বিচুলি কাটা হয়ে এলে কৃষকের হাত নরম হয়ে আসে: বাড়ির পাশে বকুল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে সকালের সূর্যের আভায়
হেজে যাওয়া হাত দেখে দু-দণ্ড থমকে দাঁড়ায় ‘ আজও কাজে যেতে হবে !’
নবান্নের গন্ধ এসে লাগে গরম ভাতের বাসের সঙ্গে মিশে যায় কাঁচা কাঠের ধোঁয়া তাই মেখে তারিয়ে তারিয়ে খায় ওরা পাঁচজন ।
‘খোকা , এবার শীতে আমাকে একটা ব্রজবাসী চাদর কিনে দিস ‘ বলতে বলতে বুড়ি এক মুঠো আলুমাখা গলা ভাত
মাড়িতেই চিবিয়ে চিবিয়ে খায় ।
হেমন্তের এই শিশির পরম মমতায় মেখে নেমে পড়তে হবে কোমর জলে ধান তুলতে ;
না হলে ছেলেমেয়েরা খেতে পরতে পাবে না !
ছোট ছেলেটার ভাল প্যান্টের অভাবে স্কুলে যাওয়া হবে না ।
সন্ধ্যে বেলার টিমটিমে আলোতে ‘পাশের বাড়ির গদাইয়ের ছেলেটা কি মিষ্টি সুর করে পড়ে আমার ছেলেটা যেন ও রকম পড়তে পারে’
ভাবতে ভাবতে মাঠে যায় কৃষক ।
ধানের জমিতে রোদের ছটা পড়ে জল থই থই ;
মাছের চাষ হয় বিঘের পর বিঘে লাঙ্গল , কীটনাশক , সার দিয়ে ধানে তেমন লাভ নেই আর ।
তাহলে কৃষকের কি হবে !
নিয়ে নিক জমি অন্য কেউ অন্য কোন জন যারা টাকার মালা গাঁথে ধনের ঐশ্বর্যে ধনতান্ত্রিক বৈভব গড়ে ।
কৃষক আর কোথায় ! সবই লুপ্ত প্রজাতির মত ।
এখন শুধু শ্রমিক – শ্রমের বিনিময়ে টাকা নাও – মাপা টাকা ।
জমির শ্রমিক , খেতের শ্রমিক , মাঠের শ্রমিক , মঠের শ্রমিক , ইমারতের শ্রমিক , কারখানার শ্রমিক , আমাদের বাড়ির কাজের শ্রমিক ।
কৃষকের দিন আনতে পান্তা ফুরায় , শেষে পান্তাতেও জল ঢালতে হয় ।
মাঠের পর মাঠ জুড়ে আর কাটা ফসলের নীচে ইঁদুর নাচে না ঝোপের আড়ালে সাদা বক খুঁটে খুঁটে চরে বেড়ায় না কাদা খোঁচা ডাহুক , বক , মরাল কোথায় সব হারিয়ে গেছে ।
কৃষকেরা বছর ফুরালে কাস্তেতে শান দিতেও ভুলে যাবে হয়তো ?
দিনকে দিন বেকার বাড়বে - শ্রমিকও ।
কোমরের গামছাতে বিকেলের ঘাম মুছতে মুছতে কৃষক ঘরে আসে ।
ঘরের পাশে ছাই গাদায় ছেলেটা হামাগুড়ি দিতে দিতে ডাকে –
বাপ এয়েছে । বাপ এয়েছে ।
কৃষকের মনটা আনন্দে নেচে উঠে ,
আবার নতুন উদ্যমে বাঁচার প্রেরণা পায় ।
ছেলেকে কোলে তুলে ধুলো ঝেড়ে দেয় ,বউকে ডাকে –
কই গো ! শুনছো ? ছেলেটাকে একটা প্যান্ট পরাতে পার নি ?
বউ সূর্যের লাল আভায় আরো রঙিন হয়ে ছেলেটাকে নেয় হামি দেয় – এই তো সবে সন্ধ্যে হল ।
কৃষক ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে – জানো , ছেলেটার জন্য আরো খাটতে হবে আরো সকালে উঠে মাঠে যাব – মাটি কুপিয়ে দেব , ঘাসগুলোকে উপড়ে ফেলে দেব ।
বউ আক্ষেপ করে – এছাড়া আর উপায় কি বলো !
চাষে আর তেমন লাভ কই ? খাটতে খাটতে গতর পড়ে যায় ফসল সেই ঘরে আসে মাত্র দু-মুঠো । সম্বৎসর আর পেরে উঠি না ।
কৃষক ছেলের গায়ে হাত বুলিয়ে মনের জোর বাড়ায় তবুও মাঠে যেতে হবে ফসল ফলাতে হবে তাতে বাবুর দু-চার বিঘের ফসল আসে আর আমারও দু-পয়সা হয় , ছেলেটা আমার মানুষ হচ্ছে যে ----
সন্ধ্যে নেমে আঁধার এসে জড়িয়ে ধরে খড় চাউনি নোনাধরা ঘরটার চারপাশে ।
কৃষক হাতের কাস্তে পরম যত্নে তুলে রেখে মাথার গামছাটাকে মাটিতে ফেলে বসে পড়ে ঃ
এই বর্ষার আগে আবার ঘরটাকে মেরামত করতে হবে ;
গত বর্ষায় কোনক্রমে ঝড়ের রাত কাবার হয়ে গেছে টুপ টুপ জল মাথায় করে ।
মেয়েটার পরনের জামা আবার ছোট হয়ে গেল ,
বউটা নিজের দিকে না তাকিয়ে তাই নিয়ে কেবল বক বক করে ।
কৃষক এ সব কথায় কর্ণপাত করে না ।
সন্ধ্যের বাজারে শাক সব্জি কলা মুলো এমন কি মাছও এসে যায় ।
তারই দু-চারটে আনতে হবে ধারে , বলে ক’য়ে মহাজন একদিন টাকা দিয়ে দেবে তখন শোধ দিয়ে দেবে ।
রাতের খাবারে ছেলেমেয়ের পাতে অনেক কষ্টে মাছ দিতে পেরেছে ;
তাই নিয়ে বুড়ি অনেকক্ষণ ঝগড়ার সুরে পাড়া মাতিয়ে দিল ।
বয়স হলে রাতে যে খেতে নেই শরীরে বয় না –
পাড়ার বিভূতি ডাক্তার বলেছে বলে বুড়ি সন্ধ্যে নামলেই ছেঁড়া কাঁথার তলায় ।
কখনও জাগে কখনও ঘুমায় আর সব কথাতেই নাক গলাবেই কথা বলবেই ।
কৃষক রাগ করে না ।
মায়ের জন্য কিছুই করতে পারে নি
রোগে ভুগতে ভুগতে একেবারে শীর্ণ হয়ে গেছে ।
বুড়ি যে বেঁচে আছে – কথা বললেই বোঝা যায় ।
বউয়ের সঙ্গে খিটিমিটি লাগে আবার মায়ার বশে কি সুন্দর বসে
দুঃখের সংসারে জীবনকালের গল্প করে ।
তখন কৃষকের মনে হয় বেঁচে থাকাটাই আসলে জীবন
জীবনের অদ্ভুত রং ।

টিমটিমে আলোর সাথে
অন্ধকার , অন্ধকারে ঘুম জড়ানো চোখ , ঘরের ঝগড়া , আহ্লাদ , দুষ্টুমি , বেঁচে থাকার প্রয়াস
নিঝুম থমথমে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক সবাই লড়াই করতে করতে আরো গাড় অন্ধকার নেমে আসে কৃষকের ঝুপড়িতে ।
ক্লান্তির সর্বংসহা হাত পায়ের পেশীতে অঘোর ঘুম নেমে আসে কৃষক ঘুমিয়ে পড়ে নতুন দিনের আশা নিয়ে ।