জ্ঞান বিকশিত হবার পর থেকে মা কে দু’কাপড়ের বেশি পড়তে দেখেনি রতন । কতবেলা অভুক্ত কিংবা আধ পেটা থেকে থেকে মা তাকে আজ এ পর্যায়ে এনেছে তা তার চেয়ে বেশি আর কে জানে ? আর সেই মা ই কিনা তাকে আদেশ করেছে মা কে ছেড়ে শহরে যেতে ।
শিক্ষক বাবা সিরাজুল ইসলাম মারা যাওয়ার পর থেকে মা রাবেয়া বেগম তাকে এমন ভাবে আগলে রেখে মানুষ করেছেন যেমন করে মা-মুরগী ছোট ছানাকে চিলের হাত থেকে রক্ষা করতে ডানার ভিতর লুকিয়ে রাখে । হাত মেশিনে সেলাই করতে করতে মায়ের কোমল হাত দু-খানায় কড় পড়ে গেছে । কত রাত যে ঢুলু ঢুলু ঘুম কাতর মায়ের দু-খানা মায়াবী চোখ জেগেছে রতনের ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে । কেউ দুটো বরই দিলেও মা স্ব-যতনে তলে রাখতেন তার জন্য । মায়ের চোখে রতন জেন কখনো বড় ই হয় না , তা না হলে এত বড় ছেলেকে কেউ লোকমা তুলে খাওয়ায় ।
রতনের দৃষ্টিতে পৃথিবীর সবচেয়ে বোকা ও সেরা মা । এই যেমন একবার “যেমন খুশি তেমন সাজো” প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে পুরস্কার নিয়ে এলে মা খুশিতে এমন খুশি হলেন যেন সে নিজেই পুরস্কার ছিনিয়ে এনেছেন । আবার রতন যেবার এস, এস, সি তে জিপিএ পাঁচ পেল সবাই যেখানে খুশিতে আত্বহারা মা সেখনে তাকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না । মায়ের চোখের অশ্রু রতন একেবারেই সইতে পারে না । মা যে তার চির দুঃখী । অল্প বয়সে মায়ের এ বিধবার সাঁজ মায়ের বয়স টাকে অন্তত বিশ বছর বাড়িয়ে দিয়েছে । কেড়ে নিয়েছে মায়ের মুখের মিষ্টি হাসি । হাস্যুচ্ছল মা কে সুন্দর দেখায় রতন তা জানে । কিন্তু বিরল সেই হাসি মায়ের ঠোঁটে শোভা পেয়েছে খুব কমই । রতন স্বপ্ন দেখে একদিন ঠিক দুঃখ নামের নরাধম কে পরাজিত করে সেই হাসিকে মুক্ত করে মায়ের মুখে ফিরিয়ে দিবে ।
এইচ,এস,সি তে ও রতন মায়ের দোয়ায় গোল্ডেন পাঁচ পেয়েছে । আর সেটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল তার জন্য । এই গ্রাম যার ধূলিকণায় গড়া রতনের সমস্ত দেহ আর তার মমতাময়ী মা কে ছেড়ে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে কি না যেতে হবে তার অপ্রিয় শহরের বুঁকে । শহরের লোকেরা রতনের কাছে যেন চক্ষুশুল । সবাই কেমন যেন একটু অহংকারী গোছের হয় । চেয়ারম্যানের ভাতিজা আকাশ রা শহরে থাকে মাঝে-মধ্যে গ্রামে আসে, কিন্তু গ্রামের মানুষ কে তারা কিছু মনেই করে না । নৌকা থেকে পা পিছলে পড়ে যাবার ভয়ে আরেকজনের কাঁধে পাদিয়ে তাদের নামতে হয় । শহরে মায়ের এক সই (বান্ধবী) থাকে নাম মমতাজ খানম রতঙ্কে সেখানেই উঠতে হবে । ২৮ই জুন রতন কে রওয়ানা হতে হবে সাহেবনগর থেকে জনৈক ফিরোজ কাকা তাকে পৌঁছে দিবেন এমনই ঠিক হল । সারা রাত মা-ছেলে বিছানা ভিজানো কান্না- কাঁটি গোপন রয়ে গেল পৃথিবীর কাছে ।
সূর্যের তেজ তখনো তেমন তীব্র হয় নি । ঘাট দেখে অবশ্য সেতা বলার অবকাশ নেই । রতন যে নৌকায় যাবে তা মনে হচ্ছিল শুধু রতনের আসার অপেক্ষায় ছিল । বাড়ি থেকে ঘাট অব্ধি মা-ছেলের কান্না যেন থামে না ।ঘাটের মাঝির যেন আজ একটু বেশিই তাড়া । সবাই দু-জনার কীর্তি দেখে কেউ কেউ নিরবে জল ছাড়ছেন । এ অশ্রু যেন বাঁধেই থামার নয় ।
নৌকা চোখের আঁড়াল হয়ে গেছে মা তবু ও তাকিয়ে আছে যেন তার দৃষ্টির বাইরে রতন কখন যেতে না পারে এই বিশ্বাসে ।
“রত্নদ্বীপ” । বিশাল একটি ফটক । ভয়ে ভয়ে নক করতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল গেরুয়া রঙের পোষাক পড়া মোঁটা-সোটা একটি লোক । রতনের আপাদ-মস্তক পর্যবেক্ষন পূর্বক ভুরু কুছকে জিজ্ঞেস করলেন- কি চাই?
রতন- জী!(ভীতু গলায়)। আমি মমতাজ খানমের সাথে দেখা করতে এসেছি।
লোকটি রতন কে নিয়ে ড্রইং রুমে বসিয়ে উপরে গেলেন । কিছুক্ষন পর লোকটা ফিরে এসে বলল- “পরিচয় দিতে গেলে নিজের নাম পয়লা কইতে অয় সেইডা ও তোমাগরে শিখাইয়া দিতে অইব”।(বোঝা গেল নাম জিজ্ঞেস না করায় লোকটাকে অন্দরমহল থেকে কিছু তেজী বাক্য হজম করতে হয়েছে)।
লোকটা চলে যাওয়ার পর রতনের দৃষ্টি পড়ল গোটা রুমের উপর । এত রীতিমত রাজমহল । মেঝেতে খয়ড়ি রঙের কার্পেট বিছানো,বাঁ-দিকে ছয়খানা চেয়ার সমেত ডাইনিং টেবিল, মাথার উপর বিশাল একটা ঝার বাঁতি । ডান দিকে নরম বসার গদি, পাশেই দেয়ালে সেটে দেয়া মস্ত বড় একটা অ্যাকরিয়াম (রতনের চেনার কথা নয়), তাতে পাঁচটা গোল্ড ফিস হয়ত পালানোর পথ খুঁজছে । চারপাশে দেয়ালে ঝুলে আছে বাহারী সাঁজের পোর্টেট । সোফার পিছনে আলমারি সেজেছে নানান লেখকের বই তে । ঠিক মাঝখান থেকে সাপের মত পেচিয়ে যে সিঁড়িটা উপরে উঠে গেছে সেখান থেকে আসা পায়ের শব্দে স্বপ্নের ঘোর কাটলো রতনের । হাল্কা আকাশি রঙের শাড়ি পড়া ছিমছাম দেহের গড়ন, গায়ের বর্ন উজ্জ্বল ফর্সা, চেহারায় গাম্ভীর্যের ছাপ রয়েছে স্পষ্ট তবে মায়ের বান্ধবীর চরিত্রে সে বড্ড বেমানান রতনের কাছে । এক কথায় রাজ্যের রানী মা । কখন যে সমিহ করে রতনের সমস্ত দেহ দু_পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে সে নিজে ও তা জানে না । অংগুলি ইশারায় ভদ্র মহিলা রতন কে বসার নির্দেশ দিলেন । রতন মহিলার উদ্দ্যেশে মায়ের দেয়া চিঠিখানা বাড়িয়ে দিলেন ।চিঠি পড়ার পর ভদ্র মহিলার গাম্ভীর্য ভাবখানা যেন হটাৎ উধাও । ভদ্র মহিলা কুলসুমের মা কে ডাকতে ডাকতে নিজেই রান্নাঘরে চলে গেলেন । ঢাকায় আসার পর এই প্রথম তার কিছুটা ক্লান্তির ছাপ পড়েছে মনে হল ।
কোমল একটা হাতের স্পর্শে ঘুম ভাংলো রতনের কিন্তু সে হাত মায়ের নয় সেটা সে বুঝতে পারল সে । চোখ খুলতেই দেখতা পেল সেই ভদ্র মহিলা । এত বেলা করে রতন কখনও ঘুমায় না কিন্তু কাল নরম বিছানায় ঘুম হয়ত বেশিই হয়ে গেছে তাই বোধহয় ।
এভাবেই মায়ের মমতা , ছোট রাফার (চশমা পরা জ্ঞানী সদৃশ মমতা খানমের পঞ্চম শ্রেনী পড়ুয়া পুতুলের মত মেয়ে) সাথে গল্প আড্ডায় ভর্তি পরিক্ষা শেষ হয়ে গেল । একদিন রাফা রতন কে জিজ্ঞেস করল রতনের কোন বন্ধু আছে কিনা? তাদের সাথে ফোনে আলাপ হয় কিনা? এবং রতনের বাড়ীতে ফোন নেই শুনে বেশ অবাক ও হল । এক দৌড়ে ফোন বুক নিয়ে পূনরায় ফিরে এল রাফা । রতনের হাতে ফোন বুক ধরিয়ে একের পর এক বন্ধুকে কল করে যাচ্ছে রাফা । হটাৎ ফোন বুক থেকে বেড়িয়ে এল মায়ের দেয়া সেই চিঠিখানা । অনেক বার বারন করে ও মনের অজান্তে চিঠিতে চোখ বুলাতে শুরু করল রতন ।
চিঠিতে লেখা…


মমতা,
স্বামী-সন্তান নিয়ে সাংসারিক জীবনে সুখে আছো এই হিত কামনাই করি সর্বক্ষন । সংসারের গ্যাড়াকলে ব্যস্ত হওয়ার কারনে তোমার দু-খানা পত্রের জবাব দিতে পারি নি বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ।
তোমাকে তো জানানো ই হই নি, রতনের বাবা মারা গেছে বছর দু-এক হল । ওর বাবার বিয়োগের পর থেকে পুরু সংসারটা যেন আমার কাঁধে ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে চলছে । আমি ও কেমন যেন আজকাল বেশ হাঁপিয়ে উঠেছি । বুকের ব্যাথাটাও বোধহয় বেড়েছে । নিজের উপর ঠিক আর বিশ্বাস পাচ্ছি না । ওর বাবার খুব সাধ ছিল সে তার ছেলে ডাক্তার হয়ে হত-দরিদ্র মানষের সেবা করবে ।তাছাড়া রতন ও আজ বেশ বড় হয়েছে তাই তার ও সত্য টা জানা দরকার । আজ হোক কাল হোক সত্য তার সামনে আয়নার মত সচ্ছতা পাবেই । তাই বোন তোমার আমানত তোমার নিকট পাঠিয়ে দিলাম । আজ অনেক দিন হল শান্তিমতো ঘুমাতে পারি না । বেশ ক’দিন ধরেই ঘুমের মাঝে স্বপ্নে দেখি ওর বাবা আমায় ডাকছে…।তাই ভাবছি ওকে তোমার কাছে পাঠিয়ে একটুখানি ঘুমাবো…
ছেলেটা আমার বড্ড অভিমানী বুঝলে । আমায় ছেড়ে কোথাও থাকেনি কখনও ।যদি কখনো আমার কাছে আসতে চায় তো মায়ের মমতা বলে আঁকড়ে ধরে রেখ । আমি জানি তুমি ঠিক মানিয়ে নিতে পারবে কেননা তুমি ওকে গর্ভে ধারন করেছ । তুমি রতনের প্রিয়-অপ্রিয় সবই বুঝবে । শহর ওর কাছে ভীষণ অপ্রিয়, তাই শহরের অভয়বে মানিয়ে নিতে হয়ত একটু কষ্ট হবে । তখন তোমার স্নেহের চাঁদরে ওকে ঢেকে দিও । ছেলে আমার আহ্লাদে বড়, নিজের হাতে ভাত খেতে পারে না, বলে আমি না খাইয়ে দিলে নাকি ওর পেট ই ভরে না । তুমি মা তবুও বলছি এত দিনের পুরুনো অভ্যেস সহজে কি যায় বল ?
অন্ধকার ছেলেটা খুব ভয় পায়, আর আকাশে সামান্য বিদ্যুৎ ঝলক এলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে সে কি চিৎকার । ছেলে আমায় খুব ভালবাসে আমিও চেষ্টা করেছি ছোট-খাটো চাহিদাগুলো পুরণ করতে । একবার ও যখন অনেক ছোট, বায়না ধরে বসল মেলা থেকে একটা পিতলের হরিণ কিনে দিতে হবে দাম সে কয়েকশ টাকা, একে ত টানাপোড়েনের সংসার তার উপর এই বায়না, পারিনি সেদিন কার সেই চাহিদা পুরণ করতে । ছেলে আমার অনেক কেঁদেছে, কিন্তু কি করবো বলো? বিধাতা আমায় সাধ দিয়েছে সাধ্য যে দেন নি, গর্ভ আছে কিন্তু সেথায় সন্তান ধারনের মত ক্ষমতা দেননি । আমার যা আছে তা দিয়ে ছেলের ভবিষ্যতের এক কাঁনাকড়ি ও পুর্ন হবার নয় । আমি কি সার্থের জন্য ছেলেকে নিজের কাছে আঁকড়ে রাখতে পারি? কাল যখন লোকে জানবে রতনের মা বেঁচে থাকার সম্বল হিসেবে ছেলেকে আগলে রেখেছে তখন নিজেকে কোথায় লুকাবো বলতো? ব্যাথাটা আবার বাড়লো বলে…।আজ এখানেই রাখছি । নিজের প্রতি যত্ন নিও।
ইতি,
তোমার খেলার সাথী
রাবেয়া
পুনঃশ্চঃ তারা বাবু কে দিয়ে আমার ভিটে খানা আমি আমার রতনের নামে লিখে দিয়েছি । ছেলের ভবিষ্যতে যদি গরীব এ অভাগীর দেয়া এ উপহারটুকু কোন কাজে আসে তবে নেজেকে বড্ড ধন্য মনে হবে ।
চিঠি পড়ার পর থেকেই রতনের মধ্যে এক অস্থির যন্ত্রনা শুরু হল মায়ের জন্য মনটা ভীষন কেঁদে উঠল তার । রাফার সামনেই ব্যাগে কাপড় গুছাতে লাগল সে । রাফা দৌড়ে মায়ের কাছে গিয়ে সেসব কথা জানাল । মমতাজ খানম রাফা কে রেখে রতনের ঘরে গিয়ে দরজা আটকে দিলেন । অতঃপর রতন কে অনুনয় বিনয় করে বুঝাতে গিয়ে যখন ব্যর্থ হলেন, তখন রতনের পায়ে পড়ে রতনের কাছে মাতৃত্বের ভিক্ষা চাইলেন । কিন্তু রতনের কাছে তার গ্রাম্য-মা এর মমতার কাছে কারো মাতৃত্বের দাবী বড় নয় মাস চারেক আগেও যার পরিচয় রতনের জানা ছিল না সে তার মা এর স্থানে কখন আসতে পারে না ।
পরদিন সকালে রতন কে প্রাইভেট কারে তুলে দিয়ে বিদায় জানালেন মমতাজ খানম চরম ইচ্ছার বিরুদ্ধে । মমতাজ খানম এর মনের ভিতর কি টর্নেডো বয়ে যাচ্ছে তা রতনের জানার কথা নয় । গাড়ীটা রতন কে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে আর মা হয়ে তা রুখতে পারছেনা সে সেই কষ্টে দু-ফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ল যা কুলসুমের মা এর দেখা সতের বছরের সবচেয়ে আশ্চর্যপূর্ন ঘটনা । রতনের যে কষ্ট হয়নি তা ও নয় কিন্তু রতন যে তার এত বছরের মায়ের মমতা ভুলতে পারে নি । রতনের চোখে জল ক্ষনে ক্ষনেই ভীড় করছে অজানা এক ভয়ে তার মা রাবেয়া খাতুন এখনো বেঁচে আছেন তো…