লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ নভেম্বর ১৯৬৪
গল্প/কবিতা: ২০টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৯৭

বিচারক স্কোরঃ ১.৯৪ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftইচ্ছা (জুলাই ২০১৩)

ছায়া
ইচ্ছা

সংখ্যা

মোট ভোট ২৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৯৭

মীর মুখলেস মুকুল

comment ১১  favorite ০  import_contacts ১,২৫৮
বীণার মা এক রাতে হঠাৎ লাপাত্তা হয়ে যায়, তখন বীনার বয়স তিন কী চার বছর। এসময় কিছুদিন থেকে নিকটবর্তি শহরে নারী ও শিশু পাচারকারী দলের তৎপরতার কথা শোনা যাচ্ছিল। অনেকের সন্দেহ হলো, কাজটা তাদেরই।
আবার এও কানা-ঘুষা হচ্ছিল; বীণাদের গ্রাম থেকে মাত্র তিন কিলো দূরে তার নানার বাড়ি, সেখানে দূরদেশ থেকে আসা এক সুদর্শন যুবক জায়গীর থেকে লেখা-পড়া করতো, যার সাথে তার মা’র নাকি একসময় গোপন সম্পর্কও ছিল, বীণার মা’র বিয়ের পরও যুবকটিকে মাঝে-সাঝে এ গাঁয়ে উদ্দেশ্যহীন ঘোরা-ফেরা করতে দেখা যেত। প্রায় একই সময় যুবকটিও অজ্ঞাত কারণে নিরুদ্দেশ হয়। ফলে যুবকের সাথেও তার মা পালাতে পারে, এটাও একটা মুখরোচক গুঞ্জন হয়ে উঠলো।
আবার সেরাতে তার মাকে কেউ কেউ দড়ি কলসি নিয়ে নদীর ঘাটের দিকে যেতে দেখেছিল। যুবককে নিয়ে তার মা-বাবা’র দাম্পত্য কলহের কথা গ্রামবাসী জানতো; অতএব নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করে ভেসে যেতে পারে, সেটাও কেউ কেউ বিশ্বাস করলো। মোটকথা এই নিয়ে বেশ কিছু রটনা রটেছিল।
বীণার বাবা আশরাফ হোসেন বিষয়টিকে ধামাচাপা দেবার জন্যে হোক বা নিজেকে ধোয়া তুলসিপাতা প্রমাণের জন্যে হোক বা ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যে হোক; রাস্তা-ঘাট, চায়ের দোকান, যত্র-তত্র মাথা উঁচিয়ে, হাত নেড়েচেরে বক্তৃতার ঢঙে বা চোখ বন্ধ করে কানে-কানে বীণার মা’র নানা কুৎসা রটাতে লাগলেন। তিনি এও বলতে লাগলেন, এ ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেবেন না এবং অই কুখ্যাত রংবাজকে তিনি কোন কালেই ছেড়ে কথা বলবেন না। তবে তিনি বীণার ভবিষ্যৎ ভেবে আপাততঃ এ কাজ থেকে বিরত থাকলেন।

যে যা ভাবে ভাবুক, করে করুক; কয়েক মাস পার হয়ে গেল। তখন এসব নিয়ে কিছু করা দূরে থাক, ভাবারও লোক থাকলো না। এদিক আশরাফ হোসেন কণ্যা-পরিজন নিয়ে সামাজিক পরিমন্ডলে নিবু-নিবু জীবন যাপন করছিলেন। হঠাৎ জ্বলে উঠলেন। এবার মানুষের নজরে এলেন অন্যভাবে। বিয়ে করার জন্যে উঠে-পড়ে লাগলেন। পাত্রী দেখা শুরু হলো। কিন্তু কাউকেই তার পছন্দ হয় না। কেউ বাতিল হলো অসুন্দরী বলে, কেউ বয়স্কা, কেউ চরিত্রহীন সন্দেহে, কেউ নিচু জাতের বলে। খুত ধরে, নানা অজুহাতে, একের পর এক পাত্রী বাতিল করতে লাগলেন। তবুও তিনি হাল ছাড়লেন না। বছরের পর বছর ঘুরতে লাগলো। একসময় পাত্রী দর্শনে অনিহা সৃষ্টি হলে এ কাজে ভাটা পরলো। তদ্দিনে তার ‘বিয়ে পাগল মাস্টার’ হিসাবে নাম ডাক ছড়িয়ে পড়েছে। একের পর এক নানা বিতর্কে জড়িয়ে শেষ পর্যন্ত নিজ গাঁয়ের হাই স্কুলের সহঃ শিক্ষকের পদটাও হারাতে বসলেন।
নদীর এপাড় ভাঙে, ওপাড় গড়ে। আবার তলায় পলি জমে ভরাটও হয়, কখনও বা দিক পরিবর্তন করে। আশরাফ হোসেনের জীবন কোন নদীর সাথে তুলনীয় কিনা জানিনা তবে তার আরও একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। ধীরে ধীরে তিনি ‘বিয়ে পাগল মাস্টার’ থেকে ‘স্কুল পাগল মাস্টারে’ পরিণত হলেন।
এতোক্ষণ যা বলেছি, তা শুধু কথার কথা, বলার জন্যে বলা। আসল কথা, এই কুখ্যাত আশরাফ কিভাবে ‘বিয়ে পাগল মাস্টার’ থেকে ‘স্কুল পাগল মাস্টারে’ পরিণত হলেন এবং ঈশ্বর্দীর রূপপুর ইউনিয়নের স্কুলের হেডমাস্টারের দায়িত্ব পেলেন; সেটাই।

বীণার মায়ের অন্তর্ধানের পর সে খানা-পিনা বন্ধ করে একাধারে কেঁদে-কেটে অস্থির হতে থাকে।
সারাক্ষণ মা! মা! মা!
মা’কে এনে দাও, মা’কে ছাড়া খাবনা, ঘুমাবো না...।
একে তো মাতৃহারা মেয়ের কান্না-হাহাকার তারপর গোদের উপর বিষফোরার মত লোক-জনের গা-জ্বালানো কথা এবং হঠাৎ পা পিছলে পড়ার মত সামাজিক পদস্খলন; বীণার বাবা অনেকটাই উন্মাদের মত হয়ে গেলো। তবুও মেয়েকে দিনের পর দিন সান্তনা দিতে লাগলেন...।
বীণা তখন ষষ্ঠ শ্রেনীর ছাত্রী, একদিন সে তার এক বান্ধবীর সাথে জৈষ্ঠের গরম পড়া দুপুরে তাদের বাসায় যায়। রোদে পুড়ে বান্ধবীটি যখন ঘরে এলো, তখন তার মা অস্থির হয়ে উঠে; তাকে নিজের আঁচল দিয়ে কপাল মুছে সরবত খেতে দিয়ে, তাল পাখার বাতাস করে তাকে মুখে ভাত তুলে খাইয়ে দেয়। আর সে কী হায়-আফসোস, কাকুতি মিনতি Ñ
আটপিঠি রোদের মদ্দি কিকামে মাথায় উড়না দিয়ে আসলু না...?
বীণা যখন বড় বড় শ্রেনীগুলো উত্তীর্ণ হতে থাকে তখন তার মায়ের অভাবজনিত বেদনাগুলো নিউরালজিয়ার মত দীর্ঘমেয়াদি রোগে রূপ নিতে থাকে। পাশাপাশি অনেকটাই সঙ্গত কারণে মায়ের প্রতি তার ঘৃণাবোধও তিল-তিল করে বড় হতে থাকে। তাই সবসময় এসব প্রসঙ্গ এরিয়ে চলতো। কখনও কেউ জিজ্ঞাসা করলে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতো এবং মনে মনে দাঁতে-দাঁত পিষতো। ভাবতো Ñ
লেখা-পড়া শেষ করে যখন নিজের পায়ে দাঁড়াবে তখন সে এই কষ্টকে গলা টিপে হত্যা করবে। আর ভবিষ্যতে যদি মা মাতারীকে হাতের কাছে পায় তো চরম প্রতিশোধ নেবে।

এভাবে একদিন মায়ের অস্পষ্ট স্মৃতিকে পেছনে ফেলে, প্রিয় সহপাঠীদের ছেড়ে, বাবাকে একলা বাড়িতে ফেলে অন্যরকম এক জীবনে প্রবেশ করলো।
বীনা প্রচণ্ড মনখারাপ এবং হতাশা নিয়ে সেদিন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকতা হিসেবে বগুড়ার গাবতলীতে যোগদান করলো। মাত্র পনের দিন হয়েছে। অথচ এরই মধ্যে তার সয়ে যাওয়া পুরনো যন্ত্রনাগুলো আবার দগদগে ঘা হয়ে ব্যথিত করে তুলতে লাগলো। সদ্য শুরু হওয়া কর্মজীবনের অনভিজ্ঞ বাস্তবতার খাঁচায় বন্দি হয়ে সে কেবলি ছটফট করতে লাগলো। যেন তার কেউ নেই। কিছুই নেই...।
উপজেলা পরিষদের স্টাফ কোয়ার্টারের দক্ষিণের জানালায় বসে রাত্রিবেলার অবসরে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতো। হয়তো চাঁদ বা তারার দিকে তাকিয়ে মায়ের চেহারাটা মনে করার চেষ্টা করতো। কিন্তু কিছুই মনে করতে পারতো না। কখনও বা স্মৃতিগুলো একের পর এক হাতিয়ে যখন কিছুই খুঁজে পেত না তখন কোন এক অস্থিরতায় মোহগ্রস্ত হয়ে চাঁদকে লক্ষ্য করে দীর্ঘশ্বাস ফেলতো, হয়তো বলতো Ñ
এই! আমার মাকে দেখেছিস?
এইসব আফসোসে ভালবাসা ও ঘৃণা একত্রে জড়িয়ে থাকতো।
বীনণার অফিসে মন বসে না। ঘরে দমবন্ধ হওয়া অস্থিরতা। প্রিয়জনহীন এক অনভ্যস্ত পরিবেশে সে ক্রমশ অভিমানিনী হয়ে উঠে। বাবা ছাড়া এ পৃথিবীতে তার আপন বলতে কে আছে? তাই যত অভিমান গিয়ে জড় হলো বাবার উপর। তাই সেদিন অম্ল-মধুর ভাষায় বাবাকে একটা চিঠি লিখলো। চিঠি লিখতে তার বার বার চোখের পাতা ভিজে যাচ্ছিল।

প্রিয় বাবা,
তুমি একটা পাষাণ। তোমার সাথে কথাও বলবো না, চিঠিও লিখবো না। সেই যে আমায় রেখে গেলে তারপর এই হতভাগার একটা খবর পর্যন্ত নিলে না। এখানে আমার কে আছে?
এক একটা দিন যেন বছর সমান।
একটা কাজের লোক নেই, যে বাসার কাজগুলো করে দেবে। এখানে কাউকেই খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি সত্তর আমাদের গ্রামের রাজার মাকে নিয়ে আসবে।
এই অসহ্য দিনগুলোতে কেন যেন পেড়ামুখী মা’কে বার বার মনে পড়ছে?
খুব তারাতারি যদি তোমায় না দেখি, তো নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে দেব। আড়ি দেব। গরুর বাছুরটাকে দিয়ে সব দুধ খাইয়ে দিও না। রাত্রে দুধভাত খেও।
পাগলী মেয়ে।

সেদিন বিকেলে যখন অফিস কক্ষের চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে চা’এর কাপে চুমুক দিচ্ছিল ঠিক তখন অফিস পিয়ন ফজর আলি চিঠিটি পোস্ট করে এক বয়ষ্কা মহিলাকে সঙ্গে করে নিয়ে এলো এবং বললো Ñ
আফা, বুয়ার কথা কইছিলেন, একয়দিন হয়রান হয়া খুঁজি খুঁজি অক ধরি আনচি।
নিজ কর্মকর্তার দূর্দিনে বড় একটা উপকার করতে পেরে নিজেকে বিরাট কিছু ভেবে বুয়ার বিশাল এক চারিত্রিক সনদপত্র দিলো Ñ
হামি অক ভাল করি চিনি। ¯^ামীও নাই ছোলপোলও নাই। পরের ভিটাত থাকে। এর ওর বাড়িত কাম করে। ¯^ামী দজ্জাল আছিলো, খালি ডাঙ্গাইতো। মরার আগোত রোগোত ভুগি ভুগি জমি-জাতি সবই বেচি-কিনি শেষ করি গেচে। তয় খালা খুব বিশ্বাসী, মনখানও ফির নরম। মানসে কয় বয়েসকালে খুব সন্দরী আছিল। হেঃ হেঃ হেঃ..., তয় আফা হামি যাই...?
চায়ের কাপে চুমুকের সাথে পর্যবেক্ষণটাও বীনার গভীরভাবে চলছিল। ছিপছিপে লম্বা, ভগ্ন ¯^াস্থ্যের মহিলা। বড় ঘোমটার ফাঁকে পোড়ামাটি রঙের মধ্যবয়সীনী ব্যতিত আর কিছুই বোঝা গেল না। সে শুধু বললো Ñ
বাসায় চলো।

বুয়ার একটু-আধটু সঙ্গ পেয়ে বীনার কিছুটা আয়েশ হয়েছে। যদিও সে প্রথম প্রথম শুধু মাটির দিকে তাকিয়ে ইশারায় বাক্য বিনিময় করতো, বড়জোর হ্যাঁ/না বলে শেষ করতো। এখন দুই একটা কথা বলে, কখনও বা মুখের দিকে তাকায়। একটু হাসে। মুখে কিছু না বলেও ঘন কালো পুরু পাপড়িঅলা চোখ দিয়ে অনেক অনেক কথা বলে।
বীনা আয়নায় নিজের চোখ কতবার দেখেছে, সেকি আর গননা করে বলা যায়। এতো মায়াবী চোখ তার নিজের, ভাবতেও পারে না। তবুও যেন সে অই বুয়ার চোখই বেশি করে দেখে আর ভাবে...
বুয়ার চোখ জোড়াই যেন নিখুত নিরেট আর দর্শনীয়। তারটা নিছক চলনসই নকল। ঠোঁট জোড়াও যেন তাই। বীনা জানালায় বসে হেমন্তের হিমেল হাওয়ায় হারিয়ে যায়..., পূর্ণপঞ্চদশির শুক্লাকে দেখে..., ভাবে..., কে বেশি সুরম্য Ñ
ঐ চাঁদ না মধ্যবয়সীনী?
বুয়া বিড়ালের মত নিঃশব্দে চৌকাঠে দাঁড়ায়, স¯েœহে আবেগ ঢেলে দেয়, মৃদু হাসিতে বলে Ñ
মা! চা দেব?
এমন মনোরম আহŸান...?
আলো আঁধারিতে একপ্রেমময় স্পর্শহীন বন্ধনে বীণা আপ্লুত হয় Ñ
ঠিক আছে দাও।
বুয়া কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। হয় তো কিছু বলতে চায় অথবা এমনি। বীণা বুঝতে পারে এবং ওর ¯েœহের দৃষ্টির বন্যায় দোল খায়, ভেসে যায়, অনেক অনেক দূর...।
বীণার ছোট বেলার সেই গ্রীষ্মের দুপুরে...। মনে মনে ভাবে Ñ

মা! এখন তো গরম, রোদ কোনটাই নেই, গা’য়ে ঘামও নেই। আর আমি তো নিজ হাতেই খেতে শিখেছি...।
এভাবে চলতে থাকে দু’টি অতৃপ্ত হৃদয়ের একে অপরের মাঝে প্রেম ঢেলে দিয়ে পূর্ণতা দেবার প্রতিযোগিতা।
একদিন ছুটির দুপুরে ভাত ঘুম শেষে বীণা সোফায় বসে পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছিল। হঠাৎ বুয়া এসে সহাস্যে বললো Ñ
মা! মাথায় তেল দিয়ে দেই?
বীণা পত্রিকার পাতা থেকে চোখ ফেরাল। পোড়ামাটির রঙ, সোনা রঙ ধারণ করেছে, যেন সদ্য ফোটা কোন সোনারঙ ফুল। ¯^াস্থ্যের হালে পানি লেগেছে। মনের পালে বাতাস লেগেছে...।
শুধু বললো, দেবে? দাও।
সারা বিকাল ধরে বীণার মাথায় তেল ঘষে চললো। যেন এর কোন শেষ নেই। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে আসতে ঠিক দুটো বেণি হয়ে গেল। অদক্ষ হাতের লাল হলুদ সবুজ ফিতের সংকোলন। বীণা অয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে Ñ
ঠিক যেন সবুজ-সাথী পড়–য়া বালিকা।
বুয়া সংকোচ নিয়ে মাথা নিচু করে বলে Ñ
মা! পুলা-পান মানুষ করিনাই তো। খারাপ হয়ছে। খুলে দেই?
কে বলেছে খারাপ? খুব সুন্দর। আমাকে ছোট্ট মেয়ের মত সাজিয়েছ...।
একথায় বুয়ার মাতৃত্ববোধ বন্যায় বাঁধ ভেঙ্গে যাবার মত হলো, সে বলেই ফেললো Ñ
সব কিছু ত্যাগ করে যারে নিজের জীবন সপে দিছিলাম, সে আমারে কিছুই দেয় নাই। কত যে আত্যাচার করছে, তাও বুকে পাষাণ বাধছি। একটা যদি পুলা-পান থাকতো। তারে বুকে নিয়া আশা-ভরসায় থাকতাম। এখন কারে নিয়া বাঁচি? কোথাই যাই?
বলেই হু হু করে কেঁদে ফেললো।
মা! তোমাকে কোথাও যেতে হবে না...।
বীণার মনের ভেতর বার বার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল Ñ
মা! মা! মা! তোমাকে কোথাও যেতে দেব না..., যেতে দেব না..., যেতে দেব না...।
বুয়া বীণাকে জড়িয়ে ধরে ঝর ঝর কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিল।

কিছু দিন পর অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে ডাকহরকরা বীণার হাতে একটা চিঠি দিয়ে গেল। বাবার চিঠি Ñ

পাগলী মা,
এই বুড়োটাকে এতো করিয়া কী সব আিভমান ঝারিয়াছিস। এইসব কথা শুনিলে এই বুড়োর পাঁজরের সকল হাড়-গোড় এক হইয়া যায়। এই হতভাগার বিরহে তুই মাথা খারাপ করিয়া ফেলিয়াছিস, এইটা আমি নিশ্চিত বুঝিয়াছি। কিন্তু আমি তোকে তিল তিল করিয়া সারাটি জীবন দিয়া যে শিক্ষা দিয়াছি তাহা তুই যে জীবনের প্রতিটি পোরে পোরে কাজে লাগাইতে পারিবি এই বিশ্বাস এই বৃদ্ধ অসফল বাবার মনে দৃঢ়মূল হইয়া গাঁথিয়া আছে। তাহা না হইলে আমার দ্বিতীয় সন্তানতুল্য স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা ফেলিয়া তোর কাছে সহসাই ছুটিয়া আসিতাম। সময়ের পরিবর্তনে সব কিছুই এক সময় সহিয়া যায়। একদিন তো তোকেও আমাকে ছাড়িয়া থাকিতে হইবে।
ঠিকমত ঘুম আহারে অভ্যস্থ থাকিবি। তাহা না হইলে তোর কোন কথাই রাখিব না, শুনিব না। বিশটি বছর ধরিয়া চোখের পানি ফেলিলাম। এখন কী আর একটু ক্ষান্ত দিবার সুযোগটুকু করিয়া দিবি না? তুই কখনও আর এমন করিয়া লিখিবি না। বলিবি না। কাঁদিবি না।
তোর বাবা।

পত্রে যেমনটি উপদেশ ছিল না কাঁদার, ঠিক ততোধিক কেঁদেই তার রাত কেটে গেল। পরদিন সকাল থেকেই তার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে ক্রমশ বাড়তে লাগলো। শীত করে জ্বর এলো। ইদানিং বীণা আর বুয়ার সম্পর্কের আরও অনেক উন্নতি হয়েছে। যার কিছু দেখা যায়, কিছু অন্তর দিয়ে অনুভব করতে হয়। এই যেমন, বড় মাছটা একজন আরেকজনকে তুলে দেয়। কিন্তু আজ আর বুয়া বীণাকে জোর করেও কিছু খাওয়াতে পারলো না। গা’য়ে হাত দিয়ে বললো Ñ
সে কী গো মা! জ্বরে যে গা ভাজা ভাজা।
¯^াভাবিক নিয়মেই শুরু হলো সেবা। মাথায় পানি ঢালা, কপালে পানি পট্টি দেওয়া। ঔষধ, পথ্যি, কোনটাতে একবিন্দু ত্রæটি নেই। টানা সাত দিন সাত রাত। বীণা জ্বরের ঘোরে অবচেতন থেকে শুধু বলছিল Ñ
মা! মাগো! মা!

একদিন কথায় কথায় অনেক কথা হলো। বীণা আবেগে অপ্রকাশিত অনেক কথাই বলে ফেললো Ñ
শুনেছি, আমার ছোট বেলায় শয়তানী মা কোন এক ছোকরার সাথে পালিয়ে গিয়েছিল। তারপরও কেন যে বাবা অই চরিত্রহীনার জন্যে বিয়ে করলেন না। আর আমি? কত তিরস্কার অভিমান অনুরাগ যাতনা ভালবাসা যে মনের মাঝে পুষে রেখেছি, যতই এসব ত্যাগ করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হই ততই যেন অধিক ওজনে মনের উপর স্থির হয়ে বসে। আজ তোমাকে পেয়ে অন্তত ঐ মাতারীর অভাব কিছুটা হলেও পূরণ হয়েছে। তুমিই আমার মা।
বুয়ার পাওনাও কম কী? সে বীণার মত মাতৃ¯েœহে তৃঞ্চার্ত এক মেয়েকে পেয়েছে। আজ তারা পাহাড় মালভূমি মরু সমতল সবকিছু অতিক্রম করে মোহনায় মিলিত হয়েছে।
তবুও কেন যেন এই মিলন সহসাই মায়ের সুখকে অনেকটাই অনিশ্চিত করে তুললো। সেখানে একটি প্রশ্ন বার বার চোরের মত উকি দিতে লাগলো এবং এক পর্যায়ে বলেই ফেললো Ñ
তা আমার সোনামেয়ের বাড়ি কোন গাঁয়ে, বাপের নামই বা কী?
সবকিছু শুনে তার দূর্যোগের ঘনঘটা কয়েকগুন বেড়ে গেলো। সে এক দীর্ঘ শ্বাস চেপে শুধু বললো Ñ
ও, তুমি আশরাফ হোসেনের মেয়ে?
কেন, তুমি বাবাকে চেন?
বুয়া গুহার মুখে পাথর চাপা দেওয়ার মত করে মনের কথা লুকিয়ে শুধু বিড় বিড় বলে গেল Ñ
তিনি, সেই কিনা, জানিনা। তবে তাকে আমি সত্যিকার চিনতে পারি নাই।
তার ভাবার্থ বীণা একবিন্দু বুঝতে পারলো কিনা সন্দেহ। সে শুধু বলে গেল Ñ
আমার বাবার মত এত ভাল মানুষ জগতে আর একটা নাই। শুধু তার নিষ্ঠুর মা’ই সেটা বুঝলো না।

দু’জন দু’জনাকে পেয়ে যেন সাগর তলার ঝিনুকে মুক্তার সন্ধান পেল। মেয়ে মা বলতে অজ্ঞান, মা ও তেমনটাই জ্ঞানহীন। সব মিলিয়ে বীণার মন এখন ফাগুনের কোকিলের মত মাতোয়ারা। এখন মাসটাও যে ফাল্গুন, বীনা সে খবর রাখে কিনা কে জানে। মনের সুখে সে বাবাকে এক পত্র লিখলো Ñ

প্রিয় বাবা,
তুমি এলে না। তবুও তোমার আশির্বাদ আমার পথকে প্রসস্থ করে দিয়েছে। আমি এক বুয়া পেয়েছি। সে দেখতে অনেকটাই নাকি আমার মত।
আমাকে হাতে তুলে খাওয়ায়। চুলে বেণি করে দেয়, একদম স্কুলের বালিকাদের মত করে। আমাকে জড়িয়ে আদর করে, গা’এর গন্ধ নেয়। বলে, আমার গা’এর গন্ধ নাকি তার অনেক আগে হারিয়ে যাওয়া খুকির মত।
বিশ্বাস কর বাবা, তুমি ছাড়া আমি তার মত এত নরম মনের মানুষ আর কখনও দেখিনি। তাকে আমি নিজের অজান্তেই মা এর আসনে ঠাই দিয়েছি। তাকে আমি খুব ভালবাসি। এই মাকে আমি আর হারিয়ে যেতে দেব না।
বিঃদ্রঃ মা’র জন্যে একখানা পাবনার শাড়ী নিয়ে আসবে।
পাগলী মেয়ে।

আশরাফ হোসেনের স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। বীণার মুখখানা দেখার জন্যে তার মন ছটফট করছিল। সেদিন সকালে তার নতুন কর্মস্থলের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে বিশ/বাইশ বছরের একটা অমিমাংশিত প্রশ্ন মনের মধ্যে নতুন করে ধু¤্রজাল তৈরী করলো। বীণা নাকি এক নতুন মা পেয়েছে। নানা অজানা শংকায় মাত্র কয়েক ঘন্টার যাত্রাকে দুঃসহ মনে হচ্ছিল। যেন সময় কাটছিলই না।
অবশেষে পড়ন্ত বিকালের কোন এক নির্বোধক্ষণে বাবা মেয়ের বাসার কড়া নাড়লেন। সেসময় হয়তো বা অন্দরমহলে মা ও মেয়ের আর এক ধাপ অন্তরঙ্গতা সৃষ্টির নতুন কোন এক গীতিনাট্য মঞ্চস্থ হচ্ছিল।
নতুন আর একখানা উপস্থাপিত হওয়ার জন্যে বুয়া এসে দরজা খুলে দিল।
বুয়া একথা বহুবার ভেবেছে তবুও এভাবে তার সাথে সাক্ষাৎ ঘটবে, বুঝে উঠতে পারেনি। এমন একটা মুহূর্তে কী করবে ভেবে কুল কিনারা পায়নি। আজও পেল না।
উত্তেজনায় কাঁপছে, একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল...।
কে বুঝবে; বীণার বাবাকে সে ¯ে^চ্ছায় ত্যাগ করেনি...। সে শুধু নিজেকে শেষ করতে গিয়েছিল, পথিমধ্যে একদল ডাকাত তাকে ধরে নিয়ে যায়। যদি সেই যুবকটি তাকে রক্ষা না করতো, তাহলে...?
বুয়া দ্রুত ঘমটা টেনে সেখান থেকে পালালো। বীণার বাবা বোবার মত দাঁড়িয়ে অদৃষ্টের পরিহাস করতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর বীণা এসে হাত জড়িয়ে ধরে বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। চোখে পানির ¯্রােত। বোঝা গেল তার বাবাও চোখ মোছার ছল খুঁজছে।
বাষ্পরদ্ধ কন্ঠে বীণা বললো Ñ
বাবা! নিশ্চয় বুঝতে পেরেছ, ঐ আমার নতুন মা।
হ্যাঁ এখন চিনতে পেরেছি। তবে গত দু’যুগ ধরে একটি বারের জন্যেও তাকে চিনতে পারি নাই। তুই যে সত্যিকারের মাকে চিনতে পেরেছিস, এটাই তোর জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। আসলে রক্তই রক্তকে চিনে নেয়।
বাবা! এতোদিন পর এলে! কী দু’টো আবেগ ঝরাবে। নয় হেয়ালি।
মা’রে! মোটেই হেয়ালি নয়। ছোট বেলায় কত করে বলতিস, বাবা! মাকে এনে দাও। আমি পারি নাই। এখন তুই তোর যোগ্যতায় তাকে খুঁজে পেয়েছিস। কিন্তু আমার বেলায় বিষয়টির ব্যাখ্যা ভিন্ন, যা নিজের নয় তাকে জোর করে নিজের বলে প্রতিষ্ঠিত করা চলে...? ভাল থাকিস।
আশরাফ হোসেন দ্রুত প্রস্থান করলেন।
বীণা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ছুটে বেড়িয়ে এলো কিন্তু তাকে আশ-পাশে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। খুঁজতে খুঁজতে বীণা গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে হেঁটে চলেছে আর ভাবছে Ñ
মায়ের পরিচয় পেয়েও কেন যে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিতে পারলাম না, বরং অনুকম্পার এক ঝাপটায় ভালবাসায় যতটুকু ফাঁক ছিল তাও পূরণ হয়ে গেল।
বাবা দাঁড়াও। আমাদের ফেলে...?
কিন্তু কারোর কোন সারা পাওয়া গেল না।
ঠিক তখন সন্ধ্যার আকাশে পান্ডুর চাঁদে নতুন করে আলোর চমক লাগতে শুরু করেছে। এবং সেই আলোতে দেখা গেল মেঠোপথের ধারে গোয়ালে একটি বাছুর বাঁটে মুখ লাগিয়ে নিবিষ্ট চিত্তে দুধ পান করছে আর গাভীটি জিব দিয়ে বাছুরকে চেটে চেটে দিচ্ছে। হঠাৎ গৃহস্থ এসে শপাং-শপাং করে বাছুরটাকে মারতে মারতে অন্যত্র নিয়ে গেল।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement