আবার বৃষ্টি আসতেই ডিঙি ঘুরিয়ে নিল মানিক । বর্ষার এই সময়ে সুজাপুর বিলে গঙ্গার জল ঢুকে পড়ে । আর ঢুকে পড়ে প্রচুর মাছ । সুযোগটা হাতছাড়া করতে চায় না জেলেরা । তাই শেষরাতেই সে বেরিয়ে পড়েছিল । পাড়ের ঝোপের কাছে ফিরে ডিঙি ভেড়ালো শিমুল গাছটার নীচে । বেশ জোর বৃষ্টি পড়ছে । গলুইয়ের ভেতর ঢুকে মানিক একটা বিড়ি ধরালো । তখনই চোখে পড়লো আলোটা । মাঝগঙ্গায় স্থির হয়ে জ্বলছে ।

আলোটা আগেও মানিক চার-পাঁচবার দেখেছে । নিতেশকাকাকে বললেও বিশ্বাস করেনি । কাকা বলে, "ঘুম চোখে কী দেখতে কী দেখেছিস ঠিক নেই !" আজ মানিকের রোখ চেপে গেল । ব্যাপারটা সে নিজের চোখেই দেখতে চায় । কাকা এখনো আসছে না কেন ? এতক্ষণ তো নিতেশকাকা চলে আসে । এলে তো নিজের চোখেই আলোটা দেখতে পেত । আলোর রহস্য নিয়ে মানিক নিজেও ধন্দে আছে । মাস দুয়েক ধরে আলোটা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে । ডাকাবুকো মানিক বৃষ্টির মধ্যেই ডিঙি খুলে দেয় । এগিয়ে যায় মাঝগঙ্গার দিকে ।

বর্ষায় গঙ্গার স্রোতের গতি বেড়ে যায় । বিল থেকে ডিঙিটা গঙ্গায় নামতেই মানিক সেটা টের পেল । ছোটো ডিঙি স্রোতের তোড়ে ভেসে যেতে চাইছে । মানিক শক্ত হাত বৈঠা ধরে । স্রোতের গতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে নৌকা চালায় । চোখ তার স্থির হয়ে আলোটির দিকে । বৃষ্টি এখন অনেকটা ধরে এসেছে । একরাশ ঠান্ডা বাতাস মানিকের চোখমুখে ঝাপটা মারল । গঙ্গার এই দিকটাতে মানিক ও নিতেশকাকা ছাড়া আর কেউ মাছ ধরতে আসে না । অন্যরা মাছ ধরে বিলের ভেতরে । মাছ সেখানেই বেশি পাওয়া যায় । গঙ্গা এবং বিলের মোহনায় বড় মাছ পাওয়া যায় । কিন্তু তা পরিমাণে কম এবং ভাগ্যেরও ব্যাপার । তারই সন্ধানে আসে মানিক ও নিতেশকাকা । এদিকে জেলেরা আসে না সেটা মনে পড়তেই ঠান্ডাটা মানিকের মুখমণ্ডল থেকে শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল । কারণ বিপদে পড়লে তাকে সাহায্য করতে কেউ আসবে না । সে মনটাকে সাহসী করতে জোরে বৈঠা চালালো । একধাক্কায় নৌকাটা সামনের দিকে এগিয়ে গেল অনেকটা । আলোটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে ।

মোহনা ছেড়ে মানিক অনেকদূর চলে এসেছে । গঙ্গার এই অংশটি প্রস্থে বেশ বড় । প্রায় দেড় কিলোমিটার । গঙ্গার ভেতরের এইদিকে সাধারণত কেউ আসে না । কারণ গঙ্গায় কেউ মাছ ধরে না । অন্যদিকে ওইপার জুড়ে শুরু হয়েছে বিশাল সরকারি বনভূমি । মাল বোঝাই নৌকা কিংবা স্টিমার যা কিছু যাতায়াত করে তা মোহনা ঘেঁষে । তাও দিনের বেলায় । মানিক পিছন ফিরে মোহনা দেখতে পেল না । সামনে দেখতে পেল অন্ধকারে জঙ্গলের গাছগুলি এক একটা দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে ।

মানিকের ডিঙি নৌকার সামনে একটা শুশুকের বাচ্চা ডিগবাজি মারল । ছোট থেকেই মানিকের শুশুকের প্রতি দুর্বলতা । শুশুক দেখতে তার খুব ভালো লাগে । বাচ্চা যখন আছে তখন মা-টাও এদিকে কোথাও আছে । মানিক মা-শুশুকটিকে খুঁজছে । আবার দাপিয়ে বৃষ্টি নামল । বৃষ্টি নামতেই সামনের আলোটা ঝাপসা হয়ে এল । তারপর ঘোর অন্ধকার । কোনোদিকে কিছুই দেখা যায় না । চারপাশে শুধু ঝমঝম শব্দ । আলোর নিশানাটা আন্দাজ করে নৌকা চালাতে লাগল মানিক ।

বেশ কিছুটা এগিয়ে আসার পর সামনে ডাঙা দেখতে পেল মানিক । ডাঙা দেখেই চমকে গেল সে । এখানে তো ডাঙা থাকা কথা না । কী ভূতুড়ে কাণ্ডরে বাবা ! অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছে ওপারের জঙ্গলটা বেশ দূরে । এখানে মাটি এল কী করে ? দারুণ ঘাবড়ে গেল মানিক । তবে কি নতুন চর ? কিনারা ধরে এগিয়ে গেল সে । আয়তন তেমন কিছু বড় নয় । কিছুটা যেতেই চড়াটা শেষ হয়ে গেল । সেযাইহোক চর তো বটে । নিশ্চয় একদিনে পড়েনি । অথচ কেউ খবর পেল না । নিতেশ কাকা ? নিতেশকাকা তো এ তল্লাটের সব খবর রাখে ? আরও একটু যেতে মানিক চরটার একদম উল্টোদিকে পৌঁছে গেল । সেদিকে যেতেই সে দেখতে পেল তার খুব চেনা একটা ডিঙি সেখানে বাধা । রহস্যটা আরো ঘোল পাকিয়ে গেল তার মাথায় ।

মানিক ডিঙি থেকে চরে নামল । সামনের ঝোপঝাড় পেরিয়ে যেতেই আলোটা দেখতে পেল । ধুকপুক করে উঠল তার বুক । মনে তো হচ্ছে হ্যারিক্যানের আলো । কিন্তু হ্যারিক্যান এখানে এল কী করে ? হালকা বৃষ্টির মধ্যে মানিক দেখতে পেল বাঁশের মাচার উপর একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর । সেখানেই আলোটা জ্বলছে । কুঁড়ের কাছাকাছি গিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেল । সেখানে শুয়ে আছে নিতেশকাকা । খুব কাছে গিয়ে দেখল কাকা আরাম করে ঘুমাচ্ছে । আহা বেচারা ! সারাজীবন অশান্তির মধ্যে কাটিয়েছে । দুদন্ড শান্তির জন্য কেমন হন্যি নিতেশকাকা মানিক তা জানে । বাইশ বছর একসাথে মাছ ধরছে তারা । কত সুখদুখের সাক্ষী এই গঙ্গা আর তারা দুজন । ঘুমাক । একটু আরাম করে ঘুমাক । কাকীমা বেঁচে থাকতে কাকার হাড় জ্বালিয়ে ছেড়েছিল । এখন চার ছেলে আর তাদের বউয়েরা জ্বালিয়ে মারে । নতুন চর থেকে ফিরে আসার আগে মানিক আর একবার নিশ্চিন্তে ঘুমানো নিতেশকাকার মুখটার পানে তাকালো । মৃদু বৃষ্টির আবছা আলোয় মানিকের মনে হল নিতেশকাকা যেন নতুন দ্বীপের রাজা ।