বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-ঐতিহ্যমন্ডিত পরিবারের যোগ্যতম কীর্তিমান পুরুষ

লুতফুল বারি পান্না

  • advertisement

    জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার যে আর দশটা জমিদার পরিবারের মত ছিল না, একথা সর্বজনবিদিত। সমাজতান্ত্রিক চেতনার আলোকে তাঁরা শ্রেণীশত্রুই ছিলেন। কিন্তু এই ধারণাটিকে সরলীকরণ করা যে কতখানি ভুল তা এই পরিবারটিকে বিশ্লেষণ করলে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়। ‘অর্থ অনর্থের মূল’ বলে যে প্রবাদটি আমরা শুনি তার বিপরীত দিকে অর্থের যথাযথ ব্যবহার যে কতটা সামাজিক এবং সার্বিক কল্যাণ বয়ে আনতে পারে এবং সঠিক জায়গায় থাকলে অর্থ মানবতার জন্য কতখানি কল্যাণকর হয়ে ওঠে এই পরিবারটি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

     

    এই পরিবারের চতুর্দশ সন্তান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। খুব অল্প বয়সে মাতৃবিয়োগে কিশোর ছেলেটির শৈশব কেটেছে চাকরদের শাসনে। হতে পারে সেটা তার মনোজগতকে নিম্নবর্ণের মানুষদের প্রতি আরো বেশী সহানুভূতিশীল করে তোলে অথবা তাদেরকে জানতে সহায়তা করে। নয়ত খোদ জমিদার পরিবারের একটি ছেলের পক্ষে ‘দুই বিঘা জমি’ রচনার মত মানবিক বোধের স্ফূরণ কিঞ্চিৎ বিস্ময়করই বটে। এটা ঠিক নিজে জমিদারনন্দন হওয়ায় জমিদার শ্রেণীমানসিকতার খুব কাছাকাছি ছিলেন তিনি। তবে এও ঠিক দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে টিপিক্যাল জমিদার শ্রেণীতে ফেলে দেয়া অন্যায়। তাঁর জীবনী অনুসন্ধান করলে দেখা যায় এক পর্যায়ে তিনি পার্থিব জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হন এবং ধর্ম ও দর্শনচর্চা শুরু করেন।

     

    ১৮৪২ সালে দেবেন্দ্রনাথ তত্ত্ববোধিনী সভা ও ব্রাহ্মসমাজের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পরের বছর তাঁরই অর্থে এবং অক্ষয়কুমার দত্তের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকা। তিনি ক্রমাম্বয়ে 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকায় ঋগ্বেদের অনুবাদ প্রকাশ করতে শুরু করেন। ১৮৫০ সালে তাঁর অপর গ্রন্থ আত্মতত্ত্ববিদ্যা প্রকাশিত হয়। দেবেন্দ্রনাথ কিছুদিন রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৮৫১ সালের ৩১ অক্টোবর ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন স্থাপিত হলে তিনি তার সম্পাদক নিযুক্ত হন। তিনি দরিদ্র গ্রামবাসীদের চৌকিদারি কর মওকুফের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন এবং ভারতের স্বায়ত্তশাসনের দাবি সম্বলিত একটি পত্র ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রেরণ করেন। দেবেন্দ্রনাথ বিধবাবিবাহ প্রচলনে উৎসাহী ছিলেন, তবে বাল্য ও বহু বিবাহের বিরোধী ছিলেন। শিক্ষা বিস্তারেও তাঁর বিশেষ অবদান ছিল।

     

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পিতার আদর্শে পুরোপুরি অনুপ্রাণিত ছিলেন। তাই সাধারণ মানুষদের প্রতি তার আগ্রহ ও সহানুভূতি ছিল বিশাল। লেখায় সাধারণ মানুষদের জীবন উপস্থাপন করলেও তিনি তৃপ্ত ছিলেন না। 'ঐকতান' কবিতায় নিজের লেখার মূল্যায়ণ করেছেন তিনি এভাবে- ‘আমার কবিতা, জানি আমি,/ গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী’ একই কবিতার পরবর্তী পংক্তিতে তিনি পথও বাতলে দিয়েছেন, ‘কৃষাণের জীবনের শরীক যে জন,/ কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন,/ যে আছে মাটির কাছাকাছি,/ সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি।’

     

    কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ বৈশিষ্ট- তিনি কর্মময় মানুষ ছিলেন। আর তার লেখা, কথা আর কাজ ছিল একই সমান্তরালে। এ বিষয়টাই আসলে রবীন্দ্রনাথকে আর দশজন কবির থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা অবস্থানে, আলাদা একটা উচ্চতায় তুলে এনেছিল। তিনি চুপচাপ বসে থাকার পাত্র ছিলেন না। সেই যূগে তিনি অনুভব করেছিলেন জাতিকে মাথা উচু করে বাঁচাতে চাইলে শিক্ষার বিকল্প নেই। ১৯০১ সালের ডিসেম্বরে (৭ পৌষ ১৩০৮ বঙ্গাব্দ) বোলপুরের নিকটস্থ শান্তিনিকেতন আশ্রমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর "ব্রহ্মচর্যাশ্রম" নামে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। এই বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত বৃত্তিমুখী অপূর্ণাঙ্গ শিক্ষার পরিবর্তে ব্যবহারিক শিক্ষার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের পূর্ণাঙ্গ মনোবিকাশের সুযোগদান। রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন ভারতের তপোবন বিদ্যালয় থেকে এই বিদ্যালয়ের আদর্শটি গ্রহণ করেন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সানন্দ অনুমতি ও আশীর্বাদ লাভ করেছিলেন। বিদ্যালয়ের প্রথম পাঁচজন ছাত্রের অন্যতম ছিলেন কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে পড়াশোনার মাধ্যমে উন্মুক্ত হৃদয় এবং উদারতা অর্জনের জন্য বিশেষ শিক্ষাদান পদ্ধতি অনুসরণ করেন যেখানে ছাত্রছাত্রীদের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বৃক্ষের নীচে শিক্ষাদান করা হয়। ১৯২১ সালে তিনি এখানে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য প্রাক্তনীদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, অস্কারবিজয়ী চিত্র-পরিচালক সত্যজিৎ রায়, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী প্রমুখ। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রথম উপাচার্য।

     

    রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তের মানুষ ছিলেন। জালিয়ান্ওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের অত্যন্ত সম্মানজনক নাইট উপাধি অবহেলায় প্রত্যাখ্যান করেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি ছিল তৎকালীন ভারতবর্ষের শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্র তথা তীর্থভূমি। কেননা ঠাকুরবাড়ি থেকেই নাট্যান্দোলন ও নাট্যাভিনয়ের প্রথম সূচনা হয়। শিল্পের চর্চায়ও ঠাকুরবাড়ি পিছিয়ে ছিল না। সাহিত্যচর্চায়ও এই পরিবার অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। ঠাকুরবাড়ি থেকে বিভিন্ন সময়ে একাধিক পত্রিকা প্রকাশিত হত। তারমধ্যে তত্ববোধিনী, ভারতী এবং ছোটদের পত্রিকা রবীন্দ্রসম্পাদিত 'বালক' অন্যতম। নারী আন্দোলন ও নারী শিক্ষাও ঠাকুরবাড়ি থেকেই প্রথম শুরু হয়েছিল। ফলে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি শিল্পসাহিত্য, সংস্কৃতিচর্চায় ও অনুশীলনে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করেছিল। ধারণা করা হয়, ঠাকুর পরিবারের আদিপুরুষ ছিলেন শাণ্ডিল্য গোত্রীয় বেদজ্ঞ পণ্ডিত ভট্টনারায়ণ। সংস্কৃত সাহিত্যে তাঁর প্রসিদ্ধি “বেণীসংহার” নাটকের রচয়িতা রূপে। সুতরাং পারিবারিক ঐতিহ্যক্রমেই রবীন্দ্রনাথ লেখালেখি এবং সংগীত সাধনায় এসেছিলেন। তাঁর ভাইবোনদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ্য দিজেন্দ্র, সত্যেন্দ্র, জ্যোতিরিন্দ্র, বোন স্বর্ণকুমারী লেখালেখি করতেন এছাড়াও চিত্রাংকন, অভিনয় এবং সংগীতেও দুরস্ত ছিলেন। ১৯১৩ সালে তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি এ পরিবারের সুদীর্ঘ ঐতিহ্যকেই প্রতিনিধিত্ব করে।

advertisement