বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ৩০ জানুয়ারী ১৯৮৫

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

মালদাহের পথে

শামস্ বিশ্বাস

  • advertisement

    ঈদে ডে-অফ, এদিক-ওদিক করে ছুটি পেয়ে গেলাম ৮ দিন! যেখানে ২ দিন ছুটি জুটে না সেখানে এতগুলো দিন! টিকিট সংকট আর রাস্তার জ্যাম লাগার আগেই ঢাকা থেকে রাজশাহী চলে এলাম। বাড়ি আসার পরে বোরিং লাগা শুরু হল। কোথাও বেড়াতে যাওয়া দরকার? পরিচিত অনেকে দেশে যাচ্ছে ছুটিতে। কিন্তু আমরা যাব কই? সবখানে শুরু হয়ে গেছে টিকিট সংকট আর রাস্তায় জ্যাম। রিয়াজ প্রস্তাব দিল মালদাহ ঘুরে আসার। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক সরকারি কলেজের নাম আদিনা কলেজ। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে ছিলাম, আদিনা কেন? সেখানে আদিনা বলে তো কিছু নেই। পরে শুনলাম বর্ডারের ওই পারে মালদায় দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় মসজিদ আদিনা। কাছে এত বড় একটা ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান থাকার পরে শুধু বর্ডারের জন্য দেখা হবে না? ব্যাস, যেমন চিন্তা তেমন কাজ। ৪ দিনের মধ্যে আমরা ভারতের মালদহে পৌঁছলাম।

     

     মালদাহ জেলার নামকরণ এ জেলার আদি বাসিন্দা 'মলদ' কৌমগোষ্ঠীর নাম থেকে। অন্যমতে, ফারসি 'মাল' (ধনসম্পদ) ও বাংলা 'দহ' শব্দদ্বয়ের সমন্বয়ে এই জেলার নামটির উৎপত্তি।

     

    ব্রিটিশ শাসনের আদিপর্বে মালদাহ জেলার কোন অস্তিত্ব ছিল না। এ জেলার কিয়দংশ পূর্ণিয়া জেলার ও অবশিষ্টাংশ অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৮৫৯ থেকে ১৮৭৬ সাল পর্যন্ত মালদাহ জেলা আমাদের রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত ছিল। ১৮৭৬ সালে এ জেলা ভাগলপুর বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯০০ সালে আবার আমাদের রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট শিবগঞ্জ, নবাবগঞ্জ, ভোলাহাট, নাচোল ও গোমস্তাপুর থানা বাদে মালদাহ জেলা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে মালদাহ বা মালদা জেলা পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি বিভাগের একটি জেলা। এ জেলার পশ্চিমে ও উত্তরে বিহার রাজ্য, উত্তর দিনাজপুর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা; পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে রাজশাহী বিভাগ, দক্ষিণে মুর্শিদাবাদ জেলা অবস্থিত। মালদাহ একটি কৃষিনির্ভর জেলা। বৃহৎ শিল্পে এ জেলা বিশেষ অনুন্নত হলেও এখানকার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। সুলতানি যুগের বিভিন্ন স্থাপত্য নিদর্শনকে কেন্দ্র করে একটি উল্লেখযোগ্য পর্যটন শিল্পও এখানে বিকাশ লাভ করেছে। মালদহের গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় উত্তরবঙ্গের দ্বিতীয় সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০১ সালের জনগণনা বা আদমশুমারি অনুসারে ৩৪৫৫.৬৬ বর্গ কি.মি. এ জেলার মোট জনসংখ্যা ৩২ লাখ ৯০ হাজার ১৬০ (মুসলিম ৪৯.৭২%, হিন্দু ৪৯.২৮%, অন্যান্য ১%)।

     

     যে জ্যামের ভয় করছিলাম এখানেও তাই। চারদিকে ঈদের প্রস্তুতি। ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে গরু আসছে আমাদের দেশে যাওয়ার জন্য। স্থানীয়দের মনে হচ্ছে না দেশের বাইরে আছি, মনে হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আছি।

     

     মালদা শহর থেকে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে ২০ কিলোমিটার দূরে ইতিহাস বিখ্যাত আদিনা মসজিদ। এর বিপরীতে আছে আদিনা মৃগদাব। দিল্লীর নবাব ফিরোজ শাহ তুঘলককে পরাজয়ের স্মারক ১৩৬৪-১৩৭৪-এ এটি বানান ইলিয়াস বংশের দ্বিতীয় সুলতান সিকান্দর শাহ। সিরিয়ার উমাইয়া মসজিদের আদলে তৈরি উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত মসজিদটির আয়তন ৫২৪ ফুট লম্বা ও ৩২২ ফুট চওড়া। গঠনশৈলী ও বিশালত্বে অনন্য মসজিদটি দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ। ঊনবিংশ ও বিশ শতকে বড় বড় ভূমিকম্পে এর পিলার ও ছাদ ভেঙেছে।

     

     স্থাপত্য শিল্প, কারুকার্য ও বিশালতায় এই মসজিদ অতুলনীয়। এ মসজিদটি সুলতান সিকান্দর শাহ প্রচুর অর্থ ব্যয় করে নির্মাণ করেন এবং সময় লেগেছিল ১০ বছর (১৩৬৪ থেকে ১৩৭৪)। এ মসজিদটিতে সুলতান, তার পারিষদবর্গ ও পাণ্ডুয়ার সব অধিবাসী (কথিত আছে দশ হাজার) একত্রে জুম্মার নামাজ পড়তেন। ভেতরে ৪০০ ফুট লম্বা ও ১৫৫ ফুট চওড়া প্রাঙ্গণ আছে, যেটা পুরু দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এতে ২৬০টি থাম ও ৩৮৭টি গম্বুজ আছে। এখানে ৯৮টি খিলান ছিল। এখন অনেকটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত, তবে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে সারাইয়ের কাজ চলছে।

     

     এ মসজিদের কিছু উপাদান অমুসলিম শিল্পরীতি থেকে নেয়া বলে মনে করা হয়। দামাস্কাসের বড় মসজিদের ধাঁচে তৈরি এ মসজিদটির মাঝে অবস্থিত ছাদহীন চত্বরটির মাপ ৪২৬.৬ ফুট লম্বা ১৪৭.৭ ফুট চওড়া। কলামের ওপর ছাদবিশিষ্ট এ গঠনশৈলীর নাম 'হাইপোস্টাইল'। অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশে এ ধাঁচের একমাত্র মসজিদ। পশ্চিমে নামাজের অংশটিকে দুটি কক্ষে ভাগ করেছে একটি ৭৮ ফুট লম্বা ৩৪ ফুট চওড়া অলিন্দ, যার উচ্চতা ৬৪ ফুট। দক্ষিণ-পূর্বে আর্চবিশিষ্ট তিনটি তোরণ পেরিয়ে মসজিদে ঢুকতে হতো। এখন পূর্ব দিকের প্রবেশ পথটিই আছে। এছাড়া উত্তর-পশ্চিমে তিনটি পথ আছে।

     

     এর ভেতরে মেঝে থেকে ৮ ফুট উঁচুতে বাদশাহর নামাজের স্থান 'বাদশাহ কি তখত' নামে একটি মঞ্চ রয়েছে, যার পেছনের পাথরের জালির আড়ালে সুলতান পরিবারের মহিলারা নামাজ পড়তেন।

     

    আর্কিওলজিক্যাল সোসাইটি নীলচে-ছাই রঙা কষ্টিপাথরে তৈরি 'মিহরাবের অংশটির কারুকাজ সংরক্ষণ করেছে। ভেতরের পিলারগুলোর উপরাংশ ইটের, নিচের অংশ পাথরের। পিলার বা কলামগুলো স্থাপিত জ্যামিতিক ছন্দে। মূল গম্বুজটি রয়েছে কেন্দ্রীয় অলিন্দের শেষে। গম্বুজে খুদিত আছে ইসলামিক ও হিন্দু সংস্কৃতির বহু মোটিফ। বাদশাহ-কি-তখতের অভ্যন্তরের ইংরেজি 'এল' আকৃতির অলিন্দের শেষের দুটি দরজা। তার একটির ভেতরের সিকান্দর শাহর সমাধি। অনেকের মতে, এটি তার আসল সমাধি নয়, বরং শাহের প্রবেশপথ।

     

    ঐতিহাসিকদের মতে, এ মসজিদ তৈরির সময় নিকটবর্তী এলাকার অনেক মন্দিরের ভাঙা পাথর ব্যবহৃত হয়েছে। প্রাক-মুসলিম যুগে বল্লাল সেন-লক্ষ্মণ সেনদের এ রাজধানীর নাম ছিল লক্ষণাবতী (বা লক্ষ্নৌতি)। সেই সময়কার বহু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এ পাথর।

     

    এ মসজিদ আসলে হিন্দুদের 'আদিনাথ মন্দির', এ অজুহাতে গত শতাব্দীর শেষ দশকে ধর্মান্ধরা আদিনা মসজিদে হামলা করে। এক সময় এ এলাকায় বসবাসকারী নাথ গোষ্ঠীর মানুষের আরাধ্য হলেন আদিনাথ। ঐতিহাসিকরা অবশ্য এর কোন প্রমাণ পাননি। যদিও খাপছাড়াভাবে হিন্দুমন্দিরের ধ্বংসাবশেষ ব্যবহারের কথা তারা স্বীকার করেন। পারসিকে আদিনা শব্দের অর্থ 'শুক্রবার' বা 'জুম্মা' বার। জানা যায়, এ কারণে বড় মসজিদকে মুঘলরা বলে 'জুম্মা মসজিদ' আর ফারসিভাষী মুসলমানরা বলেন 'আদিনা মসজিদ'।

     

    আরকটি বিষয় উল্লেখ না করলে আদিনার ইতিহাস অসমাপ্ত থাকবে। মালদার সাঁওতালরা জমিদার ও ইংরেজদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে জিতু সাঁওতালের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে ও জমিদারদের কোণঠাসা করে ফেলেন। আদিনাতে তারা নিজেদের গড় তৈরি করেন। গান্ধী কে, তা না জানলেও জিতু নাম নেয় 'গান্ধী সেনাপতি'। গান্ধী মানে তাদের কাছে ইংরেজ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। হিন্দু ও মুসলমান জমিদাররা ব্রিটিশ বাহিনী সঙ্গে নিয়ে আদিনা ঘিরে ফেলে। গুলির লড়াই হয়, মসজিদের ভেতরে মিহরাবে যার দাগ আজও আছে। অবশেষে সন্ধির নাম করে জিতুকে ডাকা হয়। জিতু সামনে এসে দাঁড়ালে তাকে গুলি করে হত্যা করেন কোতোয়ালির জমিদাররা। এ কারণে তাদের 'খান চৌধুরী' উপাধি দেয় ইংরেজরা। সেই বংশেরই সন্তান ছিলেন এ এলাকার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা সাবেক ভারতীয় কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী গণি খান চৌধুরী।

     

    থাকার জায়গা : মালদহে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের মালদা টুরিস্ট লজ। পিয়াসবারিতে জেলা পরিষদের টুরিস্ট লজ আছে। কুলীকে পাখিরালয় লাগোয়া পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের রায়গঞ্জ টুরিস্ট লজ। রায়গঞ্জে স্টেশনের কাছে জেলা পরিষদের বাংলো। এছাড়া মালদাহ ও রায়গঞ্জ শহরে অনেক বেসরকারি হোটেল আছে।

     

     

    কেনাকাটা : ভারতবর্ষজুড়ে মালদহর ফজলি আম বিখ্যাত। তাই সবচেয়ে সেরা আম ও আম থেকে তৈরি আমসত্ত্ব, আচার এসব কেনা যায়।

     

     

    যাতায়াত ব্যবস্থা :  বিমানপথে কিংবা রেলপথে গেলে কলকাতা হয়ে মালদা টাউন (MLDT) স্টেশনে যেতে হবে। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের সীমান্তের স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে প্রবেশের পর বাসে করে মালদা যাওয়া যায়। সবচেয়ে কাছে হয় ছোট সোনা মসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে। মালদাহ থেকে ট্যাক্সি, টাঙ্গা বা বাসে গৌড়-পাণ্ডুয়া ঘুরে নেয়া যায়। বাসে করে গৌড় যেতে হলে পিয়াসবারিতে নামতে হবে। সরাসরি রায়গঞ্জে এসেও কুলীক ঘোরা যায়।

     

     

    মালদহজুড়ে আরও যা দেখা যাবে : মালদহকে কেন্দ্র করে ঘুরে নেয়া যায় বাংলার অতীত ইতিহাসের সাক্ষী গৌড় ও পাণ্ডুয়া। মালদহের দক্ষিণে গৌড় ও উত্তরে পাণ্ডুয়া। রাজা শশাঙ্ক থেকে দেবপালের আমল পর্যন্ত গৌডরে স্বর্ণযুগ বলে চিহ্নিত। ভেঙে পড়া প্রাচীন মসজিদ, মিনার, প্রাসাদ আজও অতীত সমৃদ্ধির কথা বলে। মালদাহ থেকে গৌড় যাওয়ার পথে পিয়াসবারি দীঘি। পিয়াসবারির পশ্চিমে বৈষ্ণবতীর্থ রামকেলি। রামকেলি থেকে আধ কি.মি. দক্ষিণে বারোদুয়ারী বা বড় সোনা মসজিদ। আর রয়েছে ফিরোজ মিনার, কদম রসুল মসজিদ, চিফা মসজিদ, লুকোচুরি গেট, বাইশগজী প্রাচীর, ছোট সোনা মসজিদ, তাঁতিপাড়া মসজিদ, লোটন মসজিদ, গুণমন্ত মসজিদ, চামকাটি মসজিদ প্রভৃতি। আদিনা মসজিদ থেকে ১ কি.মি. দূরত্বে সুলতান সিকান্দর শাহের গড়ের ধ্বংসাবশেষ সাতাশঘরা। পাণ্ডুয়ার অন্য দ্রষ্টব্যগুলো হল, বড়ি দরগাহ, সালামি দরওয়াজা, ছোটি দরগাহ, একলাখী মসজিদ ও কুতবশাহী মসজিদ। পাণ্ডুয়া থেকে ৫৬ কি.মি. দূরে কুলীক নদীর পাড়ে কুলীক পাখিরালয় (Kulik Bird Sanctuary)। ১৯৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় উদ্যানের শিরোপা পেয়েছে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ পাখিরালয়। জুলাই থেকে অক্টোবরে জারুল, শিমূল, শিশু, সেগুন, অর্জুন গাছে ছাওয়া রায়গঞ্জ ঝিলে পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে যায়। মাছরাঙা, বক, ফিঙে, ছাতারে, দোয়েলের পাশাপাশি ভিড় জমায় শামুকখোল, হেরণ, কমোরান্টের মতো ভিনদেশীরা। মালদহর ৩৫ কি.মি. দক্ষিণে আমাদের উত্তরবঙ্গের ফারাক্কা ব্যারাজ।

advertisement