লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ অক্টোবর ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ২৮টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftআমার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা (অক্টোবর ২০১৫)

স্বপ্ণ ভাঙ্গা নদী
আমার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা

সংখ্যা

আশরাফ উদ্ দীন আহমদ

comment ০  favorite ০  import_contacts ৩২৬
পাবলিক কোম্পানীর কর্পোরেট অফিসের মোটামুটি বসের মর্যাদা সম্পূর্ণ চাকুরে সোহাগ, পিয়ন-ক্লার্ক এবং ছোট বা মাঝারি ধরে অফিসে সর্বমোট ছাব্বিশজন ইমপ্লয়, তার মধ্যে পাঁচজন ফিমেল, সোহাগ সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলে, তার সৌহার্দ্যের কোনো খামতি নেই। অফিসটা শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে বলে শহরের ব্যস্ততা সর্বসময় চোখে পড়ে, সময়-অসময়ে ঘোলাকাঁচের ভেতর দিয়ে শহরটাকে দেখে মনটাকে ভালো করে নেয়। মফঃস্বল শহরের আনন্দ এবং জীবনের উচ্ছাস চোখে পড়ার মতো। মানুষজন প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে একটু ভালো থাকার জন্য, আরেকটু সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে কে না চায়, সে জন্য তেমন বড় যুদ্ধ না করেও তো বাঁচা যায়। মফঃস্বলের জীবনযাত্রা অনেকটা এমনই, সবাই স্বপ্ন দেখে তবে খুব বেশি কারো প্রত্যাশা নেই, আছে আরেকটু হলেই যেন বেশ হয়। তার বেশি কে চায়, অথবা নাহলেও তেমন ক্ষোভ নেই কারো।
গ্রামের ছেলে সোহাগের জীবনটা ছিলো অন্যরকম, একটা চাকুরী তার জীবনটাকে পালটে দিয়েছে, আজ সে মাথা উঁচু করে সমাজের সামনে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু এখানে আসতে তাকে অনেক খড়কুঠো পোড়াতে হয়েছে, সোহাগ আকাশ দেখতে ভালোবাসে, নদী দেখতে ভালোবাসে, গান শুনতে পছন্দ করে, আবার সে কখনো-সখনো কিছুই করতে ভালোবাসে না, কখনো বা বলেই ফেলে, তাকে দিয়ে কিছুই হলো না, একটা সময় ছিলো. যখন কবিতা লিখতো, সে কি কবিতা লিখতো নাকি কবিতাই তাকে ভর করতো আজ যেন সবই কেমন ধোঁয়ায় আচ্ছাদিত ময়লা, কিন্তু তারপরও জীবনকে ভালোবাসতে হলে তো কবিতার প্রয়োজন, কবিতা ছাড়া জীবন কি চলে, জীবনের মানেই তো উলটে যায়। ফিমেল সহকর্মী ইরা অকস্মাৎ বলে ওঠে, স্যার কবিতা কিন্তু মানুষের ভেতরের অন্য আরেক সত্ত্বা, আপনি তাকে যতোই তাড়িয়ে দিন না কেনো, সে ছেড়ে যাবে না।
আরেক সহকর্মী মাহমুদ কথার মধ্যে কথা জুড়ে দেয়, কবিতা আসলে গডগিফটেড বিষয়, সবাই পারে না, কেউ-কেউ পারে, জীবনানন্দ যেমন বলেছেন সবাই কবি নয় কেউ-কেউ কবি...
একাউন্স কর্মকর্তা আসিফ হাসান মুখ ফসকে বলে ফেলে, কিন্তু কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেছেন, জীবনানন্দের কথাটা সঠিক নয়, মূলত সবাই কবি।
আরেক একাউন্স কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম গলা খাঁকারি দিয়ে জানালো, আসলে কি আপনাদের কোনো কাজ-কাম নেই, কি একটা ফালতু বিষয় নিয়ে পড়লেন...
প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে ওপারের ডেক্স থেকে ক্রাইম ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা তৈয়বুর রহমান উঁচ্চকন্ঠে বললো, শুধু কি ফালতু একেবারে ন্যারো সাবজেষ্ট নিয়ে কাসুন্দি ঘাটাঘাটি,আরে বাবা কোরআন-হাদিসের কথা বললে দুটো নেকি যোগ হয়, জীবনের আষু তো শেষ হচ্ছে আর কতোদিন বাহাদূরি রে ভাই, মরণের পরে কবরের হিসাব দেবেন কি ভাবে সেটা কি ভাবেন একবার!
অফিস ইনচার্জ শহিদুল কাদেরের মনটা ভালো হয়ে যায় তৈয়বুর রহমানের কথাগুলো শুনে, একসময় তিনিও সবার সামনে চলে আসেন কাকতালীয়ভাবে, সত্যি ভাই কথা একখান বলেছেন, আমরা বড়ই উদাসিন, জীবনের কাছে বন্দি হয়ে আছি, এই জীবনটা যে আসলে কিছুই না সেটা আমাদের বোধের মধ্যেই আসছে না।
এভাবে আরো অনেক কথা যুক্ত হয়, মানুষ সম্বন্ধে মানুষেরই বা কি করণীয় সে কথাও ঘুরে ফিরে উঠে আসে, তারপর একসময় আস্তে-আস্তে সব থিতিয়ে যায়, যার-যার টেবিলে ফিরে যায় কর্মকর্তারা, কিছু আর অবশিষ্ট থাকে না, নীড়ে ফেরা পাখির মতো শান্ত হয়, দিনের আলো মুছে যায়, থাকে শুধু জীবনের অন্যরকম লেনদেন।
বাড়ি ফিরে জানালার শার্শি ধরে সোহাগ আকাশ দেখে, রাত্রের আকাশ মূগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে, কতো কথা যেন তার বলার ছিলো কিন্তু বলা হয়নি হয়তো কখনো আর বলা হবে না। জীবনানন্দের কবিতা হয়ে রাত্রি নামে বিড়ালের পায়ে-পায়ে, বিড়াল কেনো রাত্রির সঙ্গে এতোটা সংপৃক্ত হলো, জীবন থেকে ফুরিয়ে যায় সময় কিন্তু স্মৃতি থেকে যায়, সেই স্মৃতি সারাটি জীবন শুধু তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, তারপর হয়তো একদিন জীবনানন্দের মতো ট্রামের তলে হারিয়ে ফেলে নিজেকে, হারিয়ে ফেলাটা কি খুবই জরুরী! জীবন যেখানে সমুদ্র সেখানে হারানোর কি বা ভয়, তারপরও নদীতে জোয়ার আসে, জোয়ারের পর মানুষ কি পেলো কি বা হারালো তারই হিসাব কষে, সোহাগ সেরকমই কিছু কি খুঁজে যায়, হয়তো মনের খেয়ালে তাই হবে অথবা সবই ভুল, সেই ভুলের মধ্যে সে হেঁটে যায় সুদূর। কখনো-সখনো সে ভাবে মানুষ যা পারে না কবিতা তাই হয়তো পারে, আর পারে বলেই কবিতার এতোটাই শক্তি, জীবন থেকে কবিতা হারিয়ে গেলেও মানুষ তো জীবনটাকে হারিয়ে ফেলতে পারে না। একটা রাত্রি একটু সময় তার মনটাকে সেই কবিতা এসে নেশায় আচ্ছন্ন করে ফেলে।
সোহাগের জীবনের বাঁকটা অতো সোজা ছিলো না, বেকারত্বের দায় যে কতো কঠিন তা ক’জন বোঝে, ভুক্তভোগী বোঝে শুধু। সংসারের বড় ছেলে হওয়া স্বর্ত্বেও সেদিকে তেমনভাবে নজর দিতে হয়নি, কলেজ পড়া এবং লেখালেখির মধ্য দিয়েই জীবন কাটছিলো একরকম, সে’ সময় বীথির সঙ্গে মাখামাখা একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে, আকাশের ঘুড়ির মতোই ছেড়ে দিয়েছিলো নিজেকে, কিন্তু সময়টা হঠাৎই ফুরিয়ে গেলো, সংসারে একটা ঝড় সব কিছুকে উল্টেপাল্টে দিলো, সে ঝড়ে আর কিছু যেন পড়ে রইলো না।

কলেজ থেকে বাড়ি আসার পথে বীথি র্দুঘটনায় একদিন ভটভটি থেকে ছিটকে পড়ে, ওপাশে আরেক ভটভটির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মারাত্বক আঘাত পায়, আঘাত এতোটা বেশি ছিলো যে তাকে আর বাঁচানো গেলো না, সিনেমার নায়িকার মৃত্যুর মতোই সত্যসত্যিই হারিয়ে গেলো একটা ছবি হয়ে, সোহাগের জন্য সে আঘাত সহ্য করা কঠিন, তারপরও নিজেকে সামলে নিলো কিন্তু তারও কয়েকদিন পরে তার বাপ অর্থাৎ একমাত্র উপার্জনাক্ষম ব্যক্তিটি কাকতালীয়ভাবে চলে গেলো, সে যাওয়া তো স্বাভাবিক ছিলো না, মানতে তার কষ্ট হলেও মোক্ষম ঘটনাকে মেনে নিতে হয় সময়ের প্রয়োজনে, আকাশে শ্রাবণের চাপ-চাপ মেঘ ছিলো, বাপ জমিতে গিয়েছিলো, খাড়ির জমির পানি কতোটা উঠেছে, কয়েকদিনের হালকা বৃষ্টি, কখনো আবার তেড়ে আসে ক্ষেপাটে ষাড়ের মতো, সে’সময় বাপ জমির আল ধরে যাচ্ছিলো, তৎক্ষণাৎ বৃষ্টির সঙ্গে কাস্তের মতো বাঁজটা মাথায় এসে পড়ে, নিমেষে পুড়ে ছাঁই হয়ে যায়, সেই বাপটাকে দেখে সোহাগ সহৃ করতে পারেনি, কিছুটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে, তারপর অনেক কষ্টে নিজেকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আনে। গ্রাম সম্পর্কের কোনো এক মামার মাধ্যমে চাকরী হয় কিন্তু কবিতা হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় জীবনের অনেক কিছু, অন্ধকারের মতো একটা মাকড়সার জাল বোনানো বাসাটা কেমন তাকিয়ে আছে তার দিকে, কিন্তু সে’ দিকে তাকাতে পারে না, অনেক চেষ্টা করে হাত দিয়ে সরিয়ে দিতে, অথচ পারে না, কেনো যে পারে না, সে নিজেও বোঝে না, কেমন সব দুর্বোধ লাগে, মহাচীনের মহাপ্রাচীরকে সরানো যায় না, স্মৃতির মতো আঁকড়ে থাকে মাটির অনেকখানিক গভীরে, আঘাতে জর্জড়িত একজন মানুষের এর বেশি কি আর থাকেÑÑÑকবিতা তোমায় দিলেম আজকে ছুটি/ ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী নিরানন্দ/ বেকার এবং হতাশায় জীবনানন্দ/ ভেঙেছে বীথি-সোহাগের জুটি...
অথচ মন তার আজো কবিতাকে খোঁজে, বীথি যেমন আর আসে না, কবিতাও আসে না, দুটো যেন ওই আকাশের কাছে বন্দি হয়ে আছে, কেউ আর আসবে না, সোহাগও জানে তারা আর কেউ এজন্মে আসবে না। অফিসে বসে রঙিন গ্লাসের ভেতর দিয়ে ব্যস্তবিধূর শহরটাকে দেখে, শহর প্রতিদিন প্রতিনিয়ত পাল্টে যাচ্ছে কিন্তু কে তার খবর রাখে, সে তার নিজের মতোই সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে, গ্রাম আর শহর আজ কতোটা পাল্টে গেছে, মানুষের মন তবুও হারায় যেমন হারায় সোহাগের মন। কখনো বীথি মন নিয়ে চলে যায়, আবার কখনো জীবনের পেছন দিনের জ্বলজ্বলে ভয়কাতুরে স্মৃতিগুলো, একটা সময় সোহাগ হাতড়ে মরে, কোথাও কাউকে পায় না, তারপর দুচোখে ঘুম নেমে আসে। ঘুমের জন্য যেন শরীরখানা ভেঙে পড়ে, মানুষ তো এভাবে প্রতি ঘুমে মরে আবার বেঁচে ওঠে, এমনি করেই হয়তো একদিন আর কেউ জেগে উঠেবে না, তখন মানুষের মৃত্যু মানুষ দেখবে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে, আজ সে বেলকনির গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে আকাশটাকে দেখে, আকাশের বুকে কোনো দাগ নেই, তাহলে কি সমস্ত দাগ রয়েছে মানুষেরই বুকে, মানুষ কঠিন থেকে নির্মম হয় কিন্তু ওই আকাশ তো নিম্পাপ।
দশটা-ছয়টা অফিস সেরে ভাড়া বাসায় এসে নিজেকে অন্যভাবে দেখে, হয়তো সে দেখা তার নিয়মের বাইরে। তারপরও কবিতা আসে না, কবিতা ছুটি নিয়ে চলে গেছে সেই কবে। বদ্ধ ঘরে মাথা খুটে মরে, জীবন যেন বদ্ধ একটা ঘরের ভেতর আবদ্ধ, এখান থেকে আর হয়তো বের হওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু তারপরও সে বের হয়ে আসবে, আবার সকাল হবে আবার বিকেল হবে, নীড়ে ফেরা পাখিদের মতো ফিরে আসবে আপন গন্তব্যে, জীবন হয়তো এমনই, এভাবেই ভেসে বেড়ানো, আকাশের মেঘপুঞ্জ যেমন ভেসে বেড়ায়, কোথায় হারিয়ে যায় আবার চোখে এসে ভিড় করে, তারপর হাওয়ায়-হাওয়ায় ছড়িয়ে যায় কোথায়, এভাবে বয়ে বেড়ায় সাত-আসমান, জীবন যেমন পুরুষানুক্রমে বয়ে যায়, নাকি বয়ে চলা সমস্ত শ্যাওলা-পানা বুকে জড়িয়ে, হারিয়ে যাওয়া নিজের মতো নাকি বাতাসের বেগে, বুকের মধ্যে কষ্ট বাড়ে, রাত্রি বাড়ে রাত্রির নিয়মে, ঘরের দেওয়ালের একটা টিকটিকি আরেকটা টিকটিকিকে ধাওয়া করে তারপর তারা কোথায় হারিয়ে যায়, স্বপ্ন ভাঙে কাঁচের চুড়ির মতো, নিজের কাছে ফিরে আসলেও জীবনের কাছাকাছি পৌছানো যায় না, একটা আড়াল থেকে যায়, সেই আড়ালে কেউ যেন মুখ টিপে হাসে, অথচ সোহাগ কাউকে কিছুই বলতে পারে না, অনেক না বলা কথা চুপিসারে কেঁদে মরে, কেউ দেখে না, দেখাটা কারো মতো না।
অফিস ফেরৎ মানুষের ভিড়ে সোহাগ নিজেকে চিনতে পারে না, যান্ত্রিক একটা পুতুল নাকি কম্পিউটার, মানুষের শরীরের ভেতর কতো দাগ কতো রাগ বা ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা কিছুই তো কেউ জানে না, ঝাঁকের কইয়ের মতো মানুষ ছুটছে সময়ের দাস হয়ে,তারপরও বসন্তে ফুল ফোটে, শ্রাবণে বৃষ্টিধারায় স্নাত হয় পৃথিবী, আর সোহাগ পাথরচোখে অনেক কিছু দেখার ভেতর অনেক গভীরে হারিয়ে যায়, কতোখানি গভীরে যে মানুষ যেতে পারে, তা হয়তো সবাই জানে না, কিন্তু সে জানে, কারণ তাকে জানতে হয়, এভাবেই হেঁটে মানুষ একদিন তার নিজের কাছে পৌছে যাবে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement