ইয়েস! ইয়েস! পেরে গেছি! ইউরেকা!
ছেলেটি বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে মাথার ওপর দু’হাত তুলে এভাবেই নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিল। ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে যৌক্তিক প্রাণীটি আবেগ প্রকাশের সময় বড়ই অযৌক্তিক আচরণ করে। কেউ ভীষণ কাঁদে, কেউ পাগলের মতো হাসে, কেউ চিৎকার করে। এই ছেলেটি করছে হেঁড়ে গলায় চিৎকার।
তার চারপাশে কয়েকজন জমা হয়ে যায়। সবার মনেই এক প্রশ্ন, ছেলেটা এমন করছে কেন?
একজন সাহস করে জিজ্ঞেস করেই বসে, কী ব্যাপার? এমন করছেন কেন? কী হয়েছে? কী পেরেছেন?
ছেলেটা সম্বিৎ ফিরে পায়। আশেপাশে লোকজন দেখে খানিকটা লজ্জাও পায় বোধহয়। হাতের কাগজটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, দেখুন।
ভদ্রলোক কাগজটা নিলেন। চারপাশ থেকে সবাই গলা বাড়িয়ে দেয়। লটারিতে জেতার খবর? নাকি কোন পরীক্ষায় স্মরণকালের সবচেয়ে ভাল রেজাল্ট? তাঁরা আটপৌরে মানুষ, আটপৌরে ব্যাপারগুলোর বাইরে কিছু চিন্তা করা তাঁদের জন্য একটু দুরূহই।
কই, কাগজে তো এক ছত্র লেখা মাত্র। না আছে মাথা, না আছে মুণ্ডু। ভদ্রলোক মাথা চুলকে বললেন।
ছেলেটাই খোলাসা করে। আরে, এটা আমার প্রথম গল্পের প্রথম লাইন।
ভদ্রলোক তেমন কিছু বুঝতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। শুধু ঠোঁট গোল করে বলেন, অ।
ছেলেটার উৎসাহ তাতে কিছুমাত্র কমে না। সে নিজের মাথায় চাঁটি মেরে বলে, পুরো এক মাস ধরে গল্পের প্লটটা মাথায় ঘুরছিল। কিন্তু কীভাবে লেখা শুরু করবো কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না। তারপর যা থাকে কপালে ভেবে লিখে ফেললাম লাইনটা।
একটু দম নেয় ছেলেটা। তারপর তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা মানুষগুলোকে সগর্বে বলে, প্রথম লাইনটা লিখে ফেলেছি মশাই। এবার আমি একজন লেখক। পুরোদস্তুর লেখক।

জটলার মধ্যে একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। সবাই যারপরনাই হতাশ হয়েছে। ভেবেছিল কী না কী দেখবে, যেটা নিয়ে সবার সাথে আলাপ করা যায়, চায়ের স্টলে বসে রাজা-উজির মারা যায়। না, একটা লাইন লিখে ফেলেই ছেলেটা এত লাফঝাঁপ শুরু করেছে? পুরো গল্পটা লিখে ফেললে তো ভূমিকম্প হয়ে যাবে।

একজন বিড়বিড় করে বলেন, পুরনো পাগল ভাত পায় না ... ... বাক্যটা শেষ করলেন না তিনি।
আরেকজন বলল, বেচারার মাথায় ছিট, আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। আজকালকার ছেলেপুলেরা খানিকটা এমন কিসিমেরই হয়। পড়া নেই শুনা নেই, তাই বেহুদা কাজকাম করে। “সেই যুগ” কি আর আছে?
একজন বেশ রেগে গেছেন, ধুর, খামোকা সময় নষ্ট। এদেরকে ধরে ... ... উচিৎ। (যথেষ্ট অশিষ্ট শব্দ ব্যবহার করলেন তিনি)
কেউ খানিকটা বিদ্রূপের, কেউ খানিকটা করুণার দৃষ্টিতে উষ্কখুষ্ক চুলের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। ওর স্বপ্নমাখা আর আনন্দে বিভোর চোখ দু’টি তাঁদের চোখে পড়ে না।
তবে বেশীক্ষণ নয়। জটলা যেমন দ্রুত জমে উঠেছিল, তেমন দ্রুতই পাতলা হয়ে যায়। সবাই বাড়ির পথ ধরেন। “প্রথম গল্পের প্রথম লাইন” লিখে ফেলার আনন্দে উদ্বেলিত এক অর্বাচীন বালকের জন্য এর চেয়ে বেশী সময় তাঁরা নষ্ট করতে পারবেন না।

শুধু একজন কিছু বললেন না। তিনি আগাগোড়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন, ব্যাপারস্যাপার দেখছিলেন।
স্মিতমুখে তিনি ভাবছিলেন, সত্যিই তো। জগতে যে একটা লাইন সাহস করে লিখে ফেলেছে, সে-ই তো লেখক। সবাই তো সেটা পারে না। ভাবতে পারে সবাই, বলতে পারে সবাই, কিন্তু মনের মতো করে লিখতে পারে ক’জন? আর এর সাথে মিশে থাকে যে পূর্ণতার অনুভূতি, বুকের ভেতর থেকে পাষাণভার নেমে যাবার আনন্দ, কিছু একটা করে ফেলার অবর্ণনীয় খুশি, সেটাও তো সবাই পায় না।