বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ১ মার্চ ১৯৮০

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

ব্যথার ব্যথী

বিন আরফান.

  • advertisement


    প্রথম পরিচ্ছেদ
    অরুনীর উদ্দেশ্যটা ছিল পাত্রী চাই। এক সময় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেই চোখ বুলাতেন পত্রিকার পাতা জুডে। জীবন বৃত্তান্ত, চাহিদামত খয়রাত আর খয়রাত ব্যাংক জমা করার জন্য সমপরিমানের অর্ধেক ভ্যাট ও সার্বিস চার্জসহ দুই তিন কপি ছবি আনুষাঙ্গিক কাগজ পত্র পাঠিয়ে অপেক্ষায় থাকতেন অরুনী, কবে ইন্টারভিউ কার্ড আসবে? একটা সময় কার্ড পেতেন যার আবেদনের সময় বার তার মনে থাকতো না। বাবা মায়ের কাছ থেকে তোষামোদ করে লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহনের টাকা নিতেন। পাশও করতেন। শুরু হতো মৌখিক পরীক্ষার প্রস্ততির পালা। পোষাক পরিচ্ছেদ ঠিক আছেন কিনা, নিজেকে ঐশরিয়ার মত দেখায় কিনা। সাজাতেন আর বিভিন্ন অঙ্গ ভঙ্গিতে দাড়িয়ে বাকাঁ বাকাঁ চোখে আয়নায় নিজেকে দেখতেন। না, ঐশিরিয়ার মত মনে হচ্ছে না। তবে পুরাতন আমলের নায়িকা সূচিত্রা সূচিত্রা বোধ হয়। ভাইবা বোর্ডে হাজির। মানবিক বিভাগ থেকে স্নাতক পাশ করে ‘অফিস সুপার’ পদে পরীক্ষা দিতে গিয়ে প্রশ্নের সম্মুখিন হোন আরএনএ ও ডিএনএর বৈশিষ্ট্য কি? এভাবে প্রায় পাচঁ বছর চালিয়ে হাপিয়ে পড়েছের অরুনী। চাকুরী নামক সোনার হরিণ তার হাতে ধরা দিল না। এদিকে বয়সটাও থেমে নেই। ত্রিশ ছুইঁ ছুঁই। এর মধ্যে আরো কিছু মৌখিক পরীক্ষার সম্মুখিন হযেছিলেন সেখানেও অনুত্তীর্ণ। তবে সেগুলো চাকুরীর জন্য নয়, বিবাহের জন্য। চাকুরীতে প্রশ্নের ধরণেই বুঝা যায়, আম্মা ভিক্ষা দেয়ার জন্য প্রস্তুত তো? যদিও মুখ ফোটে তা বলেনা, তাতে দূর্ণীতির প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে বিবাহের জন্য প্রস্তুতি পরীক্ষায় সেই ভিক্ষার কথা ইশারা ইঙ্গিতে বুঝাতে হয়নি, তা সরাসরিই দর কষাকষি হতো। কিন্তু তরুনী যৌতুক দিয়ে বিয়ে বসবেনা বলে সকলকে সাফ সাফ জনিয়ে দিতেন। তার বক্তব্য ছিল, বর কর্র্তৃক কনের কাছে যৌতুক চাওয়া আর বর কনেকে আম্মা কিছু টাকা ভিক্ষা দেন বলা সমান। তাই কোন সুহৃদয় যৌতুক বিহীন পাত্রী খুঁজে কিনা তাই খুঁজতেই প্রতিদিন প্রত্রিকায় পাতায়। সেই খুঁজ মিলছিলনা। গাড়ি বাড়ি, সিটিজেন, শর্ট ডির্ভোস, দ্বিতীয় বিবাহে আগ্রহী, সন্তানসহ গ্রামের গরীব, পর্দাশীল ইত্যাদির ভীড়ে অরুনী নিজেকে কোন কাতারে দাড়ঁ করাবেন তাই মিলানোর চেষ্ট করে চলছিলেন। এভাবে দেখার এক সময় চোখ পড়ল অবসর প্র্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা স্ত্রী মৃত নিঃসন্তান এর পাত্রী চাই। যাক বাবা, নাই মামা থেকে কানা মামাতো পেলেন।
    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
    ঠিকানা মোতাবেক পাত্রের বাসভবনের সামনে এসে হাজির হলেন অরুনী। বাসা তো নয়, বিশাল অট্রালিকা । তার সমস্ত শরীর ঝাকি দিয়ে উঠল। কোন অমঙ্গল হবে না তো ? তা হয়তো হবে না। এত সুন্দর বাড়ির মানুষের মনটাও নিশ্চই সুন্দর হবে। এই ভেবে ভেতরে প্রবেশ করলেন। আজব কান্ড ! আসবাবপত্র আর দেয়ালের চারপাশে দামি দামি চিত্রকর্মে রাজকীয় ড্রইং রুমটি কে ভূতের বাড়ি মনে হচ্ছিল। মানুষতো বহুদূর একটি কাকপক্ষীও নেই, অথচ দরজা খোলা। এবার ভয় কিছুটা ভর করল অরুনীর বুকে। ভয় ভরা চোখেই ঘরের চারপাশটা দেখছিলেন। হঠাৎ আওয়াজ আসল কে ওখানে? গায়ে যেন সাপ পড়েছে। এমন শিহরিত কন্ঠে আমি বলে উত্তর দিয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে দেখেন ষাট পয়ষট্রি বছরের এক বৃদ্ধ। একটু সাহস পেলেন। আর যাই হোক বৃদ্ধের দ্বারা অনৈতিক কিছু হওয়ার সম্ভবনা কম। লোকটি নিচে নেমে এসে জানতে চাইলেন, কি মনে করে এখানে এসেছেন? তরুনী এমন প্রশ্নে বিব্রত বোধ কররেও আমতা আমতা করে জবাব দিলেন, পত্রিকায় দেখলাম একজন পাত্রী খুঁজছেন। ঠিকানা এ বাড়িরই দেয়া। একথা শোনে লোকটি জানালেন, “ও, বুঝেছি। বসুন, ঠিকই দেখেছেন। বিজ্ঞাপনটি আমিই দিয়েছিলাম।” বুড়া কালে বুড় কুয়ারা দেখে অরুনী লোকটির দিকে ঘৃনা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু বলতে চেয়েও চেপে গেলেন।
    লোকটি নিজ থেকেই বলছিলেন, সেনাবাহিনী থেকে অবসরের বছর দুই পূর্বেই স্ত্রী মারা গেছে। কোন মেয়ে নেই, তিন ছেলে। দুজন অষ্টেলিয়া আর একজন আমেরিকা বসবাস করছে। শুনেছি বিয়েও করেছে। প্রায় বিশ বছর হলো তাদের সাথে কোন যোগাযোগ নেই। সন্তানেরাও আমার কেহ খোঁজ নেয় না। বাবার মন তো তাই আমি নিজেই বিভন্ন মাধ্যম ধরে একটু আধটু সংবাদ পাই। আমি এতটাই সঙ্গীন যে, অসুস্থ হলে আমাকে এক গ্লাস পানি এনে দেবে সেই লোকটিও নেই। ধন সম্পদ আর অট্রালিকার ভেতর তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি। না ঠিক মত খেতে পাচ্ছি, না সেই ভোকের কথা কারো সাথে বলতে পারছি। শুধু মানষরুপি একটি যন্ত্র হয়ে বেঁচে আমি। বযসের শেষ প্রান্তে এসে পড়ায় সম বয়সী বন্ধুদের অনেকেই আজ নেই। যে দুই চার জন আছে তারাও ডিজিটাল। আমি যন্ত্রের কাছে আরেক যন্ত্রের মাধ্যমে জানতে চায়, আমি কেমন আছি ? সরাসরি মিথ্যে বলে দেই, ভাল, খুব ভালো। বলেই লোকটি শিশু সুনভ কান্নায় জড়িয়ে পড়লেন।
    অরুনী দূরে বসে থাকবে পারলেন না। লোকটির কাছে গিয়ে আলত হাত বুলিয়ে বললেন, এতটা ভেঙ্গে পড়বেন না। যার কেহ নেই তার আল্লাহ আছ্।ে যদিও অরুনী পাত্রী বেশে এসেছেন, এমন পরিস্থিতি সেই বোধটা কজ করছিলনা। না করাটাই স্বাভাবিক । লোকটির প্রতি অরুনীর ভালবাসার জন্ম নিল। ভালবাসা এক রঙের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, স্থান কাল পাত্র ভেদে সে বিভিন্ন রঙ ধারণ করে।
    তৃতীয় পরিচ্ছেদ
    জীবনে জমে থাকা অনেক না বলা কথা একে অপরের নিকট বর্ণনা করলেন। বয়সের বেশ বেবধান হলেও নিরূপায় লোকটি জানতে চাইলেন, অরুনী তাকে বিয়ে করতে সম্মত কীনা? দুইয়ে দুইয়ের যোগফল আর গুনফল যেহেতু সমান অরুনী সম্মতী না দিয়ে কি পারে? ভাগফল যে শূন্য তাওতো স্পষ্ট। এই বুড়ো বয়সে লোকটি বিড়াল মারতে পারবে বলে মনে হয় না। নিঃসঙ্গ জীবনে লোকটির বেঁচে াকার একটি অবলম্বন হলো, অরুনীরও সুন্দর মাথা গোজার ঠাই হলো। এছাড়া লোকটির এক পা ইতিমধ্যেই কবরে হাবুডুবু খাচ্ছে, দ্বিতীয় পা’ও ছুই ছুই, শরীর অব্দি আসতে বেশী সময় লাগবেনা। তখন নিজের বাড়ি থাকরে, সম্পদের পাহাড় থাকবে। তা দেখিয়ে পছন্দের পাত্রই মিলবে ধারণা করে সে বিবাহ করতে রাজি আছেন বলে লোকটিকে জানিয়ে দিলেন। লোকটি অরুনির বাবা মায়ের সম্মতি আছে কিনা জেনে পরদিন তাদের নিয়ে আসতে বললেন। লোকটিার প্রতি অরুনীর মনুষ্যবোধ এতটাই অনুকুলে ছিল যে তার মা বাবা প্রতিকুলে থাকলেও অরুনীর আগ্রহ আর সার্বিক দিক বিবেচনা করে রাজি হয়ে যান। এতে সপ্তাহ খানেক সময় অতিক্রম হয়ে যায়।
    চতুর্থ পরিচ্ছেদ
    এক সপ্তাহ পর অরুনী তার বাবা মা সহ বিবাহের প্রস্তুতি নিযে লোকটির বাড়ি গেলেন। সীমানায় পা রাখতেই নাকে আতর চন্দরের সুবাস পেলেন। জন শূন্য বাড়ির আঙ্গিনায় লোক ভিড় করে আছে। তাদের সামনে সাদা কাপড়ে ঢাকা কাঠের পালকি, যার চারপাশে আগরবাতি জ্বলছে। উপস্থিত সবাই নিঃশব্দে। অরুনী ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে গেলেন। সাদা কাপড়ে শরীর ঢাকা থাকলেও মুখটা খোলা ছিল। দেখা মাত্রই অরুনীর ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। চার আঙ্গুলের কপাল কখনো কি পাচঁ আংগুল হয়? তাতেও অরুনী বিচলিত ছিলেন না বরং দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছিলেন, হয়রে জীবন শুধু বেঁচে থাকার জন্য। জীবনটা মানব সেবার কাজে লাগাতে পারলেননা। বিশাল অট্রালিকার মালিক এখন ঘরের বাহিরে অবেহেলিত হয়ে পড়ে আছে। অরুনীর বুকে কষ্টের মেঘ জমাট বাধল। ভূবনটা তার আপন না থাকায় বৃষ্টিতে রূপ নিচ্ছলনা। তরে চোখ টলমল করছিল, এই বুঝি বৃষ্টি হবে। অরুনীর মা তার মাথায় হাত বুলালে বৃষ্টি ঝড় হয়ে মায়ের বুকেই গর্জনের সাথে বইয়ে দিলেন। এবার মনে হচ্ছে এটা মৃত বাড়ি। কেহ একজন মারা গেছেন এখানে । অরুনীর কান্নার শব্দ পেয়ে অট্রালিকার ভেতর হতে কয়েকজন বেড়িয়ে এলেন। তাদের একজন অরুনীর নাম জানতে চাইলেন। নাম বললে তিনি বললেন, বাবা মৃত্যুর পূর্বে তোমাকে একটি চিঠি লিখে গেছেন। খামের উপরে লেখা অরুনী ভিন্ন অন্যদের খোলা নিষেধ বলে খোলিনি। কাল এসে নিয়ে যেও।
    পঞ্চম পরিচ্ছেদ
    পরদিন অরুনী গেলেন চিঠিটা আনতে। গোটা বাড়ি মেজবানদের কলকাকলিতে ভরপুর। শোক পালনের উল্যাস বইছিল। নানান মুখরোচক খারারের ঘ্রাণ নাকে আসছিল। ঘরে প্রবেশের ঠিক পূর্ব মুহুর্তে কানে আসলো কে যেন বলছে, বুইড়া, ঘরের কি হাল করে রেখেছে? মানুষ এত নোঙরা হয়।
    কথাগুলো শুনে অরুনী ঠোট ভেংচি দিয়ে মৃদু হাসির ভান করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এরইমধ্যে মৃতের ছেলে এসে অরুনীকে চিঠিটা দিলেন আর বসে কিছু ভেয়ে যেতে বললেন। অরুনী না বোধক উত্তর দিয়ে বেরিয়ে এলেন। পথে এসে চিঠিটা খোলে পড়তে থাকেন,
    “অরুনী ভালোবাসা নিও। বেশ কিছুদিন ধরে নিজের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছি। প্রায় বাতে স্বপ্ন দেখি স্ত্রী আমাকে ডাকছে। হয়তো অচিরেই তার ডাকে সাড়া দিতে হবে। নিঃসন্তান বলে বিজ্ঞাপন এই জন্য দিয়েছিলাম, কেহ আমার খুঁজ নেয় না। এ বিশাল সম্পদ কাউকে দান করব ভাবছিলাম। ভাবতে ভাবতে ছোট বেলার একটি স্মৃতি মনে পড়ল, যা মা বলেছিলেন। কোন হতাশা গ্রস্থকে উপকার করলে সাড়া জীবন সে দোয়া করে। দেশে যে হারে যৌতুক প্রবণতা বেড়েছে, একটি পরিবারে এর চেয়ে হতাশা আর কি হতে পারে ? তাই এমন একজন হতাগ্রস্থের উপকারে আসতে বিজ্ঞাপনটি দিয়েছিলাম। আমার সমস্ত সম্পত্তি তোমাকে দান করে গেলাম। আমার জন্য দোয়া করো, যেন আমি জান্নাতবাসী হই।”

advertisement

  • জালাল উদ্দিন  মুহম্মদ
    জালাল উদ্দিন মুহম্মদ বেশ ভাল লাগলো গল্প কথন। চমৎকার কাহিনী চিত্র। এ চাড়াগাছটা শাখা-প্রশাখা মেললে একটা উপন্যাস হতেপারে। আপনার লেখা একসাথে গতিশীল ও প্রগতিশীল। ধন্যবাদ ও শুভকামনা।
    প্রত্যুত্তর . ১২ এপ্রিল, ২০১২
  • আবু ওয়াফা মোঃ মুফতি
    আবু ওয়াফা মোঃ মুফতি আপনার কাছে প্রত্যাশা অনেক! তাই হয়তো তৃপ্তি মিটলনা| গল্প-কবিতার অঙ্গনে আপনি অতি পরিচিত| চেনা ... এর কি পৈতা লাগে? ছবি অনাবশ্যক মনে হল|
    প্রত্যুত্তর . ১২ এপ্রিল, ২০১২
    • বিন আরফান. চেষ্টা চালাচ্ছি. আর আপনার কথা রেখেছি.
      ১২ এপ্রিল, ২০১২