১.
ছোট-খাটো দোখানটি এখন বেশ বড় ও আধুনিক হয়েছে। পূর্বেও চেয়ে আর্থিক অবস্থা এখন অনেক ভাল দেলুমিয়ার। সবাই বলে সেই নাকি ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রি করে রাতারাতি পয়সাওয়ালা হয়ে গেছে। দেলু বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছে। আত্মীয়-স্বজন মনে করে পাড়া-প্রতিবেশীরা দেলুর আর্থিক উন্নতিতে ঈর্ষানিত হয়ে এমন কুৎসা রটনা করে তার বিরুদ্ধে। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে দেলুমিয়া এই ইয়াবা ট্যাবলেট এর ব্যবসা চালিয়ে যায় খুব গোপনে । কয়েকবার পুলিশ তার দোখান তল্লাশি করেও কোন প্রমাণ পায়নি।

২.
দেলুর চেয়ে রতন মিস্ত্রি আর্থিক অবস্থা আকাশ পাতাল ব্যবধান। সুন্দরে মোহিত হয়ে পাশের গ্রামের রতন মিস্ত্রির এক মাত্র মেয়ে রতœাকে সব খরচ দিয়ে বিয়ে করেছে। দেলুর মা-বাবা নেই এক বোন ছিল তার ও বিয়ে হয়ে গেছে অনেক আগে। সংসারে এখন দু’জন দেলু আর তার স্ত্রী রতœা। কিছুদিন পর তাদের ঘরে নতুন অতিথি আসবে একলা বাড়িতে দেখাশুনা করার মতো কেউ না থাকায় রতœা বাপের বাড়ি চলে গেছে। যাওয়ার সময় পাশের বাড়ির বিজলি বানু কে ঠিক করে দিয়ে গেছে সময়মতো দেলুর খাওয়া-দাওয়ার যাবতীয় দেখাশুনা করতে।

৩.
অভাব-অনটনের মধ্যেও ভাল চলছিল বিজলি বানুর ছোট সংসার। হরতাল-অবরোধের সময় পেট্রোল বোমায় নির্মম ভাবে প্রাণ হারায় বিজলির স্বামী। এরপর থেকে বিজলি মানুষের বাড়িতে ঝি-এর কাজ করে সংসার চালায়। অনেকে তাকে বিয়ে করার প্রস্থাব দিয়ে ছিল। সমাজের দুষ্ট লোকেরা বিভিন্ন ভাবে লোভ দেখিয়ে কু-প্রস্থাব দিয়েছিল। দুই ছেলে-মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বিজলি সাড়া দেয়নি তাদের কোন আহবানে। সময়মতো কাজে আসে। কাজে ফাঁকি দেয় না কখনো। অন্য অনেকের মতো মালিকের অনুপস্থিতিতে চুরির অভ্যাস নেই বলে বিজলিকে সবাই পছন্দ করে। সাড়া গ্রাম জুড়ে এই জন্য বেশ সুনাম আছে তার ।

৪.
হাসপাতালের বারান্দায় অস্থিরচিত্তে পাইচারি করছে দেলুমিয়া অনেকক্ষন যাবত। অপেক্ষা করছে ডাক্তারের কাছ থেকে সুখবর শুনার জন্য। ডাক্তার এসে যা বলল তা প্রত্যাশা করেনি কখনো। মা সুস্থ থাকলেও সন্তান বেচেঁ নেই। চোখ দিয়ে অনবরত টপটপ জল পড়তেছিল শ্রাবণ ধারার মতো। নিজেকে ধরে রাখতে পারছিল না, হারানোর কষ্টে বুক ভেঙ্গে যাচ্ছিল তার। এখন বুঝতে পারছে হারানোর বেদনা কতটা কষ্টদায়ক। যা সেই আগে কখনো উপলব্ধি করেনি। পাপ কাজের জন্য আজকের এই পরিনতি। নিজের প্রতি খুব ঘৃনা হচ্ছে তার। এখন থেকে আর কোন খারাপ কাজ করবে না দেলু মিয়া শপথ করেছে মৃত সন্তানের মাথায় হাত রেখে।


৫.
বিজলি বানুর এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ে এক বছর আগে গলায় ফাঁস দিয়ে মারা গিয়েছিল। কেন এমন করেছিল মেয়েটি তার আসল রহস্য এখনো অজানা সবার কাছে। কেউ না জানলেও দেলুমিয়া বিবেকের কাছে নিজে এখনো অপরাধী। সেই দিন বর্ষার রাতে বিজলি বানু অসুস্থছিল বলে মেয়েকে পাঠিয়েছিল রাতের খাবার তৈরি করতে দেলুমিয়ার বাড়িতে। কামনার তাড়নায় ক্ষুধার্ত শিক্ষারী পশুর মতো ফাঁকা বাড়িতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মেয়েটির উপর। পরদিন মেয়েটি লজ্জা, ভয় আর অপমানে নিজেকে শেষ করে দিয়েছিল চিরতরে। বিজলি বানুর এখন বেচেঁ থাকার শেষ সম্ভল ছেলেটি পাহাড়ে গাছ কাটতে গিয়ে কুড়ালের আগাতে পা কেটে পেলেছে। মারাত্মকভাবে জখম হয়েছে ডান পায়ে। চিকিৎসা করতে হলে অনেক টাকার প্রয়োজন যার ব্যায় ভার বহন করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সাহায্যের জন্য অনেক জায়গায় গিয়েছে । সবার কাছ থেকে যা সহযোগিতা পেয়েছে তা দিয়ে চিকিৎসার খরচ হচ্ছে না। আরো অনেক টাকার প্রযোজন।

৬.
বিজলি বানুর ছেলে চিকিৎসা শেষে এখন পরিপূর্ন সুস্থ হয়েছে। মা তার ছেলেকে সুস্থ পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। ছেলের চিকিৎসার সব টাকা দেলুমিয়া দিয়েছে। নিজের কাছে কেমন যেন এক প্রশান্তি কাজ করছে। যে ভুলের কারনে মেয়েটি প্রাণ দিয়েছে তার ক্ষতিপুরণ কখনো টাকা দিয়ে মূল্যায়ন হবে না। যতদিন বেচেঁ থাকবে ততদিন এই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে মানুষের উপকার করে যাবে এমন প্রতীজ্ঞা দেলুমিয়ার। উপকার করার মাঝে এত সুখ এত আনন্দ থাকতে পারে যা আগে কখনো উপলব্ধি করেনি দেলুমিয়া। অন্যায় আর পাপ কাজের মাঝে ব্যক্তি জীবন কেমন কারে অশান্তি, অশুভ ছায়া আর অন্ধকারে পর্যবসিত হয় চলার পথে বিগত দিনগুলোতে তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে দেলুমিয়া । সন্তাান মৃত ভুমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে ইয়াবা ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে হালাল ব্যবসায় মনোযোগ দিয়েছে। এরপর থেকে সাধ্যমত মানুষের উপকার করা তার নিয়মিত নেশা হয়ে দাড়িয়েছে।