বারান্দার দিকের জানালায় চার-পাঁচটা ছেলের মুখ এক হয়ে একটু পরপরই ফিসফিস করছে । আমি সামনের ঘরে ডানদিকে কাত হয়ে শুয়ে আছি । প্রচন্ড মাথা ব্যথায় আমার চোখ দুইটা খুলে আসতে চাইছে । খানিকক্ষণ থেমে থেমে ফিসফিসানির শব্দটা আরো বেশি বিরক্তিকর । কোন রকমে বাম দিকে ঘুরে তাকাতেই চারদিক থেকে এসে একই বিন্দুতে মিলিত হওয়া মুখগুলো মুহূর্তেই জানালার নিচে নুয়ে পড়ে আমার চোখের আড়াল হতে চাইলো । তৎক্ষণাৎ নিজেদেরকে আড়াল করতে পারার সাফল্য উপভোগ করতে গিয়ে সবকয়টা ছেলের মিলিত চাপা হাসি আমাকে আরো বেশি দগ্ধ করে । রাগে বিস্ফারিত হয়ে বিছানায় থেকেই ধমকানোর চেষ্টা করলাম ।
কিন্তু ধমকাতে গিয়ে মনে মনে যা স্থির করলাম তা আর মুখে উচ্চারণ করতে পারলাম না । এখন প্রায়ই মুখে উচ্চারণ করে কথা বলতে পারি না । কথা মুখে জড়িয়ে যায় । তাই লিখে দেখাতে হয় । এজন্য সবসময়ই মোবাইল ফোন সাইলেন্ট করে রাখি । বন্ধুদের কেউ কেউ পাঁচবার-দশবার ফোন করলেও ইচ্ছা হলে গুটি কয়েক শব্দের একটা এসএমএস পাঠিয়ে দায় সারি, ইচ্ছা না হলে এটুকুও করি না ।
বন্ধুরা আমার জন্য অনেক করেছে । কতগুলো চ্যারিটি সংগঠনের সাথে যোগাযোগ করেছে । ফেসবুকে প্রচারণা চালিয়ে চিকিৎসার জন্য টাকা জোগার করেছে । সকাল-সন্ধ্যা রদবদল করে দুইজন- তিনজন করে হাসপাতালে এসে খোঁজ নিয়েছে । দিনদিন চূড়ান্ত পরিণতি স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হওয়ার পরও কয়েকজন আমার পাশে থেকে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে । হাসপাতাল থেকে গ্রামে ফিরে আসার পরও ওরা অক্লান্তভাবে আমার খোঁজখবর নিয়ে চলেছে ।

যাহোক, ধমকের চেষ্টাতে একটা গোঙানির মতো শব্দ হলো বুঝতে পারছি । ভেতরের ঘরে আম্মা ছোটো ভাই-বোনদেরকে ভাত খেতে দিয়েছিলেন হয়তো । একটু আগে বাটির সাথে চামচের টুং টাং শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম । তাছাড়া পড়তে বসলে ছোট বোন পুতুলের গলা ঢুলতে ঢুলতে খাদে নেমে গেলেও খাওয়ার সময় নিজের ভাগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে গলা ঠিকই অনেক উঁচুতে থাকে । তাই খেয়েদেয়ে ওরা গভীর রাত পর্যন্ত শবে বরাতের নামাজের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো এটুকু আন্দাজ করাই যায় । গোঙানির শব্দ পেয়ে আম্মা ভাত ভাঁড়ার চামচ হাতেই আমার ঘরে ছুটে এলেন ।

“ কী হয়েছে বাবা ? কী হয়েছে তোমার ? ”

আম্মার মুখে আদর মাখা ‘তুমি’ সম্বোধন একদিক দিয়ে ভালোবাসায় সিক্ত করে দিলেও অন্যদিকে নিজের অসুস্থতার যন্ত্রনাকেই ঘা মেরে উস্কে দেয় । ছোটবেলায় ছোটবোনকে মেরে কান ফুলিয়ে ফেলার দায়ে বারান্দার খুঁটির সাথে বাঁধা অবস্থায় আম্মার হাতের রামধোলাই খাওয়া , এবং এরপর পুরোনো ডোরাকাপড়ের বাঁধন ছিড়ে দৌড়ে গিয়ে দূর থেকে আম্মার দিকে চেলা কাঠের টুকরা ছুড়ে মারার দায়ে রাতে আবার আব্বার হাতের শক্ত পিটুনি খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়া – এগুলোর আড়ালে যে সুপ্ত ভালোবাসা ছিল তার রস আস্বাদনের মাঝেই একধরণের পরিতৃপ্তি ও স্বস্তি ছিল । এই পরিতৃপ্তিতে অভ্যস্তও হয়ে পড়েছিলাম । ভালোবাসা বিষয়টা খোলামেলা হয়ে গেলে কখনো কখনো তা অস্বস্তিকর ও স্বার্থপর হয়ে পড়ে । তা মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন, প্রেমিকা বা অন্য যে কারো ভালোবাসাই হোক । তাই আমার অসুস্থতা খুব বেশি বাড়ার পর থেকে আমার প্রতি আম্মা-আব্বা বা পরিবারের অন্য যে কারো ভালোবাসার সরাসরি বহিঃপ্রকাশ প্রায় সময়ই আমাকে অস্বস্তির মুখে ঠেলে দেয় । আম্মার সপ্রশ্ন স্নেহময় চোখ জোড়ার সামনে নিজের চোখজোড়া মেলে রাখতে পারলাম না । চোখ বুজে জানালার দিকে আঙ্গুলের ইশারা করলাম ।

“কী ওইখানে ? আচ্ছা, আমি দেখছি । তুমি কাত হয়ে ঘুমাও ।”

এইটুকু বলে আম্মা আঁচল দিয়ে আমার মুখের আশপাশটা মুছে দিলেন । এতক্ষণে আমার উপলব্ধি হলো যে গোঙানির কারনে আমার মুখের আশেপাশে লালা ছড়িয়ে পড়েছিল । এরপর আম্মা আমার বাম ডানায় ধরে আমাকে খানিকটা ডানদিকে কাঁত করে দিলেন । এরই মাঝে বেরিয়ে আসা চোখের পানিটুকুকে গোপন করার জন্য আমি নিজে থেকেই আরেকটু বেশি কাত হতে গেলাম ।

বারান্দার দিকের দরজাটা খোলাই ছিল । আম্মা বেরিয়ে গিয়ে ছেলেগুলোকে ধমকালেন,

“ আসলে ভেতরে আসবি , না আসলে নাই । এইখানে লুকিয়ে থেকে চোরের মতো উঁকি –জোকি মারছিস কেন তোরা ?”

এরপর ভেতরের ঘরে গিয়ে ছোট ভাই আরিফকে পাঠিয়ে দিলেন । আরিফ এইমাত্র খেয়ে উঠে ঝাল মুখে ‘উ’-‘হা’ করতে করতে আমার খাটের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল । জানালায় উঁকি মারতে থাকা ছেলেগুলোর পায়ের শব্দের সাথে আরিফের পায়ের শব্দ মিশে গিয়ে শব্দগুলো বারান্দা মাড়িয়ে ক্রমেই বাড়ির পূবের রাস্তার দিকে গিয়ে অস্ফুট হতে লাগলো । সেই অস্ফুট শব্দগুলোর সাথে হারিয়ে গিয়ে আমি আমার শৈশব খুঁজতে লাগলাম ।

স্কুলে পড়ার সময় সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে যাওয়া রীতিমত স্বপ্নের ব্যাপার ছিল । তখন মনে হতো শবে বরাত , শবে মেরাজের রাতগুলো সেই স্বপ্ন পূরণ করার জন্যই আসতো । অমুকের গাছের পেয়ারা চুরি, তমুকের গাছের ডালিম চুরি করতে গিয়ে অল্পের জন্য ধরা খাওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া – এসব কাজে সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগটুকুর ভালই সদব্যবহার (!) করা হতো । বাজারের মসজিদে নামাজ পড়তে যেতাম । আর কাউকে পাই আর না পাই আহসান সবসময়ই আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকতো । কোন রকমে কয়েক রাকাত নফল নামাজ পড়েই চুপিচুপি বেরিয়ে গিয়ে শার্টের কলার উঁচিয়ে নিস্তরঙ্গ গ্রামীণ বাজারময় দুইজনের অপার স্বাধীনতায় চষে বেড়ানো শুরু হতো ।
বাজারের উত্তর মাথায় বেশ পুরোনো একটা বটগাছ । বটগাছের নিচে রাতের বেলা আশেপাশের গ্রামের রিকশাওয়ালাদের অনেকেই সারি করে নিজেদের রিকশাগুলোকে রেখে যেত । এলাকায় চুরি-চামারি প্রায়ই হতো । তবে সাইকেল রিকশা চুরির ঘটনা খুব একটা শোনা যেত না । তাই অধিকাংশ রিকশাওয়ালাই রিকশাগুলোকে তালা মেরে যাওয়ার কোন প্রয়োজন মনে করতো না । রিকশার সারি থেকে খুব সাবধানে কোন একটা রিকশা বের করে নিয়ে গিয়ে পালাবদল করে আমি এবং আহসান দুইজনেই চালানোর চেষ্টা করতাম । এরকম করে রিকশা চালানোটা শিখে ফেলেছিলাম আমরা দুইজনেই ।

একবার শারদ রাতে শবে বরাত । শরতের ঝকঝকে রাতের আকাশের হলদে চাঁদটা ধীরে ধীরে রূপালি আলোর অলঙ্কার পড়ছিলো মাত্র । আর সেই অলঙ্কারের দীপ্তি হালকা কুয়াশার আবরণ ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ছিলো আমার দেখা পুরো পৃথিবীটা জুড়ে । সেই পৃথিবীতে তখন পিনপতন নীরবতা । পৃথিবীবাসী প্রাণীগুলো তখন গভীর ধ্যানে মগ্ন । খুব সাবধানে একটা রিকশা বের করে নিয়ে এসে পা টিপে টিপে যততুকু পারা যায় কম শব্দ করে রিকশাটাকে ঠেলে দুইজনে মিলে মসজিদের পাশের ব্রিজে তুললাম । এরপর মূল সড়কে গিয়ে আহসান বসলো চালকের সিটে । আমি পেছনে সিটে । রাস্তার দুইপাশের রাতা করচ গাছের ঘন-দীর্ঘ ছায়ার ভেতর দিয়ে আমাদের রিকশাটা ছুটে চললো কটমট সঙ্গীত সৃষ্টি করে ।
দুই কিলোমিটার রাস্তার পরের কালভারটটার কাছ থেকে রিকশা ঘুরিয়ে এবার আমি বসলাম চালকের সিটে । আহসান পেছনের সিটে । মসজিদের পাশের ব্রিজটার সাথে যুক্ত হওয়া সড়কের অংশটুকু নিচ থেকে খাড়া হয়ে উপরে উঠে গিয়ে ব্রিজের সাথে লেগেছে । আগেরবার ব্রিজ থেকে নামার সময় এই জায়গাটুকুকেই অনেক ঢালু মনে হয়েছিল । এবং এজন্য তখন ব্রিজ থেকে এই জায়গা দিয়ে রিকশাটা নামানোর সময় সতর্কভাবে পেছনের চাকার ব্রেক ধরে নামাতে হয়েছিল । কিন্তু উল্টোপথে এখন আবার এই জায়গাটা দিয়েই রিকশা তোলার সময় আহসানকে রিকশা থেকে নেমে গিয়ে পেছন থেকে ঠেলতে হচ্ছে । আমার আধো দাঁড়িয়ে মারা প্যাডেল আর আহসানের ঠেলাতে ধীরে ধীরে রিকশাটা ব্রিজে উঠানোর পর আমরা দুইজনেই যখন স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়াবো , ঠিক তখনই একটা লোক ছায়ার মতো আমাদের কাছাকাছি এগিয়ে এসে দাঁড়ালো ।
“ কে ?”
খুব পরিচিত গলা । উত্তর দেওয়ার সাহস পাচ্ছি না । ভয়ে দুই হাঁটুর জোড়া প্রায় পুরোপুরিই অবস । টর্চের তীব্র আলো আমার চোখের দিকে ধেয়ে এল । আব্বা আমার গালে সজোরে একটা চড় মারলেন । আমার চিৎকারের শব্দ পিনপতন নীরব পৃথিবীটার ধ্যানে ক্ষণকালের জন্য বিঘ্ন ঘটালো হয়তো ।

হঠাত বুকের ভেতরটা চিনচিনিয়ে উঠলো । আমি আঁতকে উঠে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি আব্বা আমাকে ডাকছেন । এরই মাঝে ঘেমে উঠে পুরো শরীরটা একবার কাঁটা দিয়ে উঠলো । আব্বা একটা কাগজের প্যাকেট খুলে একটা চকচকে পাঞ্জাবি চোখের সামনে মেলে ধরলেন । একই সাথে আমার তিন বোনই পাঞ্জাবিটা হাত দিয়ে চেখে দেখার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলো । তিনজোড়া চোখেই তৃপ্তির ঝিলিক ।

কয়দিন পরই রোজা । তারপরইতো ঈদ । শবে বরাতে নতুন কাপড় এর আগে কখনোই পাই নি । অন্য সময় হলে আজকে আমার নতুন কাপড় পাওয়া নিয়ে ঘর জুড়ে কানাঘুষা শুরু হতো । একজন মুখ বেজার করে পড়তে বসতো । একজন না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তো । আরো নতুন কিছুও হয়তো ঘটতে পারতো । বড় হওয়ার পর থেকে দুই ঈদে নিয়মিত কাপড় কেনা খুব কমবারই হয়েছে । এক ঈদে দেখা গেল ভাই-বোন সবার জন্য কাপড় কেনা হয়েছে , কিন্তু আম্মা-আব্বা কারোরই নতুন কাপড় নেই । আমি বড় হয়ে গেছি বলে আমারও নেই । আরেক ঈদে দেখা গেল আম্মা- আব্বাসহ সবার জন্যই নতুন কাপড় কেনা হয়েছে , কিন্তু আমার জন্য কেনা কাপড়টা আমার মোটেও পছন্দ হলো না । তাই কাপড়টা না পরে আবার দোকানে ফেরত পাঠালাম । এই নিয়ে আব্বা রাগ করলেন । আমিও নাক ফুলালাম । বুঝতাম না , কেন আব্বা আমার পছন্দের কোন গুরুত্ব দিতেন না ।
কিন্তু আজকের পাঞ্জাবিটা সত্যিই আমার খুব পছন্দ হলো । চকচকে রঙিন পাঞ্জাবি । আব্বা আমাকে মৃদু স্বরে তাড়া দিচ্ছেন,
“উঠো, উঠো । পাঞ্জাবিটা পরো । দেখি কেমন লাগে। ”
আম্মা আমার কানের কাছে মুখ এনে আরো মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন ,
“উঠতে পারবে ? না উঠতে পারলে থাক । কষ্ট করার দরকার নেই । চোখ বুজে থাকো ।”
আব্বাও তৎক্ষণাৎ আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে আম্মার কথাটাকে সমর্থন জানালেন । খাটের পাশ থেকে তাকিয়ে থাকা বাকি তিনজোড়া ছলছল করে উঠা চোখেও একই কথা ফুটে উঠলো ,
“উঠতে পারবে ? না উঠতে পারলে থাক । কষ্ট করার দরকার নেই । চোখ বুজে থাকো ।”
বুকের ভেতরটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়তে চাইলো । গভীর রাতের ধ্যানমগ্ন সময়টার অপেক্ষা করতে থাকলাম অধীর হয়ে । একসময় সময়টা এল । বালিশের নিচ থেকে আমার নীল মলাটের খাতাটা বের করলাম । কাঁত হয়ে লিখতে শুরু করলাম গভীর মনোযোগে । হয়তো এই খাতার পাতাগুলোতেই ভবিষ্যতে আমি অতীত হয়ে থাকবো জীবনের পূর্ণতা নিয়ে ।