লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৫ জুন ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ২১টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftভৌতিক (নভেম্বর ২০১৪)

বৃষ্টি ঘ্রাণে ভেজা জোনাকি রাতের গল্প
ভৌতিক

সংখ্যা

সাদিয়া সুলতানা

comment ১৩  favorite ০  import_contacts ২,৮৩৩
এক.
শহরতলির রাস্তা বড় অদ্ভুত! কিছু একটা দেখতে পেলেই লোকের ভিড় জমে যায়। সময়টা ভোর হোক বা সন্ধ্যে। আর এ তো রাস্তার ধারে পড়ে থাকা লাশ দেখা! পুরুষ লাশটার মুখে গ্যাঁজলা ওঠা, ঠোঁটের কোণ বেয়ে তরল রক্ত গড়িয়ে যাওয়ার দাগ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সদ্য মৃত, তবু কি বোটকা ইঁদুর পচা গন্ধ আসছে লাশের অক্ষত শরীর থেকে!

দুই.
-তোর তো পোকার নামে নাম রে! এটা একটা নাম হলো! ফালতু।
আমার কথা শুনে জোনাকি মন খারাপ করেছে বলে মনে হয় না। বরং জোনাক পোকার মত মিটমিটে আলোয় ওর চোখ মুখ হেসে ওঠে। আমি আবার ওকে ক্ষ্যাপানোর চেষ্টা করি,
-তুই জানিস,জোনাকি হচ্ছে একটা পোকা?
-জানি, আপনি তো আমাকে দেখলেই এই কথা বলেন।
-ছোটবেলায় কি করতাম জানিস?
জোনাকির চোখে মুখে কৌতুহল,
-কি করতেন?
-আমাদের গ্রামের বাড়ির উঠোনে সন্ধ্যে নামতেই জোনাকির ঝাঁক ছুটে বেড়াতো। আমি আর ছোট কাকা জোনাক পোকা ধরে ধরে প্লাস্টিকের বৈয়ামে পুরে রাখতাম। সেই বৈয়ামে আটকে পড়া জোনাকির দল মরিচ বাতির মত আলো জ্বলতো আর নিভতো। কি যে দারুণ লাগতো দেখতে!

জোনাকি বিমর্ষ চোখে আমার দিকে তাকায়,
-নাজমুল ভাই, আপনি কি লাকি! আমি কখনোই এত জোনাকি দেখিনি। রাতে মশারি টানানোর সময় দু’একটা মাঝে মধ্যে উড়ে আসে আর ধরতে গেলেই পালিয়ে যায়।
-শহুরে জোনাকি খুব চালাক রে।
-ধ্যাত, জোনাকি পোকার কি বুদ্ধি আছে!
আমি হাসি। জোনাকি খুব সরল। জোনাকি নামটা ওর জন্য পারফেক্ট। জোনাকির আলো যেমন জ্বলে, নেভে তেমনি ওর মুখের আলোও দ্রুত জ্বলে নেভে। বছর দুয়েক ধরে ওকে দেখছি। মেয়েটা বেশ বড় হয়ে গেছে। মিষ্টি চেহারায় কৈশোরের সরলতা আর শরীরের বেকায়দা বেড়ে ওঠায় বিব্রত জোনাকিকে দেখে আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। আমি নিজেকে শাসন করি, এসব হচ্ছে কি নাজমুল?

জোনাকি আমার প্রতিবেশি। ক্লাস নাইনে পড়ে। বছর দুয়েক হলো আমি এই বাসায় ভাড়া এসেছি। জোনাকিরা তারও বছর খানেক আগে থেকে এই বাড়িতে ভাড়া থাকে। জোনাকির বাবা আবদুস সবুর খান একটা প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করে। বেশ অমায়িক ভদ্রলোক। ভদ্রলোকের এক ছেলে, এক মেয়ে। জুয়েল আর জোনাকি। আমার স্ত্রী স্বপ্নার সাথে জোনাকির মা আর জোনাকির বেশ খাতির।

দিনে বার কয়েক জোনাকি আমার ফ্লাটে আসে। কখনো লবণ, চিনির ঘাটতি পড়লে নতুবা স্বপ্নার সাথে কোনো বইয়ের আদান-প্রদান করতে। শুধু আমার সামনে পড়লেই কেমন বাসায় যাওয়ার জন্য ছটফট করে। ওর এই কিশোরীবেলার সচেতনতা আমার ভালই লাগে। স্বপ্না আজ বাসায় নেই। ওর বান্ধবী গীতার বাসায় দাওয়াত। বান্ধবীর বাসায় যাবে দেখে সাত সকালেই বেরিয়ে গেছে। আমি যাইনি। পুরো সপ্তাহ শেষে কাঙ্খিত শুক্রবার আসে। ছুটির দিনটা আয়েস করে শুয়ে থাকার আরামই আলাদা। যদিও জোনাকির দেওয়া ডোরবেলে আমার ঘুমে বাঁধা পড়েছে।

-আমি তবে যাই নাজমুল ভাই। আপনাকে বিরক্ত করলাম। মা আবার খুঁজবে।

-বিরক্ত কিসের? তোর সাথে গল্প করতে বেশ লাগছে। আর বেলা বারোটা বাজে। এখন উঠতেই হতো।
-স্বপ্না ভাবী আসলে বলবেন, বৃষ্টির ঘ্রাণ বইটা দিয়ে গেলাম।
আমি টের পাই বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির ঘ্রাণের মাদকতায় ছুটির সকালটা আরও উপভোগ্য হয়ে উঠছে।
-কি রে বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে নাকি?
-হ্যাঁ, সেই কোন সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। আপনি টের পাননি?
-না। ঘুমালাম তো পুরো সকাল।
ঘুমের জড়তা ছেড়ে আমি বাথরুমের দিকে এগোই।

-আমি তাহলে যাই নাজমুল ভাই। মা বকবে।
জোনাকি দরজার বাইরে পা রাখতেই বৃষ্টির ঘ্রাণ মিইয়ে আসে। ঠিক তক্ষুণি কি যে একটা হয় আমার, ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে কাঁচের বোতলে জোনাকিকে পুরে ফেলি।

খানিক পরে বোতলবন্দি জোনাকির আলোছায়ার খেলায় চারপাশটা মোহময় হয়ে ওঠে। জোনাকির কান্নাভেজা মুখে এখন বৃষ্টির ঘ্রাণ!

তিন.
আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। শরীর জুড়ে ক্লান্তি, সীমাহীন অবশতা। হাত পা নাড়াতে পারছি না। আমি কি দাঁড়িয়ে আছি? না শুয়ে? মনে হচ্ছে অতলে শরীর ডুবে গেছে। অনেক কষ্টে ডান হাত উঠাই। ঠোঁটের কাছটা উসখুস করছে। ঠোঁটে হাত রাখি। এ কি ঠোঁটের কোণে রক্ত! আমি ঠিকই দেখেছি। খানিক আগে স্বপ্নে দেখা রক্তপানরত মুখখানা তবে আমারই ছিল! আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করি।

পায়ের তলায় থকথকে কি? চোখ খুলতেই দেখি পায়ের তলায় লম্বা লম্বা কি যেন কিলবিল করছে। জোঁক! এত জোঁক এল কোথা থেকে? আমার পা বেয়ে সারি সারি জোঁক উঠছে। কি যে ভয় করছে! হঠাৎ চারপাশে অদ্ভুত ফিসফিসানি, নাজমুল ভাই, ও নাজমুল ভাই, বৃষ্টির ঘ্রাণ বইটা স্বপ্না ভাবীকে দিয়ে দিবেন। বার বার একই ফিসফিসানি, নাজমুল ভাই, ও নাজমুল ভাই, বৃষ্টির ঘ্রাণ বইটা স্বপ্না ভাবীকে দিয়ে দিবেন...ও নাজমুল ভাই।

আহ, কি কষ্ট! স্বপ্না কে? নাজমুল কে? আমি তো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। আমি কোথায়? আশেপাশে কেউ কি আছে? কে আছে আমার? আর কোথায় বৃষ্টির ঘ্রাণ? চারপাশে ইঁদুর পচা চিমসে গন্ধ! হায় আল্লাহ, আমার মরণ দাও। অন্ধকার কি এতই ভয়াবহ! এতই দুঃসহ! অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যেতে যেতে আমি আবার সেই ফিসফিসানি শুনতে পাই, নাজমুল ভাই, ও নাজমুল ভাই, বৃষ্টির ঘ্রাণ বইটা স্বপ্না ভাবীকে দিয়ে দিবেন।

অসহ্য! আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করি। আমার কন্ঠনালী চিরে শব্দের বদলে রক্ত বের হয়ে আসে। কেউ আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে না। কি অদ্ভুত! হঠাৎ আলোয় ঘরটা ভরে গেল। আমি আমার ঘরেই আছি। আহ্ তবে আমি বেঁচে গেলাম! চোখ মেলতেই আমি আঁতকে উঠি। কি অদ্ভুত চারপাশে এত শত শত হাজার হাজার জোনাকি কোথা থেকে এল? জোনাকির আলো জ্বলছেই, নিভছে না। আলোর তীব্রতায় আমার চোখ ঝলসে যায়, পুড়ে যায় দুই চোখের পাতা। আমি চোখ বন্ধ করি।

আবার সেই গাঢ় অন্ধকার! আবার সেই ফিসফিসানি!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement