বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ১ ডিসেম্বর ১৯৭১

অস্তিত্ব জুড়ে

  • advertisement

    উত্তরবঙ্গের গ্রামের বাড়ি থেকে মিলা ও মাসুদ রওয়ানা হলো।

     

    বাস স্ট্যান্ডে দু’জনকে একত্রে দেখে যা আন্দাজ করার তা করে নিয়ে এলাকার এক বড় ভাই স্নেহের বশে মজা করে হাসির সহিত মিলাকে বললো, ‘‘একসঙ্গে যাওয়া হচ্ছে? লাঠি দিয়ে ঠ্যাং ভেঙ্গে দিব কিন্তু।’’

    মিলা তার কথা শুনে খিল খিল করে হেসে উঠলো।   

     

    প্রথমে ওরা ঢাকা গেল। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে গাছের ছায়ায় বসে সুখ-দুঃখের কথা বললো। ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে স্বপ্নের জাল বুনলো।

     

    মিলার সুন্দর, লাবণ্যময় মুখের দিকে চোখ রেখে এক সময় মাসুদ বললো, ‘‘মিলা, আমার মা তোমারও মা হবে। আমার বাবা হবে তোমার বাবা। মাসুম হবে তোমার দেবর। এ কথা ভাবলে কেমন লাগে?’’

    মাসুদের চোখের দিকে তাকিয়ে মিলার মুখাবয়ব লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। মুখ লুকানোর হাস্যকর ও ব্যর্থ প্রয়াসের মাঝে হেসে বললো, ‘‘আমার লজ্জা করে।’’

    মিলার লাজে রাঙ্গা অবয়ব দেখে মাসুদের মনে অন্যরকম এক অনুভুতি হলো।

     

    বেলা তিনটার দিকে চাঁন খার পুল অতিক্রম করে এগিয়ে গিয়ে নিরব হোটেলে দুপুরের খাবার খেল ওরা। এরপর আবারও সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে গেল। এই স্থানটা মাসুদের কাছে নিরাপদ মনে হয়। অন্য কোথাও মিলাকে নিয়ে ঘুরতে গেলে যদি খারাপ লোকের পাল্লায় পড়ে বিপদের সম্মুখীন হয়!     

     

    মিলা মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজে অনার্সে পড়ে। কথা ছিল যে ঢাকায় কিছু সময় ঘুরে বেড়ানোর পর মিলাকে মানিকগঞ্জের গাড়িতে তুলে দেবে মাসুদ। কিন্তু ঢাকায় বেশী সময় পার করার জন্য বিলম্ব হয়ে গেল। তাই গাবতলী গিয়ে তাড়াহুড়া করে মানিকগঞ্জের যে গাড়িটি ছেড়ে দিচ্ছিলো সেটাতেই সন্ধ্যার সময় মিলাকে তুলে দিল মাসুদ।  

     

    গাড়িতে উঠে মিলা জানালার কাছে বসে মাসুদের দিকে তাকালো। বিদায় জানাতে গিয়ে মাসুদের চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো। সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলো। গাড়ি ছেড়ে দিলে ধীরে ধীরে মিলার মুখটা দূরে চলে গেল। গাড়িটা চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত সে রাস্তায় দাঁড়িয়েই রইলো।    

     

    বিষণ্ণ মন নিয়ে মাসুদ নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার জন্য গুলিস্তানের গাড়ির দিকে পা বাড়ালো।

     

    হঠাৎ মাসুদের মনের মধ্যে খচখচ করে উঠলো। ছ্যাঁত করে উঠলো বুকের ভিতরে। একটা বিষয় মনে পড়ায় দুশ্চিন্তায় নিমজ্জিত হলো। কারণ মিলা একাকী গাড়িতে চড়ার সময় গাড়ির লোকরা কেমন যেন চাতুর্যপূর্ণ আচরণ করছিল। তাছাড়া মানিকগঞ্জ পৌঁছাতে বেশ রাত হয়ে যাবে। মিলা একা যাচ্ছে। সে একজন মেয়ে। মাসুদ তাকে ভালোবাসে। মিলার মারাত্মক কোনো বিপদ হলে মাসুদ বাঁচবে কিভাবে?

     

    মাসুদ এক মুহূর্ত স্থির থাকতে না পেরে দ্রুত মানিকগঞ্জের একটা ভালো স্পিডি গাড়িতে উঠলো যাতে রাস্তায়ই মিলার পুরানো ধরণের গাড়িটা ধরে ফেলতে পারে।

     

    মাসুদ উত্তেজনায় ছটফট করতে থাকলো আর সামনের দিকে তাকাতে লাগলো যে মিলার গাড়িটা দেখা যায় কিনা। খুব উত্তেজনা ও উদ্বিগ্নতা অনুভব করলো যে গাড়িটা ধরতে পারবে তো?

     

    অবশেষে নবীনগরের ওখানে মিলার গাড়িটার নাগাল পাওয়া গেল। মাসুদের গাড়িটা মিলার গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

     

    মাসুদ দ্রুত নিজের গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে মিলার গাড়িতে উঠলো। মিলা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলো মাসুদকে দেখে। মিলার পাশের সিট খালি থাকায় সেখানে বসলো মাসুদ। ডান পাশ থেকে বাম হাতটা মিলার ঘাড়ের পিছনে সিটের উপর মেলে দিল। মিলা জিজ্ঞাসা করলো, ‘‘কি ব্যাপার তুমি?’’

    মাসুদ লজ্জায় বলতে পারলো না যে সে তাকে ঘিরে উদ্বিগ্নতার কারণেই এসেছে।

    তাই সে বললো, ‘‘তোমাদের কলেজটা তো কোনোদিন দেখি নি। তাই ভাবলাম যে কলেজটা দেখে আসি। মিলা, এই পথটুকুতে তোমার কোনো সমস্যা হয় নি তো?’’

    মিলা কিঞ্চিৎ হেসে বললো, ‘‘না হয় নি।’’

     

    মিলার পাশে বসে মাসুদ চললো মানিকগঞ্জের দিকে। অথচ সেখানে গিয়ে মিলা নিজের হোস্টেলে উঠবে কিন্তু সে কোথায় রাত কাটাবে একবারও এই চিন্তা এলো না তার মাথায়। শুধুমাত্র মিলা আর একা নেই, সেও আছে মিলার সাথে এই স্বস্তিটুকুই মাসুদের পুরো অস্তিত্ব জুড়ে বিরাজ করতে লাগলো।

advertisement