একটা মাছরাঙ্গা আমাকে আজও কাঁদায়, ভেঙ্গে চৌচির করে দেয় আমার হৃদয় প্রদেশ। আমি সখ করে তাকে মাছরাঙ্গা বলেই ডাকতাম। সেও খুব খুঁশি হতো। তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। স্কুলের সেরা ছাত্র আমি। সবাই আমাকে এক নামে চিনতো। যদিও স্কুলটি নাটোর জেলার লালপুর থানাধীন রামপাড়া নাামে ছোট্ট একটি গ্রামে অবস্থিত; তবুও ছাত্র/ছাত্রীর সংখ্যা ছিল বেশ। কোন এক স্কুলের দিনে হেড স্যার আমাকে তার কক্ষে ডেকে পাঠায়। সালাম দিয়ে তার কক্ষে ঢুকে দেখি সেই মাছরাঙ্গাটি তার বাবার সাথে হেড স্যারের সামনের চেয়ার দু’টোতে বসা। পরে শুনলাম অন্য এক স্কুল থেকে টিসি নিয়ে আমাদের স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য এসেছে। সে আর আমি একই ক্লাসে। তার হরিণি দুটি চোখ, মায়াবী চাহনী আমাকে পাগল করে দিল। আমিতো তাকে দেখে আত্মহারা। সব কিছুই যেন কেড়ে নিল সে। কেড়ে নিল আমার আমিকে। তখন আমার অস্তিত্ব জুড়ে শুধু সে আর সে। ¯^q‡b, ¯^c‡b, কল্পনাতে শুধু সেই মাছরাঙ্গাটি। মনের অজান্তেই সে আমার এই অন্তর প্রদেশের মহারানী হয়ে গেল। তারপর গল্প, আড্ডা, আমার কাছ থেকে সাজেশন নেওয়ার এক পর্যায়ে বেশ ভাব জমে উঠল দু’জনার। কখন যে এই মনটা তার মাঝে হারিয়ে ফেললাম তা এতটুকুও টের পায়নি আমি। মান-অভিমান, রাগ-অনুরাগ এই সব নিয়ে ভালোই সময় কাটছিল আমাদের। হঠাৎ এসএসসি পরীক্ষার আগে তার বিয়ের কথা উঠলো। পরে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থানায় কোন এক সৌভাগ্যবানের সাথে তার বিয়ে হয়ে যায়। তার একটি কথা আজ খুব মনে পড়ছে আমার। সে তার ভেঁজা ভেঁজা ঠোঁটে এক ঝলক হৃদয় জুড়া হাসি দিয়ে একদিন বলেছিল, “তোকে আমার খুব ভালো লাগেরে শিশির, বিয়ে করলে তোকেই করব”। কিন্তু কঠিন বাস্তব তার আমার মনের বাসনা পূর্ণ হতে দেয়নি। আমার মাছরাঙ্গাটি সেই যে উড়ে গেল কি এক অভিমানে অন্য কোন এক দেশে। সে আর ফিরে এলনা। কেমন আছে সে? আজ কতদিন হয়ে গেল তাকে দেখিনি। শুধু এক পলক তাকে দেখার জন্য আমার এ অবুঝ মনটা আনচান করে বার বার। হৃদয় মাচানের কচি লাউয়ের ডগাগুলো নুঁইয়ে পড়েছে; শুকিয়ে গেছে সবুজ কলমিলতাগুলোও। যেগুলো একদিন তাকে দেখে হাসত আর তার মনকে ভরে দিত অজানা এক সুখে। রোজ সেই মাছরাঙ্গাটি উড়ে এসে যেখানে বসত, ঠিক একই জায়গায় আজ শুন্যতা বিরাজ করে। কাউকে দেখিনা সেখানে। শুধু দেখি মুমুর্ষ কিছু আশা, কেন জানি বাসা বেঁধে আছে অকারণে। একটা মাছরাঙ্গা আমাকে নিঃশ্ব করে গেল; তীলে তীলে ধ্বংস করল আমায়। আমি এখন দু'চোখে আঁধার দেখি, শুন্যে চেয়ে থাকি তার প্রতীক্ষায়। তবুও বিশ্বাস কর মাছরাঙ্গা, সারাটা জীবন শুধু তুমিই থাকবে আমার এ বুকের মধ্যখানে। নিরবে, নিভৃতে শুধু তোমাকেই ভালবেসে যাব সম্রাট শাহজাহানের মত করে। হয়ত কৃত্রিম তাজমহল তৈরি করার সাধ্য আমার নেই; কিন্তু অকৃত্রিম তুচ্ছ কুটির রচনা করব আমার এই হৃদয় মাঝারে। তুমি কি আর কোন দিন ফিরে আসবে আমার হয়ে? উড়ে এসে বসবে আমার এই শুন্য হৃদয় প্রদেশে? তবুও বলি ফিরে আসো তুমি, ভালবাস আমাকে, দু’দন্ড শান্তি দিয়ে যাও একটা মাছরাঙ্গা।