আঞ্চলিক কবিতা প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল আমারো একটা কবিতার কথা।

 

বই মেলা হবে। দুই বন্ধু মিলে এক দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। দুজনের আট আট ষোলটা কবিতা নিয়ে একটা কবিতা সংকলন বের করে ফেললাম। সংকলনের নাম "একদিন ছিলে"। নেহাতই কম্পিউটার কম্পোজ করা সংকলন। বইটই নয়।

 

তরুণ বয়স। মনে দুরন্ত আবেগ। মেসের পাশের বাসার এক রূপবতী তরুণীর সাথে হাল্কা মেলবন্ধন চলছে। একদিন সে এক মিডিয়া মারফত বলে পাঠাল- তাকে যেন আমি একটা ফুল দেই। অনভিজ্ঞ আমি বুঝিনি সেটা তার ভালবাসার প্রস্তাব। তবু বন্ধুদের উস্কানিতে ফুল না দিয়ে একটা চিঠি পাঠালাম। চিঠিতে একটা বাক্য ছিল- সেটাও ধার করা। কোন একটা ক্যালেন্ডারে লেখা ছিল। "ফুল নেয়া ভাল নয় মেয়ে, ফুল নিলে ফুল দিতে হয়। ফুলের মত প্রাণ দিতে হয়।" জবাবে সে পূর্ণ উৎসাহে লিখল, "তোমার আমার ভালবাসা ফুলের মত শত শত জীবনের মাঝে পাথর দেয়াল ভাঙনের খেলা। তোমার আমার ভালবাসা এক নদী।" মাথার কয়েক ইঞ্চি ওপর দিয়ে গেল। কি বলতে চায় সে? কিন্তু থেমে গেলে তো চলবে না। বন্ধুদের সাথে ফাজলামো করতে করতে মুখে মুখে একটা জবাব বানিয়ে ফেললাম। তারপর ভাবলাম লিখেই ফেলি। লিখতে লিখতে আরো কিছু লাইন যোগ হল। পুরোটাই আঞ্চলিক ভাষায়। এভাবেই 'নারী' নামাঙ্কিত কবিতার জন্ম। এটা বলার কারণ আমাদের সিরিয়াস কবিতার ভিড়ে সংকলনের এই ফালতু কবিতাটাই পুরো সুপারহিট। সবার মুখে মুখে- বিশেষ করে প্রথম কয়েক লাইন। কিভাবে হিট হল সেটাই বলছি। বই মেলায় তখন ওপেন একটা পর্ব থাকত। যে কেউ গিয়ে যা খুশী তাই বলে বা করে আসতে পারত স্টেজে। মাইক থাকত। আমার কবিতার বইয়ের পার্টনার জুনিয়র বন্ধু সাইফুর রহমান সজলের আবৃত্তির কণ্ঠ ছিল দারুণ রকম ভাল। স্টেজে উঠে সে হঠাৎ ঘোষণা দিল, আবৃত্তি করছি লুতফুল বারি পান্নার 'নারী'।

 

প্রথম দুলাইন পড়ার সংগে সংগে উপস্থিত তরুণ শ্রোতা দর্শকরা প্রচণ্ড উল্লাসে তাকে বরণ করে নিল। তারপর চারদিকে হাসি উল্লাস আর উৎসাহ। মাঝামাঝি আসার পরে মেলা কর্তৃপক্ষ জোর করে স্টেজ থেকে সজলকে নামিয়ে দিল। চারদিকে তুমুল সমবেদনা। কেউ চিৎকার করে তাকে সুযোগ দেয়ার অনুরোধ করছে। মেলা কর্তৃপক্ষ এই বালখিল্য এবং বেয়াদবীপূর্ণ উদ্ধত অভিযোগে কান দিলেন না। হতাশ হলাম কারণ তার পরের লাইনগুলো নারীদের আর শোনানো হল না। হায় কি আফসোস!!! জানি যারা এ পর্যন্ত কষ্ট করে পড়তে পড়তে এসে গেছেন তারা তীব্র কৌতূহলী- কি ছিল সেই কবিতা? আসুন একটু শুনেই যান...। তবে মাইন্ড করা যাবে না কিন্তু।

 

নারী

 

কেমনে বিশ্বাস যাই

গুণীজনে কয়- নারীজাতি সাপের নাহান (তরুণদের তুমুল উল্লাস)

যহন তহন ফোঁস কইর‍্যা ওডে

আনেদানে ঠোর মারে (এবার মেলা প্রাঙ্গণ ফেটে পড়ার উপক্রম)

(নিচে দেখুন)

 

 

 

 

 

 

তুমি যারে ভালবাসা কও

হেই বাসায় মুই দেহিনা দুয়ার (তুমুল উল্লাস এবং হাসি)

চাইরদিক জুইর‍্যা খালি পাথরের আভাঙ্গা দেওয়াল

আন্ধারে ‌আতড়াইয়া কোনহানে তোমারে না পাই

কও দেহি কোন বিশ্বাসে হেইহানে যাই

 

(হাসি আর উল্লাসের সাথে চুকচুক জাতীয় কপট সমবেদনা)

 

 

(নিচে দেখুন)

 

 

 

 

তুমি যে নদীর কতা কও

হেই গাঙ্গে জল নাই

যেইদিকে চোউক যায়

কিচকিচ করে খালি বালি আর বালি

 

(এই পর্যায়ে তাকে জোর করে স্টেজ থেকে নামিয়ে দেয়া হল। দেখুন তাহলে পরের অংশে কি ছিল, আর আমার আফসোসের কারণটাই বা কি?)

 

 

 

(নিচে দেখুন....)

 

 

 

 

 

 

তুমি যদি লগে রও

মোর কোনো থাহে না যে ডর

এক আতে বাইতাম নাও

আর আতে তোমার ঐ দুইহান আত

ঘুটঘুইট্যা আন্ধারে মুই পাড়ি দেতাম

অকুল দরিয়া

 

আহারে স্বপ্ন মোর

কোনদিন যদি লাগোর পাইতো দিক

যেই গাঙ্গে জল নাই

হেই গাঙ্গে লাগতো জোয়ার