শীতের রাতগুলো লম্বা হয়। সাধারণতঃ আমার এক ঘুমে রাত কবার হয় না। প্রায়ই রাতের শেষ ভাগে ঘুম ভেঙ্গে যায়। তখনও রাত পোহাতে আরো দুই ঘন্টা বাকি থাকে। কখনো কখনো ভোর হতে তিন, চার ঘন্টা আগেই ঘুম কোথায় যেন পালিয়ে যায়। ঘুমানোর অনেক চেষ্ট করে ব্যর্থ হই। এক পর্যায়ে এটা ওটা নিয়ে ভাবতে থাকি। ভাবতে ভাবতে এক সময় সকাল হয়ে যায়। বিপরীতও হয় মাঝে মাঝে অর্থাৎ আবার ঘুমের দেশে ভ্রমনে যাই, তবে তা সকালের আগ মুহুর্তে।
প্রায় রাতের ন্যায় এক রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। সেদিন একটু আগেই যেন ঘুম ভাঙ্গল। অবশ্য এর একটি কারণ আছে। স্বপ্ন দেখছিলাম ভয়ঙ্কর স্বপ্ন। কে যেন আমাকে হত্যা করতে তাড়া করছে। আমি দৌড়তেছি আর অস্ত্র হাতে লোকটি আমার পিছনে পিছনে আসছে। বিভিন্ন স্থানে লুকোচ্ছি কিন্তু লোকটি আমাকে দেখে ফেলে আবার ধরার জন্য এগিয়ে আসছে। আর আমি তখনই আবার দৌড়াচ্ছি। লোকটির সাথে দৌড়ে আমি পারছিলাম না। প্রচন্ড ভয় আমাকে অবসাদ করে দিচ্ছিল। পা দুটো আর চলতে চাচ্ছিল না। বুকটা ধরফর করছিল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এই বুঝি আমাকে মেরে ফেলবে। হঠাৎ সামনে একটি বাড়ি দেখলাম আর আমি দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে গেলাম। দরজা বন্ধ করে হুক লাগিয়ে দিলাম। সাথে সাথে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে ধপাস করে বসে পড়লাম। নিঃশ্বাস দ্রুত আসা যাওয়া করছে যেন প্রাণ বের হয়ে যাবে। অবসাদে মাথাটি সামনের দিকে ছেড়ে দিলাম। চোখ বুজে আরামে শ্বাসপ্রশ্বাস ছাড়ছিলাম।
ইতিমধ্যে সামনে শব্দ শুনতে পেলাম। কে যেন বলছে, শরবত নেন। শব্দটি পরিচিত মনে হলো। চোখ খুলে মাথাটি উপরে তুলে হাত বাড়াতে চাইলাম। দেখি হাত উপরে উঠছে না। অনেক কষ্ট হচ্ছে। সে নিজেই শরবত পান করাল। তারপর আমার এক হাত ধরে টেনে দাড় করাল এবং পাশের ছোফা সেটে বসাল। সামনে হাটু সমান একটি ছোট টেবিল ছিল। তাতে চার্জ ফ্যান ছিল। সেটি চালু করে দিয়ে পাশে বসল। পরক্ষণে আমার কাধে হাত রেখে বলল, কোন ভয় নেই, চলে গেছে। আমি তার দিকে তাকাতেই অশ্চর্য হলাম। সাথে সাথে বললাম, আরে তুমি? তুমি কেত্থেকে? সে অদ্ভুদ চাহনিতে মুচকি হেসে মাথা সামনের দিকে ঝুকিয়ে ঝুকিয়ে আমাকে বুঝাল, হ্যাঁ! আমি। ঘুম শেষ স্বপ্ন খতম চোখদ্বয় জেগে গেল।
এই ছিল ঘুম উবে যাবার কারণ। পরক্ষনেই নিজেকে অনেকটা ক্লান্ত-শ্রান্ত মনে হলো। শরীরটা ঘেমে গেছে। প্রচন্ড শীত থাকা সত্বেও গরম লাগছিল। কম্বলটি এপাশ ওপাশ করে ঠন্ডা বাতাস ডুকালাম যাতে গরম গরম ভাব চলে যায়। গলা শুকিয়ে গেছিল, বিছানা থেকে নেমে জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে সামান্য পান করলাম। পানিও ছিল প্রচন্ড ঠান্ডা এক দুই ঢোকের বেশি পান করা দুষ্কর। পুনঃ বিছানায় ফিরে শুয়ে পড়লাম। কম্বলের নিচে ডুকে ভাবতে লাগলাম এমন স্বপ্ন কেন দেখলাম? চরম মুহুর্তে তাকেই বা কেন দেখলাম? বেশি কিছু না দেখে কেনই বা ঘুম ভেঙ্গে গেল? ভয় পাবার পর তার সাথে দেখা হওয়ার সম্পর্ক কি? তার হাসি দেখার সাথে সাথে ঘুম ভাঙ্গার কারণ কি? আরো কত কি প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল।
ভেবে-চিন্তে কোন ক্লু বুঝে আসছিল না। আচ্ছা ওর সাথে আমার প্রথম দেখা কখন হয়? দশ বছর আগে এক শীতের সকালে তার সাথে আমার সাক্ষাত হয়। তখন সে অনেক ছোট ছিল, আমিও যে তেমন বড় ছিলাম তাও না। তার থেকে আমার বয়সের তফাৎ ছিল মাত্র চার বছরের। তার পর থেকে দীর্ঘ আট বছর তার সাথে আমার দেখা সাক্ষাত মানে সম্পর্ক বহাল ছিল। এখনো যে নাই তা না, বরং আছে তবে অনেক কমে গেছে।
একদিন আমার শিক্ষক মহোদয় বলল, একজন ছাত্রী আছে তুমাকে পড়াতে হবে। আমি বললাম; না, না, আমার দ্বারা পড়ানো হবে না। অন্য কাউকে পড়াতে বলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার কোন উজর গ্রহণ হলো না।
পরদিন সকালে মনের ভিতর টিপটিপ করছিল যখন আমার জীবনে পড়ানোর প্রথম অভিজ্ঞতা অর্জনের সময় হলো। আমি আস্তে আস্তে হাটছিলাম। ভাবছিলাম, ভাল করে পড়াতে পারবো তো? মনের অজান্তে কখন যে বাড়ির সামনে এসে পৌছলাম বলতে পারিনি।
দরজা খোলা ছিল। আমাকে দেখে ছাত্রী দৌড়ে পড়ার টেবিলে বসে পড়ল। আমি তার সামনে চেয়ারে গিয়ে বসলাম। মেয়টির চেহারায় চোখ পরতেই চমকে গেলাম। দেখতে রূপ কথার স্বপ্নের পরীর মত। যেমন দেখতে সুন্দর তেমনি কথা বলার ভঙ্গি, অপরদিকে না মোটা না চিকন স্বাস্থ। চেহারা ছিল চাদমুখো। এক কথায় রূপ কথার অপস্বরী।
তখন ক্লাস টু তে পড়ত, এখন পড়ালেখা বন্ধ। বিয়ে হয়ে গেছে কি না জানিও না।
এতো কিছু ভাবার পর হঠাৎ মনে হলো মনের অজান্তে কি আমি তাকে ভালবাসি? আরে নাহ! সে তো আমার ছাত্রী! তাকে আমি ভালবাসতে যাবো কেন? আর কখনো তো এমন ভাবিনি। সব সময় তাকে আমি নিজের বোন বা একজন ছাত্রী হিসেবে দেখেছি। উভয়েই তো হাসি কান্না খেলা গল্প গুজবে সামনা সামনি বড় হয়েছি। কখনো প্রেমের দৃষ্টিতে দেখিনি।
অচ্ছা সে কি আমাকে ভালবাসতো? এটা নিয়েও তো আমি কখনো ভাবিনি। আজ মনে হচ্ছে সে আমাকে ভাল না বাসলেও অনেক পছন্দ করে।
আমার মনের ভিতর তার জন্য অনেক ভালবাসা রয়েছে। তবে তা কোন ক্রমেই প্রেম না। আমি কখনোই তাকে প্রোমিকার নজরে দেখিনি। আমিও তার প্রেমিক হওয়ার বাসনা করিনি।
তাহলে আজ স্বপ্নে তাকে কেন দেখলাম? বিপদের মুহুর্ত তার দ্বারা কেন মুক্ত হলাম? হঠাৎ মনে হলো চমৎকার একটি কথা!
মেয়েটি আমার জীবনের জন্য ছিল ভাগ্যবতী। আমি তাকে লক্ষ্য করে অনেক কিছুই অর্জন করেছি। তাকে লক্ষ্য করে এখন পর্যন্ত দশের অধিক সনদ/ডিগ্রি অর্জন করেছি। এখনও করছি হয়তো আরো অনেক বাকি আছে।
তা হলে প্রশ্ন উঠে তাকে কেন্দ্র করে এতো কিছু কেন? তাকে কি ভালবাসি? সত্যি বলতে কি তার প্রেমিক হওয়ার জন্য আমি ভালবাসি না। তবে তাকে আমি মনের গভীর থেকে স্নেহ মায়া মমতা ও ভালবাসি। মনের অশান্তি দূর হয়ে যেত যদি তার সাথে কথা বলতাম। এক নজর দেখলে অনেক দিন পর্যন্ত মুখে হাসি থাকত। তার মতো একটি মেয়ে আমার জীবনের সাথী হলে সম্ভবত জীবনে অশান্তি বলে কিছু থাকবে না। আজ আমি তার থেকে অনেক দূরে। জানি না তার সাথে আমার কখন দেখা হবে। হয়তোবা হবে না।
অনেক দিন আগের এক শীতের সকালে তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছিল আর আজ এক শীতে গভীর রাতে তোমাকে স্মরণ করছি। তুমি যেখানেই থাকো ভাল থেকো। তোমার ভাল ও মঙ্গল কামনা করি।