শেরে বাংলা হলের ৪০৪ নং রুমের তালা খুলে ভিতরে ঢুকতেই মেঝেতে পরে থাকা খামটা নজরে এলো সাহেদের। ছোঁ মেরে খামটা তুলে এপিঠ ওপিঠ করেই বুঝলো বাবার চিঠি। ও কাপড় না ছেড়ে বিছানায় ক্লান্ত শরীর এলিয়ে খ্যাঁচ করে খামটা খুলে দুরু দুরু মন নিয়ে চিঠিটা পড়তে শুরু করে। ক্রমান্বয়ে তার মুখমণ্ডলে চিন্তার রেখা ফুটে উঠে। এই তো সবে আট-দশ দিন হয় সে বাড়ী থেকে এসেছে। আবারও জরুর তলব। তাও আবার আজকের মধ্যে। সাহেদ ভ্রু কুঁচকায় আর আঙুল দিয়ে কপাল চুলকায়। বাবা তো সবই জানেন। দেড় মাস পর মাস্টার্স ফাইনাল। এবার বিদায় লগ্নে সেভাবে বিদায় নিয়ে তবেই ঢাকা এসেছে। ইউনিভারসিটিতে তুমুল ক্লাস হচ্ছে। সে আদা জল খেয়ে লেগেছে। দম ফেলার সুযোগ নেই। কিন্তু বাবার হিসাব তো ভুল হবার কথা নয়। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাক ঘোষল। মনে হয় কোন রহস্য আছে।
তার দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে যায়। শেষ বিকাল। গাড়ী-ঘোড়া পাওয়া মুস্কিল। যাওয়া না যাওয়া নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতার তরীতে ভাসতে ভাসতে সামনে খোলা পরে থাকা চিঠিটার ঐ লাইন দুটো কয়েক বার পড়ে, লেখা পড়ার চাপ যতই থাকুক না কেন অবশ্য অবশ্যই ২২শে জুন বৃহস্পতিবারের মধ্যে বাড়ী আসিবে ...।
সাহেদ বরাবরই বাবার অনুগত। কিন্তু ...?
কপালে যা থাকে থাকুক। এক লাফে বিছনা ছেড়ে পাঁচ মিনিটে ব্যাগ গুছিয়ে একটা সাদা কাগজে খস্ খস্ করে বিষয়টি লিখে রুমমেট তমালের টেবিলে রেখে বেড়িয়ে পরে। সাহেদ এক টানা প্রায় ছয় ঘণ্টা ভ্রমণ শেষে ঢাকা কোচ থেকে নামার আগে কোচের ক্ষীণ আলোয় ঘড়ি দেখে তার মনের মধ্যে কেমন কওে উঠে। রাত একটা বাজি বাজি করছে। রাজাইমন্ডলের মেইন রোড থেকে বাওইকোলা গ্রাম প্রায় পাঁচ সাড়ে পাঁচ মাইল। এখান থেকে শ্রীপুর বাজার পর্যন্ত প্রায় মাইল খানেক পাকা। বাকীটা মেটে এবং বিল বাদাড় পাড়ি দিয়ে যেতে হবে। এই রাত দুপুরে রিক্সা-ভ্যান তো দুরে থাক, মানুষের টিকিটার নিশানাও নাই।
জুন মাসের ভ্যাপসা গরমে যবু থবু অবস্থা। গাছের পাতা গুলো মনে হচ্ছে সবুজ রঙের সীসার পাত, একেবারে স্থির হয়ে আছে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ছারা আর কোন প্রকার সাড়া শব্দ নেই। যেন কোন নিষিদ্ধ এলাকা।
সাহেদ আল্লাহ নাম স্মরণ করে থু থু করে বার দুই তিনেক বুকের উপর থুতু ছিটায়। তারপর হাঁটতে শুরু করে। এ তো তার খুব চেনা পথ। অতএব তাকে আটকায় কে। এমনই একটা ভাব তার।
সরু পাকা রাস্তা। একটা বিশাল ফাঁকা ফসলী জমির ভিতর দিয়ে উত্তরে চলে গেছে। বাড়ী ঘর নেই। দুই ধারে ঝোপÑঝাড়। ডানে-বামে, এখানে-সেখানে, ছোট-বড় নানান জাতের শিশু, ইউক্যালিপটাস, দেবদারু, মেহগনি, শিমুল থেকে শুরু করে দুই একটা ফলজ বৃক্ষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্ধকারে বড় বড় বৃক্ষগুলো মনে হচ্ছে এক একটি দৈত্য। যেন তারা কোন শিকার ধরার জন্য ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। দুরে, বহু দুরে ঘন কালো দড়ির মত পাকানো গ্রামগুলো ঘুমন্ত পল্লি মায়ের রাত্রির ছবির মত মনে হয়। আকাশে সাদা-ছাই রঙের ময়লা ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘ। ক্ষণে ঘনীভূত হয়ে কৃষ্ণ বর্ণ ধারণ করে বৃষ্টির সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে গোল বিস্কুট দাঁতে কামড়ে খাওয়ার মত আধ ভাঙ্গা চাঁদ মাঝে মাঝে উঁকি দেয় আবার মেঘের ভিতর লুকিয়ে পরে। যেন ঔ ভাঙ্গা চাঁদ সাহেদের এই নিঃসঙ্গ এবং দুঃসময়ের সাথী হয়ে তার সাথে লুকোচুরি খেলে। সে নিজেকে চাঙ্গা রাখার জন্যে মনে মনে ছড়া কাটে-
নাই চাঁদের চেয়ে ভাঙ্গা চাঁদ ভালো
মাঝে মাঝে নাই হও আবার জ্বালো আলো ...
তার চলতি পথে একাকীত্বের ছলে নানা কথা মনে উঁকি ঝুঁকি দেয় ...‘রাতের এক অসাধারণ রূপ আছে। বাস্তবের মুখো মুখি না হলে তার স্বাদ আস্বাদন করা যায় না। আজকের রাত অমাবস্যার রাতের মত নিকশ কাল নয়। এই রকম আবছায়া ভাবটা কখনও কখনও রহস্যময় হয়ে উঠে। তারপর যদি হয় ঝোপ-ঝাড়, বন-বাদাড় আর গৈ-গ্রাম, যেখানে বিদ্যুৎ নেই। রাতের সত্যিকার রূপ প্রকাশ পায় দ্বিপ্রহরের পর। এ সময় সাধারণ মানুষ মৃতবত ঘুমায়। সব ধরনের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায়। ঝরা পাতা নিরবতা বিরাজ করে। তখন ভুত, পেত্নী, জ্বীন, পরীরা প্রকৃতির সাথে লীলায় মত্ত হয়। বাতাসে, গাছে, মাটিতে ওরা হোলি খেলে।’ তার দাদার কাছে শোনা সেই সব কথা হঠাৎ মনে পড়ে যায়। আজকের রাতের সাথে সেসব রাতের অনেকটাই মিল, কেমন যেন ভুতুরে। সাহেদের বুকের ভিতর শিন শিন করে উঠে। সে নিজেকে শুধরে নিতে মস্তিস্কের স্নায়ু নিয়ন্ত্রককে কষে ধমক দেয় এবং ভুত টুত নেই বলে প্রচার প্রচারণা চালানোর জন্যে নির্দেশ দিয়ে কৃত্রিম খোস মেজাজ তৈরী করে গান ধরে- নায়া রে ...। নায়ের বাদাম ...।
সাহেদ নিজের কন্ঠের অপরিচিত ভাব দশা দেখে ভড়কে যায়। কেমন যেন ভ্যাঁস-ভেঁসে, কাঁপা-কাঁপা গলা, যেন ভুত হাজির করা মন্ত্র পাঠ করছে। ভুতের ভয় যদি একবার কাঁধে ভর করে আর ভুতুরে পরিবেশ যদি সঙ্গের সাথী হয় তবে তার হাত থেকে রেহায় পাওয়া চারটে খানি কথা নয়। এখন অন্ধকারে বড় বড় গাছ গুলোকেও অপরিচিত লাগছে। মনে হচ্ছে এক একটা বিরাট বিরাট বাঘ, ভাল¬ুক, ডাইনোসার...।
হঠাৎ বাম দিকে ঝোপের মধ্যে কি যেন নড়ে চড়ে উঠে। তার চিন্তা ভাবনা এলো মেলো হয়ে যায়। মনে হয় আবছা ছাঁয়া ছাঁয়া একটা সাদা শাড়ী পরা থুরথুরি বুড়ি লাঠি ভর দিয়ে তার দিকে হেঁটে আসছে। অনেকটাই জেলে পাড়ার কামালের বড় দাদীর মত। সাথে সাথে কামালের দাদীর বিদঘুটে চেহারা তার সামনে ভেসে উঠে। ধবধবে সাদা চুল। চোয়াল বসে গেছে। বসে যাওয়া চক্ষু কোটরে চোখ দুটো জ্বল জ্বল করছে। তার গা শিহরে উঠে। দু’ কানের সামনে পিছনের চুল গুলো টান খেয়ে দাড়িয়ে যায়। দু’ কান দিয়ে গরম ভাপ বেরুচ্ছে। বুকের ভিতর ঢিপ ঢিপ করে। নিশ্বাস ঘন ঘন পড়ে। এ এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। সে কি করবে স্থির করতে পারে না। হঠাৎ একটু দুরে কয়েকটা শিয়াল ”হুক্কা হুয়া” ”হুক্কা হুয়া” করে উঠে। সাথে সাথে কয়েকটা কুকুর ঘেও ঘেও করে তাদের ধাওয়া করে। সেদিকটা খেয়াল করে বামে তাকাতেই হতভম্ব। কোথায় সেই বুড়ী? ভোজ বাজির মত অদৃশ্য হয়ে হয়ে গেছে। নিছক ভুল বুঝা বুঝি মনে করে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। সাহেদ ওসব থোরায় কেয়ার করে।
সাহেদ একমনে হাঁটছে। হঠাৎ তার মনে হয় কে যেন তাকে অনুসরণ করছে। অস্পষ্ট পায়ের আওয়াজ পাচ্ছে- খস্ ... খস্ ...খস্ ...! প্রথম প্রথম পাত্তা দিলনা। কিন্তু আওয়াজ এখন অনেকটা স্পষ্ট।
মনে হয় কেউ ঠিক তার পিছনে। আর একটু হলেই তাকে ধরে ফেলবে। ঘাড়ে গরম নিশ্বাস ফেলছে। ভয়ে দম বন্ধ হবার যোগার। এ কি হলো? তার পা দু’টো যেনো অবশ হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কোন অদৃশ্য শক্তি তার দেহকে সাপের মত পেচিয়ে রেখেছে। সে প্রাণ পণ চেষ্টা করছে শ্রীপুরের দিকে যাওয়ার। কিন্তু কিছুতেই এগুতে পারছে না। এক একটা পা যেন এক মন ওজন। পথ যেন শেষ হয় না। তবে কি সেই তার পিছু নিয়েছে ...? সাহেদ দোয়া দরুদ পড়ছে। সব কেমন যেন উল্টা পাল্টা হয়ে যাচ্ছে।
সে দুনিয়ার উৎকন্ঠা নিয়ে পিছনে তাকায়। কই? কিছুই তো নেই। মনে মনে নিজেকে তিরস্কার করে। আর বিভ্রান্তিতে পড়বে না সে। যে কোন অবস্থাতেও।
এখন সাহেদ শ্রীপুর বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ইছামতি নদীর ব্রীজের উপর। ছোট্ট একটা ব্রীজ। ইছামতি এখন নামেই নদী। মূলতঃ সুতোর মত লম্বা একটা খাল। পানি থাকেই না। কোথাও এক আধটু থাকলেও হাঁটু পানি। কচুরী পানায় ভরা। রাস্তার দু’ পাশে দু’ একটা বাড়ী ঘর দেখা যায়। সামনে প্রায় পাঁচ’শ গজ এগুলেই ছোট্ট একটা বাজার। প্রায় সবই করুগেটেড টিনের তৈরী দোকান ঘর। একেবারেই গ্রামীন পরিবেশ। মাথার উপর দিয়ে একটা বাদুর পত পত করে উরে গেল। বুকের মধ্যে ধুক করে উঠে। অন্ধকারে বাজারের মধ্যে দিয়ে যাবার সময় দেখে দোকানপাট সব বন্ধ। একটা চায়ের দোকান লাগোয়া বেড়া বিহীন চালা ঘরে কয়েকটা বেঞ্চ। তার উপর একটা লোক নাক ডেকে ঘুমায়। খুব সম্ভব পাহারাদার। লোকটাকে দেখেই গা রি রি করে উঠে। এলো মেলো লম্বা চুল। উস্ক খুস্ক চেহারা। রোগা, পাতলা, হ্যাংলা। কাছে যেতে ইতস্তত করে। তবুও যেয়ে ডাকে- ও ভাই! এই যে শুনেন! ও ভাই!
লোকটা - এ্যাঁঃ ! এ্যাঁঃ ! করে ঢোক গিলতে গিলতে অন্য কাতে শুয়ে নাক ডাকে।
বোঝায় যায় বেটা জুত সই নেসা করেছে। গাঁজা, ভাং এখন গ্রামে গঞ্জে ভরা। নেসাখোরকে ডাকা আর মরা মানুষকে ডাকা সমান। সে হতাশ হয়। ভেবেছিল ওর কাছ থেকে আশ পাশের কোন ভ্যানওয়ালার বাড়ীর সন্ধান নিয়ে তাকে রাজি করিয়ে সঙ্গে নিয়ে যাবে। ক্ষোভে তার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে। টর্চ লাইট তো ছাড় একটা দেয়াশলায় পর্যন্ত তার সাথে নেই। বিড়ি সিগারেট না খেকোদের এই একটা সমস্যা। নিঃসঙ্গ অন্ধকার রাত্রে একটা দেয়াশলায়ের কাঠি যে কি উপকার করে তা ঠিক সময় মত বোঝা যায়। হতাশার একটা দীর্ঘ শ্বাস বাতাসে মিলিয়ে গেল। ক্লান্তি আর বিরক্তি উভয় তার চোখে মুখে তীব্র ভাবে ফুটে উঠেছে। পাশের বেঞ্চে মিনিট পাঁচেক হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে থাকে।
শ্রীপুর বাজারটা পূব পশ্চিম হয়ে বামে ঘুরে খানিকটা উত্তরে যেয়ে একটা গ্রামে গিয়ে শেষ হয়েছে। গ্রামের নাম রাণীগ্রাম। সে হাঁটতে হাঁটতে বাজারের শেষ প্রান্তে চলে আসে। এখান থেকে মেটে সড়ক শুরু। তার দু’পাশে নানান জাতের ছোট বড় গাছ, ঝোপ-ঝাড়। ঐ সবের মধ্যে বাড়ী ঘর গুলো নিথর নিস্তব্ধ হয়ে ঘুমায়। মনে হয় যেন কোন যদিুকর বহু বছর পূর্বে যাদু করে সব কিছুকে পাথর বানিয়ে বশ করে রেখেছে। হঠাৎ তার শামসুলের কথা মনে পড়ে যায়। সে সাহেদের ছোট বেলার গ্রাম্যবন্ধু। এখানে তার নিজের মুদিখানার দোকানে দোকানদারী করে। রাণীগ্রামে শ্বশুর বাড়ীতে থাকে। মিনিট দশেকের রাস্তা।
নিকটেই কোন একটা গাছে কোঁওথ কোঁওথ শব্দে একটা পাখি ডেকে উঠে। ঐ শব্দের ভিতর কেমন একটা পৈচাশিক ভাব আছে। মনের ভিতর আচমকা একটা ভীতি ভাব জন্মে। এসব ভাবনার মাঝে আবারও উঁকি দেয় খানিক আগে ঘটে যাওয়া সেসব কথা। ভয় ভয় ভাবটা থেকে থেকে মাথা চাঁড়া দিয়ে উঠে। সঙ্গে যোগ হয় সাপ, পোকার ভয়। এই গ্রাম পার হলে গারুলির বিল। সে আর এক ইতিহাস। দিনে দুপুরেও লোক ভয় পায়। সাহেদ নিজেকে অবশ্য একজন সাহসী পুরুষ বলে মনে করে। ওসব ভুত টুত বিশ্বাস করে না। একটা জিগা গাছের ডাল ভেঙ্গে নেয়। হাত তিন-চারেক লম্বা। ভুত মোকাবেলা করার জন্য নয় সাপ-পোকা মারার জন্য।
এই অন্ধকার রাত্রেও সাহেদের শামসুলের শ্বশুর বাড়ী চিনতে অসুবিধা হয় না। বাড়ীর চার পাশে বড় বড় আম কাঁঠালের গাছ। মেহগনি, তাল, তেঁতুল আরও কত কি। ঘন গাছ গাছালির জন্য ঘুট ঘুটে অন্ধকার ভাব বিরাজ করে। একেবারে নিঃশব্দ পোড়ো বাড়ী। অবস্থা দেখে আঙ্গিনার বাইরেই তার গা ছম ছম করে উঠে। তবুও শামসুলকে ডাকার জন্যে সে আঙ্গিনায় প্রবেশ করে।
মূহুর্তের মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে মার-মার, কাট-কাট করতে করতে শোঁ-শোঁ শব্দে ঝরের বেগে বাতাস বইতে শুরু করে। গাছের শাখা-প্রশাখা, লতা-পাতা ছিঁড়ে ছুঁটে লন্ড ভন্ড হবার যোগার। বাঁশ ঝাড়ের গোটা তিনেক বাঁশ একবার বামে শুয়ে মাটি স্পর্শ করে আবার সরাত উঠে দাঁড়িয়ে যায়।
ওরে মারে রে! কি সাংঘাতিক ব্যাপার?
আরও ভয়াবহ ব্যপার ঝড় কেবল আঙ্গিনার মধ্যে! আর সবখানে বাতাস স্তব্ধ।
হঠাৎ কোথা থেকে একগাদা শুকনো পাতা ঝপঝপ করে তার সামনে পড়ে জমা হতে থাকে। তার পর পরই বাতাসের ঘুর্ণী চক্রের খেলা শুরু হয়। তার চার পাশ দিয়ে বাতাস বন বন করে ঘুরতে থাকে। মনে হয় তাকে তুলে আছার মারবে। ধুলা-বালু, খড়-কুঠো, শুকনো পাতা দিয়ে তার কান, মাথা, দেহ একাকার হয়ে যাচ্ছে। দম বন্ধ হবার উপক্রম। তার মনে হয় সে মারা যাবে। মাত্র বিশ পঁচিশ সেকেন্ড। যেন সব কিছু হাওয়ায় মিলে গেল। একে বারে সুনশান নিরবতা।
তার মনে নানান সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে- এসব কারও ইঙ্গিতে হচ্ছে না তো? না কি কোন অশরীরি আত্মা তার পিছু নিয়েছে? এসব কিসের আলামত? একি বিপদ হলো আজ?
সাহেদ কাঁপতে কাঁপতে একটা চালা ঘরের কাছে যায়। সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়ায়। ঠিক ঘড়টার পিছনে করুণ সুরে কে যেন কাঁদছে। সঙ্গে সঙ্গে তার হাত পা পাথরের মত স্থবির হয়ে গেল। মনে হচ্ছে তার পা হাঁটু পযন্ত মাটির ভিতর দেবে যাচ্ছে। সে নিজের ভয় ধামা চাপা দেওয়ার জন্যে গর্জে উঠে, কে কাঁদে?
কিন্তু কণ্ঠ দিয়ে কোন শব্দ বের হয় না। মনে হয় কে যেন তার গলা টিপে ধরেছে। গলায় হাত দিয়ে ডলে কাশি দেয়। থু করে শে¬ষ্মা ফেলতে যায়। কিন্তু এক ফোটা থুতুও বেরুলো না। গলা শুখে কাঠ। আবারও চেষ্টা করে, কে ওখানে?
কিন্তু ক্ষিন কন্ঠের ভূতুরে প্রতিধ্বনি হয়, তোকে খাব! ...তোকে খাব!! ...তোকে খাব!!!
সেই সাথে কান্নার আওয়াজও থেমে যায়। কেমন যেন অ¯^াভাবিক সব কিছু। হঠাৎ ঝড়! তারপর নিরবতা! এখন কান্নার শব্দ! এসব কি হচ্ছে? তবে কি সত্যি সত্যিই সেই সাদা শাড়ী পরা ছায়া মূর্তি তাকে অনুসরণ করে এখানে এসেছে?
সে ভয়ার্ত কন্ঠে আবারও বলে, কে আছেন? কিন্তু কোন সাড়া শব্দ নেই। এবার সাহেদ পরিমরি চিৎকার করে উঠে, যেন ও মরে যাচ্ছে, শামসুল! এ শামসুল! শিগগীর বের হ! ওরা আমাকে ...!
এবার চালা ঘরের মধ্যে থেকে কথার ভাঁজ পাওয়া গেল। মনে হল কোন আশিতীপর বৃদ্ধা রিন-রিনে নেঁকো কন্ঠে বলছে, কে গো তুমি, সাহেদ? শামসুল বিলে মাছ মারতে গেছে। সাহেদের বুকের ভিতর ধরাস করে উঠে!
আরে! সর্বনাস!
অজানা অচেনা একটা বৃদ্ধা তার নাম জানলো কি করে?
তারপর দেখলো ঐ চালা ঘরের জানালায় খানিক আগে রাস্তায় দেখা সেই থুরথুরে বুড়ি দাঁড়িয়ে খিল খিল করে হাসছে। আচমকা ভুত দেখার মত পরিস্থিতি হয় তার। বেহুসের মত পাথরের মূর্তি হয়ে কতক্ষন দঁড়িয়ে আছে বলতে পারবে না। হঠাৎ নারকেল গাছ থেকে কিছু একটা সর সর করে ছিঁড়ে ধাপ করে মাটিতে পড়ার শব্দ হয়। তার হুশ হয়।
ওরেবাবারে! এ তো সত্যি সত্যিই পিচাশের আস্তানা! শিগগীর পালাও! বাঁচতে চাইলে এখানে আর এক মূহুর্ত নয়।
সে বিদ্যুত বেগে এক দৌড়ে মেটে সড়কে চলে আসে। তখনই ঘটে গেল আর এক কান্ড! ইয়া বড় একটা কি যেন থপ করে তার ডান পায়ের উপর আছরে পরে।
ওরে মা রে! মেরে ফেললো রে!
সে দু’ তিন পা হটে আসে। জিগার ডাল দিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে শপাং শপাং করে মারে কয়েক ঘা। সম্ভবত কম্পমান হাতের জন্য আক্রমন একশত ভাগ ব্যার্থ হয়।
ততক্ষনে নির্বিকার ব্যাঙ লাফাতে লাফাতে চলে গেল। এই দুঃসহ পরিস্থিতিতেও হাসি এলো। এর পর আর সাহেদকে কে পায়। পরি মরি করে ছুটছে তো ছুটছে। শামসুলের আশা ত্যাগ করে মনে মনে আল্লাহ্কে স্মরণ করে, হে আল্লাহ, এই বিপদে আমাকে রক্ষা কর, আমাকে ধৈর্য দাও। সে দূর্বল, ক্লান্ত শরীর নিয়ে দ্রুত ঔ গ্রাম ত্যাগ করে।
সাহেদ মাঝে মধ্যে জিগার ডাল দিয়ে ঠাস ঠুস করে মাটিতে আঘাত করছে আর মুখে হ্যাস হুস করে শব্দ করে। উদ্দেশ্য সাপ, পোকা, মাকড়কে সাবধান করে দেওয়া। পিছনে কাল মহিষের মত বিভৎস রূপ ধরে দাঁড়িয়ে আছে ভয়ংকর রাণীগ্রাম।
সে গারুলির বিলের মধ্যে দিয়ে সোজা উত্তরে বয়ে যাওয়া মেটে সড়ক দিয়ে হাঁটছে। নানা উৎকন্ঠা, শংকায় মন ধুক ধুক করে। এই বিল এক সাংঘাতিক বিল। আশে পাশে কোন বাড়ী ঘর নাই। যতদুর চোখ যায় ধুধু মাঠ আর মাঠ। এখন দু’ ধারে ফসল বোনা হয়েছে। ভরা বর্ষায় পানি থৈ থৈ করে। তখন এসব সড়কও ডুবে যায়। নৌকা ছাড়া চলাচল অসম্ভব। তখন যতদুর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি।
ও রূপাকে বলেছিলো, কোন এক ভরা বর্ষায় তাকে তাদের গ্রাম দেখতে নিয়ে আসবে। রূপা শর্ত দিয়েছিল; সারাদিন নৌকোতে ভাসবে, ভাসবে শুধুই ভাসবে। ক্ষিধে পেলে আউসের চালের লাল রঙ্গের ভাতের সাথে কাঁচামরিচ-পেয়াঁজ, ডাল, আলু-বেগুনের ভর্তা। নৌকোর মাঝি হবে সাহেদ এবং এক মাত্র নাইয়োরী সে।
ভার্সিটি পড়–য়া শহরের মেয়ে রূপা আগামী কাল ক্যাম্পাসে যেয়ে যখন সাহেদের খবরটা তমালের কাছ থেকে পাবে, তখন নিশ্চয় সবার অজান্তে চোখের পানি লুকোবে। একটা লম্বা শ্বাস বেরিয়ে বুকটা খালি হয়ে গেল সাহেদের।
এখন মাঝে মাঝে বৃষ্টি হওয়ায় মাটি ভেজা স্যাঁত সেঁতে। সড়কের দু’ এক জায়গায় গরুর গাড়ী চলাচলের জন্য গর্ত এবং তাতে প্যাঁক-কাঁদা জমেছে। দু’ ধারে ফসলী জমির মধ্যে মাঝে মাঝে ছোট বড় ডোবা। সেখানে এখনও লোকেরা মাছ ধরে। সড়কের দু’ ধারে জঙ্গল, ঝোপ, ঝাড়, হঠাৎ দু’ একটা ছোট বড় গাছ চোখে পরে। মূলত চারিদিকে কেমন ফাঁকা ফাঁকা ভাব। তাতে চাঁদের ক্ষীন আলো ফুটে উঠেছে। আবছা আলো-ছায়ার লুকোচুরি। প্রচন্ড তৃষ্ণা নিয়েও বেপরোয়া হাঁটছে।
বেশ দুরে আবছা ঘন কালো বড় বড় গাছের মত দুটো কি যেন দেখতে পেল সাহেদ। আসলে ওগুলো প্রকান্ড দুটো বট গাছ। সবাই বলে ভাইতিতলা। ওটাই বিলের মাঝ ভাগ। এটাই এলাকার সবচাইতে ভয়ংকর জায়গা। ওখান থেকে আর মাইল দেড়েকের মত গেলেই ওদের গ্রাম। সে অনুমান করলো রাত প্রায় তিনটা-সাড়ে তিনটা।
উহ্ যে ধকল গেল। জীবনে মনে থাকবে। হায়রে এই বিপদের দিনে একটা টর্চ লাইট নেই। মনে থাকলে এমন বোকামী আর নয়। আফসোস একটা কিনা জিগার ডাল সম্বল। অথচ দুষ্টু লোকজন নিরিবিলি পেয়ে খুন খারাবী পর্যন্ত করে ফেলে সামান্য কিছু লুটে নেবার আশায়। এসব সাত-সতের ভাবতে ভাবতে এক সময় সে ঐ বট গাছের নিকটে পৌঁছে গেছে। হঠাৎ মনে হল দুই বট গাছের মাঝে সড়কের উপর কে যেন বসে আছে। দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে। সে জোরে চিৎকার করে বলতে যাবে, কে? কিন্তু তার আগেই লোকটা উঠে দাঁড়ায়। হাতে তৃকোণাকৃতির জালের মত কি একটা। মনে হয় ঠেলা জাল। সেটা কাঁধে নিয়ে হন হন করে সাহেদকে পেছনে ফেলে উত্তরে সড়ক ধরে হাঁটা দেয়।
সাহেদের মনে হল ও নিশ্চয় শামসুল। মাছ ধরতে এসে ক্লান্ত হয়ে এখানে বিশ্রাম করছে।
কিন্তু! সে তাকে না দেখার ভান করলো কেন? একটা চাপা দুঃখ দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে এল। ধারণা করে হয়ত অন্ধকারে তাকে নাও দেখতে পারে বা চিনতে পারেনি। সাহেদ বেশ উত্তেজিত। নতুন উদ্দীপনায় ডাকে, শামসুল! এ শামসুল!
কোন প্রতিউত্তর নেই। শামসুল এক মনে হাঁটে।
আবারও ডাকে, শামসুল! এ শামসুল, দাঁড়া।
মনে হল সে শুনতে পেয়েছে। তবে কথা না বলে ঘার বাঁকিয়ে হাত ইশারায় আসতে বলল। দু’জনের দুরত্ব প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ গজ।
সাহেদ ক্লান্ত দেহে আরও দ্রুত হাটতে থাকে। তৃষ্ণায় ক্ষুধায় দফা রফা হবার যোগাড়। তারপর ঘামে জর্জরীত। তবুও প্রাণ পণ হাঁটে। কিন্তু কিছুতেই ওর নাগালের মধ্যে আসতে পারে না। মাঝে মাঝেই সে ডাকে, শামসুল! এ শামসুল! শামসুল দাঁড়া! শামসুল একবারের জন্য হ্যাঁ বা না কিছুই বলে না। শুধু ধাঁই ধাঁই করে হেঁটে যায়।
সাহেদ যত দ্রুত হাঁটে শামসুল তত দ্রুত হাঁটে। দুরত্ব কিছুতেই কমে না।
সাহেদ হাঁটছে তো হাঁটছেই ...। আর ঘেমে নেয়ে একাকার। অস্থির হয়ে গেল। আর কতক্ষণ? বিরক্তির শেষ পর্যায়ে। তবুও ডাকে, শামসুল দাঁড়া! এ শামসুল দাঁড়া! এভাবে কতোক্ষণ হেঁটেছে তা সে বলতে পারবে না।
তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। শেষমেশ সাহেদের মনে প্রশ্ন উঁকি দেয়; ব্যাপারটা কি? শত চেষ্টা করেও ওকে নাগালে না পাওয়ার কারণ কি?
সাহেদ ওকে খুব ভাল করে লক্ষ্য করলো; সাথে সাথে জান উড়ে গেল।
সর্বনাশ ও তো শামসুল নয়। একটা ছায়া মূর্তি। সে পায়ে হেঁটে চলছে না। মাটির এক হাত উপর দিয়ে হাঁটছে।
হায় খোদা! এ কার পিছনে ছুটছি আমি?
মুহূর্তে হাত-পা অসার হয়ে গেল। মনে হচ্ছে গলা সমান পাঁকে ডুবে যাচ্ছে ও। রক্ত চলাচল বন্ধ হবার যোগার হয় তার।
ও রাস্তা খুঁজলো। কিন্তু এ কি? তাদের গ্রামের রাস্তা কোথায়? তাহলে আমি এতক্ষন কোন পথে হাঁটছি? বুকের মধ্যে শ্যালো মেশিনের শব্দ। ধপ! ধপ! ধপ!
ইতিমধ্যে আকাশে কালো হয়ে মেঘ জমে উঠেছে। একটা বড় মাপের বিদ্যুৎ চমকালো। সেই আলোতে যা দেখলো তাতে তার বুকের ভেতর তোলপাড় আরও কয়েকগুন বেড়ে গেল, যেন পাঁজর ভেঙ্গে কলিজা বেরিয়ে আসবে।
ঐ তো সামনে অদূরে সাহা পাড়ার শ্মশান ঘাট! পিচাশটা আমাকে গ্রাম থেকে এত দুরে নিয়ে এসেছে! আজ আমার মৃত্যু অনিবার্য!
তবে কি! ঐ প্রেতাত্মা আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে একের পর এক বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে যাচ্ছে?
সাহেদের দেহের রোম গুলো খাড়া হয়ে উঠে। দুই কান গরম হয়ে ভাব বেরুচ্ছে। তার সব কিছু তাল গোল পাকিয়ে যাচ্ছে। এক্ষুনি সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। সে মরিয়া হয়ে সামনে তাকিয়ে দেখতে চেষ্টা করে।
কি আশ্চর্য! এতো সেই বুড়ি! কটমট করে তার দিকে তাকাচ্ছে। দু চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। দুধের মত সাদা দুটি লম্বা দাঁতের মাঝ দিয়ে লিক লিকে লোলুপ জিভ নারাচ্ছে। অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছে তার চোখ মুখ জিঘাংসায় ফোঁস ফোঁস করছে।
ওর রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে! আর হতে সময় নেই। এক্ষুনি কিছু একটা করতে হবে। শয়তানটা এক্ষুনি তার ঘাড় মটকে রক্ত পান করবে!
তখন তার বাবা-মার কথা মনে পড়ে, বাবা! তুমি আমায় ভুল বুঝনা। নিশচয় তোমার সাহেদ অবাধ্য নয়। আজ আমার মৃত্যু হলেও আমি সার্থক। মা! তুমি আমাকে ক্ষমা করো। জীবনের শেষ মূহুর্তে শেষ বারের মত তোমার প্রিয় মুখটা দেখতে পেলাম না।
সে দ্রুত জিগার ডালটা হাতে নিয়ে তার চার পাশ দিয়ে একটা গোল বৃত্ত আঁকলো আর বিড় বিড় করে এসমে আযম পাঠ করলো। ঠিক তখনই পূব আকাশে কাল মেঘের আড়ালে মৃদু আলোর রেখা ফুটে উঠলো। দুরের কোন এক মসজিদ থেকে মুয়ায্যিনের সুমধুর কন্ঠ¯^র ভেসে আসে, আস্সালাতু খায়রুম্ মিনান্নাওম ...।
মুহূর্তের মধ্যে সে জ্ঞান হারিয়ে বৃত্তের মাঝে পড়ে গেল।
সাহেদ যখন চোখ মেলে তাকালো তখন দেখে সে একটা বৃষ্টি ভেজা ধান ক্ষেতের মধ্যে শুয়ে আছে। ভোরের মিষ্টি আলো আর ফুরফুরে শীতল হাওয়া পরশ বুলিয়ে রাত্রির সকল ক্লান্তি ভাব একে একে ঝরিয়ে দিচ্ছে। সে উঠে বসে। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। সারা দেহ ভিজে চুপসে গেছে। শরীরটা প্রচন্ড দূর্বল, ব্যাথায় ভার হয়ে আছে। ভয়ানক পিপাসায় কাতর। এত দুঃখ দুর্দশার মধ্যেও তার মনের মধ্যে একটা তৃপ্তির মহাতরঙ্গ স্নায়ু থেকে দেহের প্রতিটি প্রান্তে, ধমনি হয়ে প্রতিটি কোষে কোষে প্রবাহিত হতে থাকে এই ভেবে যে মারাত্ম্ক কোন দূর্ঘটনা ব্যাতিরেকে মাটির সন্তান মাটিতেই নির্বিঘে্ন ঘুমিয়ে দিয়েছিলেন পরম করুণাময় আল্লাহ্।
সাহেদ উঠে দাঁড়ায়। ভেজা ট্রাভেলিং ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ীর দিকে রওনা হয়। সে গত রাতের ঘটনা মনে করে আর ভাবে, উত্তেজিত স্নায়ু কত ঘটনারই তো জন্ম দেয় যার সত্যিকার ব্যাখ্যা আজও বিজ্ঞান দিতে পারেনি...।


খুব চেনা পথ



শেরে বাংলা হলের ৪০৪ নং রুমের তালা খুলে ভিতরে ঢুকতেই মেঝেতে পরে থাকা খামটা নজরে এলো সাহেদের। ছোঁ মেরে খামটা তুলে এপিঠ ওপিঠ করেই বুঝলো বাবার চিঠি। ও কাপড় না ছেড়ে বিছানায় ক্লান্ত শরীর এলিয়ে খ্যাঁচ করে খামটা খুলে দুরু দুরু মন নিয়ে চিঠিটা পড়তে শুরু করে। ক্রমান্নয়ে তার মুখমন্ডলে চিন্তার রেখা ফুটে উঠে। এই তো সবে আট-দশ দিন হয় সে বাড়ী থেকে এসেছে। আবারও জরুর তলব। তাও আবার আজকের মধ্যে। সাহেদ ভ্রু কুঁচকায় আর আঙুল দিয়ে কপাল চুলকায়। বাবা তো সবই জানেন। দেড় মাস পর মাস্টার্স ফাইনাল। এবার বিদায় লগ্নে সেভাবে বিদায় নিয়ে তবেই ঢাকা এসেছে। ইউনিভারসিটিতে তুমুল ক্লাস হচ্ছে। সে আদা জল খেয়ে লেগেছে। দম ফেলার সুযোগ নেই। কিন্তু বাবার হিসাব তো ভুল হবার কথা নয়। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাক ঘোষলো। মনে হয় কোন রহস্য আছে।
তার দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে যায়। শেষ বিকাল। গাড়ী-ঘোড়া পাওয়া মুস্কিল। যাওয়া না যাওয়া নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতার তরীতে ভাসতে ভাসতে সামনে খোলা পরে থাকা চিঠিটার ঐ লাইন দুটো কয়েক বার পড়ে, লেখা পড়ার চাপ যতই থাকুক না কেন অবশ্য অবশ্যই ২২শে জুন হস্পতিবারের মধ্যে বাড়ী আসিবে ...।
সাহেদ বরাবরই বাবার অনুগত। কিন্তু ...?
কপালে যা থাকে থাকুক। এক লাফে বিছনা ছেড়ে পাঁচ মিনিটে ব্যাগ গুছিয়ে একটা সাদা কাগজে খস্ খস্ করে বিষয়টি লিখে রুমমেট তমালের টেবিলে রেখে বেড়িয়ে পরে। সাহেদ এক টানা প্রায় ছয় ঘন্টা ভ্রমন শেষে ঢাকা কোচ থেকে নামার আগে কোচের ক্ষীন আলোয় ঘড়ি দেখে তার মনের মধ্যে কেমন কওে উঠে। রাত একটা বাজি বাজি করছে। রাজাইমন্ডলের মেইন রোড থেকে বাওইকোলা গ্রাম প্রায় পাঁচ সাড়ে পাঁচ মাইল। এখান থেকে শ্রীপুর বাজার পর্যন্ত প্রায় মাইল খানেক পাকা। বাকীটা মেটে এবং বিল বাদাড় পাড়ি দিয়ে যেতে হবে। এই রাত দুপুরে রিক্সা-ভ্যান তো দুরে থাক, মানুষের টিকিটার নিশানাও নাই।
জুন মাসের ভ্যাপসা গরমে যবু থবু অবস্থা। গাছের পাতা গুলো মনে হচ্ছে সবুজ রঙের সীসার পাত, একেবারে স্থির হয়ে আছে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ছারা আর কোন প্রকার সাড়া শব্দ নেই। যেন কোন নিষিদ্ধ এলাকা।
সাহেদ আল্লাহ নাম স্মরন করে থু থু করে বার দুই তিনেক বুকের উপর থুতু ছিটায়। তারপর হাঁটতে শুরু করে। এ তো তার খুব চেনা পথ। অতএব তাকে আটকায় কে। এমনই একটা ভাব তার।
সরু পাকা রাস্তা। একটা বিশাল ফাঁকা ফসলী জমির ভিতর দিয়ে উত্তরে চলে গেছে। বাড়ী ঘর নেই। দুই ধারে ঝোপÑঝাড়। ডানে-বামে, এখানে-সেখানে, ছোট-বড় নানান জাতের শিশু, ইউক্যালিপটাস, দেবদারু, মেহগনি, শিমুল থেকে শুরু করে দুই একটা ফলজ বৃক্ষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্ধকারে বড় বড় বৃক্ষগুলো মনে হচ্ছে এক একটি দৈত্য। যেন তারা কোন শিকার ধরার জন্য ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। দুরে, বহু দুরে ঘন কালো দড়ির মত পাকানো গ্রামগুলো ঘুমন্ত পল্লি মায়ের রাত্রির ছবিরমত মনে হয়। আকাশে সাদা-ছাই রঙের ময়লা ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘ। ক্ষনে ঘনিভূত হয়ে কৃষ্ণ বর্ণ ধারণ করে বৃষ্টির সম্ভবনা জাগিয়ে তোলে আবার ¯^াভাবিক হয়ে যায়। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে গোল বিস্কুট দাঁতে কাঁমড়ে খাওয়ার মত আধ ভাঙ্গা চাঁদ মাঝে মাঝে উঁকি দেয় আবার মেঘের ভিতর লুকিয়ে পরে। যেন ঔ ভাঙ্গা চাঁদ সাহেদের এই নিঃসঙ্গ এবং দুঃসময়ের সাথী হয়ে তার সাথে লুকোচুরি খেলে। সে নিজেকে চাঁঙ্গা রাখার জন্যে মনে মনে ছড়া কাটে-
নাই চাঁদের চেয়ে ভাঙ্গা চাঁদ ভালো
মাঝে মাঝে নাই হও আবার জ্বালো আলো ...
তার চলতি পথে একাকিত্বের ছলে নানা কথা মনে উঁকি ঝুঁকি দেয় ...‘রাতের এক অসাধরণ রূপ আছে। বাস্তবের মুখো মুখি না হলে তার ¯^াদ আ¯^াদন করা যায় না। আজকের রাত অমাবস্যার রাতের মত নিকশ কাল নয়। এই রকম আবছায়া ভাবটা কখনও কখনও রহস্যময় হয়ে উঠে। তারপর যদি হয় ঝোপ-ঝাড়, বন-বাদাড় আর গৈ-গ্রাম, যেখানে বিদ্যুত নেই। রাতের সত্যিকার রূপ প্রকাশ পায় দ্বিপ্রহরের পর। এ সময় সাধারণ মানুষ মৃতবত ঘুমায়। সব ধরনের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায়। ঝরা পাতা নিরবতা বিরাজ করে। তখন ভুত, পেত্নী, জ্বীন, পরীরা প্রকৃতির সাথে লীলায় মত্ত হয়। বাতাসে, গাছে, মাটিতে ওরা হোলি খেলে।’ তার দাদার কাছে শোনা সেই সব কথা হঠাৎ মনে পড়ে যায়। আজকের রাতের সাথে সেসব রাতের অনেকটাই মিল, কেমন যেন ভুতুরে। সাহেদের বুকের ভিতর শিন শিন করে উঠে। সে নিজেকে শুধরে নিতে মস্তিস্কের স্নায়ু নিয়ন্ত্রককে কষে ধমক দেয় এবং ভুত টুত নেই বলে প্রচার প্রচারণা চালানোর জন্যে নির্দেশ দিয়ে কৃত্রিম খোস মেজাজ তৈরী করে গান ধরে- নায়া রে ...। নায়ের বাদাম ...।
সাহেদ নিজের কন্ঠের অপরিচিত ভাব দশা দেখে ভড়কে যায়। কেমন যেন ভ্যাঁস-ভেঁসে, কাঁপা-কাঁপা গলা, যেন ভুত হাজির করা মন্ত্র পাঠ করছে। ভুতের ভয় যদি একবার কাঁধে ভর করে আর ভুতুরে পরিবেশ যদি সঙ্গের সাথী হয় তবে তার হাত থেকে রেহায় পাওয়া চারটে খানি কথা নয়। এখন অন্ধকারে বড় বড় গাছ গুলোকেও অপরিচিত লাগছে। মনে হচ্ছে এক একটা বিরাট বিরাট বাঘ, ভাল¬ুক, ডাইনোসার...।
হঠাৎ বাম দিকে ঝোপের মধ্যে কি যেন নড়ে চড়ে উঠে। তার চিন্তা ভাবনা এলো মেলো হয়ে যায়। মনে হয় আবছা ছাঁয়া ছাঁয়া একটা সাদা শাড়ী পরা থুরথুরি বুড়ি লাঠি ভর দিয়ে তার দিকে হেঁটে আসছে। অনেকটাই জেলে পাড়ার কামালের বড় দাদীর মত। সাথে সাথে কামালের দাদীর বিদঘুটে চেহারা তার সামনে ভেসে উঠে। ধবধবে সাদা চুল। চোয়াল বসে গেছে। বসে যাওয়া চক্ষু কোটরে চোখ দুটো জ্বল জ্বল করছে। তার গা শিহরে উঠে। দু’ কানের সামনে পিছনের চুল গুলো টান খেয়ে দাড়িয়ে যায়। দু’ কান দিয়ে গরম ভাপ বেরুচ্ছে। বুকের ভিতর ঢিপ ঢিপ করে। নিশ্বাস ঘন ঘন পড়ে। এ এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। সে কি করবে স্থির করতে পারে না। হঠাৎ একটু দুরে কয়েকটা শিয়াল ”হুক্কা হুয়া” ”হুক্কা হুয়া” করে উঠে। সাথে সাথে কয়েকটা কুকুর ঘেও ঘেও করে তাদের ধাওয়া করে। সেদিকটা খেয়াল করে বামে তাকাতেই হতভম্ব। কোথায় সেই বুড়ী? ভোজ বাজির মত অদৃশ্য হয়ে হয়ে গেছে। নিছক ভুল বুঝা বুঝি মনে করে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। সাহেদ ওসব থোরায় কেয়ার করে।
সাহেদ একমনে হাঁটছে। হঠাৎ তার মনে হয় কে যেন তাকে অনুসরণ করছে। অস্পষ্ট পায়ের আওয়াজ পাচ্ছে- খস্ ... খস্ ...খস্ ...! প্রথম প্রথম পাত্তা দিলনা। কিন্তু আওয়াজ এখন অনেকটা স্পষ্ট।
মনে হয় কেউ ঠিক তার পিছনে। আর একটু হলেই তাকে ধরে ফেলবে। ঘাড়ে গরম নিশ্বাস ফেলছে। ভয়ে দম বন্ধ হবার যোগার। এ কি হলো? তার পা দু’টো যেনো অবশ হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কোন অদৃশ্য শক্তি তার দেহকে সাপের মত পেচিয়ে রেখেছে। সে প্রাণ পণ চেষ্টা করছে শ্রীপুরের দিকে যাওয়ার। কিন্তু কিছুতেই এগুতে পারছে না। এক একটা পা যেন এক মন ওজন। পথ যেন শেষ হয় না। তবে কি সেই তার পিছু নিয়েছে ...? সাহেদ দোয়া দরুদ পড়ছে। সব কেমন যেন উল্টা পাল্টা হয়ে যাচ্ছে।
সে দুনিয়ার উৎকন্ঠা নিয়ে পিছনে তাকায়। কই? কিছুই তো নেই। মনে মনে নিজেকে তিরস্কার করে। আর বিভ্রান্তিতে পড়বে না সে। যে কোন অবস্থাতেও।
এখন সাহেদ শ্রীপুর বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ইছামতি নদীর ব্রীজের উপর। ছোট্ট একটা ব্রীজ। ইছামতি এখন নামেই নদী। মূলতঃ সুতোর মত লম্বা একটা খাল। পানি থাকেই না। কোথাও এক আধটু থাকলেও হাঁটু পানি। কচুরী পানায় ভরা। রাস্তার দু’ পাশে দু’ একটা বাড়ী ঘর দেখা যায়। সামনে প্রায় পাঁচ’শ গজ এগুলেই ছোট্ট একটা বাজার। প্রায় সবই করুগেটেড টিনের তৈরী দোকান ঘর। একেবারেই গ্রামীন পরিবেশ। মাথার উপর দিয়ে একটা বাদুর পত পত করে উরে গেল। বুকের মধ্যে ধুক করে উঠে। অন্ধকারে বাজারের মধ্যে দিয়ে যাবার সময় দেখে দোকানপাট সব বন্ধ। একটা চায়ের দোকান লাগোয়া বেড়া বিহীন চালা ঘরে কয়েকটা বেঞ্চ। তার উপর একটা লোক নাক ডেকে ঘুমায়। খুব সম্ভব পাহারাদার। লোকটাকে দেখেই গা রি রি করে উঠে। এলো মেলো লম্বা চুল। উস্ক খুস্ক চেহারা। রোগা, পাতলা, হ্যাংলা। কাছে যেতে ইতস্তত করে। তবুও যেয়ে ডাকে- ও ভাই! এই যে শুনেন! ও ভাই!
লোকটা - এ্যাঁঃ ! এ্যাঁঃ ! করে ঢোক গিলতে গিলতে অন্য কাতে শুয়ে নাক ডাকে।
বোঝায় যায় বেটা জুত সই নেসা করেছে। গাঁজা, ভাং এখন গ্রামে গঞ্জে ভরা। নেসাখোরকে ডাকা আর মরা মানুষকে ডাকা সমান। সে হতাশ হয়। ভেবেছিল ওর কাছ থেকে আশ পাশের কোন ভ্যানওয়ালার বাড়ীর সন্ধান নিয়ে তাকে রাজি করিয়ে সঙ্গে নিয়ে যাবে। ক্ষোভে তার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে। টর্চ লাইট তো ছাড় একটা দেয়াশলায় পর্যন্ত তার সাথে নেই। বিড়ি সিগারেট না খেকোদের এই একটা সমস্যা। নিঃসঙ্গ অন্ধকার রাত্রে একটা দেয়াশলায়ের কাঠি যে কি উপকার করে তা ঠিক সময় মত বোঝা যায়। হতাশার একটা দীর্ঘ শ্বাস বাতাসে মিলিয়ে গেল। ক্লান্তি আর বিরক্তি উভয় তার চোখে মুখে তীব্র ভাবে ফুটে উঠেছে। পাশের বেঞ্চে মিনিট পাঁচেক হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে থাকে।
শ্রীপুর বাজারটা পূব পশ্চিম হয়ে বামে ঘুরে খানিকটা উত্তরে যেয়ে একটা গ্রামে গিয়ে শেষ হয়েছে। গ্রামের নাম রাণীগ্রাম। সে হাঁটতে হাঁটতে বাজারের শেষ প্রান্তে চলে আসে। এখান থেকে মেটে সড়ক শুরু। তার দু’পাশে নানান জাতের ছোট বড় গাছ, ঝোপ-ঝাড়। ঐ সবের মধ্যে বাড়ী ঘর গুলো নিথর নিস্তব্ধ হয়ে ঘুমায়। মনে হয় যেন কোন যদিুকর বহু বছর পূর্বে যাদু করে সব কিছুকে পাথর বানিয়ে বশ করে রেখেছে। হঠাৎ তার শামসুলের কথা মনে পড়ে যায়। সে সাহেদের ছোট বেলার গ্রাম্যবন্ধু। এখানে তার নিজের মুদিখানার দোকানে দোকানদারী করে। রাণীগ্রামে শ্বশুর বাড়ীতে থাকে। মিনিট দশেকের রাস্তা।
নিকটেই কোন একটা গাছে কোঁওথ কোঁওথ শব্দে একটা পাখি ডেকে উঠে। ঐ শব্দের ভিতর কেমন একটা পৈচাশিক ভাব আছে। মনের ভিতর আচমকা একটা ভীতি ভাব জন্মে। এসব ভাবনার মাঝে আবারও উঁকি দেয় খানিক আগে ঘটে যাওয়া সেসব কথা। ভয় ভয় ভাবটা থেকে থেকে মাথা চাঁড়া দিয়ে উঠে। সঙ্গে যোগ হয় সাপ, পোকার ভয়। এই গ্রাম পার হলে গারুলির বিল। সে আর এক ইতিহাস। দিনে দুপুরেও লোক ভয় পায়। সাহেদ নিজেকে অবশ্য একজন সাহসী পুরুষ বলে মনে করে। ওসব ভুত টুত বিশ্বাস করে না। একটা জিগা গাছের ডাল ভেঙ্গে নেয়। হাত তিন-চারেক লম্বা। ভুত মোকাবেলা করার জন্য নয় সাপ-পোকা মারার জন্য।
এই অন্ধকার রাত্রেও সাহেদের শামসুলের শ্বশুর বাড়ী চিনতে অসুবিধা হয় না। বাড়ীর চার পাশে বড় বড় আম কাঁঠালের গাছ। মেহগনি, তাল, তেঁতুল আরও কত কি। ঘন গাছ গাছালির জন্য ঘুট ঘুটে অন্ধকার ভাব বিরাজ করে। একেবারে নিঃশব্দ পোড়ো বাড়ী। অবস্থা দেখে আঙ্গিনার বাইরেই তার গা ছম ছম করে উঠে। তবুও শামসুলকে ডাকার জন্যে সে আঙ্গিনায় প্রবেশ করে।
মূহুর্তের মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে মার-মার, কাট-কাট করতে করতে শোঁ-শোঁ শব্দে ঝরের বেগে বাতাস বইতে শুরু করে। গাছের শাখা-প্রশাখা, লতা-পাতা ছিঁড়ে ছুঁটে লন্ড ভন্ড হবার যোগার। বাঁশ ঝাড়ের গোটা তিনেক বাঁশ একবার বামে শুয়ে মাটি স্পর্শ করে আবার সরাত উঠে দাঁড়িয়ে যায়।
ওরে মারে রে! কি সাংঘাতিক ব্যাপার?
আরও ভয়াবহ ব্যপার ঝড় কেবল আঙ্গিনার মধ্যে! আর সবখানে বাতাস স্তব্ধ।
হঠাৎ কোথা থেকে একগাদা শুকনো পাতা ঝপঝপ করে তার সামনে পড়ে জমা হতে থাকে। তার পর পরই বাতাসের ঘুর্ণী চক্রের খেলা শুরু হয়। তার চার পাশ দিয়ে বাতাস বন বন করে ঘুরতে থাকে। মনে হয় তাকে তুলে আছার মারবে। ধুলা-বালু, খড়-কুঠো, শুকনো পাতা দিয়ে তার কান, মাথা, দেহ একাকার হয়ে যাচ্ছে। দম বন্ধ হবার উপক্রম। তার মনে হয় সে মারা যাবে। মাত্র বিশ পঁচিশ সেকেন্ড। যেন সব কিছু হাওয়ায় মিলে গেল। একে বারে সুনশান নিরবতা।
তার মনে নানান সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে- এসব কারও ইঙ্গিতে হচ্ছে না তো? না কি কোন অশরীরি আত্মা তার পিছু নিয়েছে? এসব কিসের আলামত? একি বিপদ হলো আজ?
সাহেদ কাঁপতে কাঁপতে একটা চালা ঘরের কাছে যায়। সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়ায়। ঠিক ঘড়টার পিছনে করুণ সুরে কে যেন কাঁদছে। সঙ্গে সঙ্গে তার হাত পা পাথরের মত স্থবির হয়ে গেল। মনে হচ্ছে তার পা হাঁটু পযন্ত মাটির ভিতর দেবে যাচ্ছে। সে নিজের ভয় ধামা চাপা দেওয়ার জন্যে গর্জে উঠে, কে কাঁদে?
কিন্তু কণ্ঠ দিয়ে কোন শব্দ বের হয় না। মনে হয় কে যেন তার গলা টিপে ধরেছে। গলায় হাত দিয়ে ডলে কাশি দেয়। থু করে শে¬ষ্মা ফেলতে যায়। কিন্তু এক ফোটা থুতুও বেরুলো না। গলা শুখে কাঠ। আবারও চেষ্টা করে, কে ওখানে?
কিন্তু ক্ষিন কন্ঠের ভূতুরে প্রতিধ্বনি হয়, তোকে খাব! ...তোকে খাব!! ...তোকে খাব!!!
সেই সাথে কান্নার আওয়াজও থেমে যায়। কেমন যেন অ¯^াভাবিক সব কিছু। হঠাৎ ঝড়! তারপর নিরবতা! এখন কান্নার শব্দ! এসব কি হচ্ছে? তবে কি সত্যি সত্যিই সেই সাদা শাড়ী পরা ছায়া মূর্তি তাকে অনুসরণ করে এখানে এসেছে?
সে ভয়ার্ত কন্ঠে আবারও বলে, কে আছেন? কিন্তু কোন সাড়া শব্দ নেই। এবার সাহেদ পরিমরি চিৎকার করে উঠে, যেন ও মরে যাচ্ছে, শামসুল! এ শামসুল! শিগগীর বের হ! ওরা আমাকে ...!
এবার চালা ঘরের মধ্যে থেকে কথার ভাঁজ পাওয়া গেল। মনে হল কোন আশিতীপর বৃদ্ধা রিন-রিনে নেঁকো কন্ঠে বলছে, কে গো তুমি, সাহেদ? শামসুল বিলে মাছ মারতে গেছে। সাহেদের বুকের ভিতর ধরাস করে উঠে!
আরে! সর্বনাস!
অজানা অচেনা একটা বৃদ্ধা তার নাম জানলো কি করে?
তারপর দেখলো ঐ চালা ঘরের জানালায় খানিক আগে রাস্তায় দেখা সেই থুরথুরে বুড়ি দাঁড়িয়ে খিল খিল করে হাসছে। আচমকা ভুত দেখার মত পরিস্থিতি হয় তার। বেহুসের মত পাথরের মূর্তি হয়ে কতক্ষন দঁড়িয়ে আছে বলতে পারবে না। হঠাৎ নারকেল গাছ থেকে কিছু একটা সর সর করে ছিঁড়ে ধাপ করে মাটিতে পড়ার শব্দ হয়। তার হুশ হয়।
ওরেবাবারে! এ তো সত্যি সত্যিই পিচাশের আস্তানা! শিগগীর পালাও! বাঁচতে চাইলে এখানে আর এক মূহুর্ত নয়।
সে বিদ্যুত বেগে এক দৌড়ে মেটে সড়কে চলে আসে। তখনই ঘটে গেল আর এক কান্ড! ইয়া বড় একটা কি যেন থপ করে তার ডান পায়ের উপর আছরে পরে।
ওরে মা রে! মেরে ফেললো রে!
সে দু’ তিন পা হটে আসে। জিগার ডাল দিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে শপাং শপাং করে মারে কয়েক ঘা। সম্ভবত কম্পমান হাতের জন্য আক্রমন একশত ভাগ ব্যার্থ হয়।
ততক্ষনে নির্বিকার ব্যাঙ লাফাতে লাফাতে চলে গেল। এই দুঃসহ পরিস্থিতিতেও হাসি এলো। এর পর আর সাহেদকে কে পায়। পরি মরি করে ছুটছে তো ছুটছে। শামসুলের আশা ত্যাগ করে মনে মনে আল্লাহ্কে স্মরণ করে, হে আল্লাহ, এই বিপদে আমাকে রক্ষা কর, আমাকে ধৈর্য দাও। সে দূর্বল, ক্লান্ত শরীর নিয়ে দ্রুত ঔ গ্রাম ত্যাগ করে।
সাহেদ মাঝে মধ্যে জিগার ডাল দিয়ে ঠাস ঠুস করে মাটিতে আঘাত করছে আর মুখে হ্যাস হুস করে শব্দ করে। উদ্দেশ্য সাপ, পোকা, মাকড়কে সাবধান করে দেওয়া। পিছনে কাল মহিষের মত বিভৎস রূপ ধরে দাঁড়িয়ে আছে ভয়ংকর রাণীগ্রাম।
সে গারুলির বিলের মধ্যে দিয়ে সোজা উত্তরে বয়ে যাওয়া মেটে সড়ক দিয়ে হাঁটছে। নানা উৎকন্ঠা, শংকায় মন ধুক ধুক করে। এই বিল এক সাংঘাতিক বিল। আশে পাশে কোন বাড়ী ঘর নাই। যতদুর চোখ যায় ধুধু মাঠ আর মাঠ। এখন দু’ ধারে ফসল বোনা হয়েছে। ভরা বর্ষায় পানি থৈ থৈ করে। তখন এসব সড়কও ডুবে যায়। নৌকা ছাড়া চলাচল অসম্ভব। তখন যতদুর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি।
ও রূপাকে বলেছিলো, কোন এক ভরা বর্ষায় তাকে তাদের গ্রাম দেখতে নিয়ে আসবে। রূপা শর্ত দিয়েছিল; সারাদিন নৌকোতে ভাসবে, ভাসবে শুধুই ভাসবে। ক্ষিধে পেলে আউসের চালের লাল রঙ্গের ভাতের সাথে কাঁচামরিচ-পেয়াঁজ, ডাল, আলু-বেগুনের ভর্তা। নৌকোর মাঝি হবে সাহেদ এবং এক মাত্র নাইয়োরী সে।
ভার্সিটি পড়–য়া শহরের মেয়ে রূপা আগামী কাল ক্যাম্পাসে যেয়ে যখন সাহেদের খবরটা তমালের কাছ থেকে পাবে, তখন নিশ্চয় সবার অজান্তে চোখের পানি লুকোবে। একটা লম্বা শ্বাস বেরিয়ে বুকটা খালি হয়ে গেল সাহেদের।
এখন মাঝে মাঝে বৃষ্টি হওয়ায় মাটি ভেজা স্যাঁত সেঁতে। সড়কের দু’ এক জায়গায় গরুর গাড়ী চলাচলের জন্য গর্ত এবং তাতে প্যাঁক-কাঁদা জমেছে। দু’ ধারে ফসলী জমির মধ্যে মাঝে মাঝে ছোট বড় ডোবা। সেখানে এখনও লোকেরা মাছ ধরে। সড়কের দু’ ধারে জঙ্গল, ঝোপ, ঝাড়, হঠাৎ দু’ একটা ছোট বড় গাছ চোখে পরে। মূলত চারিদিকে কেমন ফাঁকা ফাঁকা ভাব। তাতে চাঁদের ক্ষীন আলো ফুটে উঠেছে। আবছা আলো-ছায়ার লুকোচুরি। প্রচন্ড তৃষ্ণা নিয়েও বেপরোয়া হাঁটছে।
বেশ দুরে আবছা ঘন কালো বড় বড় গাছের মত দুটো কি যেন দেখতে পেল সাহেদ। আসলে ওগুলো প্রকান্ড দুটো বট গাছ। সবাই বলে ভাইতিতলা। ওটাই বিলের মাঝ ভাগ। এটাই এলাকার সবচাইতে ভয়ংকর জায়গা। ওখান থেকে আর মাইল দেড়েকের মত গেলেই ওদের গ্রাম। সে অনুমান করলো রাত প্রায় তিনটা-সাড়ে তিনটা।
উহ্ যে ধকল গেল। জীবনে মনে থাকবে। হায়রে এই বিপদের দিনে একটা টর্চ লাইট নেই। মনে থাকলে এমন বোকামী আর নয়। আফসোস একটা কিনা জিগার ডাল সম্বল। অথচ দুষ্টু লোকজন নিরিবিলি পেয়ে খুন খারাবী পর্যন্ত করে ফেলে সামান্য কিছু লুটে নেবার আশায়। এসব সাত-সতের ভাবতে ভাবতে এক সময় সে ঐ বট গাছের নিকটে পৌঁছে গেছে। হঠাৎ মনে হল দুই বট গাছের মাঝে সড়কের উপর কে যেন বসে আছে। দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে। সে জোরে চিৎকার করে বলতে যাবে, কে? কিন্তু তার আগেই লোকটা উঠে দাঁড়ায়। হাতে তৃকোণাকৃতির জালের মত কি একটা। মনে হয় ঠেলা জাল। সেটা কাঁধে নিয়ে হন হন করে সাহেদকে পেছনে ফেলে উত্তরে সড়ক ধরে হাঁটা দেয়।
সাহেদের মনে হল ও নিশ্চয় শামসুল। মাছ ধরতে এসে ক্লান্ত হয়ে এখানে বিশ্রাম করছে।
কিন্তু! সে তাকে না দেখার ভান করলো কেন? একটা চাপা দুঃখ দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে এল। ধারণা করে হয়ত অন্ধকারে তাকে নাও দেখতে পারে বা চিনতে পারেনি। সাহেদ বেশ উত্তেজিত। নতুন উদ্দীপনায় ডাকে, শামসুল! এ শামসুল!
কোন প্রতিউত্তর নেই। শামসুল এক মনে হাঁটে।
আবারও ডাকে, শামসুল! এ শামসুল, দাঁড়া।
মনে হল সে শুনতে পেয়েছে। তবে কথা না বলে ঘার বাঁকিয়ে হাত ইশারায় আসতে বলল। দু’জনের দুরত্ব প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ গজ।
সাহেদ ক্লান্ত দেহে আরও দ্রুত হাটতে থাকে। তৃষ্ণায় ক্ষুধায় দফা রফা হবার যোগাড়। তারপর ঘামে জর্জরীত। তবুও প্রাণ পণ হাঁটে। কিন্তু কিছুতেই ওর নাগালের মধ্যে আসতে পারে না। মাঝে মাঝেই সে ডাকে, শামসুল! এ শামসুল! শামসুল দাঁড়া! শামসুল একবারের জন্য হ্যাঁ বা না কিছুই বলে না। শুধু ধাঁই ধাঁই করে হেঁটে যায়।
সাহেদ যত দ্রুত হাঁটে শামসুল তত দ্রুত হাঁটে। দুরত্ব কিছুতেই কমে না।
সাহেদ হাঁটছে তো হাঁটছেই ...। আর ঘেমে নেয়ে একাকার। অস্থির হয়ে গেল। আর কতক্ষণ? বিরক্তির শেষ পর্যায়ে। তবুও ডাকে, শামসুল দাঁড়া! এ শামসুল দাঁড়া! এভাবে কতোক্ষণ হেঁটেছে তা সে বলতে পারবে না।
তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। শেষমেশ সাহেদের মনে প্রশ্ন উঁকি দেয়; ব্যাপারটা কি? শত চেষ্টা করেও ওকে নাগালে না পাওয়ার কারণ কি?
সাহেদ ওকে খুব ভাল করে লক্ষ্য করলো; সাথে সাথে জান উড়ে গেল।
সর্বনাশ ও তো শামসুল নয়। একটা ছায়া মূর্তি। সে পায়ে হেঁটে চলছে না। মাটির এক হাত উপর দিয়ে হাঁটছে।
হায় খোদা! এ কার পিছনে ছুটছি আমি?
মুহূর্তে হাত-পা অসার হয়ে গেল। মনে হচ্ছে গলা সমান পাঁকে ডুবে যাচ্ছে ও। রক্ত চলাচল বন্ধ হবার যোগার হয় তার।
ও রাস্তা খুঁজলো। কিন্তু এ কি? তাদের গ্রামের রাস্তা কোথায়? তাহলে আমি এতক্ষন কোন পথে হাঁটছি? বুকের মধ্যে শ্যালো মেশিনের শব্দ। ধপ! ধপ! ধপ!
ইতিমধ্যে আকাশে কালো হয়ে মেঘ জমে উঠেছে। একটা বড় মাপের বিদ্যুৎ চমকালো। সেই আলোতে যা দেখলো তাতে তার বুকের ভেতর তোলপাড় আরও কয়েকগুন বেড়ে গেল, যেন পাঁজর ভেঙ্গে কলিজা বেরিয়ে আসবে।
ঐ তো সামনে অদূরে সাহা পাড়ার শ্মশান ঘাট! পিচাশটা আমাকে গ্রাম থেকে এত দুরে নিয়ে এসেছে! আজ আমার মৃত্যু অনিবার্য!
তবে কি! ঐ প্রেতাত্মা আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে একের পর এক বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে যাচ্ছে?
সাহেদের দেহের রোম গুলো খাড়া হয়ে উঠে। দুই কান গরম হয়ে ভাব বেরুচ্ছে। তার সব কিছু তাল গোল পাকিয়ে যাচ্ছে। এক্ষুনি সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। সে মরিয়া হয়ে সামনে তাকিয়ে দেখতে চেষ্টা করে।
কি আশ্চর্য! এতো সেই বুড়ি! কটমট করে তার দিকে তাকাচ্ছে। দু চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। দুধের মত সাদা দুটি লম্বা দাঁতের মাঝ দিয়ে লিক লিকে লোলুপ জিভ নারাচ্ছে। অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছে তার চোখ মুখ জিঘাংসায় ফোঁস ফোঁস করছে।
ওর রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে! আর হতে সময় নেই। এক্ষুনি কিছু একটা করতে হবে। শয়তানটা এক্ষুনি তার ঘাড় মটকে রক্ত পান করবে!
তখন তার বাবা-মার কথা মনে পড়ে, বাবা! তুমি আমায় ভুল বুঝনা। নিশচয় তোমার সাহেদ অবাধ্য নয়। আজ আমার মৃত্যু হলেও আমি সার্থক। মা! তুমি আমাকে ক্ষমা করো। জীবনের শেষ মূহুর্তে শেষ বারের মত তোমার প্রিয় মুখটা দেখতে পেলাম না।
সে দ্রুত জিগার ডালটা হাতে নিয়ে তার চার পাশ দিয়ে একটা গোল বৃত্ত আঁকলো আর বিড় বিড় করে এসমে আযম পাঠ করলো। ঠিক তখনই পূব আকাশে কাল মেঘের আড়ালে মৃদু আলোর রেখা ফুটে উঠলো। দুরের কোন এক মসজিদ থেকে মুয়ায্যিনের সুমধুর কন্ঠ¯^র ভেসে আসে, আস্সালাতু খায়রুম্ মিনান্নাওম ...।
মুহূর্তের মধ্যে সে জ্ঞান হারিয়ে বৃত্তের মাঝে পড়ে গেল।
সাহেদ যখন চোখ মেলে তাকালো তখন দেখে সে একটা বৃষ্টি ভেজা ধান ক্ষেতের মধ্যে শুয়ে আছে। ভোরের মিষ্টি আলো আর ফুরফুরে শীতল হাওয়া পরশ বুলিয়ে রাত্রির সকল ক্লান্তি ভাব একে একে ঝরিয়ে দিচ্ছে। সে উঠে বসে। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। সারা দেহ ভিজে চুপসে গেছে। শরীরটা প্রচন্ড দূর্বল, ব্যাথায় ভার হয়ে আছে। ভয়ানক পিপাসায় কাতর। এত দুঃখ দুর্দশার মধ্যেও তার মনের মধ্যে একটা তৃপ্তির মহাতরঙ্গ স্নায়ু থেকে দেহের প্রতিটি প্রান্তে, ধমনি হয়ে প্রতিটি কোষে কোষে প্রবাহিত হতে থাকে এই ভেবে যে মারাত্ম্ক কোন দূর্ঘটনা ব্যাতিরেকে মাটির সন্তান মাটিতেই নির্বিঘে্ন ঘুমিয়ে দিয়েছিলেন পরম করুণাময় আল্লাহ্।
সাহেদ উঠে দাঁড়ায়। ভেজা ট্রাভেলিং ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ীর দিকে রওনা হয়। সে গত রাতের ঘটনা মনে করে আর ভাবে, উত্তেজিত স্নায়ু কত ঘটনারই তো জন্ম দেয় যার সত্যিকার ব্যাখ্যা আজও বিজ্ঞান দিতে পারেনি...।