লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ আগস্ট ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ২টি

সমন্বিত স্কোর

২.৪

বিচারক স্কোরঃ ০ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftইচ্ছা (জুলাই ২০১৩)

বিসর্জন
ইচ্ছা

সংখ্যা

মোট ভোট ২৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.৪

নাসরীন

comment ১০  favorite ০  import_contacts ৯০৬
রান্নাঘরের চৌকাঠে বসে ফুপিয়ে কাঁদছে রানু...ইনিয়ে বিনিয়ে শরীর দুলিয়ে বিলাপ ধরেছিল উচ্চাঙ্গে, একটু আগে ধমক খেয়েছে , তাতে আরো বেশি করে কান্না পাচ্ছে, চোখ মুখ ফুলে রক্তজবার মত হয়েছে, কষ্ট গুলো ভেলা পাকিয়ে গলার কাছ টায় এসে আটকে আছে, চোখের পানি তে দু গাল ভেসে যাচ্ছে, আর মানুষ টা একবার ফিরে ও যদি দেখত।
দেখবে কি করে, আলম এর এখনো গোছগাছ শেষ হয় নি। দু বছরে কম জিনিষ লেগেছে তার একার সংসারে।
হাড়ি পাতিল বাসন কসন, থালা বাটি মায় ঘরে পরার চটি টা পর্যন্ত প্যাক করতে হচ্ছে নিজেকেই। রানু গতকাল থেকে কাজ কর্মে হাত লাগাচ্ছে না, গুম হয়ে বসে আছে, সাড়া শব্দ কথা বার্তা বন্ধ। আজ সকাল থেকে বিকট স্বরে পাড়া খবর করে কাদতে বসেছে, আলম ফের একটা ধমক দেয়ার প্রস্তুতি নিল
-কি রে , কাদতে মানা করলাম না , কাদছিস কেন ? চিৎকার করে ত কান ফাতিয়ে দিলি
রানু জলভরা ভারন্ত মেঘের মত দু চোখ তুলে তাকায়, মুখে আচল চাপা। ভাবছে, চিৎকার করে কাদতে পারলে ত ভালই ছিল, বুক টা হাল্কা হত।
-তুমি কি সত্যি সত্যি চললে দাদা ?
-তুই যেভাবে পাড়া কাঁপাচ্ছিস কেদে কেদে, টিকতে দিচ্ছিস ? বললাম একটু হাত লাগা, আমি একা কদিক দেখি বল তো।
-আমাকে তোমার সাথে নেবে দাদা ? তোমাদের বাসায় তোমার মায়ের কাছে ? নাও না আমাকে তোমার সঙ্গে করে......।
আলম পিছন ফিরে চোখের পানি আড়াল করে। মনে মনে বলে, কি লাভ মায়া বাড়িয়ে, কি হয় এতে। সে নিজে ও তো মায়ার টানে ফিরে এসেছিল জন্মস্থানে, শিকড়ের কাছে, কি লাভ টুকু তার হল। লজ্জা অপমান গ্লানি র পাহাড় সম বোঝা কাধে নিয়ে মাথা নিচু করে চোরের মত পালিয়ে যেতে হচ্ছে, একটা সান্ত্বনা র কথা নেই, একফোঁটা সহানুভুতি র অশ্রু নেই, নেই এক দণ্ড আন্তরিক প্রশ্রয়। শুধু আছে শক্তি র দম্ভ, বিবেকের পৃষ্ঠ প্রদর্শন, প্রবৃত্তির কাছে বৃত্তির অসহায় আত্মসমর্পণ।
দরজায় টোকা পড়ছে, কে এল আবার।
রানু গিয়ে দরজা খুলে দেয়। আফতাব উদ্দিন সাহেব এসেছেন, স্থানীয় হাইস্কুলের হেড মাষ্টার। আলম একমাত্র চেয়ার টা এগিয়ে দেয়।
-গোছগাছ শেষ করে এনেছ দেখছি। তোমার বাস কয়টায় ?
-জী, দুপুরে খানা খেয়ে বেরিয়ে পরব। বাস তিনটায়।
-সেই ভালো, সেই ভালো।
আর কোনও কথা খুজে পান না আফতাব উদ্দিন সাহেব। হাতের লাঠি টায় দু হাতের ভর রেখে মাথা নিচু করে বসে থাকেন চুপচাপ। ভাবছেন, এক এক করে সবাই চলে যায়। আর তিনি, সেই কবে কোন দূর অতীতে এই ছায়া ছায়া দুর্গম গাঁয়ে এসে ভিত গড়ে ছিলেন জীবিকার তাগিদে তিনি আর যেতে পারলেন না। বৈরী প্রকৃতি , অস্বাস্থ্যকর আলো হাওয়া , গণ্ড মূর্খ মানুষ, কুসংস্কার , সর্বোপরি ক্ষমতাবান দের অবাঞ্চিত হস্তক্ষেপ , কি দেখেন নি? যুদ্ধ করে করে এতগুলো বছর পার করে দিয়েছেন এই অভিশপ্ত অজ পাড়ায়। আর পারেন না। দৃষ্টি সংকুচিত হয়ে এসেছে, সাহস হয়েছে খাটো। এখন কেবল মানিয়ে চলেন, সবার সাথে, সবকিছুর সাথে। আলম কে ও সেই পরামর্শই দিয়েছিলেন, আপোষ করার হিতোপদেশ। ওর দিকে তাকিয়ে নিজের দূরাগত যৌবনের ছবি মনে পড়ে।
বাস ছুটছে শহর অভিমুখে। মাঠ প্রান্তর গাছ বন নদী পাহাড় ক্ষেত খামার। পেছনে সরে যাচ্ছে তারাবুনিয়া গ্রাম। উল্টো দিক থেকে ধেয়ে আসা বাতাসে চুল উড়ছে আলমের। চোখ বুজে আসতে চাইছে ক্লান্তি তে। কিসের ক্লান্তি কে জানে।
দু বছর আগে যখন এই রাস্তা ধরেই উল্টো দিকে বাস তাকে নিয়ে ছুটছিল তারাবুনিয়ার দিকে, সেদিন ও এমনি মন খারাপ লেগেছিল। চিরচেনা শহর, আবাল্য পরিচিত গলি উপগলি , প্রানপ্রিয় বন্ধুবান্ধব, আড্ডা- এসব ছেড়ে সে কি আদৌ থাকতে পারবে ? মা, মা তো তার শরীরের হাত পা গুলোর মতই অবিচ্ছেদ্য অংশ। মা কে ছেড়ে ছোট বোন টা ছেড়ে জন্মভুমির মায়ায় কি সে আদৌ ধরা দেবে ? এতটা প্রশ্রয় কি আশা করতে পারে তার দুরন্ত শৈশব কাটানো তারাবুনিয়ার মাটির কাছে ?
তারাবুনিয়া তাকে প্রতি পদে পদে অপদস্ত করেছে, তার সব শুভ আকাঙ্ক্ষা গুলো কে দূরে ঠেলে দিয়েছে অসীম অবজ্ঞায় ,তাকে নিষ্ঠুরতা র পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে তারাবুনিয়া। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এই মাটি এই আলো বাতাস এই মানুষ গুলো তোমার নয়। এখানের একটা অলিখিত আরোপিত আইন আছে, আছে এর নিজস্ব সংবিধান। সেই আইনেই এই গ্রাম চলছে, চলবে।
স্থানীয় স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষকের পদে যোগ দিতে এসেছিল আলম। তার শহুরে চালচলন কথাবার্তা ধ্যান ধারনা অন্যদের সাথে মেলামেশায় ব্যাঘাত ঘটায়নি কখনো। সবাইকে নিয়ে বিশাল একটা পরিবার এর মত। স্কুলের হেড মাষ্টার আফতাব উদ্দিন সাহেব বয়স্ক লোক, অমায়িক সজ্জন । শুরু তে তার বাড়িতে থাকা খাওয়া চলত, পরে নিজেদের ভিটেয় দোচালা ঘর তুলে তাতে উঠে যায় আলম। নিজের ঘরে নিজের মত করে অনিয়ম করে থাকার যে আনন্দ অন্যের বাড়িতে তার সুযোগ মেলে না।
তার একার সংসার, ঝুটঝামেলা নাই। বিকেল হলে সমবয়সী শিক্ষক রা দল বেঁধে চলে আসতেন আলম এর বাড়ি তে, এরা তো বেশীর ভাগ তার বাল্যবন্ধু, এদের সাথে এই গ্রামের পথে ঘাটে আলো হাওয়ায় সে ছুটে বেরিয়েছে একসময়। মাঝখানের দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা আড্ডায় কখনো প্রভাব ফেলতে পারেনি, সন্ধ্যা লাগার পর পর জমজমাট আসর, তার দীর্ঘ বিরতি তে গ্রামের কোথায় কার কি হয়েছে, কে কি হতে পারত-কপালের ফেরে কে কোথায় উঠে গেছে- ভেসে গেছে, আয়নাল ব্যাপারী কি করে বেগুন এর ব্যাবসা থেকে ব্ল্যাকের কারবারে ঢুকে লাখের বাতি জ্বেলেছে, স্কুলের গভর্নিং বডি র মেম্বার হয়ে কেমন অন্যায় জোর খাটাচ্ছে , চেয়ারম্যান মেম্বার রা ইলেকশান এ কতরকম দুর্নীতি করে, কিভাবে স্কুলের জন্য সরকারি বরাদ্দ প্রভাবশালীদের ভোগে লেগে যাচ্ছে বছর বছর........
বছরখানেক নিরুপদ্রপে গেল।
শীতকাল শুরু হল। হাওর অঞ্চল, শীত বলে শীত, একেবারে রক্তকনা পর্যন্ত জমাট বেঁধে জাবার জোগাড়। মাঠে মাঠে ধান কাটার উৎসব। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ, ছাত্র শিক্ষক সবার অবসর। সময় কাটানোর নানা ফন্দি বের করে বন্ধুরা, ফন্দির সাথে ফাণ্ডের ম্যাচিং না হওয়াতে কোনটাই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠে না। এরমাঝে একদিন তপন নিয়ে এল এক খবর- স্কুলের মাঠে যাত্রাপালা হবে, গানের আসর বসবে। সহর থেকে আসবে নাচনেওয়ালি। সার্কাস, ম্যাজিক, গরুর লড়াই, তিন দিন ধরে চলবে মেলা।
আলম বেশ উৎসাহিত বোধ করে, গ্রামীন মেলার চিরন্তন আকর্ষণ জেগে উঠে রক্তে রক্তে। অন্য দের কোন ভাবান্তর না দেখে একটু অবাক হয় আলম
-ব্যাপার কি বল তো, তোরা এমন ঝিম ধরে গেলি মেলা র কথা শুনে, interest পাচ্ছিস না মনে হয়
রাজিব ম্লান সুরে বলে- ব্যাপার তো একটা আছেই, শুনলে তুই আর বেশি চিমসে যাবি।
কিসের যেন গন্ধ পায় আলম, অশুভ একটা সঙ্কেত বেজে উঠে মস্তিষ্কে। কৌতূহল নিয়ে বলে- খুলে বল তো বিষয় টা। মনে হচ্ছে ভালো কিছু না।
এরপর সবার কথার টুকরো গুলো জোড়াতালি দিয়ে দাঁড়ায় এরকম- বছর তিনেক আগে আয়নাল ব্যাপারী দীর্ঘ দিন নিরুদ্দেশ থাকার পর যখন লাখপতি হয়ে গ্রামে ফিরে এল, তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে বসেছিল এমনি এক মেলা। গ্রামের অথর্ব চেয়ারম্যান, অর্থলোভী মেম্বার সবার নিরঙ্কুশ সহযোগিতা আর সমর্থনে তিন দিন ধরে মেলার নামে চলল অসুস্থ সংস্কৃতির অশ্লীল প্রদর্শনী, উদ্দাম বেলেল্লাপনা আর গ্রামীন পরিবেশের চরম অবমাননা। গ্রামের কিশোর তরুনের দল এমন মজা দেখেনি কোনোদিন, অশিক্ষিত চাষা ভুষোরা ধান বেচা কাঁচা পয়সা নিয়ে তিন দিন ধরে মজে রইল নাচে-গানে। গ্রামের বখাটে গ্রুপ নাচনেওয়ালী নিয়ে পথে ঘাটে রঙ তামাশা যাচ্ছেতাই করেছে, কেউ টু শব্দ করার সাহস করেনি। করবে কি করে, এই গ্রুপকে প্রত্যেক ইলেকশনে চেয়ারম্যান, মেম্বার রা বাপ ডাকে। সামনে ও ডাকবে।

সব শুনে আলম সত্যি চিমসে যায়। মুহূর্তেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে ঘুমিয়ে থাকা বিবেক- স্কুলের মাঠে এমন একটা নোংরা কাণ্ড ঘটতে যাচ্ছে, হেডস্যার কিছু বলবেন না ? গ্রামের ময়মুরুব্বীরা কিছু বলবেন না ? মগের মুল্লুক ?
-মগের মুল্লুক, জোরের মুল্লুক যাই বলিস এই গাঁয়ের ময়মুরুব্বী ওই আয়নাল বেপারী। হেডস্যার কি বলবে, গতবারের স্কুলের খেলাধুলোয় বেপারী মোটা চাঁদা দিয়েছে, এক বান্ডিল টিন দিয়েছে তুফান এর পরে, এম পি সাহেব এলে বেপারীর বাড়ী তে চা পানি খায়, স্কুলের গভর্নিং বডি তে ওর পরে কোন কথা চলে না । চাকরির ভয় , পেটের দায় কার নাই ? কে কথা বলবে এগুলো নিয়ে ?
আলম ঝাড়া কয়েক মুহূর্ত নিস্পলক তাকিয়ে থাকে , কথা গুলো হজম করার চেষ্টা করে। অবশেষে ধীর, স্থির, শান্ত গলায় বলে- আমি বলব কথা। বলতে হবে। একটা অন্যায় কে সবাই মিলে প্রশ্রয় দিলে এটা একটা সময় নিয়ম হয়ে দাঁড়াবে, ঠেকানো যাবে না আর। হেডস্যার কিছু না বলে যে অন্যায় টা মেনে নিচ্ছেন আমি তা মেনে নিতে পারি না। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাকে কাপুরুষ বলুক আমি তা চাই না।
আলম এর একগুঁয়েমির খবর নিমিষেই পৌঁছে গেল হেডস্যার এর কানে। দুদিন পরে আলম কে ডেকে পাঠালেন নিজের অফিসে।
-এইসব কি শুরু করলে আলম, বাঘের ডেরায় বাস করে বাঘের সাথে লড়াই করে কেউ ? এইসব মতি বুদ্ধি ছাড়ো। চাকরি করতে এসেছ, চাকরি টাই ঠিকঠাক কর , সব্ দিকে চোখ দিলে চলে?
-সব দিকে চোখ তো আমি দিই নাই স্যার, এই স্কুলে আমি শিক্ষকতা করি, এর ভালো মন্দ ন্যায় অন্যায় দেখার দায়িত্ব কিছুটা আমার উপর ও বর্তায়। আমি শুধু তাই দেখছি।
-তা ও তোমার দেখা লাগবে না। আমি স্কুলের হেডমাস্টার, আমিই তা দেখব। তোমাদের মত চিন্তা করে স্কুলটাকে আমি তো আর ভাসিয়ে দিতে পারি না।
আলম মাথা নিচু করে বসে থাকে চেয়ারে পিঠ সোজা করে। মনে মনে ভাবে- আপনি যে কি ভালো মন্দ দেখবেন তা তো জানাই আছে। না নিজে প্রতিবাদ করবেন, না আর কাউকে করতে দেবেন।
আলমের নীরবে বসে থাকার ভঙ্গি টার মধ্যে কিছু একটা ছিল, অবিচল, অনড়, অনমনীয় একটা দাঁড়ি চিহ্ন। আফতাব উদ্দিন সাহেব অক্ষম ক্রোধে ফেটে পড়েন
-তোমরা আজকাল কার ছেলে পেলে রা বাস্তবতা বোঝ না, বোঝার চেষ্টা ও কর না, আমার তিন কাল গিয়ে এক কাল এ এসে ঠেকেছি, আমি তো আর অবুঝের মত মাথা গরম করে একটা কিছু ঘটিয়ে বসতে পারি না। আমাকে সব দিক ভেবে চলতে হয়। খামাকা ফাল পেড়ে যুদ্ধ বাধাব একটা, লাভ কি হবে ? এসব ঢের দেখা আছে। কত জন এল গেল। উনি এসেছেন বীরপুরুষ সাজতে।
তোপের মুখে কিছুই মুখে আসে না আলম এর। যে লোক টা চোখ মেলে রেখে ও অন্ধ সেজে থাকে তার দৃষ্টি তে কিছু পড়ার কথা না। শুধু দিনযাপনের জন্যই এদের বেচে থাকা, শামুকের মত গুটিয়ে, কচ্ছপের মত দীর্ঘজীবন। এই জীবনে কতজন তাদের মাড়িয়ে যায় , কতজন কতভাবে ধাক্কা মেরে এদের উচ্ছেদ করে দেয়, এরা ভাসতে থাকে শ্যাওলার মত, কচুরিপানার মত। তিন কাল ভাসতে ভাসতে শেষ কালে এসে এরা বিসর্জন দেয় লাজলজ্জা, অপমানবোধ, ন্যায়অন্যায় আবেগ বিবেক বুদ্ধি সমাহিত করে লৌকিকতার কবরগাহে।
বাসায় ফিরে সটান শুয়ে পরে আলম, রানু ভাত খাওয়ার জন্য কয়েকবার ডাকাডাকি করে , উঠতে ইচ্ছে করে না। কি এক অসীম ক্লান্তি পেয়ে বসে । চোখ বুজতেই ঘুমে তলিয়ে যায়।
অনেকক্ষণ পর দরজা ধাক্কানোর শব্দে ঘুম ভাঙ্গে। বাইরে অন্ধকার ঘনিয়েছে, মরার মত ঘুমিয়ে ছিল বলে টের পায়নি। রানু বৈকালিক পাড়া ভ্রমনে গেছে। এ সময় কে এল। আলম চোখ ডলতে ডলতে দরজা খুলে দেয়। একটু অবাক হয় এমন অসময়ে হেডস্যার কে দেখে। হেডস্যার ও অবাক গলায় ব্যস্ততার সুরে বলেন
- কি আলম, সাঁঝ বেলায় ঘুমাইতেছ, ঘরে বাইরে বাতি জালাও নাই, শরীর ভালো তো ?

আলম সালাম দিয়ে চেয়ার খানা এগিয়ে দেয়। নিজে বিছানায় বসে বলে
- শরীর ভালো স্যার। আপনি বসেন, আমি একটু চা করি । রানু টা ও আজকে এতক্ষন বাইরে।
- আ হা হা......তোমার ব্যস্ত হইতে হইব না। আমি চা পানি খাব না। বয়স হইছে তো, অবেলায় খাইলে শরীরে সয় না। তুমি হাত মুখ ধুইয়া আস, গফসফ করি, ভালমন্দ।
আলম গামছা কাধে ফেলে বেরিয়ে যায়। কল পাড়ের দিকে যেতে যেতে বোঝার চেষ্টা করে আফতাব উদ্দিন সাহেব এর আকস্মিক আবির্ভাবের কারণ। উনি কি দুপুরে স্কুলে বলা কথাগুলো কে আরেকবার শান দিয়ে আলম এর মগজে সেট করার উদ্দেশ্যে এসেছেন, নাকি অনুতাপ করতে এসেছেন ? যে উদ্দেশ্যেই আসুন, আলম মনস্থির করে নিজের অবস্থান থেকে একচুল সরবে না।
হাত মুখ মুছে ঘরে এসে বাতি জ্বালায় আলম, রানু ফিরেছে, চায়ের পানি ফুটছে চুলোয়। বিছানায় বসে আলম হেডস্যার এর মুখোমুখি।
- দুপুরে অনেক রাগারাগি করছি তোমার সাথে, মনে রাইখ না । বয়স হইছে, সবসময় মেজাজ কন্ট্রোল করতে পারি না। তুমি বাবা কিছু মনে ধইরা রাইখ না।
অপ্রস্তুত এর মত কাষ্ঠ হাসি হেসে আলম তাড়াতাড়ি বলে -না না ঠিক আছে। আমি কিছু মনে করি নাই। ভুলে গেছিলাম।

- কথা কি জানো বাবা, যেই দেশে যে নিয়ম, সেইটা মাইনা চলন লাগে। এই রাবণের রাজত্বে অনিয়ম ই নিয়ম, কি করবা।
- আমাদের কি স্যার কিছু করার নাই ? আপনি বলছেন রাবণ রাজত্ব, তাই যদি হয় এ রাজত্ব তো আমাদের ই হাতে গড়া। আমরা ই লাই দিয়ে এই সাম্রাজ্য বাড়িয়েছি।
- বাবা রে, তোমার এই বয়স টা এক কালে আমার ও ছিল। অন্যায় অবিচার আমি ও কম দেখি নাই। মুখ খুলতে এক পা আগাইছি, চাকরির ভয়ে তিন পা পিছাইছি। আমি সংসারী মানুষ, ছেলেমেয়ে
নিয়ে থাকি, চাকরি টা চলে গেলে পথে বসবো। এই ভয় করে করে জীবন টা পার করলাম।
আলম চুপ করে শোনে, এইসব কথার কোনও উত্তর হয় না। তবে সেই মুহুরতে একটা চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে সে – এইভাবে খোলস আবৃত হয়ে মাথা নুইয়ে আর নয়, কপালে যাই থাকুক, এই তারাবুনিয়ার পাঠ সে চুকিয়ে দেবে চিরতরে। কি হবে, কিছুদিন বেকার থাকতে হবে, একটু টানাটানি চলবে সংসারে, টিউশনি করে দিন আনি দিন খাই অবস্থা যাবে কিছুদিন। আবার কিছুদিন চাকরির সন্ধানে সকালসন্ধ্যা ঘুরপাক খাবে, তা ও ভালো। তার জন্য আজন্ম লালিত সংস্কার , বিবেকবুদ্ধি, শিক্ষা বিকিয়ে এই অভিশপ্ত পাড়াগাঁয়ের নির্বোধ আর অর্বাচীন মুরুব্বীদের পা চেটে পড়ে থাকার কোনও অর্থ হয় না। সে মানুষ হয়ে জন্মেছে, কচ্ছপের মত বেচে থাকতে নয়।
চোখ দুটো অকারণে জলে ভরে উঠে। আলম বুঝতে পারে কোথায় যেন একটা বন্ধন গাঁথা হয়েছিল নিভৃতে, গোপনে। এই বন্ধনের কাছে নিজের শুভ্র বিবেক, আন্তরিক শুভকামনা হার মানতে পারে নি। জটিল একটা টানাপড়েন এর অঙ্ক সমাধান না করেই ফেলে আসতে হয়েছে, তার জন্য কোন দুঃখবোধ হয় না। জগতে এই ই হয়, ক্ষমতাবানদের ইচ্ছার দামে বিক্রি হয়ে যায় দুর্বলের উপচিকীর্ষু তা। ন্যায়-অন্যায় আলো-অন্ধকার হাত ধরাধরি করে হাঁটে। ঈশ্বরের পাশার দান কখন উলটে যায় কেউ বলতে পারে না।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement