বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ১ ডিসেম্বর ১৯৭১

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

প্রভুভক্তির চিত্তাকর্ষক গল্প

ওয়াহিদ মামুন লাভলু

  • advertisement

    ফরিদ তার পিতামাতার বহু আকাংখিত পুত্র সন্তান। তার জন্মের সপ্তম দিনে তার আক্কীকার ব্যবস্থা করা হলো। এই রকমের একটা আনন্দানুষ্ঠানে আত্মীয়-স্বজন যেখানে যে আছে তাদের কাউকেই তো আর বাদ রাখা যায় না।

     

    ফরিদের বাবা জুড়ান উদ্দিনকে দূর-দূরান্তরে যেতে হয়। তাই তিনি ঘোড়ায় চলাফেরা করেন। তার একটা পাখড়া ঘোড়া আছে।

     

    আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য জুড়ান উদ্দিন বের হলেন তার পাবনা জেলার বেড়া থানার জোড়দহ গ্রামের বাড়ির পশ্চিম দিকের সমস্ত আত্মীয়-স্বজনের বাড়ির উদ্দেশ্যে। সাঁথিয়া থানার নয়/দশটা গ্রামের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ির দাওয়াত প্রদান তিনি একদিনে সেরে আসবেন এটাই তার পরিকল্পনা।

     

    সকালে ঘোড়ায় চড়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে ৪টা গ্রাম হয়ে তিনি যখন প্রায় ৫ মাইল দূরে ফরিদের বড় খালার বাড়িতে গিয়ে উঠলেন তখন বেলা দুপুর। বৈঠকখানার খুঁটির সঙ্গে লাগাম আলতোভাবে একটা পেঁচ দিয়ে বেঁধে রেখে তিনি বাড়ির ভিতরে গেছেন; ইচ্ছা এই যে ফরিদের খালাকে দাওয়াতটা দিয়েই তিনি অন্য একটা গ্রামে চলে যাবেন এবং জোহরের নামাজ সেখানেই পড়বেন। জুড়ান উদ্দিন বাড়ির মধ্যে যেতেই ফরিদের খালা তাকে বসতে দিয়েছেন।

     

    জুড়ান উদ্দিনের কানে একটা হই-চই এর মত আওয়াজ যেন এলো। হঠাৎ একটা ছেলে দৌড়ে এসে খবর দিল, “আপনার ঘোড়া ছুটে গেছে।” জুড়ান উদ্দিন দৌড়ে বাইরে এসে দেখেন যে ঘোড়া পূরা কদমে বাড়ির দিকে ছুটে চলেছে। হয়েছে কি, জুড়ান উদ্দিন যখন ঘোড়া রেখে বাড়ির মধ্যে যান তখন ওইসব ছেলেমেয়েরাও এসে ঘোড়ার চারদিকে জড়ো হয় ঘোড়া দেখার জন্য। এক সময় তারা উল্লাসে সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে এবং ওতেই হয়তো ভয় পেয়ে ঘোড়া বাড়ির দিকে ছুটতে শুরু করেছে।

     

    জুড়ান উদ্দিন খুবই চিন্তিত হলেন। প্রথমতঃ ঘোড়া কি ঠিকমত বাড়ি পৌঁছাবে না হারিয়ে যাবে? দ্বিতীয়তঃ তার সামনে তখন ছিল চৈত্র মাসের সমগ্র দিন এবং দিনের সমস্ত কর্ম-পরিকল্পনা। আক্কীকার আর মাত্র তিন দিন বাকী। আজ যদি তিনি ওই দিকের সব দাওয়াত সারতে না পারেন তাহলে খুব অসুবিধা হবে। তাছাড়া তার বাড়ি ফিরে আসার প্রশ্নও আছে, তিনি এখন আছেন বাড়ি থেকে প্রায় ৫ মাইল দূরে! রাস্তা-ঘাট ভালো না হওয়ায় এ পথে গাড়ি চলে না। এই রকমের একটা নিরূপায় অবস্থায় পড়ে তিনি আর কি করেন!

     

    ওজু করে জোহরের নামাজ পড়ে তিনি সামান্য কিছু খেলেন এবং তারপর ঐ বাড়ির দক্ষিণ দূয়ারী ঘরের বারান্দায় মৃদুমন্দ বাতাসে গা এলিয়ে দিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে যেই একটু তন্দ্রার মতো এসেছেন অমনি কে যেন তাঁর কানে মধূ ঢেলে দিল, “আপনার ঘোড়া ফিরে এসেছে।” তিনি তড়াক করে উঠে পড়লেন এবং এক দৌড়ে বাইরের দূয়ারে এসে যা দেখলেন তাতে আনন্দে তার চোখে পানি এসে গেল। তিনি দেখলেন যে গলদঘর্ম অবস্থায় তার প্রিয় ঘোড়া তিনি যেখানে যে অবস্থায় তাকে দাঁড় করিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকেছিলেন সেখানে ঠিক সেই অবস্থাতেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, যেন কিছুই হয় নি। তাকে দেখে ঘোড়া খুব খুশী হলো বলে বোঝা গেল এবং তিনিও খুব খুশী হলেন। তিনি তাড়াতাড়ি গিয়ে ঘোড়ার লাগাম ধরলেন। ঘোড়ার গলায়, মাথায়, গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করলেন। ঘোড়া সে আদর গ্রহণ করলো। তিনি লক্ষ্য করলেন যে আর সবকিছুই ঠিক আছে শুধু গদীর উপর যে “চারজামা” বা আলগা একটা চাদরের মত থাকে সেইটা নেই, সম্ভবতঃ বাতাসে উড়ে কোথাও পড়ে গেছে।

     

    ঐ বাড়ি থেকে জুড়ান উদ্দিন আরও পশ্চিমের একটা গ্রামে গেলেন এবং সেখান থেকে ফিরতি পথে তার শ্বশুর বাড়ি সোনাতলায় গেলেন।

     

    বিকাল পাঁচটার দিকে জুড়ান উদ্দিন তার শ্বশুর বাড়ি থেকে নিজের বাড়ি ফিরে আসছেন। চৈত্রের বিকালবেলা বসন্তের ঝিরঝিরে বাতাস-কে পিছনে রেখে জুড়ান উদ্দিন পূর্বদিকে আসছেন মোটামুটি ধীর গতিতেই। তাদের গ্রাম থেকে ১ মাইল দূরের একটা গ্রাম থেকে পশ্চিমে দৃষ্টি চলে যায় এতখানি থাকতেই জুড়ান উদ্দিন দেখলেন যে একজন লোক গ্রাম থেকে বের হয়ে আসতে গিয়েই আবার গ্রামের মধ্যে ঢুকে গেল, হয়তো বা জুড়ান উদ্দিনের দিকে চোখ পড়তেই। রাস্তাটা যেখানে গ্রামকে ফোঁড় দিয়ে চলে গেছে, পথিকদের বিশ্রাম এবং পানি খাওয়ার জন্য সেখানে একটা ছায়াদার আম গাছ ও একটা কুয়া আছে জুড়ান উদ্দিন সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই একজন লোক সম্ভবতঃ সেই ফিরে যাওয়া লোকটিই হাসতে হাসতে এসে জুড়ান উদ্দিনের সামনে দাঁড়ালেন, তার হাতে জুড়ান উদ্দিনের ঘোড়ার গদির উপরকার সেই “চারজামা” খানা।

     

    জুড়ান উদ্দিন ঘোড়া থেকে নামলেন এবং সালাম বিনিময়ের পর লোকটির কাছ থেকে যা শুনলেন তার বর্ণনা নিম্নরূপঃ

     

    লোকটি বললেন যে তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। তিনি মাঠ থেকে বাড়ি ফেরার পথে আম গাছ তলায় কুয়ার ধারে বসে একটু জিরোচ্ছেন-একটু পরেই যাবেন, তার বাড়ি ওখান থেকে মাত্র “এক ঢিল দূরে।” এমন সময়ে পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখলেন যে চৈত্রের ধু ধু দুপুরে ধূলা উড়িয়ে পশ্চিম থেকে একটা ঘোড়া তীড় বেগে ছুটে আসছে অথচ ঘোড়ার পিঠে কোন সোয়ারী নেই। দেখতে দেখতে ঘোড়া পরিচিতির মত দূরত্বে যখন এলো তিনি তখন দেখেই বুঝলেন যে এটা তো জোড়দহ গ্রামের “প্রামাণিক সাহেবেরই” ঘোড়া কিন্তু ঘোড়ার পিঠে তিনি নেই কেন? জুড়ান উদ্দিন বাইশ গ্রামের প্রধান, সেসব গ্রামের বিচার-সালিশ তিনিই করেন এবং এলাকায় তার পরিচিতি “প্রামাণিক সাহেব” হিসাবে। সোয়ারীবিহীন ঘোড়ার এভাবে ছুটে আসতে দেখে তিনি আতংকিত হলেন। তবে কি খুন বা অন্য কোন দুর্ঘটনায় - - - ! ঘোড়া ততক্ষণে প্রায় বিশ হাতের মধ্যে চলে এসেছে, এমন সময় হঠাৎ গদির উপর থেকে চারজামাটা উড়ে মাটিতে পড়ে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়াও হঠাৎ করে থমকে দাঁড়ালো, বোধহয় এক মুহূর্ত কি যেন ভাবলো এবং তারপরেই লোকটি দৌড়ে গিয়ে ঘোড়ার লাগামটা ধরার জন্য উঠতে উঠতেই ঘোড়া আবার যে পথে এসেছিল সেই পথেই তীর বেগে ছুটে চললো এবং ক্ষণিকের মধ্যে পশ্চিম দিকে একটা গ্রামের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। সোয়ারীবিহীন অবস্থায় ঘোড়ার ওইভাবে ছুটে আসা এবং ফিরে যাওয়া দেখে লোকটি কোন নিশ্চিত দুর্ঘটনার আশংকাসহ চারজামাটা তুলে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন এবং সাড়া দুপুর সেই কথাই ভাবছিলেন। তারপর এই একটু আগে মাঠে বের হতে গিয়ে জুড়ান উদ্দিনকে আসতে দেখেই তিনি দৌড়ে বাড়ি গিয়ে চারজামাটা হাতে নিয়ে এই এখানে এসে দাঁড়িয়েছেন।

     

    জুড়ান উদ্দিন তার হাত থেকে চারজামাটা নিলেন এবং পূর্বাপর সব ঘটনা লোকটাকে বললেন। তখন সমস্ত ঘটনাই তাদের দু-জনের এবং উপস্থিত আরও সকলের কাছেই স্পষ্ট হয়ে গেল যে ফরিদের বড় খালার বাড়িতে ঐ অপরিচিত জায়গায় ক্লান্ত দেহে একাকি শিশুদের কাছ থেকে যে অপূর্ব সম্বর্ধনা ঘোড়াটা পেয়েছিল তার জন্যেই সে হয়তো ভীত হয়ে বাড়ির দিকে ছুটে চলেছিল, সোয়ারের কথা ভাবার মত অবস্থাও হয়তো তার ছিল না কিংবা সে খেয়ালও ছিল না কিংবা হয়তো বা মনে করেছিল যে সোয়ারী পিঠেই আছে। কিন্তু অনেক দূর এসে যেইমাত্র পিঠের উপর থেকে চারজামাটা উড়ে গেছে তখনই তার খেয়াল হয়েছে যে সর্বনাশ! সোয়ার তো পিঠে নাই! তখনই হয়তো তার সব কথা মনে পড়েছে এবং তাই ছুটে গিয়ে শিশুদের সেই অদ্ভূত সম্বর্ধনার ভয়কে উপেক্ষা করে ঠিক যেখানে এবং যেভাবে জুড়ান উদ্দিন প্রথমে নিয়ে তাকে দাঁড় করিয়েছিলেন সেইখানে এবং সেইভাবেই গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

     

    সকলে খুব অবাক হলো এই ভেবে যে অজানা অচেনা রাস্তায় ঘোড়া ঠিক ঠিক রাস্তা চিনে এলো এবং গেলো কিভাবে?

     

    লোকটাকেও দাওয়াত করে জুড়ান উদ্দিন বাড়ি ফিরে এলেন এবং পরে যথাসময়ে ফরিদের আক্কীকাও সম্পন্ন হয়ে গেল।

     

    আরবী ঘোড়ার প্রভুভক্তির আশ্চর্যজনক বহু গল্প বই-পুস্তকে পাওয়া যায়। কিন্তু জুড়ান উদ্দিনের ঘোড়াটির যে প্রভুভক্তি এই সত্য ও সুন্দর ঘটনাটির মধ্যে প্রকাশ পায় তা কি সে সব গল্পের চাইতে কোনো অংশে কম আশ্চর্যজনক ও কম চিত্তাকর্ষক?

advertisement