লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৫ আগস্ট ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ১৫টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftইচ্ছা (জুলাই ২০১৩)

অনুভুতি
ইচ্ছা

সংখ্যা

ইন্দ্রাণী সেনগুপ্ত

comment ২২  favorite ০  import_contacts ১,৬৫৭
বিষন্ন বিকেল। শীতকালের বিকেলটা কেমন যেন একটা মন খারাপ নিয়ে আসে, হয়ত দিনের রেশটা তাড়াতাড়ি কেটে যায় বলেই। সবে সাড়ে পাঁচটা বাজে, এর মধ্যেই অন্ধকারে ঢেকে গেছে প্রকৃতি। জামা-কাপড়গুলো বারান্দা থেকে নিয়ে আসে সঞ্চিতা। বিছানার ওপর ফেলে রাখে অবিন্যস্ত, থাক! পরে ভাজ করে তুলে রাখবে বরং। রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের জল বসায়। রাজীব আজ অফিসের কাজে শহরের বাইরে, পরশু ফেরার কথা। মেয়েও নেই ক’দিন ধরে, শীতের ছুটিতে কাকার বাড়ি গেছে। অখন্ড অবসর সঞ্চিতার। এমন অবসর সঞ্চিতার জীবনের বড় একটা আসে না, বেশ কিছুদিন ধরেই ঠিক করে রেখেছিল সঞ্চিতা, এই ফাঁকে কাজটা শুরু করতেই হবে। একটা উপন্যাসের ছক বহুদিন ধরে মাথায় ঘুরছে, অথচ, সকাল থেকেই রাজ্যের আলসেমি এসে জড় হয়েছে শরীরে। মাঝে মাঝে মনে হয়, সঞ্চিতার, সেও হয়ত অভ্যস্ত হয়ে যাবে আর দশটা ‘গৃহবধূ’র জীবনে। না হলে, আগের সেই উদ্দীপনা আর অনুভুত হয় না কেন! লিখতে লিখতে লেখার মধ্যে ডুবে যাওয়া, একটা লেখা শেষ করার পরে যে মানসিক পরিতৃপ্তি, তার এতটুকুও তো অবশিষ্ট নেই এখন! ক’দিন আগে একটা ছোটগল্প লিখতে বসেছিল সঞ্চিতা। দু-তিন পাতা লেখার পর খেই হারিয়ে গেল, কিছুতেই পারল না শেষ করতে। অথচ, লেখাপড়ার পাট উঠিয়ে স্বামী আর মেয়েকে নিয়ে যে শুধুমাত্র সুখী গৃহবধূ হয়ে থাকবে, তাতেও অস্বাচ্ছন্দ্য। চায়ের কাপ হাতে এইসব কথাই ভাবছিল সঞ্চিতা, হঠাৎ টেলিফোনটা বেজে উঠল – হ্যালো...

- আচ্ছা, আমি কি সঞ্চিতার সাথে কথা বলছি!
- হ্যা, কে বলছেন?
- এই আমি ছোটমাসি রে!
- মানে!! তুমি! কোথা থেকে!
-কলকাতায় ফিরেছি কালকেই। আছিস কেমন?
- এই চলে যাচ্ছে। কিন্তু, তোমার কি খবর? কতদিন হয়ে গেল কোন যোগাযোগই তো নেই।
- আমি ভালই আছি। এই যোগাযোগ থাকবে না কেন রে? তোর মা’র থেকে তোদের সব খবর পাই।
- সে তো বছরে দু-তিনটে চিঠি, ব্যস! এতদিন ধরে কলকাতা ছেড়ে আছ কি করে কে জানে!
- এই তো ফিরে এলাম। এখন এখানেই পোস্টিং।
- দারুন ব্যাপার তো! তা আমার এখানে আসছো কবে বল।
- আজকেই। বাড়ি আছিস তো?
- একদম। address টা বলব?
- সে পেয়ে গেছি। রাতে থাকব। প্রচুর আড্ডা হবে। কেমন সংসার করছিস দেখতে হবে তো। এখন রাখি। তোর মায়ের সাথে গল্প করছি। একটু পরেই বেরোচ্ছি।
- হ্যা, রাখো। তাড়াতাড়ি চলে এসো।
- হ্যা রে।


ফোনটা কেটে গেল। রিসিভারটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বসে রইল সঞ্চিতা। একেই কি বলে টেলিপ্যাথি! সেই সময়কার প্রত্যেকটা দিনের স্মৃতিচারণায় অবচেতন মনে যেই মানুষটার নিত্য উপস্থিতি, আজ ছয় বছর পরে সেই মানুষটারই এভাবে আবির্ভাব, তাও আবার এই মানসিক দোলাচলের মুহুর্তে!! কলেজ ম্যাগাজিনে লেখা বেড়িয়েছে সঞ্চিতার, ম্যাগাজিনটা হাতে নিয়ে সোজা ছোটমাসির কাছে। নতুন কোন লেখা শেষ হলেই প্রথম পাঠিকা ছোটমাসি, লেখা ভাল লাগলে পাওনা গোলবাড়ির পরোটা আর কষা-মাংস। বাবুঘাটে বসে সূর্যাস্ত দেখা, প্রিন্সেপ ঘাট থেকে গোধূলিবেলায় নৌকাবিহার, কফি-হাউস, বইমেলা, নাটক, বেলুড়ে সন্ধ্যারতি অথবা, উদ্দেশ্যহীনভাবে কলকাতার রাস্তায় হেঁটে যাওয়া – এই সবকিছুতেই সঙ্গী ছোটমাসি। সঞ্চিতার থেকে বছর সাতেকের বড় এই মানুষটিই ছিল ওর কৈশোর-যৌবনের দিনগুলিতে একমাত্র ‘কাছের মানুষ’। টুকরো টুকরো অনেক কথাই ভিড় করে আসছে মনে। ‘আবির্ভাব’বলে একটা উপন্যাস লিখেছিল সঞ্চিতা, বোধহয় তখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। ছোটমাসি উপন্যাসটা শেষ করে বেশ কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসেছিল। সঞ্চিতা তো ছটফট করছে অভিব্যক্তির জন্য। বেশ কিছুক্ষণ পরে বলেছিল ছোটমাসি, ‘অদ্ভুত লিখেছিস! কোনদিনও লেখাটা বন্ধ করিস না। আর আজীবন পড়াশোনাটাও চালিয়ে যাবি। মনে রাখবি, জ্ঞান আর শিক্ষার জন্যই মানুষ অন্য সব জীবের থেকে আলাদা। না হলে ভেবে দেখ তো, এমন আর কি আছে যার জন্য মানুষের সাথে অন্য সব জীবের তফাত করা যায়?’ বুকটা কেঁপে উঠল সঞ্চিতার। সত্যিই এই ক’টা বছরের মধ্যে কতটা পরিবর্তন এসে গেছে জীবনে। কতগুলো দিন পেরিয়ে গেছে, একটা বইয়ের পাতাও উলটে দেখেনি সঞ্চিতা।


রাজীবের সাথে বিয়ের মাস দুয়েক আগেই দিল্লি চলে যায় ছোটমাসি বদলি হয়ে। এই বিয়েতে একমাত্র আপত্তি ছিল ছোটমাসির। বাবার দূর সম্পর্কের এক আত্মিয়ের মাধ্যমে বিয়ের সন্মন্ধ। রাজীব সুদর্শন, মার্জিত, MNC-তে মোটা মাইনের চাকরি, স্বচ্ছল পরিবার, কারোর অপছন্দের প্রশ্নই নেই। কেবল ছোটমাসি রাজীবের সাথে আলাপ করে বলেছিল সঞ্চিতাকে, ‘ওকে বিয়ে করিস না, তোকে চিনি বলেই বলছি, ভাল থাকবি না’। তখন মনে মনে একটু রাগই বোধহয় হয়েছিল ছোটমাসির ওপর। বিয়ে হয়েও গিয়েছিল যথাসময়ে। আজ বুঝতে পারে সঞ্চিতা, ছোটমাসির সেদিনের কথাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দু’টো ভিন্ন জগতের মানুষ একসাথে থাকা যে কতটা অস্বস্তিকর, প্রতি মুহুর্তে অনুভব করে সঞ্চিতা। সম্পূর্ন পৃথক মানসিকতা আর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলা দু’টো মানুষের একসাথে থাকাটাই শুধু হয়, একসাথে পথ চলাটা আর হয়ে ওঠে না। তবু থেকে যেতে হয় আজীবন, হয়ত এটাই অভ্যাস, হয়ত মায়া, হয়ত বা ভালোবাসাও। তবু, কোথায় যেন একটা বিরাট ফাঁক থেকে যায়। মনটাকে নাড়াচাড়া করতে করতেই হাতের কাজগুলো সেরে নিচ্ছিল সঞ্চিতা। বিছানার ওপর ছড়ানো কাপড়-জামাগুলো গুছিয়ে তুলে রাখল আলমারিতে। এলোমেলো হয়ে থাকা জিনিসগুলো রাখল স্ব-স্থানে। সকালের রান্না করা খাবার বের করল ফ্রিজ থেকে, রাতে রুটিটা করে নিলেই হবে। অনেক অনেকদিন পর একটা অদ্ভুত ভাললাগার অনুভুতি মনজুড়ে। টুকটাক কাজ সারতে সারতেই কলিং বেলের আওয়াজ, প্রায় ছুটে গেল সঞ্চিতা।


-বাড়ি চিনতে অসুবিধা হয় নি তো?
- একদম না। একেবারে রাস্তার ওপর তো। কাউকে জিজ্ঞেসও করতে হল না।

কাঁধের ব্যাগটা সোফায় রেখে বসল নিরূপমা। ছিপছিপে গড়নটায় একটু যেন ভারিক্কি এসেছে, ছ’টা বছর তো কম সময় নয়। সঞ্চিতা দেখছিল ছোটমাসিকে।

- একটু মোটা হয়েছ নাকি গো?
- হ্যা, সে তো হয়েছিই, বয়স হচ্ছে না!
- হ্যা, সেই তো। একদম বুড়ি হয়ে গেছ তো!
- বুড়ির দলে না গেলেও বয়সটা কি কম হল! প্রায় চল্লিশ হতে চলল তো। তুই তো পুরো গিন্নি-বান্নি হয়ে গেছিস রে।

হাসল সঞ্চিতা, সব ঘর ঘুরে ঘুরে দেখালো ছোটমাসিকে। অনেকদিন পর আজ হঠাৎ সবকিছু ভীষন ভাল লাগছে সঞ্চিতার। বিকেলের বিষন্নতা কেটে গিয়ে সন্ধ্যেটা পরিপুর্ণতায় ভরে উঠল যেন। রাতের খাওয়াদাওয়া সারা হয়ে গেল দশটা নাগাদ। খাটে এসে বসল দু’জন।

-এবার আসল কথাটা শুনি।

ঈষৎ কেঁপে উঠল শরীর। সঞ্চিতা বুঝতে পারল ছোটমাসির কথা। তবু জিজ্ঞেস করল,

– কি কথা?
- জানিস না তুই?
- ওসব আর হবে না।
- হবে না মানে! আর লিখিস না?
- নাহ, আর হয় না।
- হয় না মানে? সময় পাস না?
- সময় তো আছেই। কিন্তু, লিখতে পারি না।
- লিখতে পারিস না মানে?
- লেখা আসে না। মনের কথা কলম অবধি পৌঁছতে পারে না। সব কিছু গুলিয়ে যায়। লেখার সাহসটাই হারিয়ে গেছে বোধহয়।

কিছুক্ষন চুপ করে বসে থাকে নিরূপমা। বোধহয় বোঝার চেষ্টা করে পরিস্থিতিটা।

- তুই কি ভাল আছিস?

হঠাৎ এই প্রশ্নের কি উত্তর দেবে ভেবে পায় না সঞ্চিতা। তাকিয়ে থাকে ছোটমাসির দিকে।

- লেখা ছেড়ে দিয়ে তুই ভাল আছিস?

আবার এক প্রশ্ন। একটা কষ্টের ডেলা গলার কাছটায় এসে আটকে আছে যেন। অনেক না বলা কথা, অনেক কষ্ট, অনেক অভিমান ভিড় করে আসে মনে। তবু নিরবতা। শুধু ঝাপসা হয়ে আসে চোখের পাতা।

- কি হয়েছে বল তো আমায়।

- আমি সত্যি কিছু লিখতে পারছি না ছোটমাসি। ভাবনাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে মনের ভিতরে, কিন্তু কিছুতেই কলমে ধরা পড়ছে না।

- চেষ্টা করেছিস লেখার?
- হ্যা, কিছুদিন আগেই একটা ছোটগল্প শুরু করেছিলাম। পারলাম না শেষ করতে।
- রাজীব কি বলে? ওকে লেখা পড়িয়েছিস কখনো?
- ওর কথা ছাড়ো। ওর এসব ব্যপারে কোন উৎসাহ নেই। তাছাড়া, আমাদের দু’জনের মানসিকতা একেবারেই আলাদা। ও বড্ড বেশি realistic.

চুপ করে বসে থাকে নিরূপমা, হয়ত সময় দেয় সঞ্চিতাকে। সঞ্চিতা আবার বলে,

- আমার এই না পারার কথাটা যে কাউকে বলব, এমনও কেউ নেই। আমার লেখা হারিয়ে গেছে ছোটমাসি, আমি কি করে ভাল থাকব!!
- জানি, তুই ভাল নেই, লেখা ছেড়ে তুই ভাল থাকতে পারিস না। রাজীবের থেকে mental support পাবি না লেখার ব্যপারে, সেটা আমি আগেই বুঝেছিলাম, তাই তোকে বারণ করেছিলাম সেদিন। তবু বলব, তুই ভুল করছিস। সব মানুষ যে একই রকম ভাবে ভাববে সেটা মনে করাটাই ভুল। রাজীব ওর জায়গায় ঠিক, তুই তোর জায়গায়। তোর লেখার জগৎটাকে সাংসারিক টানাপোড়েন থেকে আলাদা করে দেখ, দেখবি ঠিক পারবি। সংসারটা থাকুক না তার জায়গায়, কর্তব্য পালন করে যাবি প্রয়োজন মত। কিন্তু, সেটার সাথে লেখাটাকে এক করে দেখিস না। দু’টো সম্পুর্ণ পৃথক ক্ষেত্র, এটা মনে রাখিস। আর, তোর লেখার প্রথম পাঠিকা হিসেবে আমি তো রইলামই এখন থেকে।

চোখের জল আর বাঁধ মানে না সঞ্চিতার। ধুয়ে মুছে যেতে থাকে সমস্ত অস্বাচ্ছন্দ্য, মন খারাপ আর অবসাদ। সমস্ত জটিলতা কেটে গিয়ে জীবনটাকে নতুন করে অনুভব করে সঞ্চিতা। হারিয়ে যাওয়া নিজেকে খুঁজে পায় সেই মানুষটার মধ্য দিয়ে যে তার চিরকালের ‘কাছের মানুষ’। কোন কিছুই হারিয়ে যায়নি জীবন থেকে, সব কিছুই একইরকম আছে। শুধু পেরিয়ে গেছে কিছুটা সময়। এই মানুষটার উপস্থিতিতে সেটাই নতুন করে অনুভব করে সঞ্চিতা। এত সহজ সত্যটা এতদিন অদেখা ছিল কি করে! নতুন উদ্দীপনা, নতুন তাগিদ অনুভব করে সঞ্চিতা, আর সময় নষ্ট করার সময় নেই। নিজেকে নিজের কাছে আর একবার প্রমান করার সময় আসন্ন। শুধু এই মানুষটার উপস্থিতিটাই যথেষ্ট।

কথা বলতে বলতে ছোটমাসি কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। সঞ্চিতা তাকিয়ে আছে বন্ধ কাঁচের জানলার বাইরের পৃথিবীটার দিকে। আস্তে আস্তে অন্ধকার কেটে যাচ্ছে, আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে আকাশ। লাল রঙে সদ্য স্নাতসিক্ত সূর্য উঁকি দিচ্ছে পুব আকাশে। শুরু হচ্ছে একটি নতুন দিনের, শুরু হচ্ছে আরো একটি নতুন জীবনের, অনুভব করে সঞ্চিতা। সমস্ত বিষন্নতা কেটে গিয়ে মনটা আজ বাইরের ঐ পৃথিবীটার মতই নতুন আলোয় সিক্ত ও সজীব।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement