আমি আর মনোজ গ্রীষ্মের ছুটিতে মনোজদের বাড়িতে যাব ঠিক করলাম । মনোজ আমার
বেস্ট ফ্রেন্ড । ওরা খুব গরীব । কি সব পাতা কুড়ায় তাই বিক্রি করে । আর একটু আধটু চাষ আবাদ
করে ।
মনোজ ট্রেনে করে নিয়ে গিয়ে একটা স্টেশনে নামাল । নেমে আমরা বাস ধরলাম । তা প্রায় আধঘণ্টা যাওয়ার পর আবার রিক্সা ধরলাম । আমার মনে নেই জায়গাটা কোথায় ছিল । কিন্তু আবছা আবছা মনে পড়ছে রাস্তাটা । খুব এবড়ো খেবড়ো। ভাঙাচোরা বেলে পাথর দিয়ে তৈরি । এটা তো স্বাভাবিক । কেন না এটা মালভূমি ।
রিক্সায় রাস্তার জন্য প্রচণ্ড ঝাঁকুনি এবং মাঝে মাঝে লাফিয়ে উঠছিল । আর সেই ঝাঁকুনিতে আমরা ও আমাদের মালপত্র নিজের স্থান থেকে এক দেড় ফিট উঁচুতে পর্যন্ত উঠে যাচ্ছিলাম । রাস্তাও কেমন শুনশান । খুব একটা লোকজনও দেখা গেল না । আমি জানি মনোজরা খুব গরীব । অনেক কষ্টে ও সরকারী অনুদানে মনোজ পড়াশুনা করছে । রাস্তার দু ধারে বাড়িঘরের ভাঙাচোরা অবস্থা দেখে মনোজের বেশ খটকা লাগল । রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করল – কি ব্যাপার গো দাদা , এমন ছন্নছাড়া লাগছে কেন গ্রামটাকে ।
রিক্সাওয়ালাও আমতা আমতা করে বলল – কি জানি ! জানি না গো বাবু !
অনেক কষ্টে মনোজদের বাড়ি এল । রিক্সাওয়ালা দাঁড়িয়ে পড়ল । মনোজ ভাড়া দিয়ে তাকে বিদায় করে দিল ।
আর একটু হাঁটলেই মনোজদের বাড়ি । ফোন করে বাড়ি আসার খবর দিতে পারত । কিন্তু সারপ্রাইজ দেবে ভেবে কোন খবর দেয় নি । বাড়ির কাছে পৌঁছনো গেল । কিন্তু সেখানে পৌঁছতে মনোজের মুখে যে রকমের বিস্ময় দেখলাম তা আমি আগে দেখিনি । অদ্ভুত এক বিস্ময় !
বিস্ময় দেখে আমি মনোজকে জিজ্ঞাসা করলাম - কী রে ,কি হল । এ রকম করছিস কেন ?

-আমাদের বাড়ি...বাড়ি...কোথায় ? এটা কী ?
আমাদের সামনে সুদূর বিস্তৃত মাঠ । মনোজ বলল,"আমাদের বাড়ি তো এখানেই ছিল । কোথায় গেল ?"
আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না । যদি এখানেই বাড়ি ছিল তো তাহলে গেল কোথায় ? ব্যাগ পত্র ফেলে মনোজ একেবারে থ হয়ে গেল । কি করবে বুঝতে না পেরে এদিক ওদিক করতে লাগল । আমিও দেখলাম প্রায় দশ বারোটা বাড়ি ভেঙে গেছে । কোথাও কোথাও আগুন লাগানো হয়েছে । আর প্রায় মনে হয় কোন বাড়িতে লোক নেই । মনোজ কি করবে বুঝতে না পেরে ঘর গুলোর এদিক ওদিক করতে লাগল আর জগা মনা হরি হাবু মিলু আরো কি সব নাম ধরে প্রায় কাঁদো কাঁদো সুরে ডাকতে লাগল । কোন উত্তর পেল না । আমি ওর পেছনে পেছনে কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না । দুপুর সবে পেরুচ্ছে , খিদে পেয়েছিল এখন সে সব উধাও ।
মনোজ রাস্তা ধরে ডানদিকে দৌড় দিল । আমিও গেলাম । সামনে একটা চায়ের দোকান । সেখানে গিয়ে মনোজ হাঁপাতে লাগল । খড়ের চালের খুঁটিটা ধরে জিজ্ঞাসা করার আগেই দোকানদার মনোজকে দেখেই চমকে উঠল আর বলল, "আরে মনোজ বাবু যে । কখন এয়েছো গো । রাতে যা হল । কি বলব তোমায় । তুমিই বলো , এভাবে চলতে পারে না । আমরা এ কোন রাজত্বে বাস করছি ।"
দোকানদার ভেবেছ , মনোজ সব জানে । মনোজ তো কিছু জানে না । তাই সে একটু শ্বাস নিয়ে বলল – আমি এই মাত্র মেস থেকে ফিরছি । আমার মা বাবা মুনাই এরা কোথায় ? সব শুনশান কেন ?
দোকানে কোনো খরিদ্দার ছিল না । ফাঁকা দোকানে দোকানদার অগ্রিম চা প্রস্তুত করছিল । তার হাত থেকে ঠক করে চা ভর্তি সসপেনটা পড়ে গেল । ভাঙা টেবিল মত কাপ টাপ রাখা জায়গাটা চায়ে ভরে গেল । লোকটার পায়ে পড়ল কি না কে জানে ছট করে পা টা সরিয়ে নিয়ে মনোজের কাছে তাকে জড়িয়ে হাঁউমাঁউ করে কেঁদে ঊঠল । জড়ানো গলায় বলল – তুই কিছু ভাবিস না আমরা তো আছি । আমরা তো আছি ।
মনোজ নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল আর জিজ্ঞাসা করল – আমার মা বাবা ...
আমিও বার বার তাই জিজ্ঞেস করতে চাইলাম । কিন্তু দোকানদার চিৎকার করে কাকে কাকে যেন ডাকতে লাগল । কিন্তু আসল ব্যাপারটা আমরা জানতেই পারলাম না । গত পরশু দিনও পাশের বাড়ির ফণিদা ফোন থেকে কথা বলেছিল মনোজ সবাই ভাল ছিল । মা বলেছিল – ভাল আছি । মুনাই এবার পূজোয় জামা নেবেই । কি করে দিই বলত । কয়দিন ধরে পাতা কুড়াতে যেতে পারে নি , আর পুরনো তুলে আনা পাতা খুব কম দামে দিয়ে দিতে হবে । আর আর ......
মনোজের মা কি যেন বলতে চেয়েছিল , লোকের ফোন , তাছাড়া ফোনে চার্জ ছিল না বলে ফোন কেটে যায় । ওদের বাড়ি থেকে কারেন্ট কিছুটা দূরে । আর এই সব অঞ্চলে প্রায়ই কিসের যেন ভয় আর সন্ত্রাস লেগেই থাকে ।
কোথা থেকে দু জন লোক এল । মনোজ তাদের দেখেই কেঁদে ফেলল । তারা বলল – চল মনা , চল হাসপাতালে যেতে হবে ।
- কেন কি হয়েছে আগে বলো ? তারপর ......
তারা সময় কম বলে ঊর্ধ্বশ্বাসে যা বলল তা এই রকম - গত রাতে কারা যেন বুনিতা গ্রামের প্রায় অর্ধেকের বেশি বাড়িতে ঢুকে ভেঙে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে আর বোমা মেরেছে । তাতে প্রায় জনা দশ বারোর অবস্থা খুবই খারাপ । আজই দুপুরে জানা যায় মনোজের বাবা মা আর ছোট বোন এদের মধ্যে আছে । ফোন করার চেষ্টা করা হয় । কিন্তু মনোজের ফোন বন্ধ ছিল । এ তল্লাটে এ রকম অবস্থা কয়েক বছর ধরে হতেই আছে ।
সে এক অভাবনীয় শূন্যতার দৃশ্য দেখে , আমার কী করণীয় আমি তো বুঝতেই পারছিলাম না । মনোজ নিজেকে সামলে নিল । এ রকম দৃশ্য মনে হয় ও আগেও দেখেছে ।
মনোজ এর পর তাদের সাথে হাসপাতালে গেল । ভেবেছিল মা বাবা বেঁচে থাকবে , কিন্তু তা হয় নি । এরপর প্রায় সন্ধ্যে হয়ে আসছে দেখে আমাকে ওদের লোকজন স্টেশনে পৌঁছে দিল । আর আমিও এরকম এক অভাবনীয় সর্বশূন্য অবস্থা দেখে ফিরে আসি ।।

-০-০-০-