বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

সেই সন্ন্যাসীর গল্প- সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

লুতফুল বারি পান্না

  • advertisement

    (সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। এই সময়ের কবিদের মধ্যে আমার খুব প্রিয় একজন। "দেশ" পত্রিকা তার কবিতা ছাপে। হ্যাঁ তিনি ওপাড় বাংলার কবি। নেটের একটা কবিতা ফোরামে কবি হিসেবেই তার সাথে পরিচয়। তারপর আবিস্কার করলাম, চমৎকার গদ্যও লেখেন। তার লেখায় সহজাত হিউমারের ছাপ থাকে। হাল্কা চটুল মনকাড়া ভঙ্গীতে অনায়াসে বলে যান গভীর সব কথাবার্তা। এই লেখাটা তার নিজের দাবী- তার শোনা গল্প। এখানে আনার কারণ সুদীপ্তর লেখার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া নয়- ঈশপের গল্পের মত লেখাটার অন্তর্নিহিত কিছু মোরাল আছে যা সত্যি সত্যি বুঝতে পারলে আমাদের ভেতরে কিছু পরিবর্তন হলেও হতে পারে। লেখাটা সুদীপ্তর অনুমতি নিয়েই অন্য একটা সাইট থেকে নিয়ে এসেছি।)

     

    সেই সন্ন্যাসীর গল্প  

    সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

     

    এক সন্ন্যাসীর গল্প শুনবে? সেই যে গো মাঝবয়েসী, হাসিখুশি, ভয়ানক জ্ঞানী সংসারত্যাগী মানুষটা। বুঝতে পারছো কার কথা বলছি? পারছো না! আচ্ছা আমার সঙ্গে এসো, খুব বেশী হাঁটতে হবে না, এই জনপদের চৌহদ্দি পেরোলেই আশ্রমটা দেখতে পাবে, নদীর ধারে ঠিক যেখানে জঙ্গল শুরু হয়েছে, সেইখানে। উনি ঐখানেই থাকেন...

     

    আর থাকেন ওঁর গুরুদেব, কয়েকজন গুরুভাইও থাকেন। গুরুদেবের ভারী বয়েস হয়েছে, বটগাছের অত বয়স হলে হয়তো চারদিকে ঝুরি নামিয়ে অনেকটা জায়গা দখল করে ফেলতো কিন্তু গুরুদেব তো মানুষ তাই তিনি ঝুরিও নামাননি, জায়গাও দখল করেননি। তবে তাঁর এখন ভারী বয়েস, তাই তিনি আশ্রমের বাইরে আর কোথাও যেতে পারেন না। সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠেই নদীর ধারে এসে বসেন, বসেই থাকেন। লোকে বলে উনি না কি নদীর সাথে গল্প করেন। উনি নদীর ধারে এসে বসলেই স্রোতের কলকল আওয়াজটা না কি বদলে যায়। অনেকেই এটা স্বচক্ষে দেখেছে, নিজের কানে শুনেছে। তা বলে যারা দেখেছে আর শুনেছে তাদের নাম আমাকে জিজ্ঞেস কোরো না বাপু। যারা দেখেছে শুনেছে তারা কি আর কেউ এযুগের লোক গো, তাদের নাতিপুতিরাই বুড়ো হতে চললো। মোটকথা অনেকেই না কি দেখেছে, শুনেছে। তোমরা জিজ্ঞাসা করতেই পারো, ‘বুড়ো সন্ন্যাসী যদি সারা দিন নদীর ধারেই বসে থাকেন, তবে ঠাকুরপুজো করেন কখন?’, সেটা কেউ জানে না। ওনার শিষ্যরা ঠাকুরপুজো করে, উনিও না কি করতেন আগে কিন্তু এখন সারা দিন ঐ নদীর সাথে গল্প।

     

    আশ্রমের অন্য সন্ন্যাসীরা, মানে ঐ বুড়ো সন্ন্যাসীরা শিষ্যরা, তারাও ভারী ভালো। সকাল বেলায় গেরস্থদের ঘুম ভাঙলেই ওনারা দল বেঁধে জনপদে আসেন। দল বলতে ঐ তো মোটে তিন জন। আসলে আছেন পাঁচ জন, দু’জন আশ্রমেই থাকেন পালা ক’রে। আশ্রমেও কত কাজ না, ঝাঁটপাট দিয়ে পরিষ্কার করা, ফুল তোলা, শুকনো ডালপালা কুড়িয়ে আনা কাজের কি ইয়ত্তা আছে। জনপদে এসে শিষ্যরা প্রত্যেকে এক জন করে গেরস্থর বাড়িতে গিয়ে কড়া নাড়েন। গেরস্থ বাড়ির বৌ বেরিয়ে এসে দু’মুঠো ভিক্ষে দেয়। সন্ন্যাসী হাসেন, দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করেন। কোন বাড়িতে কোন দিন হয়তো ভিক্ষে দেবার মতন কিছু থাকেনা। গেরস্থ বাড়ির বৌ চোখ ছলছল করে বলে, ‘আজ তো কিছু নেই বাবা’। সন্ন্যাসী হাসেন, দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করেন, তারপরে পাশের বাড়িতে গিয়ে কড়া নাড়েন। তবে তেমনটা কমই হয়। এদেশে ভিখারীর অভাব যদি পড়েও বা কোন দিন অন্নপূর্ণার অভাব পড়বে না। সন্ন্যাসীরা এক বাড়িতে ভিক্ষা পেয়ে গেলে অন্য বাড়িতে আর যান না।

     

    কোন বাড়িতে কোন দিন হয়তো গেরস্থর বৌ ভিক্ষে দিতে গিয়ে বলে, ‘তিনদিন ধরে ছেলেটার জ্বর বাবা, কিছুতেই সারছে না’, সন্ন্যাসী দু’হাত জড়ো করে বলেন, ‘ঈশ্বর মঙ্গল করবেন’। ভাবছো সন্ন্যাসী মন্ত্র পড়ে জ্বর সারিয়ে দেন না কেন বা কোন তাবিজ-কবচ কেন দেন না? সন্ন্যাসী মানুষ তো, ওনাদের সম্পত্তি বলতে পরণের কাপড়টুকু, ওনারা তাবিজই বা পাবেন কোথায় আর কবচই বা পাবেন কোথায়! তবে মন্ত্র কিন্তু পড়েন, ওনাদের গুরুদেব না কি ওনাদের একটা অমোঘ মন্ত্র শিখিয়েছেন, জ্বর-জ্বারি, আপদ-বিপদ, সব কিছুতেই ওনারা সেই মন্ত্রটাই বলেন, ‘ঈশ্বর মঙ্গল করবেন’।

     

    গল্প বলার এই হল মুশকিল। আসল গল্পের থেকে কতদূর সরে এসেছি, তোমাদেরও দোষ তাই বলে কম নয়, যাই বলো। একবারও খেইটা ধরিয়ে দিলে না কেন শুনি! বলছিলুম তো সেই সন্ন্যাসীর গল্প, সেই যে মাঝবয়েসী, হাসিখুশি, ভয়ানক জ্ঞানী আর কেমন যেন একটু অন্যরকম, ঠিক অন্যান্য সন্ন্যাসীদের মতন নয়। তাঁর যেখানে যা বুঝতে অসুবিধে হয় সমস্ত বলেন গুরুদেবকে। গুরুদেব সহজ করে বুঝিয়ে দেন। সন্ন্যাসীদের জিজ্ঞাসা তো আবার আমাদের জিজ্ঞাসার মতন নয়। ওনাদের জিজ্ঞাসা অন্যতরো, কেমন যেন। আমরা জিজ্ঞাসা করি, ‘তুমি কে?’ আর ওনারা জানতে চান, ‘আমি কে?’, কি অদ্ভুত না, বলো। তাছাড়া ওনাদের প্রশ্নগুলো ভারী শক্ত হয়, উত্তরগুলোও। একবার অনেক দিন আগে এক সন্ন্যাসী, গুরুদেবকে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘অহং কী?’। কি কঠিন প্রশ্ন ভাবো তো! এমনিতেই অনুস্বর ব্যাপারটাই গোলমেলে, তার আগে আবার একটা হ আর একটা অ জুড়েছে। প্রশ্ন শুনেই তো গুরুদেব রেগে আগুন। এমনিতে গুরুদেব রাগটাগ করেন না, মাটির মানুষ কিন্তু সেদিন ঐ সব অনুস্বর লাগান প্রশ্ন শুনে রেগে গিয়ে সন্ন্যাসীকে বললেন, ‘গাধার মতন কি সব আজেবাজে প্রশ্ন করছো, আহাম্মক কোথাকার’। শুনে তো সেই সন্ন্যাসীর মুখ শুকিয়ে গেছে লজ্জায়, অপমানে। একে তো গুরুদেব সকলের সামনে আহাম্মক বলেছেন, তার উপর বলেছেন গাধা। তাও যদি গাধা সত্যি সত্যি প্রশ্ন করতে পারতো, তাও না হয় হত। এরই মধ্যে সন্ন্যাসী তাকিয়ে দেখেন গুরুদেব মুচকি মুচকি হাসছেন, রাগের চিহ্ণ নেই। হাসতে হাসতেই গুরুদেব বললেন, ‘বুঝলে বাছা অহং কাকে বলে’।

     

    গুরুদেব বসে থাকেন নদীর পাশে, তার পাশেই রাস্তা, সেই রাস্তাটা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দূরে চলে গেছে। এক দিন বিকেলের আগে সেই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এলো এক পথিক। সারা দিন ধরে হেঁটেছে লোকটা, একেবারে হাক্লান্ত। হাক্লান্ত হলে কি হবে, সভ্যভব্য লোক। গুরুদেবকে নদীর ধারে বসে থাকতে দেখে ঠিক বুঝেছে, উনি একজন সন্ন্যাসী মানুষ। ‘দণ্ডবত হই ঠাকুরমশাই’, পথিক বললে গুরুদেবকে। গুরুদেব হেসে বললেন, ‘ঈশ্বর মঙ্গল করবেন বাছা’, আসলে গুরুদেবও ঐ একটাই মন্ত্র জানেন কি না, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সুযোগ সুবিধে বুঝে ঐটেই বলেন তাই। পথিক জিজ্ঞাসা করে, ‘ঠাকুরমশাই, কাছাকাছি কোন জনপদ আছে? রাতটুকু মাথা গোঁজার মতন আশ্রয় পেতে পারি এমন কোন জায়গা।‘, গুরুদেব পথ দেখিয়ে দেন, এই রাস্তা ধরে অল্প এগিয়ে রাস্তাটা যেখানে কাস্তের মতন বেঁকেছে সেইখানে পৌঁছলেই দেখা যাবে জনপদ। পথিক আবার জানতে চায়, ‘তা ঠাকুরমশাই সেখানকার মানুষজন কেমন?’। এবার গুরুদেব জানতে চান, ‘তা তুমি কোন জনপদ থেকে এলে বাছা?’, পথিক বলে, ‘জঙ্গল যেখানে শেষ হয়ে পাহাড় শুরু হয়েছে, সেইখানে এক জনপদ আছে, গ্রামের নাম মেঘপাহারা, সেইখানেই রাতটুকুন ছিলেম। সকাল হতেই হাঁটতে শুরু করেছি’। গুরুদেব শুধোন, ‘তা সে গাঁয়ের মানুষজনকে কেমন দেখলে বাছা?’। ‘আর বলেন কেন’, পথিক উত্তর দেয়, ‘মোটে ভালো না, একেবারে কালমেঘের মতন তেতো স্বভাব, সব ক’টা বদ। পাজির পা-ঝাড়া যাকে বলে। তা ঠাকুরমশাই, সামনের গাঁয়ের মানুষজন কেমন বললেন না তো’। গুরুদেব উত্তর দেন, ‘একদম সেই রকমই বাছা, একদম সেই রকমই’। পথিক হাঁটা দেয়, আঁধার নামার আগেই সে সামনের জনপদে পৌঁছতে চায়।

     

    গুরুদেব বসে থাকেন নদীর পাশেই, তার পাশেই রাস্তা, সেই রাস্তাটা দিয়ে আরেকদিন আরেক পথিক আসে। সারা দিন ধরে হেঁটেছে লোকটা, একেবারে হাক্লান্ত। হাক্লান্ত হলে কি হবে, সভ্যভব্য লোক বলে কথা। গুরুদেবকে নদীর ধারে বসে থাকতে দেখে সে বলে, ‘দণ্ডবত হই সন্ন্যাসীঠাকুর’। গুরুদেব হেসে বললেন, ‘ঈশ্বর মঙ্গল করবেন বাছা’। পথিক জিজ্ঞাসা করে, ‘সন্ন্যাসীঠাকুর, কাছাকাছি কোন জনপদ আছে? রাতটুকু মাথা গোঁজার মতন ঠাঁই জোটে এমন কোন গাঁ-গেরাম?‘, গুরুদেব পথ দেখিয়ে দেন, এই রাস্তা ধরে অল্প এগিয়ে রাস্তাটা যেখানে কাস্তের মতন বেঁকেছে সেইখানে পৌঁছলেই দেখা যাবে জনপদ। পথিক আবার জানতে চায়, ‘তা ঠাকুরমশাই সেখানকার মানুষজন কেমন?’। গুরুদেব জানতে চান, ‘তা তুমি কোন জনপদ থেকে এলে বাছা?’, পথিক বলে, ‘জঙ্গল যেখানে শেষ হয়ে পাহাড় শুরু হয়েছে, সেইখানে এক জনপদ আছে, গ্রামের নামটি মেঘপাহারা, সেইখানেই রাতটুকুন ছিলেম। সকাল হতেই হাঁটতে শুরু করেছি’। গুরুদেব শুধোন, ‘তা সে গাঁয়ের মানুষজনকে কেমন দেখলে বাছা?’। ‘আহা সে বড় চমৎকার লোকজন গো সন্ন্যাসীঠাকুর’, পথিক উত্তর দেয়, ‘একেবারে মিছরির মতন মিষ্টি স্বভাব, সব্বাই ভালোমানুষ, আপনজন যেমন হয়। তা সন্ন্যাসীঠাকুর, সামনের গাঁয়ের মানুষজন কেমন বললেন না তো’। গুরুদেব উত্তর দেন, ‘একদম সেই রকমই বাছা, একদম সেই রকমই’। পথিক খুশি মনে হাঁটা দেয়।

     

    কিন্তু এ তোমাদের কি রকম আক্কেল বলো দিকি। সেই সন্ন্যাসীর গল্পটা বলতে বসে তখন থেকে তাঁর গুরুদেবের গল্পই বলে চলেছি আর তোমরা এই যে মুখে কুলুপ এঁটে শুনছো, একবারও মনে করাচ্ছো না তো যে আসল গল্পটাই বলা হচ্ছে না। তোমাদের গল্প বলতে বসাই ঝকমারি হয়েছে আমার। কি বলছো! সেই সন্ন্যাসীর গল্প এখন বলে ফেললেই হয়! আবদার দেখে বাঁচি না। সে গল্প অন্য দিন হবে... অন্য কোন দিন...

advertisement