লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২০ জুন ১৯৭০
গল্প/কবিতা: ২০টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবাবা দিবস (জুন ২০১৩)

বাবা দিবসের উপহার
বাবা দিবস

সংখ্যা

জি সি ভট্টাচার্য

comment ০  favorite ০  import_contacts ৫০০
সেদিন সকালে আমার ল্যাপটপে জি-মেলের ইনবক্স খুলতেই দেখি –
123 greetings.com
Free Greetings for the Planet য়ের কয়েকটা greetings cards এসে হাজির।

পাঠিয়েছিল চঞ্চল নামের একটা ছোট্ট ছেলে। বাবা দিবস উপলক্ষ্যে।

এতোদিন পরে আজ সেই গল্পটা লিখতে বসে আমার মনে পড়লো যে এই ২০১৩ সনের ১৬ জুন পড়েছে এই বাবা দিবস। আমার কম্প্যুটারে ইন্টারনেট তাই তো বলছে।

কার্ডে লেখা ছিলো---হ্যাপি ফাদার্স ডে।

লাল গোলাপের সুন্দর একটা স্তবকের ফটোর সাথে সুমধুর সঙ্গীত শোনা যাচ্ছিলো ও লেখা ফুটছিলো—

you make me feel safe and loved
And today I’d like to say how much
I love you for it
HAPPY FATHER’S DAY

আর একটা অন্য কার্ডে ও সুন্দর বাজনা বাজছিলো আর একে একে কবিতার লাইন ফুটে উঠছিলো—

Wish you great joy,
And wish you everlasting love,
Wish you eternal peace,
And may the heavens shine from above,
Wish you warmth and kindness
And wish you unimaginable goodness,
Wish you all these things,
For today and forever

HAPPY FATHER’S DAY

খরম কাল। জুন মাস। দুষ্টু ছেলেটা তখন মৈসূরে গিয়েছিলো বেড়াতে গরমের ছুটিতে। গিয়েছিলো অবশ্য বাবা মায়ের সাথেই। সেইখান থেকেই এই দুষ্টুমিটা সে করেছে নির্ঘাৎ।

পরম সুন্দর পরীর দেশের রাজকুমার দুধবরণ ছেলেটার বয়স তখন বছর সাত কি আট হবে হয়তো।

কি পাগল ছেলে বলতো। আরে. বাবা দিবস তো হয়, কিন্তু দুনিয়ার কোথাও কি চাচা বা কাকু দিবস মানে uncle’s day হয় না কী?

সে তো হ’তেই পারে না। কেননা এ’সব হচ্ছে বিদেশী আদিখ্যেতা। আর বিদেশে তো সবাই আংকল, নিজের চাচা বা কাকু বলে কিছু সেখানে আলাদা করে থাকলে তো। ছেলেমানুষ আর বলে কাকে? সব ইংরিজী স্কুলে পড়বার ফল আর কি?

আর বাবা তো সাথেই আছে। Greet করলেই পারে, উপহার টুপহার ও দিতে পারে। বুঝলুম যে ছেলেটাকে তো মানুষ করেছি আমি, তাই ছেলেটা ভাইপো হয়ে ও আমাকে বাবা বানিয়েছে আর কী।

তা চঞ্চল সেইদিনই ফিরে এলো। বৌদি ও অবশ্য এসেছিলো ছেলের সাথে। জিজ্ঞাসা করলুম—‘বৌদি, তোমরা ফিরলে কোন ফ্লাইটে? স্পাইসজেটের?’

‘নাঃ, রাত হয়ে যেতো তো ওই সন্ধ্যের ফ্লাইটে এলে । তাই এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে এসেছি আমরা’।

‘আর দাদা…?’

আমার সুন্দরী বৌদি মুখ ভার করে বললো-‘দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধী ইন্টার ন্যাশন্যাল এয়ারপোর্টের টার্মিনাল -৩ এ আমাদের পৌঁছে দিয়ে নিজের কাজে দৌড়েছে। তাই ছেলে তোমার জন্যে উপহার নিয়ে এসেছে’।
চঞ্চল আমার হাতে একটা দামী হ্যান্ডব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে তখন প্রণাম করতে ব্যস্ত।
আশীর্বাদ টাদ সেরে সেটা খুলে দেখি দু দু’টো প্যাকেট।

একটা থেকে বের হ’লো একটা রঙচঙে ধাতুর বাক্স ।
টেপ দিয়ে বন্ধ করা।

তার গায়ে লেখা---
Sapphire
Assortment
Almonds, Hazelnuts& Raisins
Covered with milk Choco

বাক্সের পেছনে লেখা—

Network Foods Industries SDN.BHD.
Lot 3, Persiran Raja Muda, Seksyen 16,
4000 Shah Alam, Selangor, Malaysia,
web: www.networkfoods.com
Chocolet coated nuts are product of MALAYSIA
NET WEIGHT:200g,
M.R.P.Rs.300/-(Inclusive of all taxes)

Imported & Repacked by:
DUGAR OVERSEAS PVT LTD
Plot No. G 120-122, EPIP, Neemrana,
Dist. Alwar 301706, Rajasthan, India

আর অন্য প্যাকেটটা থেকে বের হ’লো একটা ইয়ার ফোন সমেত মিউজিক সিস্টেম আর ব্যাটারী চালিত ছোট্ট কানেক্টেবল মাইক্রোফোন, আর এক্সট্রা তার।

তাইতে ও দেখি লেখা—
organizer
K.C. Automation
Remote Hearing and Music System,
Made in China
M.R.P. Rs. 900/-ইত্যাদি …। কতকগুলো চীনে অক্ষরেও কি সব লেখা ছিল চিত্রমালার মতন দেখতে।

আমি চকোলেটের বাক্স খুলে দু’টো প্যাকেট পেয়ে তার থেকে গোল গোল চকোলেট বার করে আগে চঞ্চল আর বৌদিকে দিলুম।

নিজে ও কয়েকটা খেলুম।

চকলেটের ভেতরে আছে বাদাম ও অন্য সব শুকনো ফল।

বেশ ঠান্ডামতন লাগে মুখে দিলেই।

জিজ্ঞাসা করলুম--‘বেশ ভালো খেতে। তা কোথায় কিনলে এ’সব, বৌদি? মৈসূরে?’

‘আমি কিনেছি না কী? ও সব তোমার চঞ্চলের আব্দার। চকোলেটটা পেয়েছে ও ব্যাঙ্গালোর এয়ারপোর্টে। মৈসূর থেকে তো আমরা শতাব্দিতে এসেছি। ফ্লাইট ও সোজা নেই বলে। আর এম০এস০টা দিল্লিতে কিনেছে ছেলে। আমি এখন যাই, ঠাকুরপো। তুমি ছেলে সামলাও’। ।

‘আমাকে একটু মার্কেটে ও যেতে হবে আজ। বেশ দূরে সেই Vishal Mega Mart মানে paisa limited shopping unlimited য়ের দোকানে। সোনারপুরায়। তা আমি গাড়ীটা নিয়েই যাই না হয়’।

বৌদি চলে গেল আর আমি চঞ্চলের সাথে ক্যারম খেলতে বসলুম।

সন্ধ্যাবেলায় বাদল আসতে চঞ্চল ছাদে গিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলবে বলে সরন্জাম আনতে গেল। আমি তখন বাদলকে একটা বড় দেখে গোল চকোলেট দিলুম।

মুখে দিয়েই ছেলের সুন্দর ভ্রু কুঞ্চিত হ’লো।

বললো-‘কাকু, এই চকলেট তুমি পেলে কোথায় বলোতো? এ তো এই দেশে তৈরী নয়’।
বাবারে বাবা। কি ছেলে!

বাদলের মুখে একটা চকোলেট দিয়েছি না কম্প্যুটারে ডাটা ফিড করেছি অ্যানালিসিসের জন্য তাই তো বুঝছি না।

বললুম-‘তুমি কি করে জানলে, বলোতো বাদল?’

‘জানি তো কাকু। এই দেশের সব চকলেট হয় বেশ নুনপোড়া মানে আমার কাছে আর কি। সে ক্যাডবেরিস হোক বা চকোবার বা অন্য কোম্পানিরই হোক। অন্য সবাই তো খেয়ে বেশ ভালোই বলে। এই চকোলেটে নুন নেই আর স্বাদ ও আলাদা’।‘

তখন ছেলেটাকে সব বললুম। শুনে বাদল হেসে বললো-‘ভালোই তো কাকু। তোমার দিব্যি চঞ্চলের মতন একটা অতো দারুণ সুন্দর ছেলে হয়ে গেলো। হ্যাপি ফাদার্স ডে, কাকু…হিঃ হিঃ হিঃ…

আমি রাগ করে বাদলের ঠাট্টার উত্তর দিলুম না।

এই ঘটনার পরে বেশ কিছুদিন কেটে গেছে।

সেদিন সকালে ফোন বাজতে আমাকেই উঠে গিয়ে ধরতে হ’লো। চঞ্চল তার মায়ের কাছে গিয়েছিল বলে।

বৌদি বললো-‘ঠাকুরপো। একবার বাড়ী আসতে পারবে এখন?’

উদ্বিগ্ন স্বর শুনে জিজ্ঞাসা করলুম--‘কি হয়েছে, বৌদি?’

‘সে সব কথা ফোনে বলাই যাবে না। তুমি এসো। আমি রাখছি’।

শুনে চিন্তা বাড়লো। দাদা কয়েকদিন আগে ছত্রিসগড়ে গিয়েছে। ছত্রিশগড় তো নয় সবাই বলে টেররিষ্টগড়। নক্সালরা ওখানে বড় বড় সব নেতাদের ও গুলী আর বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়। পুলিশ তো রোজ মারে ডজন খানেক করে, তবে না কি তারা সকালে জল খায়।

তখন শীতকাল এসে গিয়েছে। আমি আবার শীতে বড়ই কাতর হই।
তাই গরম ড্রেস পরে নিয়ে দামী জ্যাকেট ও একটা গায়ে চড়ালুম। পকেট গুলো বন্ধ ছিলো জীপার লাগানো। এক পকেটে দেখি সেই এম০এস০টা রয়েছে। ভাবলুম—‘থাক। গান শুনবো না হয়’।

বাড়ী গিয়ে দেখি দাদা ফিরে এসেছে। যাক, নিশ্চিন্তি হলুম। তবে দাদার মুখ দেখি বেশ ভার। নির্ঘাৎ পুলিশরা নক্সালদের হাতে ভালোমতন ঠ্যাঙানী খেয়েছে সেখানে। কিন্তু বৌদির মুখ এমন অন্ধকার কেন? গন্ডগোল হয়েছে কিছু নির্ঘাৎ।

চা জলখাবারের পরে বৌদি ছেলেকে নিয়ে অন্য ঘরে চলে যেতেই দাদা উঠে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বসে বললো---‘শোন সিদ্ধার্থ, একটা বেশ ঝামেলা হয়েছে। তোর পরামর্শ চাই। আমার মাথায় কিছুই আসছে না। অনেক লোককে জিজ্ঞাসা করেছি। এমন কি জানা শোনা জ্যোতিষ পন্ডিত ও তান্ত্রিকদের ও বাদ দিইনি। সবাই লম্বা ফর্দ দিয়েছে পূজোপাঠ আর শান্তি স্বস্ত্যয়ন করাবার জন্য কিন্তু পরিণাম কি হতে পারে কেউ জানেনা। পুরো ব্যাপারটা তুই শোন আগে’।

আমি চুপ।

‘ছত্রিশগড়ের এক ঘোর জঙ্গলে যেতে হয়েছিল এবার আমাকে ফোর্স নিয়ে। এই পুলিশের অখাদ্য চাকরী করে খেতে হ’লে, সে না গিয়ে আর পথ কি? এই চাকরিতে অর্ডার ইজ অর্ডার। তা অর্ডার মানে হুকুম তামিল করেছি। চাকরী ও বজায় আছে। সে জন্য চিন্তা নেই এখন’।

‘তবে সেখানের সব কাজ তো লোকাল ইনফর্মারদের ভরসায়। তারা আবার দিনের বেলায় সঙ্গে যাবে না আমাদের পথ দেখাতে। উগ্রবাদিরা যদি চিনতে পারে তো গুষ্টিশুদ্ধ সবাইকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেবেই, সেই ভয়ে। তাই রাতের বেলা চুপিচুপি গিয়ে আমরা দশবারোজন নক্সালপন্থিদের ঘেরাও করে ফেলতেই সে’খানে খন্ডযু্ধ বেধে গেলো। গুলি গোলা গ্রেনেড সব চলতে রইলো। তিন ঘন্টা ফায়ারিং চলবার পরে চারজন উগ্রবাদী মারা পড়লো ও তিনজন পুলিশ শহীদ হ’লো। কিন্তু ভয়ংকর সংঘাত বন্ধ হ’লো না। স্বচালিত আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তারা হারতে চাইবে কেন?’।

‘কিন্তু হঠাৎ আমাদের ওয়্যারলেস ট্রান্সমিশন সিস্টেম জ্যামিং যন্ত্রটা বিকল হয়ে গেলো। হয়তো স্যাবোটাজ করেছিল কেউ কিন্তু ফল সাংঘাতিক দাঁড়ালো। অন্য উগ্রবাদী দলের কাছে সাহায্যের জন্য খবর চলে যেতেই তারা এসে পেছন থেকে আমাদর ঘিরে ফেলে আক্রমন করলো। পুলিশ ও মিলিটারীর দল ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। দশ পনেরোজন শহীদ হয়ে ও শেষ রক্ষা হ’লো না। পিছু হঠতেই হ’লো আমাদের আর তারা বেপরোয়া ভাবে বোমা গুলী চালাতে চালাতে ধাওয়া করলো’।

‘সর্বনাশ। তখন, দাদা?’

‘রাতের অন্ধকারে তখন কোথায়ই বা গেলো সেই পথপ্রদর্শক আর কোথায় যে গেল আমাদের হ্যান্ড গ্রেনেডিয়াররা তা কে জানে। আমরা তখন শুধু গুলির জবাবে গুলী চালিয়ে পিছন দিকে ছুটছি। ঘোর অন্ধকারে কিছুই তো দেখা যায় না’।

‘কতোবার যে আছাড় খেলাম সবাই, কে বলবে’।

‘মনে আছে আমরা চারজন একসাথে ছিলাম’।

‘হঠাৎ কাছেই গুড়ুম করে শব্দ হতেই আঃ করে উঠে রামচরণ রাইফেলম্যান মাটি নিলো। আমরা আবার ছুটতে শুরু করলুম। শত্রু খুব কাছে এসে পড়েছে, বোঝা গেল। হঠাৎ আবার গুলির শব্দ হ’লো আর অন্যজন ও গেলো। রইলো ইন্সপেক্টর যাদব আমার সাথে। তা তিনি ও লুটিয়ে পড়লেন দশ মিনিট পরেই। আমি একলা আর তখন গুলী না চালিয়ে ঊর্দ্ধশ্বাসে দৌড় দিলুম। গুলির আওয়াজ কোথা থেকে হচ্ছে সেই আন্দাজে ওরা পালটা গুলী ছুঁড়ছে। শত্রু বেশী কাছে এসে পড়লে এই মুশ্কিল হয়’।

‘হঠাৎ জঙ্গল শেষ হয়ে গেলো আর আমি একটা ঝোপঝাপ আর গাছে ভরা খোলা প্রান্তরে এসে পড়তেই বুঝলুম যে এইবারে আমার পালা আসছে। চঞ্চলের মুখটা এক মুহুর্তের জন্য শুধু মনে ভেসে উঠলো। তখনই গুড়ুম করে শব্দ হতেই আমি মাটিতে ঝাঁপ দিলুম আর মাথার ওপর দিয়ে সাঁ করে মৃত্যুদূত বেরিয়ে গেলো। আমি ও একপাক গড়িয়ে গিয়ে উঠেই ছুট দিলুম আবার। অনেকক্ষণ মরণের সাথে আমার যুদ্ধ চললো। শেষে সামনে এক রেল লাইন দেখে ভাবলুম কাছেই হয়তো কোন রেল স্টেশন আছে’।

‘আমি রেললাইন পার হয়ে ছুটতে যাচ্ছি। হঠাৎ একটা গাছের আড়ালে দেখি এক ছায়ামূর্তি হাত নেড়ে ডাকছে আমাকে’।

বন্দুক তুলে বললুম--‘তুমি কে? কি চাও?’

অষ্পষ্টভাবে কেউ বললো--‘প্রাণ বাঁচাতে চাও নিজের? দৌড়ে পালিয়ে তুমি বাঁচতে পারবে না আজ’।

‘তা জানি…’

‘কিন্তু মূল্য দিতে হবে। যা চাইব তাই দিতে হবে। কথা দিতে হবে তোমাকে। মাত্র দু’সেকেন্ড সময় আছে। তুমি রাজী????’

দড়াম ধাঁই করে গ্রেনেড ফাটলো একটা পিছনদিকে। আমি ভয়ে ভয়ে বললুম-‘রাজী, কিন্তু আমার কাছে তো এখন বেশী টাকা নেই। হাজার তিনেক আছে হয়তো। তা’তে হবে?’

‘টাকা পয়সা আমার চাই না। ওসব পরে হবে। তুমি কথা দাও আগে।‘

‘দিলাম’

‘বেশ। তবে তুমি এইখানেই দাঁড়াও। ছুটবে না একদম, ছুটলেই মরবে। একটা ট্রেন আসছে এই লাইনে। মেল ট্রেন। থামবার প্রশ্নই নেই। শুধু এ’খানেই কেন আগে পঞ্চাশ মাইলের ভেতরে ও থামবে না। কিন্তু ট্রেন হঠাৎ ব্রেক কষবে এ’খানে এসে। তুমি যেভাবে পারো উঠে পড়বে’।

‘পরক্ষনেই লোকটা মিলিয়ে গেলো’।

‘তখনই দূরে বেজে উঠলো ট্রেনের হুইশিল। ঝমঝম ঝমাঝম শব্দে মেল ট্রেন আসছে আর সেই সাথে দূরে জঙ্গল থেকে ও হৈ হৈ করে বেরিয়ে ছুটে আসতে শুরু করলো উগ্রবাদিদের দল।

তবে ট্রেন এসে যেতেই তারা থামতে বাধ্য হ’লো। হঠাৎ আবার বেজে উঠলো হুইশিল আর সশব্দে ব্রেক কষবার ধ্বনি জাগলো ট্রেনের। দেখি যে সামনে লাইন বন্ধ করে পার হচ্ছে একদল নীলগাইয়ের মতন কি জন্তু জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে। ট্রেনের আলো দেখে ভয় পেয়ে তারা দৌড়ে লাইন পার হতে শুরু করলো আর তারা সবাই লাইন পার হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন স্পীড নিলো আবার। ততক্ষনে আমি কিন্তু ট্রেনে উঠে পড়েছি’।

‘কাল বাড়ী এসেছি আমি । তবে এই যাত্রায় আমার প্রাণ বাঁচলে ও ভয় কাটে নি। তাই গুণীন, জ্যোতিষ পন্ডিত অনেকের কাছেই দৌড়েছে তোর বৌদি আমাকে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে। সবাই বলছে কাজটা আমি না কি মোটেই ভালো করিনি। একটা ঘোর অনিষ্টের আশংকা তো অবশ্য আছেই। আমি কোন কিছু অশুভ জিনিষের পাল্লায় পড়ে গিয়েছিলাম। চেনা নেই জানা নেই অস্থানে কুস্থানে ওইভাবে কথা দেওয়াটা আমার না কি কখনোই উচিৎ হয় নি। তিন দিন পরে অমাবস্যা আসছে। সেই রাতটা ভালোয় ভালোয় পার হয়ে গেলে, তবে কিছু বলা যাবে। তাঁরা অবশ্য তাবিজ কবজ সব দিয়ে দেবেন পূজোপাঠ হোম যজ্ঞ সেরে। অনিষ্ট হবার আশংকা তাইতে কমতে ও পারে’।

‘তা তুই তো বিজ্ঞানের ছাত্র। ওসব পন্ডিত জ্যোতিষ ছেড়ে দিয়ে এখন তুই ভেবে বল দেখি কি হতে পারে এর পরিণাম আর তার প্রতিকারই বা কি করা যায়?’

অর্থাৎ তাঁরা নিঃসন্দেহ যে হ’তে পারছেন না, তা বোঝাই যাচ্ছে । শুনে আমি চুপ। কি বলবো?

শেষে আমি বললুম-‘তোমরা এইখান থেকে দূরে কোথাও চলে গেলেই তো পারো…’

‘নাঃ, সে’চেষ্টা করে কি হবে? ঘরের সুরক্ষাও থাকবে না বাইরে। আর ছত্রিশগড় থেকে যে এ’খানে আসতে পারবে সে অন্য কোথাও তো যেতেই পারবে অনায়াসে। সিদ্ধার্থ, মনে হয় সে আমাদের আগে থেকেই বেশ চেনে। তোর কি মনে হয় এ’টা কোন লোকের দুষ্টুমি না ষড়যন্ত্র?’

‘নাঃ, তা হ’লে সে হঠাৎ ট্রেন স্লো করবে কি করে? সে ওই ঘটনাটা যে ঠিক তখনই ঘটবে তা আগে থেকেই জানতো বলে মনে হয়। সেই জানাটাকে সে নিজের কোন দুরভিসন্ধি পূর্ণ করতে কাজে লাগিয়েছে, বোধ হয়। কিন্তু ভবিষ্যৎ জ্ঞানের জন্য কোন কিছু অতিপ্রাকৃতিক শক্তি তো আছেই তার, দাদা’।

‘সে তুই ঠিক বলেছিস। আমি অবশ্য পুলিশ দিয়ে বাড়ী ঘিরে রাখবো পনেরো দিন আর নিজে পিস্তল হাতে পাহারা দেবো। দেখামাত্র গুলী করবার অর্ডার ও নিয়ে রাখব। সুতরাং সুবিধে করতে কেউ পারবে না সহজে, তা ঠিক’।

কিন্তু আমরা ভাবি এক তো হয় আর কিছু। দুপুরের আগেই দাদার সব প্রোগ্রাম ভেস্তে গেলো।

একখানা টেলিগ্রাম এসে হাজির হ’লো। দাদার ছুটি ক্যানসেল। সঙ্গে সঙ্গে দিল্লী গিয়ে কাজে জয়েন করতে বলা হয়েছে। একেবারে আন্তরিক সুরক্ষা মন্ত্রালয়ের হুকুম, সুতরাং….’

ভীষণ রাগ করে দাদা বললো—‘আমি এখুনি চাকরী থেকে রিজাইন করছি। কাজে আর আমি যাবোই না’।

বলে দাদা দরখাস্ত লিখতে বসলো।

বৌদি এসে তখন দাদাকে বুঝিয়ে বারণ করতে সচেষ্ট হ’লো।

বললো—‘শোন, এই টেলিগ্রামখানার হঠাৎ আসাটাও কিন্তু ঠিক স্বাভাবিক ঘটনা বলে মনে হয় না। কোন কিছু আছে এর পেছনে। তাই তুমি রিজাইন করে কি করবে? আটকাতে পারবে তাকে? সে কি মানুষ বলে তোমার মনে হয়? তখন হয়তো অন্য কোন দুর্ঘটনায় পড়ে যাবে তুমি। আর মাঝখান থেকে তুমি বেকার ও হয়ে যাবে। আর শুধু তাই নয়, পুলিশের চাকরিতে শত্রু তো অনেক তৈরী হয়েই থাকে। তুমি আর ক্ষমতায় না থাকলেই তখন তারা সুযোগ পাবে। সুতরাং আমার কথা শোন। তুমি দিল্লী যাবার ব্যবস্থা করো, আমি ……..’।


‘তা’হলে এ’খানে কে দেখবে? কি হবে?’

‘কেন? আমি, সিদ্ধার্থ, চঞ্চল সবাই তো আছি। তোমার পুলিশ পাহারাও থাকবে। পূজোপাঠ, শান্তি স্বস্ত্যয়ন, তাবিজ কবজ সব করা হবে। অতো চিন্তা করছো কেন?’

দাদা আর কি বলবে? সে’দিন বিকেলেই রওনা হবে বলে লেগে গেলো সেইমতন ব্যবস্থা করতে। এয়ার টিকিট ও তো চাই দিল্লীর…’

দাদা বেরিয়ে যেতেই বৌদি এসে আমাকে গম্ভীর মুখে বললো-‘শোন ঠাকুরপো। তোমার ও বাড়ী পালানো ক্যানসেল। আজ থেকে সবসময় এই বাড়িতেই থাকবে তুমি। অন্ততঃ অমাবস্যা অবধি। তোমার দাদা বাড়িতে না থাকলেও তুমি থাকবে। এখন কে কি বলবে বা ভাববে, সে সব শোনবার বা দেখবার সময় নয়। এখন হ’লো এমার্জেন্সী। আর চঞ্চল থাকবে তোমার জিম্মাতে। যেই আসুক, আমি একলা হাতে লড়ে যাবো। দেখি কে কি করতে পারে এসে?’

পুলিশ পাহারার কড়া ব্যবস্থা তো দাদা করেই গিয়েছিলো।

আমি ও এক সময় সব্বাইকে লুকিয়ে ভোরে উঠে গিয়ে চুপচাপ বাড়ির মেন গেটে সেই ব্যাটারী চালিত মিনি মাইক্রোফোনটায় নতুন ব্যাটারী সেট করে লাগিয়ে রেখে সরু কালো তার নিজের ঘর অবধি টেনে নিয়ে এসে, হেডফোনের সাথে জুড়ে দিলুম তারপরে।

যথাসময়ে পূজোপাঠ ও সব হয়ে গেল।

আমাদের বাইরে বেরোনো বা কারো সাথে দেখা করা ও বন্ধ। শুয়ে, বসে চঞ্চলের সাথে খেলাধূলো করে আরামসে দিন কাটছিল আমার।

দেখতে দেখতে অমাবস্যা এসে গেলো।

সেদিন মন্ত্র পড়ে বাড়ী বন্ধন করে দিলেন পন্ডিতেরা এসে। দিনভোর ঠিক ছিলো সব কিছু। কিন্তু সন্ধ্যে হতেই আকাশে বেশ মেঘ জমতে শুরু করলো। শীতকালে বেনারসে এমন তো হয়েই থাকে। ওয়েস্টার্ণ ডিস্টার্বেন্স। তবে বাড়াবাড়ী শুরু হয়ে গেল রাত নটার পর হ’তে। দারুণ ঝড় জল শুরু হতেই সব লাইট ও নিভে গেলো, কারেন্ট অফ হয়ে। মেঘের ডাক ও বেড়ে উঠলো খুব।

বৌদি চঞ্চলকে খাইয়ে দাইয়ে দিয়ে আমার ঘরে এনে ছেলেটাকে পৌঁছে দিয়ে গেলো। সাথে আমার খাবার ও এনে দিলো। আমি দারুণ ঠান্ডায় কাতর তখন। রুম হীটার বন্ধ বলে। আমি তাড়াতাড়ি করে উঠে ঘরের সব জানলা দরজা বন্ধ করে দিয়ে এমার্জেন্সী লাইট জ্বেলে খেয়ে নিয়ে এ্যাটাচড বাথরুমে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে এসে চঞ্চলের সাথে শুয়ে পড়বার আয়োজন করলুম, আলো জ্বলে রেখে দিয়েই।

অনেকক্ষণ কেটে গেলো। গরম লেপের মধ্যে শুয়ে চঞ্চল একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়লো। আমি কিন্তু জেগেই ছিলাম। বাইরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বেড়েই যাচ্ছিলো একটু ও না কমে। ঝমঝমিয়ে যেমন বৃষ্টি তেমনি হাওয়ার সোঁ সোঁ শব্দ আর মেঘের হুড়ুম দুড়ুম গর্জন। ঘোর প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর তান্ডব যাকে বলে আর কি

হঠাৎ কেউ যেন জিজ্ঞাসা করলো--‘কে?’

স্বরটা মনে হয় কোন মহিলার। তবে যন্ত্রে ঠিক ধরা পড়ে না। নির্ঘাৎ বৌদির স্বর হবে। অন্য যারা আছে, সব তো ঘুমিয়ে কাদা। পুলিশরা ও এই শীতে ঝড়জলের রাতে দিব্যি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পাহারা দিচ্ছে তা ঠিক। দারুণ ঠান্ডা বাইরে। কুকুর বেড়াল ও একটা নেই ঘোর অন্ধকার পথে কিন্তু বৌদির চোখে ঘুম আসা হচ্ছে অসম্ভব।

নাঃ। আর কোন শব্দ নেই। আমারই মনের ভূল তবে। বৌদি যে তখন কোথায় বা কি করছে তা কে জানে।

আমার আবার একটু ঘুমের চটকা মতন যেন এসে গিয়েছিল। খানিক পরেই চটকা ভাঙতে ঘড়িতে দেখি রাত দু’টো বাজে।

দুধের বরণ ছেলে চঞ্চল আমার গলা জড়িয়ে ধরে শুয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। বেশী নড়া চড়াও করা যাবে না। ছেলেটার ঘুম ভেঙে যাবে। বাঁ হাতে আস্তে করে হেডফোনের মতন যন্ত্রটার ভল্যুম বাড়িয়ে নিলাম। সুইচ অন করাই ছিলো। রেকর্ডিং সিস্টেম ও চালু হয়ে গেল অন্য একটা সুইচ অন করতেই।

সব চুপচাপ।

খানিকক্ষন পরে মনে হ’লো কোথাও কোন মোটর বা মেশিন চলবার ঘস ঘস করে শব্দ হয়ে চলছে একটানা। ক্ষীণশব্দ ক্রমেই জোর হয়ে উঠছে। ঠিক যেন গেটের কাছে এগিয়ে আসছে। এ কী কারো পায়ের শব্দ না কোন মোটর বাইক? কি আসছে এই ঘোর দুর্যোগে? মনে তো হয় না কারো পায়ের শব্দ, তবে অ্যাম্প্লিফায়েড হয়ে শোনা যাচ্ছে।

তারপরে আমাদের গেটে কেউ যেন খুব জোরে এক ধাক্কা দিলো। নেহাৎ বিশাল বড় আর মজবুত নতুন লোহার গেট বলে ভেঙে পড়লো না। এ আবার কী? কলিং বেল আছে, কড়াও রয়েছে। তবু ধাক্কা দেয় কে? তবে হয়তো হাওয়া?

তখন আবার প্রশ্ন হ’লো--‘কে?’

হেডফোনের মাধ্যমেই উত্তর ও শোনা গেল--‘আমি’।

কেমন যেন অদ্ভূত ঘষা মতন স্বরে উত্তর হ’লো।

‘আমি কে?’

‘একসময় সবাই আমাকে বলতো ময়ূর ওঝা। ওঝা বলে অনেকেই চিনতো ও জানতো। তা নামেতে কি আসে যায়? দরজা খোলা হোক।’

‘তোমার কি চাই?’

‘এটা তো সিদ্ধার্থবাবুর বাড়ী?’

‘না, তার দাদা রঞ্জনবাবুর’।

‘ও একই কথা। আমার একটা পাওনা বুঝে নেবার কথা ছিলো আজ। সিদ্ধার্থ বাবুর দাদা বাড়িতে আছে?’

‘না, দিল্লী গেছে জরুরী কাজে’।

‘তা যাক। সে আমাকে কথা দিয়েছে আমি এসে যা চাইবো তাই সে দেবে। আমি আজ নিজের পাওনা বুঝে নেব বলেই এসেছি’।

‘তার প্রাণ বাঁচাবার মূল্য চাই তোমার?’

‘মনে কর তাই…’

‘তা হ’লে তুমিই বলো তোমার কতো টাকা চাই? এতো রাতে দরজা খুলতে আমি পারবো না। দরজার নীচে দিয়ে দেব’।

এ…এ…এ…হেঃ .. হেঃ .. হেঃ….…….. করে কে যেন হেসে উঠলো বিশ্রী ভাবে। ঝড় জলের আওয়াজ ছাপিয়ে ভেসে এলো সেই তীক্ষ্ন রক্তহিম করা বিশ্রী অমানুষিক হাসি। আমার মতন ডানপিটে ছেলেকে ও চমকে উঠতে হ’লো।

‘টাকা পয়সা নিয়ে এখন আর আমি কি করবো? ওই সব আমার চাই না’।

‘তবে কি চাও? সোনা? হীরে? তবে তাই দেব…’

‘তাও আমার চাই না…’

‘তবে?’

‘শোন…যা বলছি ….আমি বড় একা হয়ে আছি। সঙ্গী কেউ নেই আমার, সুতরা ভাবছি যে রঞ্জনবাবুর সুন্দর মতন ছেলেটাকে নিয়ে যাব আমি আজ। অনেকদিন ধরেই তো নজরে রেখেছি। অমন দারুণ সুন্দর ছেলে গোটা দেশ ঘুরে ও কোথাও দ্বিতীয়টি দেখলুম না। তাই খুব পছন্দ ও হয়েছিলো আমার । কিন্তু ওর কাকু আর সেই বিটকেল বন্ধুটা সবসময় চোখে চোখে এমন করে ছেলেটাকে আগলে রাখে না, যে কোন সুযোগই তো পাই না আমি। তা এতোদিনে পেয়েছি হাতে। আজ এসেছে সেই সুবর্ণ সুযোগ। আজ আমি খালি হাতে ফিরতে রাজী নই। আমাকে আটকাবার শক্তি তোমাদের মানুষের নেই জানবে। এখন তুমি শুধু হ্যাঁ বলে দাও। তা হ’লেই আমার কাজ হয়ে যাবে।’।

তার কথা শুনেই আমার বুক কেঁপে উঠলো তখন, জীবনে প্রথমবার।

‘কেন? আমাকে হ্যাঁই বা বলতে হবে কেন?’

‘ছেলে তো অবশ্যই তার বাবার। আর সে আমি এসে চাইলে দেবে বলে অঙ্গীকার ও করেছে । কিন্তু তবু ও তো তুমি তার মা। তোমার সন্মতি চাই আমার’।

‘না’।

‘তার মানে? তুমি রাজী নও?’

‘একদম না’।

‘সে কী কথা? কেন? কথা দিয়ে না রাখলে আমি নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নিতে জানি। আমি তোমাদের সবাইকে গলা টিপে মেরে রেখে তবে যাবো এ’খান থেকে আজ….’ ভীষণ ক্রুদ্ধকন্ঠে কে যেন বলে উঠলো।

‘সেই কথাই। কেন না ওই ছেলেটি হচ্ছে সম্পূর্ণ আমার। আমি দেবো না। ব্যস। যার প্রাণ তুমি বাঁচিয়েছো, তার যখন হবে নিজের ছেলে, তখন এসে তুমি তাকে স্বচ্ছন্দে নিয়ে যেও। আমি হ্যাঁ বলেই রাখছি…’

‘সে কি কথা? সে আবার হয় না কী? তোমার সন্তান তো তোমার স্বামীর ও। আমার সঙ্গে মস্করা করা হচ্ছে? চালাকী? ….’

‘চালাকী কেন হবে? এ তো খুব হয় আজকের বিজ্ঞানের যুগে। হয়ে রয়েছে। তোমার তো আর এখন সে’কথা না জানার কথা ও নয়। একটু চেষ্টা করলেই জানতে পারতে তুমি অনায়াসে। কিন্তু মনে হয় তুমি তা ও করো নি, কেননা রঞ্জনবাবুকে অসহায় অবস্থায় বাগে পেয়ে খুশীর চোটে এতোই অহংকার হয়েছিলো তোমার। আর তুমি ভালো করেই জানো যে তোমাকে আটকাবার শক্তি ও নেই আমাদের কারো। আর তুমি তা বলে ও ফেলেছ। কি? ঠিক বলছি তো আমি’?

‘….…’

কোন উত্তর নেই। শুধু একটা ভয়ংকর তীক্ষ্ন ক্রুদ্ধ গোঁ গোঁ গর্জন শোনা গেল। ঝড়ের শব্দ কি? না সেটা কারো গর্জন? কে জানে?’.’

‘কি? বোঝা যাচ্ছে না এখন ও সব কিছু? বেশ তো, আমিই বুঝিয়ে দিই না হয় তোমাকে, কেমন? চাইলে প্রমান ও পাবে।’

‘……..’

ঝোড়ো বাতাস বয়ে যাওয়ার মতন গোঁ গোঁ শব্দ বেশ জোরে হচ্ছে তখন। ।

‘শোন, আমি দেখতে খুবই সুন্দর মেয়ে ছিলুম বলে আমার ১৮ বছর বয়সেই ভালো ঘরে বিয়ে হয়ে যায় কিন্তু তা হ’লে কি হয়? বিয়ের পাঁচ বছর পরে ও আমার কোন সন্তান হয় নি। আসলে স্বাভাবিক ভাবে আমার মা হবার ক্ষমতাই ছিলো না। সে তো আর আমি তখন জানতাম না’।

‘লোকে এই দেশে এমন মেয়েদের বলে আঁটকুড়ি আর সকালবেলায় তার কেউ মুখ ও দেখে না, জানো তো। তা আমি ও তাই হয়ে ছিলাম’।

‘হঠাৎ আমার স্বামী একটা ইন্টারপোলের ডেলিগেশনে রাশিয়া মানে ইয়ু০এস০এস০আরে০ চলে গেলো। সুযোগ বুঝে সঙ্গে করে আমাকে ও নিয়ে গেলো ডেলিগেট বানিয়ে’।

‘আমার একমাত্র দেওরের বয়স তখন ছিল প্রায় তেরো বছর, এক দু’মাস বেশী কম ও হতে পারে। মুশ্কিল হ’লো যে একলা ছেলেটাকে এ’খানে দেখে কে? তাই সেও প্রথমবারে আমাদের সঙ্গে গেলো অ্যাটেন্ড্যান্ট বা সার্ভিস বয় হিসেবে’।

সেখানের লেনিন মেমোরিয়াল ইন্স্টিট্যুটে আমার পরীক্ষা করা হতে গাইনিরা এক লাইনের রিপোর্ট দিলেন- ‘নর্ম্যাল কনসেপন ইজ নট পসিবল’।

‘কি কান্ড বলো তো? প্রধান অধ্যক্ষ্য ডঃ নিকোলাই পেত্রোভস্কি সেই রিপোর্ট পড়ে আমাকে বললেন—‘ডোন্ট ওরি ম্যাডাম। ইট ইজ এ ভেরী সিম্পল কেস। নো কম্প্লিকেশন। ইট মে বি ডান…’

‘তারপরে অর্ডার দিলেন –মেক এ টেস্টট্যুব বেবী ফর হার। ইট মে বি এ গুড প্রেজেন্ট ফর আওয়ার ফেলো কান্ট্রি ইন্ডিয়া’

‘বলা বাহুল্য যে ভারতে তখন ও ওই সুবিধা ছিলো না’।

‘তা তখন চললো পুরো অটোমেটিক সিস্টেমে পরীক্ষা ও এক্সপেরিমেন্ট’।

‘এই সব পরীক্ষায় ওখানে ছেলেদের বলা হয়ে থাকে ডোনার। মেয়েরা হয় রিসিভার। তা ডোনার অবশ্যই করা হ’লো আমার স্বামীকে’।

‘কিন্তু প্রক্রিয়া শুরু করে দেবার প্রায় তিন ঘন্টা পরে সিস্টেম কন্ট্রোলিং সুপার কম্প্যুটার রিপোর্ট দিলো -‘প্যাট্রিডিস ফার্টিলাইজেশন ফেইল্ড। চেন্জ দি ডোনার অর ট্রাই এগেন’।

‘রিপোর্টটা শুধু আমাকেই পড়তে দেওয়া হ’লো। সেটা হাতে নিয়ে পড়ে আমার তো মাথায় হাত’।

তখন আবার ডেট পড়লো একমাস পরে। কি আর করা? আবার আমার পরের পিরিয়ডের জন্য অপেক্ষা।

একমাস পরে আবার সবাই দৌড়লুম সেইখানে।

তখন ও সেই একই রিপোর্ট দেখে অধ্যক্ষ্য আমাকে বললেন—‘ম্যাডাম, চেন্জ ইয়োর ডোনার। হ্যাভ এ গুড প্রেটি রাশিয়ান ডোনার….ইট উইল বি কনফিডেনসিয়াল’ ।
শুনেই আমি ঘোরতর আপত্তি করলুম।

বললুম-‘থাক, আমার সন্তান হয়ে তবে আর দরকার নেই। আমি আঁটকুড়ি হয়েই থাকবো না হয়’।

ফলে আবার পরের মাস অবধি অপেক্ষা এবং আবার সেই এক পরিণতি।

তখন অন্য উপায় নেই দেখে আমাকে অধ্যক্ষ্য একান্তে বললেন—‘ম্যাডাম, উইল য়ু পারমিট আস টু ট্রাই উইথ হিজ ইয়াঙ্গার ব্রাদার? ইট ইজ টোটালি এ মেশিনাইজ্ড এন্ড এক্সটার্ন্যাল প্রসেস’।

‘তখন আর আমি কি করি? দেওর বা দেবর তো দ্বিতীয় বর। তাই বাধ্য হয়ে সোজা হ্যাঁ বলে দিলুম। পরের মাসে রিপোর্ট এলো-‘ডোনার ইজ আন্ডার এজ। ট্রাই এগেন লেটার’।

‘আবার একমাস অপেক্ষা’।

‘এই করে করে যখন সবাই প্রায় হাল ছেড়ে দিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছি আমরা, তখন শেষ পরীক্ষায় হঠাৎ কম্প্যুটারের গ্রিন সিগন্যাল জ্বলে উঠলো আর চমকপ্রদ পরিণাম এলো স্ক্রিনে যার প্রিন্টআউট ও পরে এসেছিলো আমার হাতে’।

‘স্ক্রীনে লেখা ফুটলো—‘চিয়ারস। প্যাট্রিডিশ ফার্টিলাইজেশন সাক্সেসফুল। নাউ দি হোল ম্যাটার ইজ টু বি ট্রান্সফার্ড ইমিজিয়েটলি ইন এ টেষ্টট্যুব ফর এলিমেন্টারি সেল ডিভিশন’।

‘তারপরে যথাসময়ে সেই বস্তুটি আমার শরীরে নিয়মানুসারে ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে দেওয়া হয় পুরো নয় মাসের জন্যে এবং চঞ্চলের ডেলিভারী হয় যথাসময়ে আবার সেইখানে গিয়েই’।

‘আমার কাছে কিন্তু চঞ্চলের প্যাট্রিডিস ফার্টিলাইজেশন ও টেষ্ট ট্যুবে প্রাথমিক কোষ বিভাজনের ইলেক্ট্রান মাইক্রোস্কোপিক ফটোর এনলার্জড কম্প্যুটার ফটো ও জিন টেষ্টিং ও ডি০এনএ০ ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচিং রিপোর্ট ও আছে, প্রমাণ হিসেবে। কেননা ওই সব দেশে কাজে কোন ফাঁকি থাকে না’।

‘এখন বলো তোমাকে এনে সে’সব দেখাতে হবে কি? ইংরিজীতে লেখা তুমি পড়তে পারবে তো? চঞ্চল যে টেষ্টট্যুব বেবী তা ও তো জানতে না তুমি? তখনও এই দেশে কোন টেষ্টট্যুব বেবীই জন্মায়নি যে। এইবার বলো তুমি কি বলছো?’

‘……………’

ঝড়ের বা কোনো কিছুর গর্জনের কোন শব্দই আর শোনা গেল না তবে আমার কান মাথা সব ভোঁ ভোঁ করছে তখন।

তারপরে সব চুপচাপ। আর কেউ কোন উত্তর দিলো না।

আমি তখন ঘুমন্ত পরীর দেশের রাজকুমার ছেলে চঞ্চলের শ্বেত পদ্মফুলের মতন অপরূপ সুন্দর মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছি। নীল নাইট বাল্বের আলোয় ঘুমন্ত দুধের বরণ ছেলেটাকে যা দারুণ সুন্দর দেখাচ্ছে না, সে আর কি বলবো?

আমার ছোটবেলায় কয়েকবার সবাই মিলে রাশিয়ায় যাওয়ার কথা মনে থাকলে ও সে’খানে সেই বিরাট সেন্ট্রালী এয়ার কন্ডিশন্ড হাসপাতালের ডাক্তাররা ঝকঝকে সব অটোমেটিক মেশিন আর কম্প্যুটার দিয়ে কি যে করছিলো তা তো আমি জানতুম না। বৌদি ও কিছুই বলে নি কক্ষনো।

আমাকে তো দাদা বলে ছিলো যে বৌদির বাচ্ছা হয় নি বলে তাকে রাশিয়ার হাসপাতালের নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।

আর সে’খানেই চঞ্চলের জন্ম ও হয়।

আমার তো তখন খুব আনন্দ হয়েছিলো অতো সুন্দর ভাইপো হ’তে। তেরো বছর বয়সে তখন আমি কিছু বুঝতুমই না যে প্যাট্রিডিস কি, ফার্টিলাইজেশন কি আর টেষ্টট্যুব বেবীই বা কি জিনিষ। আর চঞ্চল যে একটা টেষ্টট্যুব বেবী তাই বা কে জানতো?

তাহ’লে তো দেখছি আমার পাওয়া সেই বাবা দিবসের উপহার সত্যিই সার্থক হয়েছে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement