বাবা বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে যায়। বুক পকেটে থাকে দুটো চকচকে সিকি। মা কুয়ো থেকে পানি তুলে রাখে বাবার জন্য। হাত মুখ ধুবে। বাবা এসেই ছেলের হাতে সিকি দুটো তুলে দেয়। এর একটি কোন দিন কুয়োতে ফেলতে হয় কোন দিন হয় না। মায়ের মন খারাপ থাকলে কারণে অকারণে ছেলের গালে থাপ্পড় দেয়। মা আজ জাকিরের গালে থাপ্পড় দিয়ে পাঁচ আগুলের ছাপ বসিয়ে দিয়েছে। মন খারাপ। বাড়ির সামনে পুকুর পাড়ে কাঁঠাল গাছের শিকড়ে বসে বাবার অপেক্ষা করছে জাকির। ঠিক সন্ধ্যের আগে বাবা এলো। কিছু দিন আগেও বাবা এসেই কোলে তুলে আদর করতো ছেলেকে। এখন কোলে তুলে না। কোলে তুলে আদর করার বয়সটা সবে মাত্র পার হয়ে গেছে এই কদিন আগে। সেই বয়সে যদি আটকে থাকা যেতো... বাবাকে দেখেই দৌড়ে কাছে যায় জাকির। বাবা ডান হাতে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে গায়ের সাথে। পকেট থেকে সিকি দুটো বের করে ছেলের হাতে গুঁজে দেয়। এক দৌড়ে কুয়োতলায়। দিন রাতের মাঝা মাঝি সময়। বাঁশ ঝাড়ের নীচে কুয়ো। ঝি ঝি পোকা ডাক শুরু করেছে মাত্র। জাকির উঁকি দিয়ে তাকায় কুয়োর তলায়। একটা সিকি ফেলে দেয় কুয়োর পানিতে। টাপ্পুস... শব্দ হয়। কান পেতে প্রাণ ভরে শুনে সেই শব্দ। মন ভালো হয়ে যায়। ভুলে যায় মায়ের হাতের থাপ্পড়ের কষ্ট। বাবা হাত মুখ ধুয়ে মুছে গামছাটা মায়ের হাতে তুলে দেয়। মা আরেক বালতি পানি তুলে। ছেলের হাত মুখ ভালো করে ধুয়ে দেয়। আলতো ভাবে আধা ভেজা গামছা দিয়ে ছেলের মুখটা মুছে। গালে একটা চুমু দেয়। নিজের গালের সাথে ছেলের গালটা ছোঁয়া লাগায়। জাকির নিজের বুকের ভিতরে কয়েক মুহূর্ত নাচানাচি শব্দ শুনতে পায়, একটা প্রশান্তির লম্বা নিঃশ্বাসে বুক ভরে উঠে। মায়ের চোখ থেকে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে।

সময় বড়ই নিষ্ঠুর। চিরদিন এক রকম থাকে না। ছুটে চলা সময়ের পিছনে ছুটছে মানুষগুলো নাকি বদলে যাওয়া মানুষের পিছনে ছুটছে সময়? সময় বদলে দিচ্ছে মানুষকে নাকি মানুষই বদলাচ্ছে সময়? বদলে যায় মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের বস্তুগুলো। সময়কে আর দোষ দিয়ে কি লাভ। এর তো বিবেক বুদ্ধি নেই। তাই বলে মানুষের কি বদলে যাওয়া উচিৎ! এক সময় হেটে যেতে যেতে ধানশাকিলের সাথে কথা হতো মানুষের। এখনো মানুষ আছে, আছে ধানশালিক। শুধু দূরত্ব বেড়েছে।
পুরনো এস এল আর ক্যামেরাটায় ছবি তোলা হয় না আজ কাল। কিন্তু নিয়মিত পরিচর্যা না করলে যেন অন্যায় মনে হয়। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঘরের এক কোনে সাজিয়ে রাখা গ্রামোফোনের শরীরে ধুলো জমতে থাকলে নিজের ভিতরটা বড় বেশী অপরিচ্ছন্ন লাগে। জীবনের ঘটে যাওয়া সবগুলো ঘটনা কি অনিবার্য ছিল? না কি দুএকটি ঘটনা না ঘটলেও এভাবেই চলতো জীবন? প্রশ্নটা ক্রমেই বিব্রতকর হয়ে উঠছে জাকিরের কাছে। চুয়াল্লিশ বছর বয়সে কেন বিয়ে করছে না? স্কুল পার হওয়ার আগেই বাবা চলে যায়। এক সময় প্রকাশনী ব্যবসা ছিলো। এখন নেই। শহরে বইএর দোকান রেখে গেছে বাবা। এক নামে শহরে পরিচিত। বড় ছেলে হিসাবে এই তো বড় দায়িত্ব, দোকানটা আরো বড় করেছে জাকির। গান শুনে বই পড়ে বেশতো কাটছে। বোনের বিয়ে দেয়া, মায়ের যত্ন নেয়া, ছোট ভাইকে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত করা। চিন্তা শুধু একটাই -ছোট ভায়ের বিয়ের বয়স যাচ্ছে। সে গোঁ ধরেছে দাদা বিয়ে না করলে বিয়ে করবেনা।
বই কেনাবেচা করলেই বই পড়তে হবে এমন নিয়ম নেই। দেশে বই ব্যবসায়ী কম আছে? তারা কি থাকার জন্য আধুনিক বাড়ীর ডিজাইন করে না? নতুন মডেলের গাড়ি কিনে না? সুখে সংসার করে না? দেশ বিদেশ বেড়াতে যায় না? শুধু জাকির আটকে আছে পুরনো বই এর পাতায়। নতুন বই যে টানে না তা নয়। কিন্তু পুরনো বই একটু বেশীই টানে। নতুন বইএ যদি পুরনো দিনের কথা থাকে সেও টানে। এই পুরনোকে আঁকড়ে ধরে নতুনের সাথে তাল মিলাতে একটু বিব্রত বোধ করে জাকির। এই নিয়ে একটা গর্ব আছে মনের মধ্যে। বাহিরে যথেষ্ট আধুনিক, মনে পুরনো সুর পুরনো গান বাজে অবিরত।

লাইব্রেরীর পিছনে দাদার জন্য বসার ঘরটি চমৎকার সাজিয়ে দিয়েছে ছোট ভাই। চার দিকে তাকে তাকে সাজানো বই আর বই। মাঝ খানে বসার চেয়ার টেবিল। আশরাফ বলেছে দাদাকে –দাদা তোমার ইচ্ছে হলে এসি চালিয়েই সিগারেট খাবে, কিন্তু খুব সাবধানে। তোমার চার পাশে শুধু কাগজ। জাকির খুব সাবধানে সিগারেট খায়। একটা টিস্যু পেপার পানিতে ভিজিয়ে অ্যাশ-ট্রেতে রেখে ছাই ফেলে। জ্বলন্ত শেষ অংশটুকু সেই ভেজা টিসুতে গুঁজে নিভিয়ে ফেলে। হাতে এক মগ ব্ল্যাক কফি। ল্যাপটপে মানবেন্দ্র মুখার্জীর কণ্ঠে নজরুল সঙ্গীত বাজছে -যাবার বেলায় ফেলে যেয়ো একটি খোপারি ফুল...। ল্যাপটপে জাকির গান শুনে বেশী সময় কাটায়। নেট কানেকশন আছে কিন্তু তার কোন ফেইস বুক আই ডি নেই, নেই ইমেইল এড্রেস। বাইরের জগতের সাথে বিচ্ছিন্ন থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। মাঝে মাঝে একটা দুর্লভ গানের কথা মনে পড়ে গেলে শুনতে ইচ্ছে হলে গোগলে সার্চ দিয়ে নামিয়ে নেয়। এ ছাড়া নেট তার বিশেষ কাজে লাগে না। ল্যাপটপে ওয়েব ক্যাম চালু আছে। মানুষের সাথে কথা বলার চাইতে শুধু মানুষ দেখতে তার খুব ভালো লাগে। গানটি শুনতে শুনতে মনের অজান্তেই ডানে বায়ে মাথা দুলছে জাকিরের। শিল্পীর কণ্ঠে কথার জোর দেখে মনের মধ্যে উদয় হওয়া হাসির ঝিলিকটি ঠোটে ফুটে উঠে –খোঁপা থেকে একটি ফুল যেন সে ফেলে যেতে বাধ্য... ফেলে যেতেই হবে... হঠাৎ ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে চমকে উঠে জাকির। ওয়েবক্যামে যে মুখটি দেখা যাচ্ছে সেটি বর্ষার। কিন্তু সাথের পুরুষটি এবারও নতুন।
বর্ষা সমরেশ আর সুনীলের বই কিনতো নিয়মিত। মাঝে মাঝে বেশ উত্যক্ত করতো জাকিরকে। অসম্ভব রুপের ভয়ে মন স্পর্শ করেনি বর্ষার নিবেদন। তা ছাড়া মেয়েটিকে অসম্ভব দুষ্ট মনে হতো জাকিরের কাছে। মেয়েদের এতটা দুষ্ট হতে নেই। আটানব্বই সালের শেষ দিকের যখন স্বামীকে নিয়ে আসে বই কিনতে সেদিন তিন জন এক সাথে বসে কফি খায়। সেদিন জানতে পারে জানুয়ারীতে ওরা আমেরিকা চলে যাচ্ছে। সেদিন এক অন্য বর্ষাকে দেখে জাকির। নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য লাগে এই সেই দুষ্ট মেয়েটি! পরিপূর্ণ ভারী মেজাজের এক রমণী। শেষ বার ঠিক একি ভাবে দেখা হয় দুই হাজার সাতে। তখন যে পুরুষটি সাথে ছিল সে তৃতীয় স্বামী। আজ যে সাথে আছে সে চতুর্থ সন্ধেহ নেই। একেক বার স্বামী বদলায় আর দেশে বেড়াতে আসে। সন্তানাদি হয়নি কিংবা নেয়নি। হুমায়ুন আহমেদের মধ্যাহ্ন দ্বিতীয় খণ্ড না পেয়ে অখণ্ড নিয়ে চলে গেলো বর্ষা। আজ আর কাছে যেয়ে দেখা করতে ইচ্ছে হলো না জাকিরের। শুধু মনে করার চেষ্টা করছে -বর্ষাকে কি কখনো খোঁপায় ফুলের মালা পড়তে দেখেছে সে? জাকির মনে করতে পাড়ছে না।

টাঙ্গাইলের নাগরপুর থানায় ঘোনাপাড়া জাকিরের গ্রামের বাড়িটি খালি পড়ে আছে। এক সময় বছরে দু এক বার মা গ্রামে আসতো। এখন বয়স হয়েছে। আগের মতো আর আসে না গ্রামে। দু চার ঘণ্টা থেকে আবার দিনে দিনেই শহরে ফিরে যায়। থাকার ঘরটি এখন ধানের গোলা। রহিম চাচা জমি জমা দেখা শোনা করে। বাড়ির পিছনের কুয়োটি এখনো আছে। গত পচিশ বছর ব্যবহার হয় না। এক সময় বাড়ির রান্না বান্নার কাজে এমন কি খাওয়ার পানি তোলা হতো এই কুয়ো থেকে। এখন জংলায় ঢেকে গেছে। বছর দশেক আগেও নোংরা পানি ছিল কুয়োর তলায়। এখন পানি নেই। ময়লা আবর্জনায় প্রায় ভরে গেছে। তিন বছর পর জাকির গ্রামে এসেছে আজ। বাড়ির উঠোনে একটা বেঞ্চে বসে রহিম চাচার সাথে গল্প করছে। চাচী গাছ থেকে হলুদ রঙ পাকা আম পেড়ে খেতে দিয়েছে জাকিরকে। জাকিরের মন টানছে পরিত্যক্ত কুয়ো। কিন্তু এখনো সন্ধ্যা হতে কিছু সময় বাকী। রহিম চাচা এক সময় গান বাজনা নিয়ে মেতে থাকতো। তার নেতৃত্বে বছরে একটা নাটক মঞ্চে উঠতো এই গ্রামে। এখন বয়স হয়েছে। সে জানে জাকির গ্রামের বিষয় সম্পত্তি নিয়ে মাথা ঘামায় না। তবুও কোন জমিতে কি আবাদ হচ্ছে তা বলছিলো। মাগরিবের আজানের সময় ঘনিয়ে আসছে। চাচা চাপ কলে অজু করতে চলে গেলো। জাকির হেটে হেটে কুয়োর কাছে যায়। বুক পকেট থেকে ময়লা লেগে থাকা সিকিটা বের করে হাতে নেয়। বর্ষার নামে চতুর্থ সিকিটা ফেলে দেয় কুয়োতে। একটা পলিথিন পেপারের উপরে আছড়ে পরে ছপ্পস শব্দ হয়।