প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাওয়া একজন লেখকের আত্মঅহংকারের গল্প এটি। মধ্যবিত্ত ঘরানার মানুষের আত্মিক আর আর্থিক টানাপোড়েন বড়ো বিচিত্র। আর এই গল্পের মুস্তাফিজ, একেতো মধ্যবিত্ত, তার ওপর আবার লেখক ! যার একমাত্র অবলম্বন নিজের আত্মসম্মান যাকে আমরা সাধারণ মানুষেরা দম্ভ মনে করি! গল্পকবিতার এবারের বিষয় ‘দাম্ভিক’ এর সাথে তাই গল্পটি প্রাসঙ্গিক।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৫ জুন ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ২১টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৭৩

বিচারক স্কোরঃ ৩.৬৯ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - দাম্ভিক (জুলাই ২০১৮)

দশ কপি বই
দাম্ভিক

সংখ্যা

মোট ভোট ১৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৭৩

সাদিয়া সুলতানা

comment ১৯  favorite ১  import_contacts ৪৪৪
মুস্তাফিজ নামের ছেলেটিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। এই বইটি হাতে পাওয়ার আগে কখনো ওর নামই শুনিনি আমি। অথচ কী অদ্ভুতভাবে ছেলেটির হাত ধরে কতগুলো অচেনা চরিত্রের অন্তরমহলে আমি বাধাহীন ঢুকে যাচ্ছি। ছেলেটি অদ্ভুত ভালো লেখে, নির্লিপ্তভাবে বিষাদের গল্প বলে যায়।

গল্প-উপন্যাস পড়ার অভ্যাসটা এখন আমার নেই বললেই চলে। যদিও অনেকবছর পর মুস্তাফিজের লেখা বইটি আমাকে ভীষণভাবে টানছে। রাতের খাবার সেরে বইটি পড়তে বসেছি, এখনো উঠতে পারিনি। একটানে পড়ে চলছি। মুস্তাফিজের বই ‘আঁধারে মৃতের অপ্রলাপ।’

মুস্তাফিজ একজন লেখক। মুস্তাফিজের ‘লেখক’ পরিচয়ের সামনে ঠিক কোন সম্বোধনটি ব্যবহার করা ঠিক হবে তা আমি জানি না। আজকাল লেখকদের নামের সাথে নানান ধরণের তকমা বা বিশেষণ থাকে। নবীন, প্রবীণ, অমুক দশক-তমুক দশকের সেরা, সংগ্রামী, উঠতি, সম্ভাবনাময়, সমকালীন সেরা, সেলিব্রেটি ইত্যাদি। এদের মধ্যে অনেকেরই ফেসবুকে লক্ষাধিক ফলোয়ার থাকে। তবে শুনেছি সেলিব্রেটি হোক আর যাই হোক কোনো প্রকাশকই ঝুঁকি নিয়ে এদেশের কোনো লেখকের বই হাজার কপির ওপরে ছাপান না। আর আমি নিশ্চিত মুস্তাফিজের প্রকাশক তার মতো নিতান্ত অপরিচিত লেখকের বই দুই-তিনশ কপির ওপরে ছাপায়নি।

তবে স্বীকার করতেই হবে যে, ছেলেটির লেখা বেশ ঝরঝরে। আরোপিত বর্ণনা, বিশেষণের আড়ম্বর নেই বলেই ওর বইটি পাঠ তরতর করে এগোচ্ছে। তবে প্রথম গল্পটি পড়ার শুরু করতেই আমার কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল। গল্পটির নাম-একজন মৃত বালকের আত্মকথন। এই গল্পে গল্পকথকের ভূমিকায় লেখক যেন নিজের মৃত্যুর ধারাবিবরণী দিচ্ছে! কী অদ্ভুত জীবন্ত সেই বর্ণনা!

আচ্ছা ছেলেটি কি গল্পের এই চরিত্রের মতোই মারা গিয়েছিল? নিজের মৃত্যুদৃশ্য কি সে নিজেই অংকন করে গেছে? বইটিতে মোট তেরোটি গল্প সংকলিত হয়েছে। আনলাকি তেরো সংখ্যার মতো, আনলাকি তেরোজন মানুষের গল্প। প্রতিটা গল্পে পৃথক পৃথক চরিত্র অংকন করা হয়েছে। এক একটি গল্প খুব সাদামাটা মানুষকে নিয়ে লেখা। তারা আমাদের আশেপাশের মানুষই কিন্তু তাদের আমরা কখনো বিশেষ পাত্তা দিই না। আমি তবু সেই চরিত্রগুলোর ভেতর ঢুকতে গিয়ে বার বার হোঁচট খাচ্ছি। তবু পড়ছি, পড়তে ভালো লাগছে।

আগেই বলেছি আমি খুব পড়ুয়া মানুষ না। মেসের এই ছোট ঘরে তবু আমার ছোট একটা বুক শেলফ আছে। বাড়ি গেলে প্রতিবারই দুএকটা করে বই নিয়ে আসি। ছাত্রজীবনের টিউশনির টাকায় কেনা কিছু গল্প, উপন্যাসের বই আছে বাড়িতে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যদের শখের বশে কেনা বা উপহার হিশেবে পাওয়া শদুয়েক বইয়ের সংগ্রহ ছিল বাড়িতে। ছোট বোনটার বিয়ের পর সেগুলোতে কেউ আর হাত দিতো না বলে বইগুলো আমি নিজের কাছে নিয়ে এসেছি। যদিও বছর দুই ধরে সরকারি চাকরির আশায় কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স আর আজকের বিশ্বের বাইরে তেমন কোনো বই পড়েছি বলে মনে পড়ে না।

অফিসের দু-একটা ফাইলপত্রের সাথে সাথে আমার টেবিলে দৈনিক পত্রিকা, ইংলিশ টু ইংলিশ ডিকশনারি, গোটা পাঁচেক কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, আজকের বিশ্ব শোভা পায়। এখন অবশ্য মুস্তাফিজের ‘আঁধারে মৃতের অপ্রলাপ’ এর আট কপি বই টেবিলের এক কোণায় শোভা পাচ্ছে। বইগুলো যেন এখনো ক্রেতা পাবার অপেক্ষায় আমার টেবিলে থেকে শরীরে ধূলো নিচ্ছে। বইগুলো শেলফে তুলে রাখতে হবে। এগুলোর ক্রেতা এখন আমিই। এই মাসের বেতন থেকে বই বিক্রির বাকি টাকাটা ওয়ালেটে আলাদা করে রেখেছি।

আমি আলতো হাতে বইগুলো ছুঁই। গাঢ় সবুজ রঙের মলাটের হার্ডকভার বই। বইটির লেখক এখন মৃত। গতকাল মুস্তাফিজের মৃত্যুর খবর পেলাম। গত পরশু ছেলেটি মারা গেছে। তন্ময়দার কাছ থেকে শুনেছি অর্থাভাবে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মুস্তাফিজ মারা গেছে।

বইটি পড়া শেষ করে আমি বিছানা ছাড়ি। খাটে শুয়েবসে বই না পড়লে ঠিক আরাম পাই না আমি। রাত অনেক হলো। ঘুমিয়ে পড়তে হবে। দাঁত ব্রাশ করতে করতে আয়নায় নিজেকে দেখে কেমন অদ্ভুত লাগে আমার। মুখচোখ কুঞ্চিত করে খানিকক্ষণ নিজের চেহারা পরখ করি। মুস্তাফিজের ‘বিষলক্ষ্যার ছুরি’ গল্পের প্রধান চরিত্র জোবায়েরের মতো দেখাচ্ছে আমাকে। ডান ভ্রুর ওপরে ঠিক সেইরকমই লাল আঁচিল। চোখের মণি ঘোলাটে; যেন ছানি পড়ছে ক্রমশ। উফফ! এই বই দেখি আমাকে পাগল করে দিচ্ছে!

আমি হুড়মুড় করে টয়লেট থেকে বের হই। কিন্তু কী এক অমোঘ আকর্ষণে আমি ধীরপায়ে পড়ার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াই। ঐ তো বইগুলো। একটি বই হাতে তুলে নিতেই বিদ্যুৎময় একটা অনুভূতি হাতের চামড়া ভেদ করে আমার ঠিক ঘাড়ের কাছে চলে যায়! সেই সাথে ঘরের বৈদ্যুতিক লাইটের আলো তীর্যকভাবে আমার হাতের ওপর পড়ে। আমার কেমন অন্যরকম লাগছে। অনুভূতিটা আমি ঠিক বোঝাতে পারছি না। আমার শরীর শিরশির করছে। তবু বইটি থেকে হাত আর চোখ সরাতে পারছি না।


মুস্তাফিজের বইয়ের প্রচ্ছদে গাঢ় সবুজ আয়তাকার একটি ফ্রেমের মাঝে আলো আঁধারিতে একটি ছেলের প্রস্থানদৃশ্য আঁকা। বেশ একটা জীবন্ত ভাব প্রচ্ছদে। যেন ছেলেটি নিজেও জানতো যে ঐ প্রান্তহীন পথে হেঁটে যাওয়া তার জন্য অবশ্যম্ভাবী ছিল।

রাত প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে। এই সময় এই বইটা আমার না ধরলেই ভাল হতো। কিন্তু এই বইটি তো বিশেষ কোনো বই না। তবে কি বইটির লেখকের মৃত্যুসংবাদ পেয়েছি বলে আমার এমন লাগছে? কিন্তু আমার বুক শেলফের বেশির ভাগ বইই তো মৃত মানুষের লেখা। নাহ্ ভুল বললাম! বেশিরভাগ বইয়ের লেখকই এখন মৃত।

তবে মুস্তাফিজের অর্থাভাবে মৃত্যুর কার্যকারণের সাথে আমার সংযোগ ছিল বলেই কি আজ আমার এই ব্যাখ্যাহীন অনুভূতি হচ্ছে? কিন্তু আমি তো চেষ্টা করেছি। তাহলে? তাহলে কি আমার ওয়ালেটের তিন হাজার টাকাই আমাকে এই অদ্ভুত অনুভূতির স্বাদ দিচ্ছে? টাকাটো তো আমি এখনো পৌঁছাতে পারিনি। কিন্তু এই এতটুকু আস্থাও কি নেই আমার ওপর! বলেছি তো টাকাটা যথাসময়ে পৌঁছে দিবো। ছেলেটি যে এত দ্রুত মারা যাবে তা কি আমি বুঝতে পেরেছিলাম? তবে কেন এই আলো? এই ছায়া? এই রহস্যময়তা?

তন্ময়দার কাছ থেকে আমি মোট দশ কপি বই নিয়েছিলাম। কথা ছিল, বিক্রয়লব্ধ তিন হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে মুস্তাফিজের স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। এই বই বিক্রি নিয়ে তো আমাকে আর কম ধকল পোহাতে হয়নি। অবশ্য আমি কুরিয়ারে বইগুলো পাবার পরের দিনই বুঝেছিলাম, এই অচেনা লেখকের বই বিক্রি করে টাকা যোগাড় করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

এই তো মিনিটে মিনিটে টাকা খরচ করার মানুষ সহকর্মী রাহাত ভাইকে এক কপি বই নেবার কথা বলতেই বলেছিল, ‘আরে দুর, দুর, এ কোন না কোন রাইটার, তার জন্য কিনা তিনশ টাকা গচ্চা দিবো! তাছাড়া আমার হাতে একেবারেই কোনো টাকা নেই ছোট ভাই, ক’দিন আগেই শিখাকে ম্যারেজ অ্যানেভার্সারির গিফট হিশেবে আট হাজার টাকা দামের টাঙ্গাইল সফট সিল্ক কিনে দিতে হলো। তোমার ভাবী আবার খুব করে ধরেছে, আজ রাতে বুফে ডিনারে যাবে।’

পাশের টেবিল থেকে কণা শুনতে পাচ্ছিল আমাদের কথা, আমি ওকে কিছু বলার আগেই ওর উত্তর পেয়ে গিয়েছিলাম, ‘বড় ভাই মাফ করেন, ওইসব দানছদকাতে আমি নাই। আপনিও ফেরিওয়ালার মতো বই পুশসেল করছেন দেখে আমার কিন্তু বেশ অস্বস্তি হচ্ছে। খবরদার ভাই বসের কাছে আবার যাবেন না এই সব আবদার নিয়ে। এইসব পুওর মেন্টালিটি বস ভীষণ হেইট করেন।’

কণার প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখিয়ে আমি যখন বইগুলো টেবিলের ড্রয়ারে রাখছিলাম তখন মনোজ এসে আমার সামনে দাঁড়িয়েছিল। সংকোচের সাথে মনোজ আমাকে বলেছিল, ‘আমাকে একটা দেন স্যার, কিন্যাই নিমু, কাইল পোলাডার মাটির ব্যাংক ভাঙছি, মেলা টাকা হইছিল।’

মনোজের কাছ থেকে খুচরোগুলো নিয়ে আমি গুনছিলাম আর নিজেকে আমার ভরদুপুরে গৃহস্থের দরজায় দাঁড়ানো অনাকাঙিক্ষত ভিখেরির মতো মনে হচ্ছিল। তারপর একসময় সেই ঠুনকো আবেগ বাতাসে মিলিয়ে গিয়ে আমার রাগ হচ্ছিল ভীষণ।

এত অহংকার কেন ছেলেটির! মরতে বসেছে তবু অহংকার যায় না। বই বিক্রির টাকা দিয়ে নিজের অপারেশনের খরচ যোগাবে! যেই না এক লেখক! নিজেকে সে কি মনে করে? হুমায়ূন আহমেদ? মুহাম্মদ জাফর ইকবাল? যেন বাজারে বই নামার সাথে সাথেই তৃতীয় সংস্করণ বের হবে! আমি আলনায় ঝোলানো প্যান্টের পকেট থেকে ওয়ালেটটি বের করি। বই বিক্রির তিন হাজার টাকা আমার ওয়ালেটে বন্দি। কাল সকালে টাকাটা পাঠাতেই হবে।

টাকাগুলো আবার জায়গামতো রাখতে রাখতে আমি বইগুলোর দিকে তাকাই। নয় কপি বই ঠায় দাঁড়ানো। কেমন উদ্ধত একটা ভঙ্গি ওদের। আমি বইগুলো থেকে চোখ ফেরাতে পারি না। দাম্ভিক মুস্তাফিজের লেখা বইগুলো যেন ওরই মতো দম্ভভরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

উদ্ধত আর বেপরোয়া ভঙ্গিতে বইগুলো দাঁড়িয়েই থাকে আর আমি প্রশ্নবোধক তাকিয়ে ভাবি, যে বইয়ের ক্রেতা শুধু আমি আর মনোজ, সেই বইয়ের লেখকের এত দম্ভ কিসের?

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement