সনাতন হাজরাকে এ তল্লাটের প্রায় সব লোকই খুব ভালকরে চেনে । চেনে বললে ভুল হবে , গ্রামের বয়স্ক লোকজন থেকে শুরু করে কচিকাঁচার দল পর্যন্ত তাঁর স্বভাবের কথা খুব ভাল করে জানে । গ্রামের মাতব্বররা তাঁকে যথেষ্ট সমীহ করে । সমীহ করার কারন হিসেবে আড়ালে ব্যাক্তিগত স্বার্থের লোভে পরোক্ষভাবে তোষামোদই করে । গ্রামের লোকজনেরা সনাতন হাজরাকে যেন-তেন প্রকারে সেবা করবার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে । কোনো বাড়ীতে সনাতন হাজরার আগমনে গৃহের লোকজন আনন্দে পুলকিত হয়ে তাঁকে সামনে পেয়ে বানিয়ে বানিয়ে তাঁর গুণগান গাইতে থাকে আর মনে মনে অনেক কিছু অলীক কল্পনা করে আবার আসবার জন্য আগাম নিমন্ত্রণ জানিয়ে রাখে । এইরকম ভাবে সনাতন হাজরার জীবনটা অন্যদের সেবায় , সাহায্য-দানে কোনরকমে কেটে যাচ্ছিলো । কিন্তু এত সেবা , এত তোষামোদের আসল উদ্দেশ্যটা গ্রামের প্রত্যেকে যেমন জানতো তেমনি এর আসল কারনটা সনাতন হাজরা বুঝতে পেরে মনে মনে শুধু হতাস ভাবে হাসতো আর এ সমস্ত ভেবে নিজেকে অপরাধী মনে করতো ।

বাঁকুড়া শহর থেকে বাসে ঘন্টা পাঁচেক গেলে এক সাদামাটা গ্রাম । গ্রামের বেশির ভাগ লোকের অবস্থা বিশেষ একটা সচ্ছল নয় । কোন রকমে জীবনযাত্রা অতিবাহিত করে । বেশ কিছুটা দূরে উচুঁ-নীচু ঢেউ খেলানো ছোট পাহাড়ের সারি , পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটা নদী । বহুকাল আগে এই নদীর রূপ ছিল ভয়ংকর । এই নদী বেয়ে বড় বড় বজরায় ব্যবসায়ীরা এই শহরে আর তার আশপাশের এলাকায় ব্যবসা করতে আসত । এই নদীর পারেই কয়েক একর জমি সমেত জমিদারের বিশাল প্রাসাদ । রাত হলেই প্রত্যেক ঘরে ঘরে জ্বলে উঠতো দামি-দামি ঝাড়বাতির লন্ঠন । এই নদী ধরেই বিভিন্ন দেশ থেকে বিখ্যাত সব ব্যবসায়ীরা জমিদার বাবুর কাছে আসত ব্যবসার কাজে । প্রচুর ধন-সম্পত্তি , হিরে-জহরত , সোনা-দানা , টাকা-পয়সা মজুত করা থাকত জমিদার বাড়ীর এক গোপন কুঠুরীর সিন্দুকে ।

পূর্বের সেই ভয়ংকর নদীটি আজ তার নাব্যতা হারিয়ে গিয়ে বেশির ভাগ জায়গায় গজিয়ে উঠেছে অনেক চর । নামেই নদী , অনেক খুঁজলে হয়তো কিছু কিছু জায়গায় জলের সন্ধান পাওয়া যায় । মানুষজন এখন দিব্যি অনায়াসে এর উপর দিয়ে হাটা-চলা করে । জমিদারের বিরাট প্রাসাদটি পূর্বের সেই জৌলুস পুরোপুরি হারিয়ে গিয়ে এখন এক জরাজীর্ণ ভূতুড়ে বাড়ী । চতুর্দিকে বটগাছে গ্রাস করা এক কঙ্কালসার অট্টালিকা । তবুও বর্তমান বাজারে এই জমিদার বাড়ী আর তার কয়েক একর জমি সব মিলিয়ে দাম প্রায় কয়েক লক্ষ টাকা । এই জমিদার বাড়ীর একমাত্র উত্তরাধিকারী বংশধর হচ্ছে সনাতন হাজরা । তিঁনি এই জরাজীর্ণ বাড়ীটিকে আঁকড়ে ধরে পরে রয়েছেন । কারন হিসেবে জনশ্রুতি প্রচলন আছে , এই সনাতন হাজরাই একমাত্র জানে কোন গোপন কুঠুরিতে তাঁদের পূর্বপুরুষদের গচ্ছিত ধন-সম্পত্তি লুকিয়ে রাখা রয়েছে । সেইজন্যই গ্রামের প্রত্যেক মানুষের তাঁকে নিয়ে এত কৌতূহল , সেবাযত্ন করা , তোষামোদ করা যদি ভুলিয়ে-ভালিয়ে সেই পুরনো আমলের গচ্ছিত মূল্যবান সম্প্রতি থেকে ছিটেফোঁটা হাতিয়ে নেয়া যায় । এই প্রচলিত খবরের জন্য মাঝে মাঝে দিনেরাতে কলকাতা শহর থেকে লোকজনের আনাগোনা হয় তাঁর কাছে । শোনা কথা , এরা কথিত মূল্যবান সম্পত্তি কমদামে কেনবার লোভে তাঁর কাছে যাতায়াত করে ।

গ্রামের লোকজন সবাই জানে সনাতন হাজরা উত্তরাধিকার সূত্রে পূর্বপুরুষের থেকে পাওয়া এত সম্পত্তির মালিক হয়েও ভয়ংকর কঞ্জুস , কৃপণ আর ব্যয়কুণ্ঠ ব্যক্তি । পরনে হাটু অবধি একটা ময়লা বহুদিন ব্যবরিত শত ছিদ্র ধুতি আর গায়ে জামার বদলে একটা ততোধিক শত ছিদ্র গামছা । গ্রামের লোকেরা তাঁকে এই প্রসঙ্গে বললে তাঁর একটাই উত্তর -- আপনাদের ধারণা একেবারেই ভুল , আমার কিছুই নেই । হাতে একটা পয়সা নেই বলেই তো খরচা করতে পারি না । গ্রামবাসীরা এই কথা শুনে চোটে গিয়ে মুখে কিছু না বললেও তাঁর অসাক্ষাতে বলে -- সনাতন হাজরা লোকটা এতই কৃপণ যে তাঁর এত মূল্যবান ধনসম্পদ , টাকাকড়ি থাকা সত্ত্বেও পরনের জামাকাপড় কেনাতো দূরের কথা , দৈনন্দিন খাবারের জন্য টাকা-পয়সা খরচা না করে অন্যের গৃহস্থের বাড়ীতে ভিক্ষুকের মত পারলে দুবেলা খেয়ে নিজের টাকা-পয়সা গুলি শুধু জমিয়ে রাখে । যেদিন অন্যের বাড়ীতে খাওয়া না জোটে সেদিন না খেয়ে অথবা শুধু জল খেয়েই কাটিয়ে দেয় । তবুও গ্রামের লোকজন তাঁকে কখনও রাগায় না কিংবা কোন কটু কথা বলে না । শুধু আশায় থাকে এই কৃপণ লোকটাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আদর , সেবাযত্ন করে যদি তাঁর গচ্ছিত মূল্যবান সম্পত্তি , টাকা-পয়সা থেকে কিছুটা হাতিয়ে নেয়া যায় ।

গ্রামে একবার কলেরা অসুখের প্রকোপে এক মহামারীর আকার ধারণ করে । এই গ্রামে কিংবা আশপাশের গ্রামগুলিতে কোন স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল নেই , এরফলে বহুলোককে চিকিৎসার অভাবে মরতে হয় । সেইসময় গ্রামের লোকজন সনাতন হাজরাকে বলে -- আপনার গচ্ছিত টাকা-পয়সা থেকে কিছু সাহায্য দান করুন যাতে করে এই অসুস্থ লোকগুলিকে গাড়ীর ব্যবস্থা করে সদরের হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করানো যায় । সনাতন হাজরার সেই একই উত্তর -- আমি আপনাদের থেকেও গরীব আমার কাছে কিছুই নেই দেবার মত । বরং আপনারা আমাকে সাহায্য করুন । গ্রামবাসীরা রেগে গিয়ে বলে আপনি শুধুই কঞ্জুস কিংবা ব্যয়কুণ্ঠ ব্যক্তি নন , আপনি একজন অমানবিক , নিষ্ঠুর লোক । অনেকজন আবার রাগে গজ গজ করে বললো -- আপনার এত টাকা-পয়সা খরচ না করে গচ্ছিত রেখে কি করবেন ? আপনি মরে গেলে টাকাগুলিতো স্বর্গে বা নরকে নিয়ে যেতে পারবেন না । এগুলি সব ভূতে খাবে নয়তো দেশের সরকার সব বাজেয়াপ্ত করবে ।

বেশ কিছুদিন অসুস্থতার পর সনাতন হাজরার মৃত্যু হয় । সনাতন হাজরার মৃত্যুতে লোকজন কষ্ট পাবার বদলে তাঁর প্রতি ক্ষুব্ধ হল বেশি । এতদিন গ্রামবাসীরা তাঁর দেখভাল করল অথচ লোকটা এতটাই কৃপণ তাঁর গচ্ছিত টাকা-পয়সা থেকে কাউকেতো কিছু দিলেই না আর নিজেও চরম দারিদ্রের মধ্যে জীবনযাপন করে নিজেও কিছু ভোগ করলেন না । এখন তাঁকে দাহ করবার খরচটাও গ্রামবাসীদের বহন করতে হবে ।

জমিদার বাড়ীর শেষ বংশধর সনাতন হাজরার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পরার পর সমস্ত গ্রামের লোকজন জড় হয়েছে জমিদার বাড়ীর সামনে । জমিদার বাড়ীর লুকোনো যক্ষের ধনের কথা জানাজানি হতে পুলিশের লোকজনও উপস্থিত হয়েছে । সবাই এখন উৎসুক - না হয় লোকটার কৃপণতার দরুন দামি দামি সোনা-গহনা , হিরে-জোহরত , টাকা-পয়সা নাইবা পাওয়া গেল , তবু এবার সেই সব মূল্যবান জিনিসগুলি একবার চোখের সামনে দেখা যাবে ।

পুলিশের দল বিশাল জমিদার বাড়ীটায় তন্ন তন্ন করে খুঁজে অবশেষে হদিস পেল সেই বহু বছরের পুরনো বহু আখাঙ্কিত প্রাচীন সিন্দুকটির । অনেক চেষ্টা করে অভিজ্ঞ লোকেদের দিয়ে খোলান হল সিন্দুকটি । অবশেষে যেটা মিললো -- তাতে সবাই একেবারে অবাক । কিছুই নেই , কয়েকটি বহু পুরোন চিঠিপত্র ছাড়া । তবে , সিন্দুকের এক গোপন দেরাজে পাওয়া গেল একটি " উইল " আর সনাতন হাজরার হাতে লেখা একটি চিঠি ----

" .......বহুদিন ধরে প্রচলিত আমাদের এই বিশাল জমিদার প্রাসাদের ভিতর গোপন সিন্দুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখা আছে অনেক দামি সোনা-গহনা , হীরে-জহরত , প্রচুর টাকা-পয়সা । কিন্তু মানুষজনের এই ধারনা বা প্রচলন সম্পূর্ণ ভুল । আমি অনেকবার একথা বলেছি আর বোঝাবার চেষ্টা করছি কিন্তু লোকে আমার কথা বিশ্বাস করে নি , উল্টে লোকে আমাকে কৃপণ , কঞ্জুস অপবাদ দিয়ে এসেছে । আসলে আমি অত্যন্ত দরিদ্র , অন্যের দানে , সেবায় কোনরকমে জীবনযাপন করেছি । আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ । গ্রামবাসীদের অনেক দিনের ইচ্ছে , আমারও সেই ইচ্ছে , এই গ্রামে একটা ভাল হাসপাতাল গড়ে উঠুক যাতে লোকজন সুচিকিৎসা পায় , বিনা চিকিৎসায় গ্রামবাসীদের মৃত্যু যাতে না ঘটে । আমার একান্ত ইচ্ছে আমার মৃত্যুর পর এই বিশাল জমিদার বাড়ী আর সমস্ত স্থাবর , অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রামবাসীদের সুবিধার জন্য একটি হাসপাতাল গড়ে উঠুক আর সেই মর্মে আমি এই দানপত্র " উইলটি " করে দিয়ে গেলাম ....... "

এতদিন গ্রামবাসীরা যে লোকটাকে কৃপণ , কঞ্জুস , দানকুণ্ঠ , অমানবিক আখ্যা দিয়ে গালি-গালাজ দিয়ে এসেছে , তাঁর মৃত্যুর পর জীবনের প্রকৃত কারনটি জেনে আর বিশেষ করে গ্রামবাসীদের জন্য মহৎ উদ্দেশ্যে করা এই " উইলের " কথা জানতে পেরে তাঁর মৃত আত্মার প্রতি ক্ষমা প্রার্থনা করে চিতার আগুনে অশ্রুজলে অন্তরের শেষ শ্রদ্ধা , প্রণাম জানালো ।