু রাত জেগে নাকি উঠোনে উঠোনে ঘুরে বেড়াত । একরাতে বাগে পেয়ে উঠোনেই ঘাড় মটকে দিয়েছিল । ভোরে জেঠুর বড় ছেলে উঠোনে জেঠুর লাশ আবিষ্কার করে । চোখদুটো নাকি ঠিকরে বেরিয়ে আসবার জোগাড় !

শ্রীপতিও এসবে বিশ্বাস করে না । কিন্তু শ্রীলেখার মৃত্যুর মাসিক শ্রাদ্ধের রাতের ঘটনা তার সব বিশ্বাস অবিশ্বাসকে দুরমুচ করে দিয়েছে । ষোড়শ উপচারে ছেলেরা জাঁকজমক করে শ্রাদ্ধশান্তি করেছে । শ্রীলেখার হাসিমাখা মুখ, কপালজুড়ে বিরাট সিঁদুরটিপ, গভীর আয়ত চোখ ছবি হয়ে রজনীগন্ধার বেষ্টনীতে চেয়ারে সাজানো । সব চুকে বুকে গেলে সাজানো ছবিটা শ্রীলেখার ঘরেই রাখা হয় । এই পাশাপাশি দুটো রুম সাজিয়েছিল শ্রীলেখাই । একটা তার নিজস্ব । আর পাশেরটা শ্রীপতির জন্য । শ্রীপতির দেওয়াল জোড়া বইয়ের আলমারী,দোলখাওয়া ইজিচেয়ার, টেবিল্যাম্প সব সাজিয়ে দিত নিজের হাতেই । নিজের ঘরের বিছানার পাশেই টেবিলে সাজানো থাকতো কলকাতা থেকে কেনা তার প্রিয় হারমোনিয়াম,পাশে তবলা । ফুলদানিতে সর্বদা হাসতো তাজা ফুল । কখনো রজণীগন্ধা,কখনো গোলাপ,রঙ্গন যখন যা পাওয়া যেত । শ্রীপতি বলত, শ্রী তোমার ঘরের সুবাস না পেলে যে আমার ঘুম আসেনা । সেদিনও সব জিনিস সঠিক স্থানেই ছিল, শুধু শ্রী হয়ে গেল ছবি ।

সবাই চলে গেলে শ্রীপতি শ্রীর ঘরে ঢুকে । ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক । একসময় নিজের ঘরে এসে ঘুমিয়ে পড়ে । হঠাৎ জেগে উঠে কিসের সুরেলা শব্দে । ঘুমের রেশ কাটতেই থতমত খায় । পাশের ঘর থেকে শ্রীর সেই অবিকল গলা –
নিশি নিঝুম ঘুম নাহি আসে
হে প্রিয় কোথা তুমি দূর প্রবাসে
এ কী করে সম্ভব ? ঘুরঘুট্টি অন্ধকার । কালো আধাঁর ছাড়া কিছু বোঝা যায় না। শ্রীপতি মনোযোগ দিয়ে শোনে,
ফুরায় দিনের কাজ, ফুরায় না রাতি,
শিয়রের দীপ হায় অভিমানে নিভে যায় ।
নিভিতে চাহে না নয়নের বাতি ।
একটা একটা শব্দ স্পষ্ট তার কানে ঢুকছে । শ্রীর এটি অতি প্রিয় গান । অবিকল সুরে গাইছে শ্রী । শ্রীপতি উঠে বসে বিছানায় । রজনী গন্ধার সুবাস ঘরময় । শ্রী গাইছে,
দিন যায় দিন গুনে, নিশি যায় নিরাশে
নিশি নিঝুম ......।
শ্রীপতি ত্রস্ত অথচ নিশব্দ হয়ে হুইল চেয়ারে বসে । শ্রীর ঘরে ঢোকার মুখে দরজায় হুইল চেয়ার লেগে শব্দ হতেই গান থেমে যায় । শ্রীপতি হাতড়ে হাতড়ে লাইটের সুইচ অন্‌ করে । ছবির শ্রী হাসছে । সব সাজানো আছে ঠিকঠাক । অনেকক্ষণ শ্রীকে দেখে আবার বিছানায় ঢুকে শ্রীপতি ।

শ্রীলেখার আসল নাম ছিল লেখা মিত্র । বিয়ের পর শ্রীপতি তার নামের ‘শ্রী’ যোগ করে শ্রীলেখা করে দেয়, আর ডাকত শ্রী বলে । নজরুল গীতির দক্ষ শিল্পী । শ্রীপতিকে বুঝাতো, জান তো এই গানটি বেহাগ রাগে নিবদ্ধ । আরোহনে ঋষভ ও ধৈবত বর্জিত হলেও অবরোহনে সব স্বর ব্যবহৃত হয় । এই রাগ রাত দ্বিতীয় প্রহরে গীত হয় । শ্রী তন্ময় হয়ে বেহাগ রাগে খেয়াল গাইতে বসলে শ্রীপতি মুগ্ধ হয়ে যেত । খেয়ালের পরই গাইত ,নিশি নিঝুম ----। শুনতে শুনতে শ্রীপতি ঘুমের দেশে চলে যেত । দুই ঘরের মাঝের দরজা বন্ধ করে দিলে শ্রী মজা করে গাইত , ‘আমি রূপে তোমায় ভোলাব না,ভালোবাসায় ভোলাব,আমি হাত দিয়ে দ্বার খুলব না গো,গান দিয়ে দ্বার খোলাব’ ।


অথর্ব হওয়ার আগে শ্রীপতি উদ্দাম উচ্ছলতায় শ্রীকে অস্থির করে তুলত । শ্রী বলত, যেদিন আমি থাকব না সেদিন কে তোমাকে গান গেয়ে ঘুম পাড়াবে ? শ্রীপতি বলত, আমি তো তোমার গান শুনে শুনেই ওপারে চলে যাব । অথচ শ্রীই আগে চলে গেল ।

বহুদিনের অভ্যাস, শ্রীপতি রাত ন’টার কাছাকাছি সময়ে ঘুমিয়ে পড়ে । সেদিনের পর থেকে প্রতি রাতেই শুনতে পায় ,নিশি নিঝুম - - -। প্রথম প্রথম উঠে মাঝের দরজা পর্যন্ত যেতেই গান থেমে যেত । সে দরজা বন্ধ করেই ঘুমোতে যেত । অথচ গান শুনে উঠে দেখত দরজা খোলা । অনেক দিন ধরে গান শুনে শ্রীপতি এখন আর উঠে না । চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে । গানটা উপভোগ করে । শ্রীর গলার কাজ মনে মনে তারিফ করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে বুঝতে পারে না । আবার সেই ঢং ঢং শুনে জেগে উঠে ,অথবা জেগে উঠে ঢং ঢং শুনে । আর চোখের পাতা এক করতে পারে না । এই করে চলছে আজ এক বছর । গানের কথা এখনো কাউকে বলে নি ।

তিন ছেলে শ্রীপতির । একজন আমেরিকায় ,একজন দিল্লি আর ছোটোছেলে বাড়িতে থেকেই চাকুরি করে বেসরকারি অফিসে । বউমা এবং কাজের লোক উমেশের কারণে তার যত্নের কোন ত্রুটি হয় না । উমেশ সারাদিন থেকে সন্ধ্যে হলে চলে যায় । কিন্তু মাঝ রাতের পর শ্রীপতির নিদ্রাহহীনতার কষ্ট কেউ ভাগ করে নিতে পারে না । হুইল চেয়ারে জানালায় এসে নিস্তব্ধ রাতের দিকে তাকিয়ে ভাবে জগতে তার মত অসুখী আর কেউ নেই ।রাতের নৈশব্দকে চিরে বাদুড় জাতীয় নিশাচর যখন ছুটে যেত , শ্রীপতি তখন তার নিঃসঙ্গতার সঙ্গী পেত । কোন কোন রাতের মৌনমুখরতা খান খান হয়ে যেত ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির বুক কাঁপানো ঘন্টাধ্বনিতে । কোন নিকষ কালো রাতে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এলে সে আকুলিত হত । মনে পড়ত এমন বৃষ্টিতে শ্রী সহ জানালায় বসে রাতের প্রহরকে হারিয়ে দিত । ঘন বৃষ্টিতে বাসস্ট্যাণ্ডের বাতিগুলি ভিজে ভিজেও আলো দিত , এখনও দেয় । লাইটপোষ্টগুলি যেন পুরো এলাকার প্রহরী । শ্রী বলত, এই বাতিগুলোকে একদিন ভেঙ্গে দিয়ে এলে হয় । এরা বেরসিকের মতো রাতের আঁধারকে জাগিয়ে রাখতে চায় । রাতের সৌন্দর্যকে উপহাস করে । জলের ঝাপটা চোখেমুখে লাগলে পুলকিত হত শ্রী । হাত বাড়িয়ে জল এনে ছিটিয়ে দিত শ্রীপতির চোখে মুখে । মাঝে মাঝে দুজনে নিশ্চুপ হয়ে হাত ধরে আঁধারের রূপ অবলোকন করত ।

অনেকদিন ঘরে আর্থারাইটিসে ভুগছিল শ্রীপতি । ভেলোরের চিকিৎসায়ও পুরোপুরি সুস্থ হয় নি। কোনরকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলত । কিন্তু স্ট্রোকের পর একেবারে হাঁটাচলা বন্ধ হয়ে গেল । প্যারালাইজড্ হয়ে গৃহবন্ধী হয়ে গেলে শ্রীর যত্ন যেন আরো বেড়ে গিয়েছিল । শ্রীপতির বাবাও স্ট্রোক করেই দেহ রেখেছিলেন । শ্রীপতি এই যাত্রা রেহাই পেলেও অচল হয়ে গেল । সবাই বলে বংশের রোগ এটা । শ্রীর মৃত্যুর পর অঘুম-রোগ শ্রীপতিকে চেপে ধরেছে । ন’জেঠি বলেছিল ন’জেঠুরও নাকি অঘুম-রোগ ছিল । ন’জেঠি ছড়া কাটত ,
প্রথম প্রহরে সবাই জাগে ,দ্বিতীয় প্রহরে ভোগী ,
তৃতীয় প্রহরে তস্কর জাগে , চতুর্থ প্রহরে যোগী ।
শ্রীপতির হাসিও পায় ,কারণ সে তস্কর শ্রেণিতে পড়ে । ন’জেঠির ঝুলিতে তৃতীয় প্রহরের জাগরূকদের অনেক গল্প ছিল । দেশ-বাড়িতে দুঃসাহসী সিঁদেল চোর মাঝরাতেই হানা দিত । খালি গায়ে তেল মেখে আসত । বালি-পড়া দিয়ে বাড়ির সকলকে ঘুমে আচ্ছন্ন করে সিঁদ কাটত । কুকুরও শব্দ করত না । তারপর ঘরে ঢুকে দরজা খুলে সব নিয়ে যেত । তবে একটা বিষয়ে তাদের সততা ছিল প্রশ্নাতীত । ঘরের মেয়েছেলেদের দিকে তাকাত না । বিখ্যাত গজু ডাকাতের দলের একজন নাকি একবার এক নূতন বউয়ের দিকে হাত বাড়িয়েছিল । সেই নিঝুম রাতেই গজু নাকি তার হাত কেটে দিয়েছিল ।

ন’জেঠুর রাতজাগা রোগের জন্য অনেক কবিরাজ বৈদ্য দেখিয়েছিল । কিছু হয় নি । ন’জেঠু নাকি প্রহরের পর প্রহর মেঝেতে গড়াগড়ি করত আর ব্যাথায় কাতরাতো । শ্রীকে শ্রীপতি বলত, দেখ কোন এক মাঝরাতে আমিও চলে যাব বংশের ধারা বজায় রেখে । শ্রী ধমক দিয়ে বলত, তোমায় বক্ষ মাঝে রাখব যেতে দেব না । এখন শ্রী নিজেই তার বক্ষ খালি করে চলে গেল ।

গতকাল ছিল শ্রীর চলে যাওয়ার বর্ষপূর্তি । সকলে স্মৃতিচারণ করল । শ্রীপতি শুধু অপেক্ষা করছিল কখন রাত হবে । সন্ধ্যা পার হতেই ঘুরঘুট্টি অন্ধকার । নির্দিষ্ট সময়ে শুরু হল ‘নিশি নিঝুম ঘুম নাহি আসে - - -’। ঘুমের ঘোরেই উপলব্ধি করে সেই অতিপরিচিত তাজা রজণীগন্ধার সুবাস ঘরময় ভেসে বেড়াচ্ছে । শ্রীর গলার কাজ কত জীবন্ত ! শ্রীপতি উঠে বসে । নিঃশব্দে হুইল চেয়ারে চড়ে । মাঝ দরজায় গিয়ে অন্ধকারেও দেখল, ঐ তো অবিকল শ্রী হারমোনিয়ামে হাত চালিয়ে পরিচিত ভঙ্গীতে মাথা কাত করে গাইছে ,
ফুরায় দিনের কাজ , ফুরায় না রাতি - -
মুখটা দেখা যাচ্ছে না পিছন থেকে । আজ হাতেনাতে ধরতেই হবে । আঁধারে শ্রীপতি দিল জোরে হুইলচেয়ার চালিয়ে । চেয়ার গিয়ে কোথায় ধাক্কা লেগেছে কে জানে । কিন্তু গান থেমে ঘরের মধ্যে যেন তুফান ছুটল । ঝড়ো হাওয়ায় সব লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে মনে হল । কিসের এক বিকট শব্দ হল । তানপুরার তারে বেসুরো ঝংকার উঠল । ঘরের সব যেন উড়ছে মনে হল । কেউ দাপাদাপি করছে যেন । দরজার পাল্লা ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে উঠল । খোলা দরজা দিয়ে শ্রী যেন দ্রুতবেগে ছুটে গেল । হিতাহিতজ্ঞানশূন্য শ্রীপতি দরজা বরাবর চালিয়ে দিল হুইল চেয়ার । পাকা র্যা ম্প দিয়ে তীব্র বেগে চেয়ার ছুটে গিয়ে মাঝ উঠোন পেরিয়ে কোথায় গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল শ্রীপতি জানে না ।

আজ ভোরে উঠেই ছোটো বউমার চিৎকারে সকলে উঠোনে জড়ো হয়ে দেখল শ্রীপতির নিথর দেহের উপর পড়ে আছে হুইলচেয়ারটা ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement